রিয়াজ ওসমানী

১৭ জানুয়ারী ২০২৬

জুলাই সনদে অন্তর্ভুক্ত সাংবিধানিক সংস্কার প্রস্তাবগুলো সংগ্রহ করে আমি একটি তালিকা তৈরি করলাম। এই তালিকাটি সনদের সাংবিধানিক সংস্কারের শাখার কিছুটা আংশিক হলেও আমি মূল বিষয়গুলো তুলে ধরতে পেরেছি এবং কিছু ব্যাখ্যা দিতে পেরেছি। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী জুলাই সনদের শুধু সাংবিধানিক সংস্কার প্রস্তাবগুলোই ১২ ফেব্রুয়ারির গণভোটের আওতায় থাকছে।

সেই গণভোটে “হ্যাঁ” ভোট জয়যুক্ত হলে “সংবিধান সংস্কার পরিষদ” হিসেবে দ্বৈত দায়িত্ব পালনকারী আগামী জাতীয় সংসদ তার প্রথম অধিবেশনের প্রথম দিন থেকে শুরু করে ১৮০ দিনের মধ্যে রাষ্ট্র সংস্কারের এই প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নের জন্য সকল বিল পাশ করতে আইনগতভাবে বাধ্য থাকবে।

এর বরখেলাপ হলে সাংবিধানিক লঙ্ঘন ঘটবে যা সর্বোচ্চ আদালতের হস্তক্ষেপ ডেকে নিয়ে আসবে। উল্লেখ্য যে কিছু রাজনৈতিক দলগুলো যেসকল বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে ‘নোটস অফ ডিসেন্ট’ দিয়েছিল, একটি “হ্যাঁ” ভোটের পর নির্বাচিত সংসদে বিজয়ী দলের সাংসদরা বিল প্রস্তাব করার সময়ে তাদের আপত্তিগুলো যেন প্রতিফলিত হয় সেইভাবে এগুতে পারবে।

জুলাই সনদে উল্লেখিত আইন/অধ্যাদেশ, বিধি ও বির্বাহী আদেশের মাধ্যমে যেসকল আইনি সংস্কারের প্রস্তাবনাগুলো এসেছে, সেগুলোর সাথে গণভোটের কোনো সম্পর্ক নেই এবং সেগুলো সংবিধানকে স্পর্শ করবে না। সেই জন্য আমি এই তালিকায় সেগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করলাম না।

সাংবিধানিক সংস্কার প্রস্তাব

১. প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ

প্রধানমন্ত্রী পদের মেয়াদ সর্বোচ্চ ১০ বছরে সীমাবদ্ধ করা। একই ব্যক্তি যত মেয়াদ বা যত বারই হোক, মোট ১০ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রী পদে থাকতে পারবেন না। প্রধানমন্ত্রী পদে আসীন ব্যক্তি একই সঙ্গে দলীয় প্রধানের পদে অধিষ্ঠিত থাকতে পারবেন না।

২. রাষ্ট্রপতি

রাষ্ট্রপতির নির্বাচন, অভিশংশ ও তাঁর ক্ষমা প্রদর্শনের এখতিয়ারে ব্যাপক পরিবর্তন আনা। নতুন এই প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রপতি কেবল দলীয় ভোটে নয়, বরং সংসদের উচ্চকক্ষ ও নিম্নকক্ষের সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত হয়ে একটি নিরপেক্ষ অবস্থানে থাকবেন।

৩. ক্ষমতার ভারসাম্য ও নিয়োগ কর্তৃত্ব

রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার সুনির্দিষ্ট বণ্টন নিশ্চিত করা; বিশেষ করে নির্বাচন কমিশন, দুদক ও বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর একক পরামর্শের পরিবর্তে রাষ্ট্রপতির হাতে স্বাধীনভাবে নিয়োগ দেয়ার ক্ষমতা নিশ্চিত করা। রাষ্ট্রপতি যেন সর্বোচ্চ আদালতের আপীল বিভাগের জ্যেষ্ঠতম বিচারপতিকে প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ করতে পারে সেই সাংবিধানিক বিধান রাখা।

৪. দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ

আইন প্রণয়নে বিশেষজ্ঞ ও গুণীজনদের অন্তর্ভুক্ত করতে সংসদের একটি উচ্চকক্ষ গঠন করা। সেখানে জাতীয় সংসদ বা নিম্নকক্ষে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলোকে দেয়া ভোটের অনুপাতে উচ্চকক্ষে আসন বন্টন করা। এই বন্টনের নাম হচ্ছে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব বা প্রপোর্শনাল রেপ্রেজেন্টেশন (পিআর)।

