আবুল আ’লা মওদুদী

রিয়াজ ওসমানী

৩১ আগষ্ট ২০২৫

চ্যাটজিবিটি দ্বারা রচিত
——————————–
মওদুদী মতাদর্শের উৎপত্তি

আবুল আ’লা মওদুদী (১৯০৩–১৯৭৯) ছিলেন একজন ভারতীয় মুসলমান চিন্তক। বিলেতি ঔপনিবেশিক শাসনের সময় ১৯৩০ ও ১৯৪০-এর দশকে তিনি তার মতাদর্শ গড়ে তোলেন। ১৯৪১ সালে তিনি অবিভক্ত ভারতে জামায়াতে ইসলামী প্রতিষ্ঠা করেন। তার ধারণা জন্ম নেয় একদিকে পাশ্চাত্যের ধর্মনিরপেক্ষ আধুনিকতার প্রতিক্রিয়া হিসেবে, আরেক দিকে ভারতীয় জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের বিকল্প হিসেবে—কারণ তিনি মনে করতেন, এসব আন্দোলনে ইসলামকে পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা হিসেবে উপেক্ষা করা হচ্ছে।

মওদুদীর মতাদর্শ (সংক্ষেপে)

১. আল্লাহর সার্বভৌমত্ব: মওদুদীর মতে সার্বভৌমত্ব কেবল আল্লাহর। মানুষ বা রাষ্ট্রের হাতে চূড়ান্ত ক্ষমতা নেই। মানুষের সব আইন কোরআন ও সুন্নাহর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।

২. থিও-ডেমোক্রেসি বা ধর্মভিত্তিক গণতন্ত্র: তিনি পাশ্চাত্যের ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্র প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তার মতে, জনগণের ভোটে নেতা নির্বাচিত হতে পারে, তবে তারা পুরোপুরি শরীয়ার অধীন থাকবে।

৩. ইসলাম পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা: ইসলাম কেবল ধর্ম নয়; বরং রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতিসহ জীবনের সবক্ষেত্রকে নিয়ন্ত্রণকারী পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা। ধর্ম ও রাষ্ট্রকে আলাদা করা তার কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না।

৪. রাষ্ট্রের ভূমিকা: রাষ্ট্রের কাজ হবে শরীয়া আইন কার্যকর করা, সমাজকে ইসলামী নীতিমালার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা এবং অ-ইসলামী কার্যকলাপ বন্ধ করা।

৫. ধর্মনিরপেক্ষতা ও পাশ্চাত্য মতাদর্শের বিরোধিতা: ধর্মনিরপেক্ষতা, জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র ও উদারনীতি — এসবকে তিনি ইসলামের জন্য হুমকি মনে করতেন।

৬. জিহাদ বা সংগ্রাম: মওদুদীর কাছে জিহাদ মানে শুধু সামরিক লড়াই নয়; বরং এমন এক বৃহৎ সভ্যতাগত সংগ্রাম, যার লক্ষ্য ইসলামকে শাসনব্যবস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। জামায়াতে ইসলামীকে তিনি এই সংগ্রামের অগ্রদূত ভাবতেন।

৭. ক্রমিক পরিবর্তন: হঠাৎ সহিংস বিপ্লবের বদলে ধীরে ধীরে সমাজ পরিবর্তন, শিক্ষা, প্রচার ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথকেই তিনি সঠিক মনে করতেন।

বাংলাদেশে প্রভাব

মূল ভিত্তি: বাংলাদেশের জামায়াতে ইসলামী সরাসরি মওদুদীর চিন্তাধারার ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়। ইসলামকে পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা হিসেবে দেখা ও ধর্মনিরপেক্ষতার বিরোধিতা ছিল এর মূল ভিত্তি।

মুক্তিযুদ্ধ ১৯৭১: জামায়াত স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল। তাদের মতে, একটি মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তানকে ভাঙা ইসলামের পরিপন্থী। তাদের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র সংঘ পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগী ছিল এবং নৃশংসতায় জড়িত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

স্বাধীনতার পর রাজনীতিতে ফেরা: ১৯৭১ সালের পর জামায়াত নিষিদ্ধ হয়। তবে ১৯৭০-এর শেষ দিকে সামরিক শাসকরা (জিয়াউর রহমান ও পরে এরশাদ) ধর্মনিরপেক্ষ শক্তিকে দুর্বল করার জন্য তাদেরকে রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনে। পরে জামায়াত বিএনপির সঙ্গে জোট গড়ে সংবিধানে ইসলামী ধারা যুক্ত করতে ভূমিকা রাখে।

সামাজিক বিস্তার: কেবল রাজনীতিতেই নয়, জামায়াত স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয়, দাতব্য সংস্থা ও এনজিওর মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করে। শিক্ষার্থী ও মধ্যবিত্তের মধ্যে মওদুদীর ধারণা ছড়িয়ে দেয়।

সমাজে প্রভাব: এতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক আলোচনায় এক ধরনের পরিবর্তন আসে। মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদ ধীরে ধীরে ইসলামী পরিচয়কেন্দ্রিক বিতর্কে রূপ নেয়।

সমালোচনা ও পতন: ধর্মনিরপেক্ষ শক্তি জামায়াতকে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের সাথে বিশ্বাসঘাতক মনে করে। ২০১০-এর দশকে যুদ্ধাপরাধের বিচারে জামায়াতের শীর্ষ কয়েকজন নেতা দোষী সাব্যস্ত হয় এবং দলটি রাজনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। তবে তাদের ছড়িয়ে দেওয়া মওদুদী চিন্তাধারা আজও বাংলাদেশের ইসলামপন্থী ধারা ও বিতর্কে প্রভাব বিস্তার করে।

সারসংক্ষেপ: ১৯৩০–৪০-এর দশকে উপনিবেশিক ভারতে জন্ম নেওয়া মওদুদীর মতাদর্শ — আল্লাহর সার্বভৌমত্ব, ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ও ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্রের প্রত্যাখ্যান — জামায়াতে ইসলামীকে তার পরিচয় ও কর্মপন্থা দিয়েছে। বাংলাদেশে এটি জামায়াতকে এক বিতর্কিত কিন্তু স্থায়ী শক্তি বানিয়েছে, যারা রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ ভিত্তির বিরোধিতা করেছে এবং রাজনীতি, শিক্ষা ও সমাজে গভীর ছাপ রেখেছে।

Leave a comment