রিয়াজ ওসমানী

১২ জুলাই ২০২৩

পৃথিবীটাতে আজ একটি নতুন মেরুকরণের সৃষ্টি হয়েছে। এক মেরুতে রয়েছে পশ্চিমা দুনিয়ার গণতন্ত্রগুলো। অন্য মেরুতে রয়েছে কিছু স্বৈরাচারী একনায়কতন্ত্র যাদের মধ্যে রাশিয়া, চীন, উত্তর কোরিয়া, ইরান ইত্যাদি দেশগুলো অন্তর্ভুক্ত। বর্তমান সরকারের নেতৃত্বে বাংলাদেশ আজ দ্বিতীয় মেরুটির কাছাকাছি অবস্থান নিয়েছে এবং পৃথিবীর অন্যান্য কিছু স্বৈরাচারীরা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সমর্থন করছে।

আমরা ভিসা আবেদন করার সময়ে কোন দূতাবাসগুলোতে গিয়ে হাজির হই? কেন হই? কারণ ভেতরে ভেতরে আমরা অধিকাংশ বাংলাদেশিরাই আমাদের দেশকে পশ্চিমা দেশগুলোর মতোই দেখতে চাই, যেখানে অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি রয়েছে গণতন্ত্র, নিয়মিত সুষ্ঠ নির্বাচন, নির্বাচিত সরকারকে জবাবদিহিতার আওতায় রাখার জন্য কার্যকর বিরোধী রাজনৈতিক দল, বাকস্বাধীনতা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, রাষ্ট্রীয় ধর্মনিরপেক্ষতা, রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ প্রশাসন ও রাষ্ট্রীয় অঙ্গসমূহ, রাষ্ট্রের সহায়তায় জনগণ ও সম্পত্তির নিরাপত্তা; বিত্ত ভিত্তিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থান নির্বিশেষে সকল নাগরিকের ক্ষেত্রে আইনের সমান প্রয়োগ; সকল প্রকার সংখ্যালঘুদের সমান নাগরিক অধিকার ও রাষ্ট্র কর্তৃক তাদের সুরক্ষা; সকল প্রকার বৈষম্যের বিরুদ্ধে শক্ত আইন ও তার প্রয়োগ; দুর্নীতিমুক্ত সমাজ; সংসদ থেকে শুরু করে প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে জনগণের কাছে জবাবদিহিতা; সকল মৌলিক মানবাধিকারের নিশ্চয়তা ইত্যাদি।

পশ্চিমা দেশগুলো অবশ্যই উপরের সব কিছু এখনও সঠিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেনি। উপরের চিত্রটি একটি গন্তব্যস্থল যার পানে যাত্রাটি কোনো সময় শেষ হয় না। কিন্তু বাংলাদেশে সম্প্রতি যাত্রাটি হয়েছে বিপরীত দিকে। আওয়ামী লীগ সরকারের বিগত ১৫ বছর ধরে কাঙ্খিত চিত্রটির অনেক কিছুই পর্যায়ক্রমে ধ্বংস করা হয়েছে, যার অন্যতম হাতিয়ারগুলো ছিল ক) বিচার বিভাগ এবং রাষ্ট্রের প্রতিটি অঙ্গের দলীয়করণ; খ) সর্বজনীন স্বজনপ্রীতি; গ) “ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন” নামের একটি নিপীড়নমূলক পদক্ষেপ; ঘ) রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গ ব্যবহার করে আইন ও মানবাধিকার বহির্ভূত কার্যকলাপ; ঙ) আমলা, ব্যবসায়ী ও সরকারের বিবিধ সমর্থকদেরকে সীমাহীন দুর্নীতির সুযোগ সৃষ্টি; চ) জনসাধারণের ভোট বিহীন পরপর দুটি প্রহসনের নির্বাচন করে নিজের ক্ষমতা নবায়ন এবং ছ) ধর্মীয় গোত্রকে পৃষ্ঠপোষকতা করে রাষ্ট্রীয় ধর্মনিরপেক্ষতার কবর। এর সব কিছুই করা হয়েছে অতীতের সকল রেকর্ড ভঙ্গ করে।

কিন্তু আওয়ামী লীগ সেই অতীতের ফিরিস্তি বারবার শুনিয়ে এবং অন্যদের ঘাড়ে সেগুলোর দোষ চাপিয়ে দিয়ে বর্তমান সময়কার মাছগুলো শাক দিয়ে ঢাকতে পারবে না। হাজার মহাসড়ক, সেতু, রেলপথ, বন্দর, ইপিজেড, কমিউনিটি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র, ডিজিটাল সেবাকেন্দ্র ও পল্লী আবাসন দিয়েও রাষ্ট্রের ক্ষতিগুলো আড়াল করে রাখা সম্ভব নয়। বরং, উল্লেখিত ধ্বংসলীলার কারণে এসব উন্নয়ন কখনো টেকসইও হয় না। তাই এবার পরিবর্তনের পালা। না হলে রাষ্ট্রের ক্ষতিগুলো ভবিষ্যতে এমন পর্যায় পৌঁছে যেতে পারে যে বাংলাদেশ নামের একটি কার্যকর রাষ্ট্রের অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে যেতে পারে।

