
রিয়াজ ওসমানী
১০ জুন ২০২৫
এক্স (X)-এর মাধ্যমে বাংলাদেশের বেশ কিছু “পণ্ডিত”দের কাছ থেকে জানতে পারলাম যে একটি মানুষের যৌন অভিমুখিতা এবং/অথবা লিঙ্গ পরিচয় নির্ভর করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরকার যৌন সংখ্যালঘু (এলজিবিটি)দের বিভিন্ন সংস্থা বা গবেষণার পেছনে কতটুকু ব্যয় করে তার উপর! ট্রাম্প প্রশাসন দ্বারা অর্থায়নের কাটছাট আর প্রচারণার কমতি হবে জেনে তারা এখন প্রফুল্ল যে বাংলাদেশ সহ সবখানেই যৌন সংখ্যালঘুদের অস্তিত্ব বা সংখ্যা এখন কমে আসবে।
এর থেকে আজগুবি বোধশক্তি মানুষের আর কী হতে পারে তা আমার বোধগম্য নয়। এই পণ্ডিতদের ধারণা যে মার্কিন তথা পশ্চিমা দুনিয়ার একটি বিশেষ “এজেন্ডা” ভিত্তিক প্রচারণার ফলে সারা দুনিয়া সহ বাংলাদেশেও অনেক তরুণরা সমকামী হয়ে যাচ্ছে বা সমকামিতার পথ বেছে নিচ্ছে বা সমকামিতায় “আসক্ত” হয়ে যাচ্ছে! কেউ কেউ ছেলে হয়ে মেয়ে হয়ে যাচ্ছে, মেয়ে হয়ে ছেলে হয়ে যাচ্ছে। লিঙ্গ ভাগ এখন বাড়তে বাড়তে একশত একে গিয়ে পৌছেছে!
পশ্চিমা দুনিয়ার একটি স্বার্থান্বেষী মহল (এলজিবিটি) বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে তদবির করে তাদের এই কুরুচিপূর্ণ, বিক্রিত ও অপ্রাকৃতিক যৌনাচার এবং জীবনধারণকে স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক হিসেবে ঘোষিত করে নিয়েছে। এখন তারা চক্রান্ত করে বাংলাদেশের মতো রক্ষণশীল দেশগুলোর ধর্ম, সমাজ ও রাষ্ট্রকে ধ্বংস করার পাঁয়তারায় লিপ্ত! বাংলাদেশে আগে কোনো সমকামী ছিল না, এলজিবিটি বলতে কিছু ছিল না। এখন উদিত হওয়া এই জঘন্য নরকের কীটরা উলঙ্গ হয়ে গায়ে রঙ মেখে পতাকা উড়িয়ে উড়িয়ে “প্রাইড র্যালি” করতে চায়। মদ খেয়ে বা মাদক সেবন করে নাইটক্লাবে নাচানাচি করতে চায়, সবার সাথে সবখানে যৌন মিলন করতে চায়।
বলাই বাহুল্য যে উপরের শেষের বাক্যটি বাংলাদেশের বহু তরুণদেরই সুপ্ত বাসনা – সমকামী (গে), উভকামী (বাইসেক্সুয়াল), বিষমকামী (স্ট্রেইট) যেই হউক না কেন! কিন্তু আমার এই লেখাটির উদ্দেশ্য সেটাকে বিশ্লেষণ করা নয়। উদ্দেশ্য হচ্ছে যে অজ্ঞতা আর ধর্ম দ্বারা অনুপ্রাণিত সমকামী-বিদ্বেষ (হোমোফোবিয়া) ও রূপান্তরকামী-বিদ্বেষ (ট্রান্সফোবিয়া)র আড়ালে যে সত্যগুলো লুকিয়ে রয়েছে তা নিয়ে কথা বলা। আমি বাংলাদেশে যৌন সংখ্যালঘুদের নিয়ে প্রচলিত কিছু বদ্ধ ধারণাগুলো একে একে নির্মূল করার চেষ্টা করবো।
১) সমকামিতা একটা মানসিক বা শারীরিক রোগ!
