রিয়াজ ওসমানী

২৮ অক্টোবর ২০২৩

বাংলাদেশের “উন্নয়ন”-এর একটি বৈশিষ্ট হচ্ছে যে দেশের মুক্তবাজার অর্থনীতি আজ পরিণত হয়ে গিয়েছে ক্রোনি পুঁজিবাদে। সেটা কী? সেটা একটি ব্যবস্থা যেখানে রাজনীতি ও বাণিজ্য এক হয়ে গিয়েছে এবং সরকারের সাথে ঘনিষ্ট সম্পর্ক বজায়ে রেখে কিছু মুষ্টিমেয় ব্যবসায়ীক প্রতিষ্ঠান অপ্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে তাদের কর্মকান্ড চালিয়ে যাচ্ছে। বিনিময়ে সরকার পাচ্ছে এই ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে উল্লেখযোগ্য আনুগত্য।

এর জলজ্যান্ত উদাহরণ হচ্ছে দেশে উৎপাদিত খাদ্য সামগ্রী কৃষক থেকে দোকানীদের কাছে পৌছে দেয়া মধ্যস্বত্বভোগীরা। এদের প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কম এবং এরা একে অপরের সাথে সহযোগিতা করে একটি বাজার চক্র তৈরি করে সেই খাদ্য দ্রব্যের মূল্য এমন পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছে যে তারা লুটে নিচ্ছে সীমাহীন মুনাফা আর দেশের নিম্নমধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তরা, যারা এখনও দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ, তারা পারছে না তাদের দৈনন্দিন পুষ্টি মেটানোর জন্য পর্যাপ্ত পরিমানে খাদ্য ক্রয় করতে।

ফলে বাংলাদেশের জনৈক মন্ত্রীর সাম্প্রতিক এক বক্তব্য অনুযায়ী দেশে ৪ কোটি জনগনের ” ইউরোপীয়” ধাঁচের জীবন যাপন সম্ভব হলেও বাকি ১৩ কোটির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ একটি নিরব দুর্ভিক্ষের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে যেখানে তারা অপুষ্টি বা আধা পুষ্টিতে ভুগছে। আওয়ামী লীগের কিছু চাটুকারদেরকে অনলাইনে বলতে দেখেছি যে খাদ্যের উচ্চ মূল্য হচ্ছে উন্নতির লক্ষণ। এই উচ্চ মূল্য সময়ের সাথে সাথে সকলের আয় বৃদ্ধি দেবে। সরকারের চাটুকারিতা করতে করতে নিজের পকেট ভরলে এরকম কথা সহজেই বলা যায়।

কিন্তু এই উন্নয়ন কোনো উন্নয়ন নয়। এটা মুক্তবাজার নামে অরাজগতা এবং সরকার যে এই ব্যাপারে ধ্বনি বধির এবং এর সুরাহা বের করতে অপারগ ও অক্ষম, তা আমাদের বর্তমান বাণিজ্যমন্ত্রীর সাম্প্রতিক বক্তব্য থেকেই বোঝা যায়। এই বাজার চক্র ভেঙে দিতে গেলে সরকার তার একটি বিরাট সমর্থনকারী শক্তিকে হারাবে বলে বালুর ভিতর নিজের মাথা ডুবিয়ে রেখেছে।

ক্রোনি পুঁজিবাদ হচ্ছে মুক্তবাজারের সবচেয়ে নিকৃষ্ট রূপ যা রাশিয়া ও চীনে প্রতিষ্ঠিত। বাংলাদেশও যে এই পথে আগাবে তা ৩০ লক্ষ শহীদরা বোধহয় দু:স্বপ্নেও দেখেনি। মুক্তবাজারের ব্যর্থতাগুলো লাঘব করার পন্থাগুলো মুক্তবাজারেই লুকিয়ে আছে। সেগুলো অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়ার জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও শক্তিই যথেষ্ট। আগামী সরকার যেই দলেরই হোক না কেন, সেই সরকারকে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতে হবে আরো অধিক ছাএপত্র দিয়ে আরো অধিক মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রতিষ্ঠান স্থাপন করার পরিবেশ তৈরি করে দেয়ার। এবং তা হতে হবে বর্তমানের তুলনায় দশ-বিশগুন বেশি। ছাড়পত্র দেয়ার ক্ষেত্রে কোনো প্রকার রাজনৈতিক বিষয়াদি বিবেচনায় নেয়া যাবে না।

তিনটা প্রতিষ্ঠান যেভাবে একে অপরের সাথে শলাপরামর্শ করে পণ্যের দাম ঊর্ধ্বে স্থির করে রাখতে পারে, ৩০টা প্রতিষ্ঠান সেটা অত সহজে পারে না। তাদের মাঝে প্রতিযোগিতার আদলে কৃষকের লাউ দোকানীর কাছে অপেক্ষাকৃত কম দামে আসতে পারে। ক্রেতারাও তখন এখনকার তুলনায় আরও কম দামে সেই লাউ কিনতে পারবে। বাজার চক্র ভেঙে দেয়ার এটাই হচ্ছে সবচেয়ে কার্যকর পন্থা।

এখানে আরেকটা বিষয় নিশ্চিত করতে হবে। কৃষকের লাউ দোকানীর হাতে আসতে আসতে যতবার হাত বদল হয়েছে, যে কটি ব্যবসায়ীক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে লাউটি রদবদল হয়েছে, এবং রদবদলের প্রতিটি ধাপ কী দামের বিনিময়ে সম্পন্ন করা হয়েছে তার একশো শতাংশ স্বচ্ছ নথির ব্যবস্থা থাকতে হবে এবং সেগুলো সর্বোচ্চ প্রশাসনিক তদারকির মধ্যে রাখতে হবে। একজন ক্রেতা হিসেবে ইচ্ছে থাকলে আমি যেন জানতে পারি যে কৃষক সেই লাউয়ের জন্য কত দাম পেয়েছে, মধ্যস্বত্বভোগীরা কত দামে তা রদবদল করেছে এবং সর্বশেষে দোকানীর কাছে তা কত দামে এসেছে।

এভাবেই বাংলাদেশে ভোক্তা অধিকার নিশ্চিত করতে হবে এবং দেশের ক্রোনি পুঁজিবাদ, যা শুধু খাদ্য দ্রব্যের ব্যবসার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, তাকে গলা টিপে মেরে ফেলতে হবে।

Leave a comment