
রিয়াজ ওসমানী
৪ জুন ২০২৪
সরকারের চামচা মার্কা গণমাধ্যম, প্রভাবিত বিচারবিভাগ ও নির্বাচন কমিশন, বিরোধী দলের প্রতি দমন-পীড়ন, বাকস্বাধীনতার হ্রাস, ভিন্নমতের প্রতি অসহিষ্ণুতা, অর্থনৈতিক বৈষম্যের বৃদ্ধি, দুর্নীতির রাজত্ব এবং অতি বিত্তশালীদের সাথে সরকারের যোগসাজস! শুনতে অবিকল বাংলাদেশ মনে হলেও আমি বলছি ভারতের কথা। হ্যাঁ, বিগত ১০ বছর ধরে নরেন্দ্র মোদী ও তার বিজেপি দলের শাসনামলে ভারতের রাজনৈতিক চেহারার আজ এই করুণ দশা।
কিন্তু ভারতের সাথে বাংলাদেশের একটি উল্লেখযোগ্য পার্থক্য হচ্ছে যে ভারতে এখনও মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেয়া হয়নি। সেই দেশে এখনও তুলনামূলকভাবে সুষ্ঠ নির্বাচন সম্পন্ন করা যায় এবং হয়। একমাত্র এই কারণেই সদ্য সমাপ্ত জাতীয় (লোকসভা) নির্বাচনে ভারতের ভোটারগণ মোদী ও বিজেপিকে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না দিয়ে সতর্ক করে দিতে পেরেছে যে তারা বিগত সময়গুলোর জন্য সন্তুষ্ট নয়। তরুণদের বেকারত্ব, কৃষকদের দুর্দশা, নিম্নবিত্তদের কষ্ট ইত্যাদির দিকে নজর না দিয়ে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি ও অতিবিত্তশালীদের সাথে প্রণয় স্থাপণ করে তারা আর বেশি দিন মানুষদের মন জয় করে রাখতে পারবে না।
ভারতের জনগণ যে এই বার্তাটি দেয়ার সুযোগ পেয়েছে, সেটা গণতন্ত্রেরই জয়। একই সাথে লোকসভায় আসনের চূড়ান্ত তালিকা আবারও ভারতকে একটি শক্ত বিরোধী দল উপহার দেবে (কংগ্রেস ও তার শরিক দলগুলো মিলে)। এই শক্ত বিরোধী জোটের কারণে মোদী এখন আর অযাচিতভাবে দেশটির সংবিধান বদলে দিতে পারবে না। বিজেপি সময়ের সাথে সাথে যেভাবে গণমাধ্যম, বিচারবিভাগ ও নির্বাচন কমিশনকে কুক্ষিগত করে ফেলেছিল, সেটা থেকে কিছুটা পরিত্রাণ পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা এখন আর অযৌক্তিক নয়। বাকস্বাধীনতা ও ভিন্নমতের প্রতি সহিষ্ণুতাও যে কিছুটা ফিরে পাওয়া যেতে পারে সেটাও আশা করা যায়।
নরেন্দ্র মোদী আর তার বিজেপি দল যেভাবে ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতার বুকে ক্রমান্বয়ে ছুরি মেরে দেশটির রূপ বদলে দেয়ার চেষ্টা করে এসেছে, দেশটির জনগণ যে তাতে সায় দিয়েছে তা বলা যাবে না। এখানেই রয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার জন্য একটি শুভ বার্তা। ভারতের দুই পাশেই রয়েছে দুটি মুসলমান প্রধান দেশ, যেগুলোতে রয়েছে হিন্দু সংখ্যালঘু। ভারতের অভ্যন্তরের হিন্দু-মুসলমান সম্পর্কের মাধ্যমে কখনোই তার পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রগুলোর ভেতরকার একই সম্পর্কগুলো প্রভাবিত হওয়া উচিৎ নয়। কিন্তু তারপরেও কিছুটা প্রভাব কাঁটাতারের বেড়া অতিক্রম করে ফেলে। ভারতের ভোটাররা সাম্প্রদায়িকতার ডাকে সারা না দিয়ে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে সাম্প্রদায়িক সম্পর্ককে কিছুটা হলেও সহায়তা করলো।
বাংলাদেশে আজ গণতন্ত্র মৃত। নির্বাচন বলতে জনগণ যা বুঝে ও আশা করে, এই দেশে তার ছায়াটুকুও আজ সম্পন্ন হওয়ার ক্ষমতাটি হারিয়ে ফেলেছে। সেই কারণে বাংলাদেশের জনগণের আজ ক্ষমতা নেই বর্তমান ক্ষমতাসীন দলকে শায়েস্তা করতে। তবে ভারতের ২০২৪ সালের নির্বাচনটি বাংলাদেশিদেরকে আশার আলো দেখাতে পারে, যদি আমরা তা দেখার ইচ্ছা পোষণ করি। বাংলাদেশের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি ভারতের যে কোনো সরকারের সাথেই কিঞ্চিৎ বৈরিতা বজায় রেখে এসেছে। বর্তমানে তাদেরই কিছু অতি উৎসাহী অনলাইন সমর্থকরা ভারতীয় পণ্য, এমনকি গোটা ভারতকেই বর্জন করার ডাক দিয়ে চলেছে।
আশা করি সমর্থকদের এই শিশুসুলভ বাতুলতা শিগগিরি বন্ধ হবে এবং বিএনপি ভারতকে আশ্বস্ত করতে পারবে যে (জামাত ব্যতীত) বিএনপি আবারও ক্ষমতায় এলে বাংলার মাটিকে কখনোই ভারতের বিরুদ্ধে বিচ্ছিন্নতাবাদী বা সন্ত্রাসী কার্যকলাপের জন্য ব্যবহার করতে দেয়া হবে না। এতে ভারত আর একচেটিয়াভাবে আওয়ামী লীগকে সমর্থন করবে না, যার ফলে বাংলাদেশে গণতন্ত্র বিকাশের পথটি আবারও একটু হলেও খুলে যাবে। ঐতিহাসিক ও সাংষ্কৃতিক বন্ধনের পটভূমিতে বিশ্ব দরবারে ভারত ও বাংলাদেশকে একত্রে মিলে গণতান্ত্রিক ও অর্থনৈতিক বিকাশের উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকা উচিৎ।