কোনো গোষ্ঠীর তদবিরের কারণে নয়, বরং গবেষণার খাতিরেই পশ্চিমা দুনিয়ার অনেক চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা সমকামীদের নিয়ে গবেষণা করেছে যে তাদের যে ব্যতিক্রমী যৌন অভিমুখিতা (সেক্সুয়াল ওরিয়েন্টেশন), অর্থাৎ সমলিঙ্গের প্রতি তাদের যেই যৌন আকর্ষণ, প্রেম ও ভালোবাসা, সেটা কোনো প্রকার রোগের ছকে পড়ে কি না। কোনো প্রকার রোগবালাই হলে, হোক সেটা মানসিক বা শারীরিক, তার অনেক উপসর্গ থাকে যা সহজেই চিহ্নিত করা যায়। মানুষটার উপর সেই উপসর্গগুলো বিভিন্ন রকমের প্রভাব ফেলে। এর উদাহরণস্বরূপ শারীরিক যন্ত্রনা, দুর্বলতা, নিষ্ক্রিয়তা, মানসিক যন্ত্রণা, ও ভারসাম্যহীনতাকে অন্তর্ভুক্ত করা যায়।
অথচ সমকামীদেরকে পর্যবেক্ষণ করে বার বার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে শুধু তাদের এই যৌন অভিমুখিতার কারণে তাদের মধ্যে উপরে উল্লেখিত কোনো শারীরিক উপসর্গ লক্ষ্য করা যায়নি এবং মানসিক যন্ত্রণা উপস্থিত থাকলে তা ছিল পরিবার, সমাজ, ধর্ম ইত্যাদি থেকে অবিরাম নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার কারণে, স্রোতের বিপরীতে চলতে বাধ্য হওয়ার কারণে। দুটো ব্যক্তি, যাদের মধ্যে স্বাস্থ্যজনিত বা মানসিক কোনো পার্থক্য নেই এবং প্রায় সব কিছুই এক, অথচ তাদের যৌন অভিমুখিতা ভিন্ন (একজন বিষমকামী, আরেকজন সমকামী), তাদের মধ্যে সেই যৌন অভিমুখিতা ছাড়া আর কোনো পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়নি। ব্যাপারটা অনেকটা ডান হাত আর বাম হাত দিয়ে লেখার মাঝেকার পার্থক্যটার মতো।
কাজেই সমকামিতা নামক যৌন অভিমুখিতাকে অন্তত চিকিৎসা বিজ্ঞানের জগতে কোনো প্রকার শারীরিক বা মানসিক রোগ বলে নির্ণয় করে যাওয়া সম্ভব হয়নি। এই পরিবর্তনটা কোনো প্রকার তদবিরের কারণে আসেনি। বিজ্ঞানীরা তদবিরের উপর তাদের কর্ম নির্ধারণ করে চলে না।
২) এলজিবিটিদের মানসিক ও হরমোন চিকিৎসার প্রয়োজন!
সমকামী (গে, হোমোসেক্সুয়াল)
সমকামিতা নামক যৌন অভিমুখিতাটি যেহেতু কোনো রোগবালাইয়ের মধ্যে পড়ে না, স্বাভাবিকভাবেই সেটার চিকিৎসারও কোনো প্রসঙ্গ আসে না। তবে সেটার চেষ্টা যে করা হয়নি তা নয়! কাউন্সেলিং থেকে শুরু করে বৈদ্যুতিক শক, ঝাঁড়ফুক, সম্মোহন, ধর্মীয় বুটক্যাম্প, হরমোন প্রয়োগ, বিপরীত লিঙ্গের কারো সাথে অনিচ্ছা সত্বেও যৌন মিলন, কোনো কিছুই বাদ রাখা হয়নি।
বিগত শতাব্দীর মধ্যম সময়ে কয়েক যুগ ধরে চালিয়ে যাওয়া এই সকল চিকিৎসা নামক প্রহসনগুলো কখনোই কারো যৌন অভিমুখিতা পাল্টে ফেলতে পারেনি। বরং যাদের উপর এই অন্যায়গুলো চালিয়ে যাওয়া হয়েছে, তাদেরকে উলটো বিষণ্ণতা এমন কি আত্মহত্যার দিকেও ঠেলে দেয়া হয়েছে। এসকল হৃদয়বিদারক বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে এটাই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে একটি মানুষের যৌন অভিমুখিতা, সেটা যেটাই হোক, সেটাকে কোনোভাবেই পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। অর্থাৎ কোনোভাবেই সমকামীদেরকে বিষমকামী বানিয়ে দেয়া যায় না এবং বিষমকামীদেরকে সমকামী বানিয়ে দেয়া যায় না।
