রিয়াজ ওসমানী

১১ জানুয়ারি ২০২৬

বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জাতীয় ঐকমত্য কমিশন ও রাজনৈতিক দলগুলোর অক্লান্ত পরিশ্রমের ফসল জুলাই সনদটি রাজনীতির ঊর্ধ্বে কারণ এখানে আমাদের দেশটাই প্রথম। জামায়াত-এনসিপিকে নির্বাচনে “না” বলেও, যেই জুলাই সনদে এনসিপি ও জামায়াতের অবদানটাই বেশি, সেই সনদটিকে কেন “হ্যাঁ” বলা যায় এবং উচিৎ, সেটা বুঝতে হলে অনুগ্রহ করে সনদটির অন্তর্ভুক্ত ধারাসমূহ ভালো করে জেনে ও বুঝে নিন। নিচে ধারাগুলো গুছিয়ে তালিকা করে দিলাম। কম পড়ুয়া নির্বাচকদেরকে কীভাবে এই সনদটির ধারাসমূহ ও গুরুত্বটি বোঝানো যায় তা আপনার ও আমার উপরে ছেড়ে দিলাম।

লেখাটি জেমিনির সহায়তায় রচিত এবং চ্যাটজিপিটি দ্বারা অনুবাদিত। তারপর আমার দ্বারা পরিমার্জিত। বিষয়বস্তুতে ভুলত্রুটি থাকলে জেমিনিকে ক্ষমা করবেন। জুলাই সনদে পৌঁছতে পারার জন্য আমি ব্যক্তিগতভাবে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন, সেটার সভাপতি ও উপসভাপতি এবং রাজনৈতিক দলগুলোকে আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। লেখাটির শেষের দিকে আমি জুলাই সনদকে কেন্দ্র করে বিএনপিকে নিয়ে কিছু কথা বলেছি যা অবহেলা করবার মতো নয়

বাংলাদেশের জুলাই সনদে মোট ৮০টির বেশি প্রস্তাব বা অঙ্গীকার রয়েছে। এর মধ্যে ৩০টি হলো বাধ্যতামূলক বিষয়। এই বিষয়গুলো সংবিধান ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর নির্দিষ্ট সংস্কারের সঙ্গে যুক্ত। সনদটি ঘিরে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারিতে যেই গণভোটটি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, সেটাতে যদি জনগণের সম্মতি পাওয়া যায়, অর্থাৎ বেশির ভাগ নির্বাচক গণভোটে “হ্যাঁ” ভোট দেয়, তাহলে পরবর্তী নির্বাচিত সরকার আইনগতভাবে এসব সংস্কার বাস্তবায়নে বাধ্য থাকবে। নিচে এই ৩০টি বাধ্যতামূলক বিষয়ের তালিকা কার্যক্ষেত্র অনুযায়ী ভাগ করে দেওয়া হলো।

নির্বাহী বিভাগ ও নেতৃত্ব সংক্রান্ত সংস্কার

১. প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদের সীমা

একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ দুই মেয়াদ, অথবা মোট দশ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না।

২. দ্বৈত দায়িত্ব নিষিদ্ধ

প্রধানমন্ত্রী (নির্বাহী বিভাগের প্রধান) একই সঙ্গে নিজের দলের সভাপতির দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না, তবে সংসদের নেতা হয়ে থাকতে পারবেন।

৩. রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি

স্বাধীন কমিশনগুলোর, যেমন মানবাধিকার কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন ইত্যাদির প্রধান নিয়োগে রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ছাড়াই সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।

৪. রাষ্ট্রপতির রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা

রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব গ্রহণের সময়ে তিনি কোনো রাজনৈতিক দল এবং/অথবা রাষ্ট্রীয় বা সরকারি পদে থাকতে পারবেন না।

৫. স্বচ্ছ নিয়োগ পদ্ধতি

সংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধানদের নিয়োগ হবে দ্বিদলীয় বা স্বাধীন কমিটির মাধ্যমে, নির্বাহী আদেশে নয়।

সংসদ সংক্রান্ত সংস্কার

৬. দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ

জাতীয় সংসদ, যাকে নিম্নকক্ষ বলা হবে, তার পাশাপাশি ১০০ সদস্যের একটি উচ্চকক্ষ গঠন করা হবে।

৭. আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থা

উচ্চকক্ষের সদস্যরা নির্বাচিত হবেন সাধারণ নির্বাচনে নিম্নকক্ষে দলগুলোর মোট প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে।

