রিয়াজ ওসমানী
২৭ মে ২০২৩
অনেকের মাঝে প্রশ্ন আসতেই পারে যে বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র তথা পশ্চিমাদের চুলকানি কেন? এর উত্তর লুকিয়ে আছে বিগত এবং আগামী দিনগুলোতে। একটি জনবহুল কিন্তু যুদ্ধ বিধ্বস্ত হত দরিদ্র দেশ অজস্র রাজনৈতিক ও আবহাওয়া জনিত বিপর্যয় সত্যেও ৫০ বছরে তার মোর ঘুরিয়ে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে নিজেদের মেধা ও বন্ধুপ্রতিম দেশগুলোর সহায়তায়। এবং দেশটির অর্থনৈতিক শক্তি, যা ক্রমে বেড়েই চলছে, তা মৌমাছিকেও টানে।
তার উপর রয়েছে বাংলাদেশের ভৌগলিক অবস্থান এবং সাম্প্রতিক কিছু আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্বের মাঝে দেশটির কিছু উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারার সম্ভাবনা। এই ভূমিকা পশ্চিমা দুনিয়ার অনুকুলে যেতে পারে, আবার রাশিয়া-চীনের অনুকুলেও, যার সিদ্ধান্ত বাংলাদেশকেই নিতে হবে। আর এই সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পশ্চিমা দুনিয়া এখন সচল।
কিন্তু একটি সম্ভাব্য দারিদ্রমুক্ত এবং অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ বিশাল জনগোষ্ঠীর দেশের আকর্ষণ যেমন অনস্বীকার্য, ঠিক তেমনি একটি গণতন্ত্রহীন, বাকস্বাধীনতাহীন, মুক্ত গণমাধ্যম ও বিচারবিভাগহীণ দেশ সেই আকর্ষণকে যথেষ্ট দমিয়ে ফেলে। এই মনোভাব অন্তত পশ্চিমাদের মনে বিদ্যমান, এবং আমরা অনেক বাংলাদেশিরাই এর সাথে একমত হতে পারি। বাংলাদেশকে যদি ভূরাজনৈতিক অঙ্গনে নেতৃত্ব দেয়ার প্রশ্নই উঠে, তখন অর্থনৈতিক শক্তির সাথে গণতন্ত্র, সুষ্ঠ নির্বাচনের প্রক্রিয়া, ধর্মনিরপেক্ষতা, সকল শ্রেণির মানুষদের জন্য সকল ও সমান মানবাধিকার, আইনের শাসন এবং সকলের জন্য আইনের সাম্যতাকেও দৃষ্টান্ত হিসেবে বিশ্বকে দেখাতে হবে।
এখানে আরেকটা ব্যাপার তুলে ধরা প্রয়োজন। পৃথিবীতে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা বিকশিত হয়েছে এমন উদাহরণ হাতে গোনা। বাংলাদেশের সম্ভাবনা ছিল (হয়তো এখনও আছে) এরকম একটি সেরা গোত্রের উল্লেখযোগ্য সদস্য হতে। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রাক্তন প্রশাসন বাংলাদেশকে নিয়ে এই আশাটিই ব্যক্ত করে এসেছে, যাতে আমাদের দেশটি শরীয়া আইন দ্বারা চালিত মধ্যপ্রাচ্য এবং আফ্রিকার বেশ কিছু স্বৈরতান্ত্রিক দেশের চোখে আঙ্গুল দেখিয়ে একটি উজ্জ্বল তারকা হিসেবে নিজের পরিচিতি দিতে পারে।
বাংলাদেশকে নিয়ে এই উচ্চাকাঙ্খা আমাদের সকলের হওয়া উচিৎ। পশ্চিমা দুনিয়া, যারা স্বাধীনতার শুরু থেকেই আমাদের উন্নয়নের পাশে ছিল, তারাও এখন এই উচ্চাকাঙ্খা প্রকাশ করছে। এত উন্নয়ন সত্যেও বাংলাদেশের বিগত দুটি নির্বাচন নামের প্রহসনে তার উদ্বিগ্ন। তারা ক্রমান্বয়ে গণতান্ত্রিক পরিবেশের অবক্ষয়, গণমাধ্যমের উপর সৃষ্ট চাপ, মৌলিক মানবাধিকারের অনুপস্থিতি ইত্যাদি পর্যবেক্ষণ করে বাংলাদেশের ভবিতব্য আন্তর্জাতিক ভূমিকা সম্বন্ধে সন্দিহান।
আমি বলবো যে যারা বাংলাদেশের জন্মের শুরু থেকেই আমাদের পাশে ছিল এবং আছে, তাদের কিছুটা হলেও অধিকার আছে বাংলাদেশ নিয়ে তাদের ভবিষ্যতের চাওয়া পাওয়া ব্যক্ত করা, সেই নিয়ে দেশের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষদের সাথে নিয়মিত আলোচনা করা এবং সেগুলো ব্যর্থ হলে তাদের নিজস্ব ক্ষমতা অনুযায়ী কিছু ব্যবস্থা নেয়া।