রূপান্তরকামী (ট্রান্সজেন্ডার)
যৌন সংখ্যালঘুদের মাঝেই ছোট একটি গোত্র আছে যাদের মানুষরা “জেন্ডার ডিসফোরিয়া” নামক একটি মর্মস্পর্শী অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে জীবন অতিবাহিত করে। এদের বাহ্যিক শরীর একটি ছেলের হলেও, অতি অল্প বয়স থেকেই এরা দিন, রাত, জেগে থাকা এমন কি ঘুমন্ত অবস্থায়েও মনের গভীরতম স্তর থেকে অনুভব করে যে এরা একটি ভুল শরীরে বসবাস করছে। এই উদাহরণটিতে এরা আসলে একটি মেয়ে। ঠিক এই উলটো চিত্রটিও বিরাজমান! এরা কেউ কেউ মেয়ের শরীরে জন্মগ্রহণ করেছে, কিন্তু রন্ধ্রে রন্ধ্রে তারা জানে যে তারা আসলে একটি ছেলে।
এই লেখাটির শুরুতে যে সকল পণ্ডিতদের কথা উল্লেখ করেছি, তারা এই স্পর্শকাতর ভুবনে একটি “আইডিলজি” বা সামাজিক ও রাজনৈতিক আদর্শ এবং “প্রপাগান্ডা” বা প্রচারণা খুঁজে পায়, যেন এটা একটা বহিরাগত ষড়যন্ত্র! কেউ কেউ এই ভুবনটিকে “উয়োউক” সংস্কৃতির বহি:প্রকাশ হিসেবে দেখে। অথচ এরা কেউই ব্যাপারটার গভীরে যাওয়ার চেষ্টা করে না – উল্টো বলে বেড়ায় যে রূপান্তরকামীদের অবদানের ফলে এখন একশত একটা লিঙ্গ প্রকার আবিষ্কার করা হয়েছে!
জেন্ডার ডিস্ফোরিয়াকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের জগতে কোনো মানসিক বা শারীরিক রোগ হিসেবে নির্ণয় করা হয়নি। অতএব এর কোনো চিকিৎসারও প্রসঙ্গ অবান্তর। তবে যারা জেন্ডার ডিস্ফোরিয়া অনুভব করে, তাদের যন্ত্রণা অসহনীয়। এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাওয়ার পথ বেশ প্রসারিত এবং প্রশিক্ষিত বিশেষজ্ঞদের সাথে আলোচনা সাপেক্ষে এরা সিদ্ধান্ত নিতে পারে তারা হরমোন প্রয়োগ করেই ক্ষান্ত থাকবে, না কি দীর্ঘ অস্ত্রপ্রচারের মাধ্যমে শরীরটাকে বদলে ফেলবে যাতে মনের ভেতরের মানুষটা বাইরের মানুষটার সাথে এক হয়ে যেতে পারে। অর্থাৎ এদের বাহ্যিক লিঙ্গ আর অন্তর্নিহিত লিঙ্গ পরিচয়ের অসামঞ্জস্যতা দূর হয়ে যেতে পারে। সিদ্ধান্ত যেটাই হবে, সেটাই তাদেরকে জেন্ডার ডিস্ফোরিয়ার যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দিবে। রূপান্তরকামীদের ক্ষেত্রে আর কোনো চিকিৎসার প্রসঙ্গ আসে না।
অদ্বৈত (নন-বাইনারি)
যৌন সংখ্যালঘুদের মধ্যে আরেকটি গোত্র আছে যারা জেন্ডার ডিস্ফোরিয়ার কারণে নিজেদেরকে নারী বা পুরুষ, এই ছকেই ফেলতে পারে না। তাদের বাহ্যিক শরীর যেটাই থাকুক না কেন, তারা নিজেকে নারীও ভাবতে পারে না, পুরুষও ভাবতে পারে না। এদের লিঙ্গ পরিচয় অনির্ধারিত। এরা অদ্বৈত। এরা এইভাবেই নিজেদেরকে নিয়ে সন্তুষ্ট। এখানেও কোনো রোগবালাই নেই এবং কোনো প্রকার চিকিৎসাও অপ্রাসঙ্গিক।
আন্তলিঙ্গ (ইন্টারসেক্স)
কারো কারো জন্ম হয় এমনভাবে যে তাদের যৌনাঙ্গ পুর্ণাঙ্গভাবে নারী বা পুরুষদের মতো নয়, অথবা তাদের যৌনাঙ্গে নারী ও পুরুষ উভয়েরই বৈশিষ্ট বিদ্যমান। এদের জন্মের সময়ে তাদের অভিভাবকগণ ডাক্তারের সাহায্যে কী পদক্ষেপ নেয় তা নৈতিকতা বা নীতিশাস্ত্রের আওতায় এসে পড়ে৷ কিন্তু এরাও এলজিবিটি সম্প্রদায়েরই অংশ এবং এদেরও মানবাধিকার সকল মানুষের মতোই গুরুত্বপূর্ণ।
৩) বাংলাদেশ সহ সারা দুনিয়াতে এলজিবিটি হওয়া একটা ফ্যাশন বা চল!