৫. ৭০ অনুচ্ছেদ সংস্কার

সাধারণ আইন ও নীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে সাংসদদের নিজ দলের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ার স্বাধীনতা বা ‘বিবেক ভোট’ প্রদানের অধিকার নিশ্চিত করা; তবে সরকারের টিকে থাকা নিশ্চিত করতে আস্থাভোট (সরকার গঠন ও মেয়াদ চলাকালীন যেকোনো অনাস্থা প্রস্তাব) এবং অর্থবিল পাসের ক্ষেত্রে দলীয় সিদ্ধান্তের বাধ্যবাধকতা বহাল রাখা।

৬. জরুরি অবস্থা

রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও অখন্ডতার প্রতি হুমকি বা মহামারি বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রেক্ষিতে বিরোধী দলীয় নেতা বা উপনেতার উপস্থিতিতে মন্ত্রীসভার অনুমোদন সাপেক্ষে রাষ্ট্রপতির জরুরি অবস্থা ঘোষণা করার বিধান রাখা। এই রাষ্ট্রীয় জরুরি অবস্থাতে যেন নাগরিকের জীবন, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচার পাওয়ার মতো মৌলিক অধিকারসমূহ কোনো অবস্থাতেই স্থগিত না হয়, তার সুনির্দিষ্ট সাংবিধানিক নিশ্চয়তা প্রদান করা।

৭. তত্ত্বাবধায়ক সরকার

অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ব্যবস্থা সংবিধানে স্থায়ীভাবে অন্তর্ভুক্ত করা। সনদে বর্ণিত পন্থা অনুযায়ী এই সরকার বাছাই করা। এই সরকারের প্রধান উপদেষ্টা এবং অন্যান্য উপদেষ্টারা কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে যুক্ত থাকতে পারবেন না এবং তারা পরবর্তী কোনো নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবেন না।

৮. বিচার বিভাগের স্বাধীনতা

৮. বিচার বিভাগের স্বাধীনতা: সাংবিধানিকভাবে বিচার বিভাগকে পূর্ণ স্বাধীনতা প্রদান করা। নির্বাহী বিভাগ থেকে নিম্ন আদালগুলোকে সম্পূর্ণভাবে মুক্ত করা। নিম্ন আদালতের বিচারকদের চাকরির নিয়ন্ত্রণ, আইন মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে সম্পূর্ণভাবে সর্বোচ্চ আলাদতের উপর ন্যস্ত করা। বিচারকদের পদের মেয়াদ ও তাদের অপসারণ সংক্রান্ত বিষয়ে সুপ্রীম জুডিসিয়াল কাউন্সিলকে শক্তিশালী করা ও এর এখতিয়ার বৃদ্ধি করা। সাংবিধানিকভাবে নিশ্চিত করা যে সর্বোচ্চ আদালতের বিচারক নিয়োগে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে একটি স্বাধীন বিচার বিভাগীয় নিয়োগ কমিশন গঠন করা হবে। একই সাথে সর্বোচ্চ আদালতের আপীল বিভাগ ও উচ্চ আদালত বিভাগের বিচারক নিয়োগ কমিশন সংক্রান্ত বিধানকে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা।

৯. সর্বোচ্চ আদালতের বিকেন্দ্রীকরণ

সর্বোচ্চ আদালতের বিচারিক কার্যক্রমকে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে এবং বিচার ব্যবস্থার অতিরিক্ত ঢাকা কেন্দ্রিকতা পরিহার করতে দেশের প্রতিটি বিভাগীয় শহরে সর্বোচ্চ আদালতের স্থায়ী সার্কিট বেঞ্চ স্থাপন করা। এর মাধ্যমে বিচারপ্রার্থীদের সময় ও ব্যয় সাশ্রয় নিশ্চিত করা এবং বিভাগীয় পর্যায়ে মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির মাধ্যমে বিচার বিভাগের কার্যকর বিকেন্দ্রীকরণ বাস্তবায়ন করা।