এই মনোভাব থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান রাষ্ট্রপতি জো বাইডেন, যিনি নিজের দেশ সহ বিশ্বে গণতন্ত্রের সুরক্ষা ও বিকাশে বদ্ধপরিকর, তার প্রশাসন সম্প্রতি একটি নীতি ঘোষণা করলো যে বাংলাদেশে যারা আগামীতে অবাধ ও সুষ্ঠ নির্বাচনের অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে তারা ও তাদের পরিবার মার্কিন ভিসা থেকে বঞ্চিত হবে। বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনকে উৎসাহিত করার জন্য তাদের হাতে এই অবশিষ্ট পন্থাটাই ছিল। দুর্ভাগ্যবসত, অতীতের বিভিন্ন আলোচনামূলক পন্থায় কাজ হয়নি।
অনেকেই এখন ১৯৭১ সালে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলবেন এবং সেটাই স্বাভাবিক। আমেরিকার তখনকার নিক্সন প্রশাসন পাকিস্তান নামক বন্ধুপ্রতিম দেশকে ব্যবহার করে সেই সময়ে অচেনা চীন দেশটির সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করার জন্য উদ্যোগি ছিল। চীন ছিল পাকিস্তানের বন্ধু (এখনও তাই)। এবং এই কারণেই পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক নেতাদের পূর্ব পাকিস্তানে (বাংলাদেশে) পরিচালিত সকল কুকর্মের প্রতি যুক্তরাষ্ট্র খালি মুখই ফিরিয়ে নেয়নি, সাথে সামরিক সহায়তার হাতও বাড়িয়ে দিয়েছিল।
আমেরিকার বৃহত্তর জনগোষ্ঠী এবং তার আইন প্রণয়ণ বিভাগ (কংগ্রেস)-এর একাংশ নিক্সন প্রশাসনের এই নীতির ঘোর বিরোধী ছিল। ভারতের হস্তক্ষেপের ফলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা তরান্বিত হওয়ার ৩/৪ মাসের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয় এবং ইউএসএইডের মাধ্যমে দেশের জনগণের জন্য বিভিন্ন সহায়তা এবং উন্নয়নমূলক কর্মকান্ড শুরু করে যা এখনও বিদ্যমান।
মার্কিন পররাষ্ট্র নীতি অনেক সময়েই প্রতিটি নতুন প্রশাসনের সাথে বদলায়। এই ব্যাপারে সচেতন থাকলে আমরা ১৯৭১ সালে মার্কিন ভূমিকাকে সেই আঙ্গিকে দেখতে পারি। এখানে বলে রাখা উচিৎ যে যুক্তরাষ্ট্র ১৯৭১ সালের পরপরই পাকিস্তানকে ব্যবহার করে চীনের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করতে সক্ষম হয়। এর চেয়ে বেশি তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হচ্ছে যে এর কিছু পরেই ওয়াটারগেট নামের একটি আন্তর্জাতিক কেলেঙ্কারিতে ফেঁসে গিয়ে নিক্সনকে রাষ্ট্রপতি পদ থেকে পদত্যাগ করতে হয়।
নিক্সনের পরবর্তী প্রশাসনগুলো বরাবার বাংলাদেশের পাশেই ছিল এবং আছে, তবে ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রতিশোধ পরায়ণ হয়ে যেভাবে অধ্যাপক ইউনুসকে হেনেস্তা করেছেন, তার কারণে ওবামা প্রশাসনের সাথে বাংলাদেশের কিছুটা বৈরিতার সৃষ্টি হয়, যা এখন উননে পেছনে দমে দেয়া হয়েছে।
তবে জো বাইডেনের এই ভিসা সংক্রান্ত সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞা বাংলাদেশের জন্য অপমানজনক। আর এই অপমানের দায় আমাদের দুই নেত্রী, তাদের অধীনে বিভিন্ন রাজনীতিবিদ, নিরাপত্তা বাহিনী, বিচার বিভাগ এবং আমলাবর্গের উপর। আর কারোর উপর নয়।