স্রোতের বিপরীতে চলে, নিজের সাথে যুদ্ধ করে, পরিবার, সমাজ এমন কি রাষ্ট্রের কাছ থেকেও নিগ্রহের শিকার হয়ে ও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কার এত ফ্যাশন করার শখ হয়েছে, পণ্ডিতদের কাছে সেই প্রশ্নটাই রাখছি। যৌন অভিমুখিতা এবং লিঙ্গ পরিচয় সংক্রান্ত জ্ঞানের পরিধি সময়ের সাথেই বাড়ছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী একটি মানুষের যৌন অভিমুখিতা নির্ণিত হয় তার বিভিন্ন বংশাণুর (জিনের) একটি জটিল মিথস্ক্রিয়ার ফলন হিসেবে। অর্থাৎ সমকামীদের ক্ষেত্রে তার জিনগুলো একভাবে একত্রে কাজ করে। উভকামী ও বিষমকামীদের ক্ষেত্রে তাদের বংশাণুগুলো ভিন্নভাবে একত্রে কাজ করে। যে সকল পণ্ডিতগণ বলে বেড়ায় যে কোনো “গে জিন” আবিষ্কৃত হয়নি, তাদেরকে জানিয়ে রাখছি যে কোনো “স্ট্রেইট জিন”ও আবিষ্কৃত হয়নি। জেন্ডার ডিসফোরিয়াও একটি মানুষের বিভিন্ন বংশাণুর একটি জটিল মিথস্ক্রিয়ার ফলন। এটা নিয়ে আরো অনেক গবেষণা চলছে।
৪) সারা দুনিয়া সহ বাংলাদেশেও সমকামিতাকে “প্রমোট” করা হচ্ছে!
একটি মানুষের যৌন অভিমুখিতা যেহেতু তার বিভিন্ন বংশাণুর একটি জটিল মিথস্ক্রিয়ার ফলন, সেহেতু সমকামিতাকে “প্রমোট” করার ধারণাটি একেবারেই হাস্যকর এবং অবাস্তব। ইহাকে প্রমোট করা যায় না এবং প্রমোট করারও কিছু নেই। কাওকে প্রলোভন দেখিয়ে সমকামী বানিয়ে দেয়া যায় না এবং ঠিক তার উল্টাটাও সত্যি। কিছু অনুকাহিনী অনুযায়ী শোনা যায় যে অমুক ছেলেটি কোনো বড় ভাই, চাচা-মামা-ফুপা, হুজুর বা বন্ধু দ্বারা ছোট বেলায় ধর্ষিত হয়ে বড় হয়ে সমকামী হয়ে গিয়েছে। এর কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই৷ এই ক্ষেত্রে ছেলেটি বরাবরই সমকামী ছিল। ধর্ষকটি সমকামী, উভকামী বা শিশুকামী (পেডোফাইল) জাতীয় কেউ একজন ছিল। মেয়ে সমকামীদের বেলায়েও একই যুক্তি প্রযোজ্য। অন্য কোনো নারীর স্পর্শে কেউ লেজবিয়ান হয়ে যায়নি।
৫) কেউ কি আসলেই সমকামী হয়ে জন্মগ্রহণ করে?