১০. উপজেলা পর্যায়ে অধস্তন আদালতের সম্প্রসারণ

যে সকল উপজেলা জেলা সদরে অবস্থিত (সদর উপজেলা), সে সকল উপজেলা আদালতসমূহ জেলা জজ কোর্টের সাথে সংযুক্ত রেখে সুনির্দিষ্ট করে দেয়া। অবশিষ্ট উপজেলাগুলোর জনসংখ্যার ঘনত্ব, ভৌগলিক অবস্থান ও বৈশিষ্ট, যাতায়াত ব্যবস্থা, দূরত্ব, অর্থনৈতিক অবস্থা ও মামলার সংখ্যা বিবেচনায় নিয়ে পর্যায়ক্রমে আদালত স্থাপন করা।

১১. স্থায়ী আটর্নি সার্ভিস গঠন

সর্বোচ্চ আদালত ও জেলা ইউনিটের সমন্বয়ে একটি স্থায়ী আটর্নি সার্ভিস গঠন করা হবে। এখানে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া হবে, যা বর্তমান অস্থায়ী ও দলীয় বিবেচনাভিত্তিক ব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে কাজ করবে।

১২. নির্বাচন কমিশনের স্বায়ত্তশাসন

নির্বাচন কমিশনকে আর্থিক ও প্রশাসনিকভাবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সরাসরি বা পরোক্ষ প্রভাবমুক্ত করা। কমিশনকে নিজস্ব জনবল নিয়োগ ও নিয়ন্ত্রণের পূর্ণ ক্ষমতা প্রদান এবং নির্বাচন পরিচালনার যাবতীয় ব্যয় নির্বাহের জন্য সরকারের মুখাপেক্ষী না হয়ে সরাসরি রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে বাজেট ব্যবহারের পূর্ণ আর্থিক স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা।

১৩. নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ

প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য কমিশনার নিয়োগের জন্য একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ ‘বাছাই কমিটি’ গঠনের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা নিশ্চিত করা। জাতীয় সংসদ কর্তৃক প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও কমিশনারগণের জবাবদিহিতার জন্য আইন প্রণয়ন ও আচরণবিধি প্রণয়ন করা।

১৪. স্থানীয় সরকার

রাষ্ট্রক্ষমতার কার্যকর বিকেন্দ্রীকরণ নিশ্চিত করতে একটি নির্বাচিত স্থানীয় সরকারকে (ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা পরিষদ) পর্যাপ্ত প্রশাসনিক ক্ষমতা, আইনি সুরক্ষা ও স্বাধীন বাজেট বরাদ্দ দিয়ে একটি প্রকৃত স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা। কেন্দ্রীয় সরকারের মুখাপেক্ষী না হয়ে স্থানীয় পর্যায়ে উন্নয়ন ও সুশাসন নিশ্চিত করতে স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করার সাংবিধানিক নিশ্চয়তা প্রদান করা এবং উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে স্থানীয় জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিশ্চিত করা। স্থানীয় সরকারের নির্বাচন ব্যবস্থা নির্বাচন কমিশনের কাছে হস্তান্তর করা।

১৫. জাতীয় সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি

জাতীয় সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব ক্রমাণ্বয়ে ১০০ আসনে উন্নিত করার লক্ষ্যে বিদ্যমান সংরক্ষিত ৫০টি আসন বহাল রেখে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পরবর্তী নির্বাচনগুলোতে প্রতিটি রাজনৈতিক দলকে ৩০০ সংসদীয় আসনে প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রে ন্যূনতম ৫% বর্ধিত নারী প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রাখা।

১৬. ন্যায়পাল নিয়োগ

সংবিধানের ৭৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে এবং সরকারি আমলাতন্ত্রের ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে একটি স্বাধীন ‘ন্যায়পাল’ পদ কার্যকর করা। নাগরিকদের সরকারি হয়রানি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে আইনি সুরক্ষা দিতে ন্যায়পালকে তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের পূর্ণ ক্ষমতা প্রদান করা।

১৭. সরকারি কর্ম কমিশনে নিয়োগ

সরকারি চাকরিতে নিয়োগের প্রতিটি স্তরে মেধার প্রতিফলন ঘটাতে এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সরকারি কর্ম কমিশনকে সব ধরনের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত করা। এই কমিশনের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করার মাধ্যমে একটি পেশাদার ও দক্ষ আমলাতন্ত্র গড়ে তোলার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রক্ষা করা।

১৮. মহা হিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক নিয়োগ

রাষ্ট্রীয় অর্থের প্রতিটি পয়সার সঠিক হিসাব নিশ্চিত করতে ‘মহা-হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক’ দফতরকে পূর্ণ প্রশাসনিক ও আর্থিক স্বাধীনতা প্রদান করা। সরকারের আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিতে এই প্রতিষ্ঠানকে কেবল সংসদের কাছে দায়বদ্ধ করা এবং এর বার্ষিক প্রতিবেদন জনসমক্ষে প্রকাশের মাধ্যমে জনগণের তদারকি নিশ্চিত করা।

