রিয়াজ ওসমানী

২৬ অক্টোবর ২০২৪

বাংলাদেশে নিজেকে একজন সংখ্যালঘু হিসেবে পরিচয় দেয়ার অর্থ এই নয় যে সেই মানুষটা আর বাংলাদেশি রইলো না৷ সেই মানুষটার প্রথম পরিচয় সে অবশ্যই বাংলাদেশি৷ তারপর সে সংখ্যালঘু। যারা বলে যে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু বলতে কিছু নেই, তারা একটি রাষ্ট্রে যে কোনো প্রকার সংখ্যালঘুদের ন্যায্য দাবীগুলোর প্রতি ধ্বনি বধির থাকতে চায় এবং দাবীগুলোকে “বিশেষ সুবিধা” বা “বিশেষ চাহিদা” আখ্যা দিয়ে সকল ক্ষেত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদ প্রতিষ্ঠা করতে চায়।

বাংলাদেশের ধর্মীয়, জাতিগত, ভাষাগত, সাংষ্কৃতিক এবং যৌন সংখ্যালঘুরা এটা ভালো করেই জানে। কাজেই বিএনপিকে বিশেষ করে বলছি “বাংলাদেশে সবাই বাংলাদেশি, কেউ সংখ্যালঘু নয়”, এসব বক্তব্য পেশ করে সংখ্যালঘুদের ন্যায্য দাবীগুলোর প্রতি অসহানুভূতিশীল হবেন না। এর কারণ হচ্ছে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠরা খুব সহজেই তাদের পছন্দের চাহিদাগুলো রাষ্ট্রের কাছ থেকে আদায় করে নিতে পারে। সংখ্যালঘুদের জন্য সেটা অপেক্ষাকৃত কঠিন।

বিএনপির কিছু নেতাদের মুখে “হিন্দুরা কেন নিজেদেরকে বাংলাদেশি মনে করে না, নিজেদেরকে আগে বাংলাদেশি মনে করা উচিৎ” – জাতীয় কথাবার্তা চশমখোর জাতীয় কথাবার্তা! বাংলাদেশের হিন্দুরা অবশ্যই নিজেদেরকে আগে বাংলাদেশি মনে করে৷ তাদেরকেই বরং কিছু মুসলমানরা ভারতে চলে যেতে বলে। ইতিহাস জুড়ে অনেককে সেটা করতে বাধ্যও করা হয়েছে। উলটো দিকে কিছু মুসলমানদের মুখ থেকেই শুনেছি “আমি আগে মুসলমান, তারপর আমি বাংলাদেশি”। বাংলাদেশে নিজেদের ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে রাজনীতি করার বদভ্যাস কাদের রয়েছে সেটা এতে সহজেই বোঝা যায়।

একটি দেশে কোনো বিশেষ শ্রেণীবিন্যাসে আনুপাতিক হারে সংখ্যায় কম হওয়া মানেই সংখ্যালঘু। বাংলাদেশে সংখ্যালঘু থাকে না কী করে? ধর্মের কারণে, ভাষার কারণে, জাতের কারণে, যৌন প্রবৃত্তির কারণে বা লিঙ্গ পরিচয়ের কারণে বাংলাদেশেও রয়েছে সংখ্যালঘু। এবং রাষ্ট্রের কাছে এদের দাবি দাওয়া রাখার উদ্দেশ্য একটিই – প্রতিটি রাষ্ট্রে অন্তর্নিহিত সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদের ফলে সৃষ্ট বিভিন্ন বৈষম্য লাঘব করে নিজেদের জন্য সমতা অর্জন করা।

বাহাত্তরের সংবিধান প্রণয়ণের সময়ে শেখ মুজিব নাকি পাহাড়িদেরকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন যে তারা যেন বাঙালী হয়ে যায়! পাহাড়িরা নিজেদের ভাষা ও সংষ্কৃতিকে বজায় রেখে বাংলা ভাষাও শিখতে পারে। কিন্তু তারা বাঙালী হয়ে যাবে কী করে? বাংলা শিখলেই বাঙালী?

বর্তমান সময়ের দিকে তাকালে দেখা যাবে যে সংখ্যালঘু শব্দটা ব্যবহার করার বিরুদ্ধে শক্তভাবে রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। কিন্তু কেন? আমরা বিভক্ত হয়ে যাবো বলে? নাকি সবার উপর সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদ চাপিয়ে দিতে পারলেই অধিকাংশ জনগণের আরাম?

আমাদের মাঝেকার বৈচিত্র‍্যগুলোকে আমাদের মাঝে বিভাজন সৃষ্টি করতে না দিলেই তো হলো। বৈচিত্র‍্যের মাঝেই তৈরি হবে আমাদের জাতীয় ঐক্য যা একটি ক্রমবর্ধমান প্রক্রিয়া। এবং তার জন্য প্রয়োজন আমাদের বৈচিত্র‍্যগুলোর স্বীকৃতি, সেগুলোর সম্বন্ধে সামগ্রিক সচেতনতা, এবং পরষ্পর সহিষ্ণুতা।

Leave a comment