এই ব্যাপারে চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা এখনও এক জায়গায় পৌছতে সক্ষম না হলেও এটা বলা যায় যে যেহেতু একটি মানুষের বিভিন্ন বংশাণুর জটিল মিথস্ক্রিয়া তাকে গে, স্ট্রেইট বা বাইসেক্সুয়াল বানিয়ে দেয়, সেহেতু সংশ্লিষ্ট যৌন অভিমুখিতাটি জন্মের আগে নির্ধারত হয়েছে, না কি জন্মের পরে, তা একেবারেই মুখ্য নয়। যেটা মুখ্য, তা হচ্ছে যে যৌন অভিমুখিতাটি যখনই নির্ধারিত হউক না কেন, তা একবার নির্ধারিত হয়ে যাওয়ার পর আর বদলানো যায় না।
৬) বাংলাদেশে এলজিবিটিদের সংখ্যা নগণ্য!
নগন্য ধারনাটা আপেক্ষিক কারণ একজন মানুষও একটি মানুষ। যেহেতু নানাভাবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে যে পৃথিবীর ৫-১০% মানুষ যৌন সংখ্যালঘু, এবং এদের বংশাণুগত বৈশিষ্টগুলো দেশ, সংস্কৃতি ও ধর্মগুলোকে আমলে নেয় না, সেহেতু নির্দিধায় বলা যায় যে বাংলাদেশের জনসংখ্যারও ৫-১০% যৌন সংখ্যালঘু। পৃথিবী জুড়ে এই শতাংশের হারটি বাড়ছে বা কমছে বলে কোনো তথ্য নেই। বলা যায় যে বৈচিত্র্যময় প্রকৃতিতে এই সংখ্যাটি বরাবরই বিদ্যমান ছিল, আছে এবং থাকবে।
৭) সমকামিতা অপ্রাকৃতিক!
সমকামীরা যেহেতু প্রকৃতিরই অংশ সেহেতু তাদের বংশাণুগত এবং অপরিবর্তনীয় যৌন অভিমুখিতাটি অবশ্যই প্রাকৃতিক। তাছাড়া প্রাণী জগতে সমকামিতা বিস্তর। ব্যক্তিগত পর্যায় কার কাছে কোনটা প্রাকৃতিক সেটা সম্পূর্ণ আপেক্ষিক। একজন সমকামীর পক্ষে বিপরীত লিঙ্গের কারো সাথে যৌন মিলন করাটা একেবারেই অপ্রাকৃতিক বা আনন্যাচারাল। বরং সমলিঙ্গের কারো সাথে যৌন মিলন করাটাই স্বাভাবিক। আবার বিষমকামীদের পক্ষে সমলিঙ্গের কারো সাথে যৌন মিলন করাটা একেবারেই অপ্রাকৃতিক বা আনন্যাচারাল। বরং বিপরীত লিঙ্গের কারো সাথে যৌন মিলন করাটাই স্বাভাবিক।
৮) সমকামীরা বাচ্চা দিতে পারে না। কাজেই সমকামিতা প্রাকৃতিক হলো কীভাবে? এটা তো প্রকৃতি বিরুদ্ধ কাজ!
এই বিষয়ে বিবর্তন বিশেষজ্ঞরা বুঝিয়েছেন যে জন্ম দেয়াটাই প্রাণীর মূল উদ্দেশ্য নয়৷ প্রাণীটা যেন সময়ের সাথে সাথে টিকে থাকে পারে সেটাই প্রাণীর মূল উদ্দেশ্য। বাচ্চা জন্ম দেয়াটা সেই উদ্দেশ্য হাসিল করার একটি পন্থা, কিন্তু একটি মাত্র পন্থা নয়! যাদের জন্ম দেয়া হচ্ছে তাদের লালন-পালন এবং সার্বিক বিকাশেরও প্রয়োজন আছে৷ প্রাণী জগতে জন্ম দিতে পারে না এমন প্রাণের অবদান দেখা গিয়েছে একটি প্রাণী গোষ্ঠীর সার্বিক বিকাশের ক্ষেত্রে। মানুষের ক্ষেত্রে ইতিহাস জুড়ে যৌন সংখ্যালঘুরা সভ্যতাকে যা দিয়ে এসেছে তাতে মানব সভ্যতাই সমৃদ্ধ হয়েছে যা বিবর্তনে টিকে থাকারই প্রয়াস। ইতিহাস জুড়ে এই যৌন সংখ্যালঘুদের কিছু নাম হচ্ছে:
- আলেকজ্যান্ডার দ্যা গ্রেট
- লিওনার্দো দা ভিঞ্চি
- আলেন টুরিং
- চায়কফস্কি
- ঋতুপর্ণ ঘোষ
আধুনিক উপায়ে সমকামীরা এখন বাচ্চা নিতে পারছে অনেকটা বন্ধ্যা বিবাহিত দম্পতিদের মতো করে। তাদের এই বাচ্চা নেয়াটা অপ্রাকৃতিক হলে বন্ধ্যা দম্পতিদের বাচ্চা নেয়াটা বা যৌন মিলন করাটাও অপ্রাকৃতিক, যা একেবারেই উদ্ভট একটি ধারণা। তাছাড়া পৃথিবীতে এত এতিম শিশু পড়ে আছে। তাদের কাওকে সমকামীরা দত্তক নিলে মানব জাতিরই তো কল্যান! সেই শিশুরা যে বড় হয়ে সমকামী হয়ে যাবে সেটার একেবারেই কোনো ভিত্তি নেই। তবে কাকতালীয়ভাবে হলে কোনো সমস্যাও নেই। আর জেনে রাখা উচিৎ যে বিষমকামীদেরও একাংশ বিভিন্ন কারণে কোনো বাচ্চা জন্ম না দিয়েই মারা যায়।
৯) আপনার বাবা বা মা সমকামী হলে আপনি পৃথিবীতে আসতেন না!
