কোটা বিরোধী আন্দোলন থেকে সরকার পতন

রিয়াজ ওসমানী

১৭ আগষ্ট ২০২৪

আমার এই ব্লগের শুরুটাই হয়েছিল ১ ডিসেম্বর ২০১৮  তারিখে লেখা “আওয়ামী লীগের বিদায় চাই” এই শিরোনামের একটি প্রবন্ধ দিয়ে। সেখানে আমি ১৫টা বিষয় উপস্থাপন করেছিলাম যার ভিত্তিতে আমার মূল্যায়ন ছিল যে বাংলাদেশে তখন আসন্ন সাধারণ নির্বাচনে ক্ষমতার পরিবর্তন প্রয়োজন।

তারপর প্রায় ছয় বছর অনেক চড়াই উৎরাই পেরিয়ে কোটা সংস্কারকে ঘিরে শুরু হওয়া একটি ছাত্র আন্দোলন অবশেষে সরকার পদত্যাগের দাবিতে উপনীত হওয়ার পর এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের হাতে ৬০০র অধিক প্রাণহানির পর শেখ হাসিনা নিজের প্রাণ বাঁচাতে লেজ গুটিয়ে বিগত ৫ আগষ্ট ২০২৪ তারিখে বাংলাদেশ ছেড়ে পালিয়ে গেলেন।

এই লেখাটির উদ্দেশ্য বিগত ১৬ বছরের ফিরিস্তি দেয়া নয়, বরং কিছু মনের ভাব প্রকাশ করা। এই মনের ভাবগুলো আমি এবং আরও অনেকেই কয়েক বছর ধরে প্রবাস থেকে সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করে প্রকাশ করে এসেছি। স্বদেশে বসে অনেকেই সেগুলো প্রকাশ করার সাহস পায়নি।

বিগত কয়েক বছরের বেশি সময় ধরেই বাংলাদেশের বেসরকারি টিভি চ্যানেলগুলোতে বিভিন্ন কথামালা অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগ নেতাদেরকে সেই সরকারের কুকীর্তি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তাদের দাম্ভিকতা, অহমিকা এবং ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের সরকার (বিএনপি-জামাত)-এর উপর সমস্ত দোষ চাপিয়ের দেয়ার প্রবণতা দেখে স্তম্ভিত হয়ে যেতাম। উত্তর এড়িয়ে যাওয়ার সকল কৌশল তারা আয়ত্তে এনেছিল। তখনই আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব এবং তাদের অচিরের মহা পতন সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিলাম।

একই সাথে বিভিন্ন বিষয়ে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা থেকে শুরু করে শীর্ষ পর্যায়ের মন্ত্রীদের মুখে যা শুনতাম তা থেকে অনুধাবণ করেছি যে সরকারকে সহজেই “ধ্বনি বধির” বলে আখ্যায়িত করা যায়। সময়ের সাথে সাথে আমার কাছে এটাও প্রতিয়মান হয়েছে যে হাসিনা নিজের তৈরি একটি কাঁচের ঘরে বাস করতেন, যেই ঘরের দেয়ালগুলো ছিল তারই বাছাই করে নেয়া বিভিন্ন আস্থাভাজনরা, যারা তাকে শুধু সেটুকুই বলতেন, যা তিনি শুনতে চাইতেন ও বিশ্বাস করতে চাইতেন।

সময়ের সাথে সাথে এবং কৌশলে হাসিনা ও তার আস্থাভাজনরা একটু একটু করে তাদের কল্পনার জগতকে সত্যি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য সমাজের এক স্তরের মানুষের বাকস্বাধীনতা কেড়ে নেয়, অন্য দিকে রাষ্ট্রের প্রতিটি অঙ্গ আরও আস্থাভাজন এবং চাটুকারদের দিয়ে ভরে দিয়ে সেগুলোকে নিজের আয়ত্তে নিয়ে আসে। শেখ হাসিনা এবং রাষ্ট্রের মধ্যে পার্থক্যটা বিলীন হয়ে যায়।

হাসিনার সমালোচনাকে বাংলাদেশ বিরোধী মতবাদ হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা হয়েছে। যারাই এই সমালোচনা করেছে, তারাই রাজাকার হিসেবে নামকরণকৃত হয়েছে৷ সাথে অজস্র মানুষকে গুম করা হয়েছে, অনির্দিষ্ট কালের জন্য বন্দী করে শারীরিক ও মানসিক অত্যাচার করা হয়েছে, খুন করা হয়েছে।

এই অভিজ্ঞতাগুলো যে খালি বিরোধী দলের মানুষদেরই হয়েছে তা নয়। যাদেরই বিবেক বলতে কিছু ছিল এবং সেটার ভিত্তিতে তারা কোনো কিছুর প্রতিবাদ করার সাহস দেখিয়েছে, তাদের অনেকেরই এই পরিণতি হয়েছে৷ বহু সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ, লেখক ও সমাজকর্মীরা ত্রাসের মধ্যে থেকেছে কখন এবং কোন মধ্যরাতে সাদা পোশাক পরা ব্যক্তিরা দরজার কড়া নারবে ও ধরে নিয়ে যাবে।

যারা এই ত্রাসের মধ্যে বাস করতে চায়নি, তারা অনেকেই চাটুকারিতার মাধ্যমে হাসিনার আস্থাভাজনদের দলে নাম লিখিয়েছে। কোনো পেশার মানুষই এ প্রচেষ্টা থেকে বাদ যায়নি। কীসের সীমাহীন দুর্নীতি, কীসের সীমাহীন ক্ষমতার অপব্যবহার, কীসের আইন-কানুনের ব্যত্যয়? প্রতিযোগিতা দিয়ে মাফিয়া প্রশাসনের কাছ থেকে যতটুকু নিরাপত্তা পাওয়া যায় এবং পাহার সমান সম্পদ লুটে নেয়া যায় (ও বিদেশে পাচার করা যায়), তারই মগ্নে ছিল এই প্রতিযোগিরা।

