শেষ না হওয়া যাত্রা

রিয়াজ ওসমানী

১০ মে ২০২৫

বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কিছু সময় আগে একটি নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশন গঠন করে, যা সম্প্রতি প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ইউনুসের কাছে তাদের প্রতিবেদন হস্তান্তর করে। গণমাধ্যমে প্রতিবেদনটির কিছু সুপারিশ বের হয়ে আসার পর হেফাজতে ইসলাম নামক দেশটির ইসলামি মৌলবাদী গোষ্ঠী কমিশনটির বিলুপ্তির আহ্বান করে। এর কারণ হচ্ছে প্রতিবেদনটিতে নারীদের ব্যক্তিগত বিষয়াদি নিয়ে কিছু দাবি দাওয়া ছিল, যা তাদের চোখে মনে হয়েছে ইসলাম বিরোধী। আসুন এবার এসবের রাজনীতিতে মনোনিবেশ করি।

বাংলাদেশে সাধারণ অপরাধ সংক্রান্ত দণ্ডবিধির বাইরে কিছু দেওয়ানি আইন রয়েছে যার মধ্যে ব্যক্তিগত আইন অন্তর্ভুক্ত, যার কিছু অংশ লিখিত, কিছু অংশ অলিখিত। এই ব্যক্তিগত আইনগুলোই বিবাহ, তালাক, উত্তরাধিকার ইত্যাদি বিষয়াদি নিয়ন্ত্রণ করে। এখানেই মুসলমান, হিন্দু, খ্রিস্টান ইত্যাদি মানুষদের জন্য ভিন্ন ভিন্ন ধর্মীয় অনুশাসন প্রযোজ্য হয়ে পড়ে, যা তাদের নিজেদের মতো করে নারীদের বিরুদ্ধে বৈষম্য করে।

বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থা থেকে এই ধর্মভিত্তিক বৈষম্যগুলো অপসারণ করার একটি মাত্র উপায় হচ্ছে দেওয়ানি আইনগুলো, যার মধ্যে ব্যক্তিগত আইনগুলো বিদ্যমান, তা প্রতিস্থাপন করে একটি নতুন, সম্পূর্ণভাবে লিখিত এবং অভিন্ন দেওয়ানি কার্যবিধি (সিভিল কোড) প্রতিষ্ঠা করা।

এই নতুন দেওয়ানি কার্যবিধিতে বিবাহ, তালাক, উত্তরাধিকার ইত্যাদি ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষরা সমান সুবিধা ভোগ করবে। বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থায় কোনো ধর্মভিত্তিক বৈষম্য অবশিষ্ট থাকবে না। বাংলাদেশের সকল ধর্মের নারী ও পুরুষের ক্ষেত্রে এই দেওয়ানি কার্যবিধি সমানভাবে প্রযোজ্য হবে, হোক তারা মুসলমান, হিন্দু, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ এবং অন্যান্য। পুরুষরা কোনো নতুন বৈষম্যের শিকার হতে পারবে না।

এখানেই সমস্ত প্রতিকূলতার উদয় হতে পারে। বাংলাদেশের আইনি ব্যবস্থা, যা নিধার্মিক বিলেতি সাধারণ আইন (কমন লও)-এর ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত, সেখানে ব্যক্তিগত আইনই একটি মাত্র ক্ষেত্র যেখানে ধর্মীয় অনুশাসনগুলোকে স্থাপন করা হয়েছে, হোক সেগুলো মুসলমানদের, হিন্দুদের, খ্রিস্টানদের ইত্যাদি। সম্ভাব্য প্রয়োজনীয়তার খাতিরেই বিলেতি শাসকরা তা করেছিল।

মুসলমান অথবা হিন্দুরা, যারা চিরকাল বিবাহ, তালাক উত্তরাধিকার ইত্যাদি বিষয়ে ধর্মীয় অনুশাসনগুলো মেনে এসেছে, তারা কি বিচার ব্যবস্থা থেকে এই অনুশাসনগুলোর অপসারণে সায় দেবে? অনেক মুসলমান নারীরাই হয়তো দেবে, যাতে তাদেরকে তাদের ভাইদের তুলনায় অর্ধেক সম্পত্তি পেয়ে সন্তুষ্ট থাকতে না হয়।

অনেক হিন্দু নারীরাও হয়তো খুশি হবে, কারণ একটি অভিন্ন দেওয়ানি কার্যবিধির আওতায় তারা প্রথমবারের মতো তাদের স্বামীদেরকে তালাক দিতে পারবে। তো এই আইনি পরিবর্তনগুলোর সবচেয়ে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে কারা? এর উত্তর স্পষ্টতই হচ্ছে পুরুষরা, যারা ধর্মীয়ভাবে নির্দিষ্ট করে দেয়া বারতি সুবিধা ভোগ করে এসেছে যা তারা এখন হারাতে বসতে পারে।

এই হচ্ছে হেফাজতের হুংকারের কারণ। এই গোষ্ঠী, সাথে আরও কম চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলো মিলে নিশ্চিত করবে যে বাংলাদেশে কোনো দিন কোনো অভিন্ন দেওয়ানি কার্যবিধি প্রতিষ্ঠিত হবে না। এমনকি যেসকল পুরুষগণ নারীর সমতাকে সমর্থন করে, তারা শক্ত ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে ব্যক্তিগত আইনগুলোর বিলুপ্তি সহ্য করতে পারবে না – নারীদের বেলায়েও তা সত্য। অথচ সেটা সাধন করতে না পারলে নারীরা বাংলাদেশে কোনো দিনও পুরুষদের সাথে সম্পূর্ণ সমতা অর্জন করতে পারবে না।

বিশেষ হালনাগাদঃ বিগত ৫ তারিখে এই লেখাটির ইংরেজি সংস্করণটি প্রকাশ করার পরপরই বাংলাদেশি একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলে আমার একটি সাক্ষাৎকার দেখার সৌভাগ্য হয় যেখানে কমিশনের দুইজন সদস্য যথেষ্ট বেগের সাথে সকলকে বুঝিয়েছেন যে ধর্মীয় ব্যক্তিগত আইনগুলোকে স্পর্শ করা হয়নি।

তারা একটি ঐচ্ছিক এবং নিধার্মিক দেওয়ানি কার্যবিধি (সিভিল কোড)-এর প্রস্তাবনা রেখেছেন, যেখানে ব্যক্তিগত আইনগুলো হবে নিধার্মিক এবং শুধু তাদের জন্য প্রযোজ্য হবে যারা ইচ্ছাকৃতভাবে এই আইনের আওতায় পারিবারিক ব্যাপারগুলো সম্পন্ন করতে চায়। এই কার্যবিধিটি হবে সকল ক্ষেত্রে পরম সমতার ভিত্তিতে। এটি একটি অভিনব চিন্তা যা যথেষ্ট পর্যালোচনার দাবি রাখে।

Leave a comment