না আসলেই কি পৃথিবীটা জনশূন্য হয়ে যেত? আমি না আসলেও অন্য ঘরে অনেক প্রতিভাবান মানুষের জন্ম হতো এবং মনুষ্যজাতি সমৃদ্ধ হয়ে টিকে থাকতো। সবাই যে সমকামী হবে সেটা যে প্রকৃতি মা চেয়েছে তার কোনো ইঙ্গিত নেই। তাছাড়া বাবা বা মা সমকামী হলে অন্য কোনো যুগলের মাধ্যমেও আমার/আপনার জন্ম হতে পারত।
১০) পর্ণ ছবি ও আন্তর্জাল (ইন্টার্নেট) ও পশ্চিমা জনপ্রিয় সংষ্কৃতির আগ্রাসন প্রসারিত হওয়ার পর বাংলাদেশে এলজিবিটিদের সংখ্যা বেড়ে গিয়েছে!
সেটা কখনোই সম্ভব না। যেহেতু যৌন অভিমুখিতা এবং লিঙ্গ পরিচয়ের ভিত্তিটি জৈবিক, সেহেতু কে কী পর্ণ দেখলো, মার্কিন প্রশাসন কোন সংস্থাকে কত টাকা অনুদান করলো ইত্যাদি একেবারেই অপ্রাসঙ্গিক। আধুনিকতার এই সব ছোঁয়ার আগেও বাংলাদেশে সমকামী, রূপান্তরকামী সকলেই ছিল। কিন্তু অধিকাংশজনই নিজের জীবনে কী ঘটছিল তা সহজে অনুধাবন করতে পারেনি। তারা জানতো যে তারা আর পাঁচ-দশটা মানুষের চেয়ে যথেষ্ট ভিন্ন। এই ভিন্নতা থেকে মুক্তি পেতে তারা অনেকেই দিনরাত তাদের সৃষ্টিকর্তার কাছে কেঁদেছে৷ কেউ কেউ আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে৷ অনেকেই বিপরীত লিঙ্গের মানুষকে বিয়ে করে পরিবার ও সমাজকে চুপ রেখেছে৷ কিন্তু সেই বিবাহিত জীবন ছিল অপূর্ণ, ব্যক্তিগত অত্যাচারে ডুবন্ত, মিথ্যায় জর্জরিত এবং পরকিয়ায় কলুষিত।
তথ্যপ্রযুক্তি ও বিদেশি টিভি চ্যানেলের যুগে বহির্বিশ্বের সাথে তরুণ সমাজের ঘন পরিচিতি স্থাপিত হওয়ার পর এখন আর কেউ নিজের জীবন নিয়ে রহস্যের মধ্যে পড়ে থাকে না। যারা এলজিবিটি, তারা আগের চেয়ে অনেক সহজেই বুঝে ফেলে যে তারা সেটা। এর সাথে যুক্ত হয়েছে যৌন সংখ্যালঘু হিসেবে তাদের যে তাদের মতো করে বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে, সেই সচেতনতা। এখন আর সমাজের অন্তরালে বাস করার কোনো যৌক্তিকতা নেই৷ সমাজের চোখে একটি মিথ্যা চেহারা প্রদর্শন করে বাস করার কোনো কারণ নেই। এই সকল কারণেই পণ্ডিতদের কাছে মনে হচ্ছে যে বাংলাদেশে আস্তে আস্তে সমকামীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাস্তবতা হচ্ছে আত্মপ্রকাশ করে নিজেদের কাছে সৎ হয়ে বাঁচার চেষ্টা করছে এমন সমকামীদের সংখ্যা বাংলাদেশে বাড়ছে। আগে সমকামীরা মিথ্যা জীবনযাপন করতো।
১১) সমকামীরা বাংলাদেশ সহ সারা দুনিয়াতে এইডস রোগ ছড়াচ্ছে!