৮. সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংস্কার

অর্থবিল ও আস্থাভোট ছাড়া অন্য সব বিষয়ে সংসদ সদস্যরা দলের বিপক্ষে ভোট দিতে পারবেন।

৯. বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার

সংসদের উপ-স্পিকার অবশ্যই বিরোধী দল থেকে নির্বাচিত হবেন।

১০. বিরোধী দলের কমিটি সভাপতিত্ব

গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতিদের একটি অংশ বিরোধী দল থেকে আসবে।

১১. নারী প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি

নিম্নকক্ষে নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসন বাড়িয়ে মোট ১০০ করা হবে, মোট আসন হবে ৪০০।

১২. নারী প্রার্থী কোটা

সরাসরি নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোকে অন্তত ৩৩ শতাংশ নারী প্রার্থী দিতে হবে।

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা

১৩. বিচারক নিয়োগ কমিশন

সর্বোচ্চ আদালতের বিচারক নিয়োগের জন্য একটি স্বাধীন কমিশন গঠন করা হবে, যার উপর নির্বাহী বিভাগের কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকবে না।

১৪. প্রধান বিচারপতি নিয়োগ

আপিল বিভাগের সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ বিচারককে প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার ব্যবস্থা পুনর্বহাল হবে।

১৫. বিচার বিভাগের আর্থিক স্বাধীনতা

বিচার বিভাগের নিজস্ব বাজেট থাকবে, যা সর্বোচ্চ আদালত পরিচালনা করবে।

১৬. নিম্ন আদালতের পূর্ণ পৃথকীকরণ

নিম্ন আদালতকে আইন মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ থেকে সম্পূর্ণভাবে আলাদা করা হবে।

নির্বাচন ও রাষ্ট্র সংস্কার

১৭. নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার

জাতীয় নির্বাচনের জন্য সংবিধানে স্থায়ীভাবে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল করা হবে।

১৮. নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা

নির্বাচন কমিশনের পূর্ণ আর্থিক ও প্রশাসনিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হবে এবং কমিশনার নিয়োগের নতুন পদ্ধতি চালু হবে।

১৯. গণভোটের বিধান

ভবিষ্যতে বড় সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে জাতীয় গণভোট বাধ্যতামূলক করা হবে।

২০. গণঅভ্যুত্থানের স্বীকৃতি

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানকে রাষ্ট্রের ইতিহাসের একটি ভিত্তি হিসেবে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

জবাবদিহিতা ও নাগরিক অধিকার

২১. সামাজিক অধিকারের আইনি নিশ্চয়তা

রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতে থাকা শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসহ সামাজিক অধিকারগুলোকে মৌলিক অধিকারের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে, যাতে আদালতে এসব অধিকার দাবি করা যায়।

২২. ন্যায়পাল কার্যালয় সক্রিয়করণ

সরকারি মন্ত্রণালয় ও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তের জন্য ন্যায়পাল কার্যালয় কার্যকর করা হবে।

২৩. দুর্নীতি দমন কমিশন সংস্কার

সরকারের অনুমতি ছাড়াই মামলা করার ক্ষমতা দেওয়া হবে এবং বেসরকারি খাতেও এর এখতিয়ার বাড়ানো হবে।

২৪. স্বাধীন পুলিশ কমিশন

পুলিশের নিয়োগ, বদলি ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থার তদারকির জন্য একটি স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠন করা হবে, যাতে পুলিশের রাজনৈতিক অপব্যবহার বন্ধ হয়।

২৫. ডিজিটাল অধিকার সুরক্ষা

মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা সীমিত করে এমন আইন বাতিল বা সংশোধন করা হবে (যেমন সাইবার নিরাপত্তা আইন)।

২৬. সম্পদের ঘোষণা

সব নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ও তাদের নিকটাত্মীয়দের সম্পদের বার্ষিক প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা হবে।

২৭. তথ্য অধিকার শক্তিশালীকরণ

সরকারি ব্যয় ও চুক্তি সংক্রান্ত তথ্য গোপন রাখার বাধা তুলে দেওয়া হবে।

ভাষা ও সংখ্যালঘু অধিকার

২৮. মাতৃভাষার স্বীকৃতি

বাংলা রাষ্ট্রভাষা থাকবে, তবে অন্যান্য সব আদিবাসী ভাষাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে মাতৃভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হবে।

২৯. সংখ্যালঘু সুরক্ষা কমিশন

জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষায় একটি স্থায়ী সংবিধানিক কমিশন গঠন করা হবে।