এই পরিবর্তনটি আসলে বিকল্প হিসেবে যারা ক্ষমতায় আসতে চায়, তারা যে বাংলাদেশ নিয়ে আমাদের সকল চাওয়াগুলো পূরণ করতে পারবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। তাদেরও ইতিহাস নিন্দনীয়। রাষ্ট্রীয় অব্যবস্থা ও দুর্নীতিতে তাদের অবদান ছিল আকাশচুম্বী। বাংলাদেশে ধর্ম নিয়ে আত্মঘাতী রাজনীতি, সাথে রাষ্ট্রীয় ধর্মনিরপেক্ষতার বুকে ছুড়ির আঘাত তাদের আমলগুলোতেই শুরু হয়। তার উপর বাংলাদেশ ও ভারতের মাঝে আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিতে তাদের অবদান ছিল অপরিসীম। বিরোধী দলকে দমন করার প্রবণতা, যা বর্তমান সরকারের আমলে ছিল অনৈতিক এবং আইন ও মানবাধিকার বহির্ভূত, তা তাদের আমলে রূপ নিয়েছিল তখনকার বিরোধী নেত্রীকে (বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে) হত্যা করার চেষ্টার মধ্য দিয়ে।

এত কিছুর পরও একটি নতুন সূচনা হলে বর্তমান সরকারের অধীন রাষ্ট্র ব্যবস্থার চরম ক্ষতিগুলোর গতিতে লাগাম টানার সম্ভাবনার সৃষ্টি হতে পারে, যদিও রাষ্ট্রীয় ধর্মনিরপেক্ষতা পুনরায় স্থাপন করার ইচ্ছা বা সাহস বাংলাদেশের কিছু বামপন্থী রাজনীতিবীদ ছাড়া আর কারোর নেই। অথচ রাষ্ট্রীয় ধর্মনিরপেক্ষতা ছাড়া একটি উদারপন্থী গণতান্ত্রিক দেশের হদিস পৃথিবীর কোথাও নেই এবং তা সম্ভবও নয়। তথাপি, যারা ক্ষমতায় আসতে চায়, তারা রাষ্ট্র মেরামতের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং তা সম্পন্ন করার পন্থাগুলোও জনগণের সামনে উপস্থাপন করেছে। এই প্রতিশ্রুতি তারা পূরণ করতে ব্যর্থ হলে তাদেরকেও পরবর্তী নির্বাচনে হার মানিয়ে দেয়া যাবে (যদি সুষ্ঠ নির্বাচনের প্রক্রিয়া বলবৎ থাকে)। এই হলো গণতন্ত্রের বিকাশের মাধ্যমে একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত উন্নয়নের চিত্র।

এই প্রকৃত উন্নয়নের ধারাবাহিকতা চলাকালীন আমাদেরকে নির্দ্বিধায় সমমনা রাষ্ট্রগুলোর কাছাকাছি চলে যেতে হবে। সেটার রূপ হবে কূটনৈতিক, ব্যবসায়িক এবং ভূরাজনৈতিক। উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের দেশগুলো, সাথে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ইত্যাদি রাষ্ট্রগুলো যেই মেরুতে অবস্থান করছে, আমাদেরকে সেই দিকেই অগ্রসর হতে হবে। এবং তা করতে হবে পশ্চিমা দুনিয়ার অতীতের কিছু বিতর্কিত ইতিহাসকে উপেক্ষা করেই। সময়ের সাথে সাথে দুনিয়াটা বদলায়। ভবিষ্যতে আমাদের প্রকৃত রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন আরো টেকসই হবে যদি আমরা তাদের সাথে সম্পর্কের উন্নয়ন করি যারা যুগযুগ ধরে তাদের নিজেদের রাষ্ট্রীয় উন্নয়নে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে এবং করছে।

বাংলাদেশের বামপন্থীরা অবশ্যই এতে নব্য ঔপনিবেশিকতা, পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদ, পুঁজিবাদী আগ্রাসন, শ্রমিকদের শোষণ ইত্যাদির ধোঁয়া তুলবে। অথচ রাশিয়া যে বরাবরই একটি ঔপনিবেশিক শক্তি এবং চীন যে এখন তার সাথে যুক্ত হয়েছে, তার উপলব্ধি এই বামপন্থীদের কোনো দিনও হবে না। বর্তমান যুগে শ্রমিক ও কৃষকদের অধিকার নিয়ে ন্যায্য কথাগুলো বলা ছাড়া তাদের আর কোনো উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নেই। বিশ্বায়নের যুগ একটি বাস্তবতা, যেখানে মুক্তবাজারের সুষ্ঠ ব্যবস্থাপনা সময়ের সাথে সাথে দেশের সমাজ ও অর্থনীতির ঘাটতিগুলো নিরাময় করতে পারে। সরকারের এখতিয়ারে থাকবে মুক্তবাজারের ব্যর্থতাগুলো লাঘব করা, যার হাতিয়ার রয়েছে বিস্তর। আর এর সব কিছুই সম্ভব হয় একটি প্রতিনিধিত্বমূলক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায়। অন্য কোনো ব্যবস্থায় নয়।

বাংলাদেশে একটি সুষ্ঠ নির্বাচন ও আগামী দিনের গণতান্ত্রিক বিকাশ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের বর্তমান উদ্যোগগুলোকে আমি এই কারণেই স্বাগত জানাই।

Leave a comment