এই দোষ সমকামী, উভকামী, বিষমকামী সকলেরই। বাংলাদেশে যেসকল ট্রাক চালকরা নিয়মিত পতিতালয়ে যায় কিন্তু যৌন মিলনের সময়ে কন্ডম ব্যবহার করে না, তারা কি এইডস ছড়াচ্ছে না? যৌন রোগ ছড়ানো রোধ করার দায়িত্ব সকলের। এই বিষয়ে বিশ্বের সকল সমকামীরাই আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন। কন্ডম ব্যবহার করা ছাড়াও বর্তমানে প্রতিরোধক ওষুধও বের হয়েছে। একজনের এইডস ধরা পড়লে সে যেন আরেকজনকে সেটা দিয়ে সংক্রমণ না করে তার জন্য পরামর্শ দেয়া আছে।
ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলুন, এইড থেকে বাঁচুন – এই সকল বুলি আওড়িয়ে যৌন রোগের ব্যাপকতা কমানো সম্ভব নয় কারণ ধর্মের ঢালের নিচেই মানুষ (সমকামী, উভকামী এবং বিষমকামী)রা “অপকর্ম” করে। রোগবালাই ছড়ানোর পথ বন্ধ করার পন্থা হচ্ছে নিরাপদ যৌনাচার নিশ্চিত করা অর্থাৎ যৌন মিলনের সময়ে অন্তত একজন পুরুষ থাকলে সেখানে কন্ডমের ব্যবহার নিশ্চিত করা। বিবাহিত দম্পতি, যারা একে অপরের প্রতি অনুগত, তাদের ক্ষেত্রে এই নিয়ম প্রযোজ্য হওয়ার কারণ নেই। তবে তাদের বেলায় কন্ডমকে একটি জন্ম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি হিসেবে ব্যবহার করা যায়। জেনে রাখা উচিৎ যে এইচআইভি ভাইরাস বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়াতে পারে, যার মধ্যে যৌন মিলন একটি।
১২) বাংলাদেশে সমকামিতা স্বীকৃতি পেলে এবং সমকামী যুগলদের সন্মান করলে আমাদের পরিবার ও পারিবারিক মূল্যবোধ ধ্বংস হয়ে যাবে। পারিবারিক বন্ধন নষ্ট যাবে!
৫-১০% মানুষ সমাজের বাকি মানুষদের পারিবারিক জীবনে কীভাবে প্রভাব ফেলবে তার যুক্তি খুঁজে পাওয়া কঠিন। আর পশ্চিমা দুনিয়াতে সমকামী দম্পতিদের স্বীকৃতি দেয়ার পর সমকামীরা বেশি করে সম্পর্কে আবদ্ধ হতে শুরু করেছে৷ বিষমকামী সম্পর্কগুলোর উপর তা একেবারেই কোনো প্রভাব ফেলেনি। পরিবার বলতে কিছুরই ধ্বংস হয়নি, বরং পরিবারের সংজ্ঞাটি একটু বিস্তৃত হয়েছে যা সমাজকেই করেছে আরও শক্তিশালী। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে যে পশ্চিমা দুনিয়াতে দেখা গেছে যে বাচ্চারা একটি বিষমকামী যুগলের মধ্যেকার ভালোবাসা আর একটি সমকামী যুগলের মধ্যেকার ভালোবাসার মধ্যে একেবারেই কোনো পার্থক্য খুঁজে পায় না।
১৩) সমকামীরা এবং রূপান্তরকামীরা বাংলাদেশকে ধ্বংস করে ফেলবে!