১৯. দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)

দুর্নীতি দমন কমিশনকে সরকারের প্রভাব থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত করতে একে একটি ‘সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে’ রূপান্তর করা। কমিশনারদের নিয়োগে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং রাজনৈতিক প্রভাব ব্যতিরেকে যে কোনো স্তরের দুর্নীতির বিরুদ্ধে স্বাধীনভাবে তদন্ত ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের পূর্ণ ক্ষমতা দান করা।

২০. রাষ্ট্রের মূলনীতি

সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক সুবিচার, এবং ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সম্প্রীতির ভিত্তিতে রাষ্ট্রের মূলনীতিসমূহের আধুনিকায়ন করা। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের মূল চেতনাকে ধারণ করে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বৈষম্যহীন সমাজ গঠনের লক্ষ্যকে সংবিধানের মূল ভিত্তি হিসেবে স্থাপন করা।

২১. জাতীয় পরিচয় ও নাগরিকত্ব

সংবিধানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা যে বাংলাদেশের নাগরিকগণ ‘বাংলাদেশি’ হিসেবে পরিচিত হবেন। এছাড়া দ্বৈত নাগরিকত্বের আইনি জটিলতা নিরসন করে প্রবাসীদের জন্য নাগরিক অধিকার সহজতর করা, জাতীয় নির্বাচনে তাদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা এবং রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় তাদের অংশগ্রহণ ও বিনিয়োগের সুরক্ষা প্রদান করা।

২২. সকল সম্প্রদায়ের সহাবস্থান ও মর্যাদা

সংবিধানে যুক্ত করা যে বাংলাদেশ একটি বহু-জাতি-গোষ্ঠী, বহু-ধর্মী, বহু-ভাষী ও বহু-সংষ্কৃতির দেশ যেখানে সকল সম্প্রদায়ের সহাবস্থান ও যথাযথ মর্যাদা নিশ্চিত করা হবে।

২৩. ভাষা

‘বাংলা’কে প্রজাতন্ত্রের ভাষা হিসেবে অটুট রাখা। সংবিধানে বাংলাদেশে নাগরিকদের মাতৃভাষা হিসেবে ব্যবহৃত অন্যান্য সকল ভাষাকে দেশের প্রচলিত ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করা।

২৪. মৌলিক অধিকারসমূহের তালিকা সম্প্রসারণ

সংবিধান সংস্কার কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী সংবিধানের তৃতীয় ভাগে বর্ণিত মৌলিক অধিকারসমূহের তালিকা সংশোধন ও নাগরিকদের অধিকার সম্প্রসারণ করা। কমিশন সুপারিশ করেছে যে সংবিধানে অননুমোদিত বৈষম্যের যে সীমিত তালিকা আছে তা পরিবর্তন করে এমন একটি তালিকা করা হোক, যেখানে ধর্ম, জাতি, বর্ণ, গায়ের রঙ, নৃগোষ্ঠী, ভাষা, সংষ্কৃতি, লিঙ্গ, রাজনৈতিক মত, শারীরিক বা মানসিক অক্ষমতা, অর্থনৈতিক অবস্থা, জন্মস্থান – এই সব সহ আরও অনেক কারণ অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

২৫. আন্তর্জাতিক চুক্তি আইনসভায় অনুমোদন

সংবিধানে এরূপ যুক্ত করা যে জাতীয় স্বার্থ বা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা প্রভাবিত করে এরূপ আন্তর্জাতিক চুক্তি সম্পাদনের পর আইনসভার উভয় কক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটের মাধ্যমে অনুমোদন করা হবে।

২৬. প্রতি জনশুমারি বা দশ বছর পর পর সীমানা পুন:নির্ধারণ

নির্বাচন কমিশন প্রতি জনশুমারি বা প্রায় দশ বছর অন্তর জনসংখ্যার পরিবর্তন অনুযায়ী সংসদীয় আসনের সীমানা যে পুনর্নির্ধারণ করবে, তার বিধান রাখা। এই প্রক্রিয়ায় জনশুমারির উপাত্তকে ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা এবং এলাকাভিত্তিক জনঘনত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সুষ্ঠু ও সমতাভিত্তিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা। প্রক্রিয়াটিকে আরও স্বচ্ছ, সুনির্দিষ্ট ও অংশগ্রহণমূলক করতে একটি অস্থায়ী বিশেষায়িত কমিটি গঠনের বিধান যুক্ত করা।