আওয়ামী লীগ সরকার ভেবেছিল যে যতক্ষণ পর্যন্ত কিছু চোখ ধাঁধানো অবকাঠামো দিয়ে আম জনতাকে ভুলিয়ে রাখা যাবে, যতক্ষণ পর্যন্ত দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃত্তির সংখ্যাগুলো সংবাদ শিরোনাম হয়ে থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত এভাবে দেশ চালালে কোনো ক্ষতি নেই। কিন্তু ভাগ্যের কী পরিহাস! কোভিড মহামারি এসে সেই পরিকল্পনার সব কিছুই লন্ডভন্ড করে দিল। তখন থেকে শুরু করেই জনগন জানতে শুরু করলো চাকচিক্যের আড়ালে কী পরিমান অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা, নানা বিষয়ে ভুল সিদ্ধান্ত এবং বৃহত্ত প্রকল্পগুলোর স্ফীত বাজেট লুকিয়েছিল।

তবে এগুলো ছিল উপসর্গ। আসল ব্যাধি ছিল সময়ের সাথে সাথে হাসিনার গঠিত একটি ফ্যাসিবাদী প্রশাসন। ক্ষমতার লোভে এই ফ্যাসিবাদী সরকার অব্যাহত রাখার জন্য হাসিনা তার অধীনস্থ আদালত ব্যবহার করে বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে সংবিধান থেকে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান উঠিয়ে দিয়ে বাংলাদেশকে একটি কঠিন রাজনৈতিক অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিয়েছিল।

এর ফলস্রুতিতে বাংলাদেশ পায় পরপর তিনটা নির্বাচন নামের প্রহসন। পুরা একটা প্রজন্ম সঠিকভাবে ভোট দেয়া ও সেটার গণনা কাকে বলে তা জানে না। স্বাধীন বিচার বিভাগ কাকে বলে জানে না। একটি কার্যকর সংসদ কাকে বলে জানে না। একটি গণতান্ত্রিক দেশ কাকে বলে তা জানে না। নিরপেক্ষ ও শক্তিশালী গণমাধ্যম কাকে বলে জানে না। তাদের কাছে রাষ্ট্রের জবাবদিহিতা কাকে বলে তা জানে না। বাংলাদেশের সংবিধান মোতাবেক তাদের কী অধিকার আছে তাও জানে না। তারা শুধু জানে দানবীয় পুলিশ বাহিনী, গোয়েন্দা বাহিনী ইত্যাদি। তারা জানে নিজেদেরকে রাজা ভাবে এমন সকল অসহায়ক, অকর্মন্য এবং ঘুষখোর সরকারি আমলাদেরকে।

৭১ সালের প্রজন্ম এবং তারও পরবর্তী প্রজন্ম কীভাবে দেশকে এই জাহান্নামের হাত থেকে মুক্ত করতে পারবে তা জানতে পারেনি। কারণ তাদের মাঝেই অনেকে হয়ে উঠেছিল সেই জাহান্নামের লাভজনক বিষয়াদির সুবিধাভোগী। দেশে প্রথমবারের মতো দেখলাম অজস্র অতি বিত্তশালী বা অলিগার্কদেরকে, যারা ছিল সব কিছুর ঊর্ধ্বে (সাথে হাসিনার নব আস্থাভাজন হওয়া থেকে শুরু করে নজিরবিহীন ব্যাংক ঋণ খেলাপি)।

অন্য দিকে অর্থনৈতিক বৈষম্য বাড়তে বাড়তে এমন পর্যায় চলে এল যে মধ্যবিত্তদের একটি অংশ দারিদ্রের মুখ দেখতে লাগলো। বেকারত্বের হার বাড়তে লাগলো। মহামারি ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর সারা বিশ্বে মূল্যস্ফীতি কমলেও বাংলাদেশে তা কমলো না। অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনার কারণে টাকার মুদ্রাস্ফীতি, সাথে সরকারের মদদপুষ্ট বাজার চক্র সাধারণ মানুষের জীবন বিপন্ন করে দিল।

এক কথায় বলা চলে যে যেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিক্রি করে শেখ হাসিনা তথা সমগ্র আওয়ামী লীগ এত দিন রাজনীতি করলো, ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর ধীরে ধীরে তারা সেই চেতনাগুলোর প্রতিটি বিষয় বহির্ভূত অবস্থান নিয়ে দেশ শাসন করলো। এমন কী ক্ষমতার লোভে তারা ধর্মনিরপেক্ষতাকেও বিসর্জন দিতে দ্বিধা বোধ করেনি।

আজ এসেছে এক নতুন দিন যার ভবিষ্যত এখনও সাদা ক্যানভাসে অঙ্কণ করা হয়নি। আগামীতে আমরা যেই চিত্রটিই দেখতে পাবো, তার মধ্যে ফ্যাসিবাদের ছায়াটুকুও যেন আর খুঁজে না পাই। বিগত দশ বছরের অধিক সময় বাংলাদেশ পার করেছে একটি শ্বাসরুদ্ধকর আয়নাঘরে। একাত্তর সালের মুক্তিযোদ্ধারা সেই দেশের স্বপ্ন দেখেনি৷ এবারের ছাত্র-জনতা শহীদরাও জাহান্নামের পুনরাবৃত্তি দেখবার জন্য রক্ত দেয়নি।

Leave a comment