সমকামী আর রূপান্তরকামীরা পৃথিবীর কোনো দেশ আজ পর্যন্ত ধ্বংস করেনি। আর লুত ধ্বংস হয়ে যাওয়ার কাহিনীটি শুধু একটি কল্পকাহিনী মাত্র। এর কোনো ঐতিহাসিক প্রমাণাদি নেই। তাছাড়া যারা এই সকল উদ্ভট ভীতিতে ভুগে, তারা ঠিকই পশ্চিমা দেশগুলোর ভিসার জন্য সবার আগে কাতারে দাঁড়ায়, যেই দেশগুলোতে যৌন সংখ্যালঘুদের মৌলিক মানবাধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে।
১৪) সমকামীরা খালি সেক্স, সেক্স, আর সেক্স নিয়ে ব্যস্ত। চুপচাপ করলেই তো পারে। এত স্বীকৃতির কি আছে?
সারাক্ষণ ইয়ে করার কথা কি শুধু সমকামীরাই ভাবে? তাছাড়া সমকামীদের অধিকারকে খালি সেক্স করার অধিকার ভাবলে সেটা অজ্ঞতা ছাড়া আর কিছু হবে না। সমকামীরাও ভালোবাসতে জানে, একজন জীবন সঙ্গীর বাসনা ধারণ করতে পারে, তার সাথে জীবন কাটানোর স্বপ্ন দেখতে পারে। সেই ভালোবাসা, আবেগ, অনুভূতি, সুখ ও দু:খ বিষমকামীদের বেলায় যা, সমকামীদের বেলায়েও ঠিক তা।
১৫) বাংলাদেশে এই পশ্চিমা হালচাল গ্রহণযোগ্য না!
বাংলাদেশে পশ্চিমা কোন হালচালটার ছোঁয়া লাগেনি? তবে দেশে যৌন সংখ্যালঘুদের মৌলিক মানিবাধিকার নিশ্চিত হওয়া মানেই ঢাকার রাস্তায় প্রাইড পদযাত্রার অনুমতি নয়, যদিও দেশীয় কৃষ্টির প্রতি সন্মান রেখেই সেই পদযাত্রা অনুষ্ঠিত করা যায়। সমকামীদের মৌলিক মানবাধিকার নিশ্চিত হওয়া মানে দেশের দন্ডবিধি থেকে ৩৭৭ ধারা অপসারণ করা। সকল যৌন সংখ্যালঘুদের মৌলিক মানবাধিকার নিশ্চিত হওয়া মানে সংবিধানে বৈষম্য করা যাবে না এমন উল্লেখিত নির্ণায়কের তালিকায় যৌন অভিমুখিতা এবং লিঙ্গ পরিচয়কে অন্তর্ভুক্ত করা। আমরা তাহলে নিজের পায়ের নিচে নিজের দেশের মাটিটা খুঁজে পাব। চাকুরিদাতা বা বাড়িয়ালার কাছ থেকে বৈষম্য থেকে রক্ষা পাব। পরিবার, আত্মীয় বা প্রতিবেশির কাছ থেকে শারীরিক হুমকির মধ্যে পড়লে পুলিশ প্রশাসনের কাছে আশ্রয় চাইতে পারব। সমকামীদের অধিকার মানেই নাইটক্লাব, মদ ও মাদকসহ ভোগ বিলাসের জীবন নয়। সমকামীরাও দাম্পত্য জীবনযাপন করতে জানে। তাদের অধিকার হচ্ছে তাদের সেই ভালোবাসার পারিবারিক ও সামাজিক স্বীকৃতি।
১৬) বাংলাদেশে সমকামিতার বৈধতা দিলে ইসলাম ধর্মের অবমাননা হবে!
এই কথাটি ইসলামি রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, যেই দেশের সংবিধান, দন্ডবিধি ও দেওয়ানিবিধি শরীয়া আইন দ্বারা গঠিত। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই ধারণাটির কোনো স্থান নেই যদিও দেওয়ানিবিধিতে নারী ও পুরুষদের নিয়ে কিছু ধর্মীয় বিষয়কে আমলে নেয়া হয়েছে। যেসকল সমকামীরা ইসলাম বা অন্য যে কোনো ধর্মের অনুসারী, তাদের যৌন অভিমুখিতা আর ধর্মবিশ্বাসের বিরোধটির সামাল দেয়ার এখতিয়ার শুধু সেই সমকামীদের, রাষ্ট্রের না। আর ইসলাম ধর্ম কি এতটাই দুর্বল যে ৫-১০% মানুষের কারণে সেই ধর্মটির ক্ষতি সাধন হবে?