২৭. সংসদের স্থায়ী কমিটি

প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম তদারকি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলোকে বিরোধী দলীয় সাংসদদের অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে শক্তিশালী করা। প্রশাসনিক নজরদারির পূর্ণ ক্ষমতা কমিটির হাতে ন্যস্ত করা এবং যে কোনো মন্ত্রণালয়ের যেকোনো অনিয়ম বা সিদ্ধান্তের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কমিটির কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য করার বিধান নিশ্চিত করা।

২৮. ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন

সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রকৃত সৌন্দর্য ও নিরপেক্ষতা রক্ষা করতে প্রধান বিরোধী দল থেকে ‘ডেপুটি স্পিকার’ নির্বাচনের স্থায়ী রীতি ও বিধান প্রবর্তন করা। এর মাধ্যমে আইনসভার কার্যক্রমে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা এবং সংসদের নিরপেক্ষতা সুসংহত করা।

২৯. সংবিধান সংশোধন

সংবিধানের মৌলিক কাঠামো পরিবর্তনের ক্ষেত্রে কেবল সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নয়, বরং দেশব্যাপী ‘গণভোট’ আয়োজন ও জনগণের সরাসরি রায় গ্রহণ বাধ্যতামূলক করা। যেকোনো সংশোধনী পাসের জন্য জাতীয় সংসদের উচ্চকক্ষ ও নিম্নকক্ষ উভয়েরই দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন নিশ্চিত করা এবং গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ক্ষেত্রে জনগণের সম্মতির সাংবিধানিক নিশ্চয়তা প্রদান করা।

৩০. ক্রান্তিকালীন ও অস্থায়ী বিধানবলি

অতীতের সামরিক শাসনকে বৈধতা দেওয়া সংক্রান্ত সাংবিধানিক ভিত্তি সরিয়ে ফেলা। ভবিষ্যতে কোনো অস্থায়ী বা ক্রান্তিকালীন বিধান যুক্ত করার ক্ষমতা ও প্রক্রিয়া নতুনভাবে নির্ধারিত হওয়ার সুযোগ তৈরি করা, যা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা ও বৈধতার কাঠামোকে উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তন করতে পারে।

৩১. সংবিধান বিলুপ্তি ও স্থগিতকরণ ইত্যাদির অপরাধ

সংবিধানের ওপর চাপিয়ে দেওয়া তথাকথিত ‘অপরিবর্তনযোগ্য’ বা ‘স্থায়ী’ বিধিনিষেধগুলো বাতিল করা। এই বিধানগুলো বিলুপ্ত করার মাধ্যমে সংবিধানকে একটি গতিশীল দলিলে রূপান্তর করার উদ্যোগ নেওয়া, যাতে ভবিষ্যতে দেশের মানুষ তাদের প্রয়োজন ও সময়ের চাহিদা অনুযায়ী সংবিধানের যেকোনো অংশ সংশোধন বা পরিমার্জন করার পূর্ণ ক্ষমতা ফিরে পায়।

৩২. ক্ষমতার অপব্যবহার ও অনুপার্জিত আয় রোধ

সাংবিধানিকভাবে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা যেখানে পদমর্যাদা বা আইনি ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে কেউ নিজের পকেট ভারী করতে পারবে না। কোনো সরকারি বা সাংবিধানিক পদে থেকে ব্যক্তিগত লাভের জন্য ক্ষমতার ব্যবহার করাকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা। পাশাপাশি ‘অনুপার্জিত আয়’ বা কোনো পরিশ্রম ছাড়া অবৈধভাবে (যেমন: ঘুষ, দুর্নীতি বা চক্রের মাধ্যমে) অর্থ উপার্জনের পথ বন্ধ করা। এর পরিবর্তে এমন ব্যবস্থা করা যাতে প্রতিটি মানুষ তার মেধা ও শারীরিক পরিশ্রমের সঠিক মূল্যায়ন পায় এবং কাজের মাধ্যমে একজন নাগরিকের সৃজনশীলতা ও ব্যক্তিত্বের পূর্ণ বিকাশ ঘটে। অর্থাৎ, দখলদারিত্ব ও দুর্নীতির বদলে মেধা ও শ্রমই হবে জীবন গড়ার প্রধান ভিত্তি।

Leave a comment