৩০. স্থানীয় সরকারের ক্ষমতায়ন

জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা হস্তান্তরের বাধ্যবাধকতা সংবিধানে যুক্ত করা হবে।

জুলাই সনদ ও এই সংক্রান্ত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)র আপত্তিসমূহ বা নোটস অফ ডিসেন্ট

বিএনপি জুলাই সনদের স্বাক্ষরকারী হলেও তারা বাধ্যতামূলক কয়েকটি ধারার বিরুদ্ধে তাদের আপত্তি নথিভুক্ত করেছে। ফলে তারা পরবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতায় এলে এই ধারাগুলো কীভাবে, বা আদৌ বাস্তবায়িত হবে কি না, তা নিয়ে আইনি ও রাজনৈতিক ধোঁয়াশা রয়ে গেছে।

১) তারা সবচেয়ে বড় আপত্তি এনেছে সংসদের উচ্চকক্ষের আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থা নিয়ে। সনদ যেখানে ভোটের অনুপাতে উচ্চকক্ষ গঠনের কথা বলছে, বিএনপি সেখানে আসনসংখ্যাভিত্তিক পদ্ধতি চায় যাতে বড় দল সুবিধা পায়, ছোট দলগুলো নয়। বিএনপি ক্ষমতায় এলে চেষ্টায় থাকতে পারে উচ্চকক্ষে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব স্থাপন না করতে।

২) তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বাছাই নিয়েও তাদের আপত্তি গুরুতর। একটি বিশেষ সংসদীয় দ্বিদলীয় কমিটি, প্রধান উপদেষ্টা বাছাইপর্বে চুড়ান্ত ব্যক্তিকে নিয়ে একমত হতে না পারলে সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে শেষ কথা বলার ক্ষমতা দেওয়ার বিএনপির পালটা প্রস্তাবটি হবু প্রধান উপদেষ্টার কার্যত নিরপেক্ষতার ধারণাকেই দুর্বল করে।

৩) সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংস্কারে বিএনপি নীতিগত সমর্থনের কথা বললেও বাস্তবে দলীয় শৃঙ্খলার অজুহাতে তারা তাদের সংসদ সদস্যদের স্বাধীন মতামত বা ভোট দেয়ার অধিকার সীমিত রাখতে চায়। অর্থাৎ অর্থবিল ও আস্থাভোট ছাড়াও আরও অনেক ক্ষেত্রেই বিএনপি চাবে না তাদের সাংসদরা কোনো বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বা দলের এজেন্ডার বিরুদ্ধে ভোট দিক। তার মানে বিএনপি ৭০ অনুচ্ছেদ সংস্কারকে অনেক সীমিত করে ফেলতে চাবে।

৪) সবশেষে, সনদের ‘স্বয়ংক্রিয় বাস্তবায়ন’ ধারাকে তারা অসাংবিধানিক বলে দাবি করেছে। সনদ অনুযায়ী নতুন সংসদ অধিবেশন শুরু হওয়ার ২৭০ দিন পার হওয়ার মধ্যেও যদি ত্রিশটি বাধ্যতামূলক বিষয়াদি নিয়ে সংবিধান সংস্কার সম্পন্ন না হয়, তাহলে সেই ত্রিশটি বাধ্যতামূলক বিষয়াদি নিয়ে সংবিধান সংস্কারগুলোকে সেই ২৭০ দিন পরে আপনা আপনি সংবিধিবদ্ধ হিসেবে গণ্য করা হবে। বিএনপির অবস্থান: সংবিধান বদলাবে শুধু সংসদের ধারবাহিক কর্মকান্ডে, গণভোটে বেধে দেয়া কোনো সময়সীমায় নয়।

জুলাই সনদেই একটি উল্লেখযোগ্য ফাঁক রাখা হয়েছে। যারা ক্ষমতার ম্যান্ডেট পাবে, তারা নিজেদের আপত্তি অনুযায়ী কাজ করতে পারবে। অর্থাৎ কাগজে কলমে উপরে উল্লেখিত ত্রিশটি ধারাসমূহ বাধ্যতামূলক হলেও, বাস্তবে বিএনপি সংস্কারের “পদ্ধতি” বদলে দিয়ে নির্বাচনী কাঠামোসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে চাবে। এখানে বাধা দিতে পারবে একমাত্র বিরোধী সাংসদরা এবং সংবিধান সংস্কার নিয়ে আগামীতে গঠন করা সংসদীয় কমিটিটি।

Leave a comment