প্রসঙ্গ রেঙ্গু এবং মাহমুদ

পরিমার্জিত এবং পুনঃপ্রকাশিত

রিয়াজ ওসমানী

২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২২

২০০০ সাল কিংবা তার থেকে এক বা দুই বছর আগের কথা। আমি যুক্তরাষ্ট্র থেকে নেটের মাধ্যমে বাংলাদেশের সব খবরাখবর আর যোগাযোগ রাখতে শুরু করি। বাংলাদেশেও তখন থেকে আস্তে আস্তে নেটের প্রসার শুরু হয়। ভ্রমণ সংক্রান্ত জালপাতা থর্নট্রি’র (Thorntree) বাংলাদেশ শাখায় এক ভদ্রলোকের সাথে পরিচয় হয়। সেখানে আমার মত তিনিও বাংলাদেশে বেড়াতে আসার জন্য উদগ্রীব বিদেশি পর্যটকের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিতেন এবং বাংলাদেশ সম্বন্ধে সাধারণ তথ্য বিলি করতেন। দেখলাম যে এই দিক থেকে তার আর আমার চিন্তাভাবনা এক। তবে বিরাট একটা পার্থক্য ছিল আমাদের নিজস্ব অবস্থানে। আমি বাস করতাম মিশিগান অঙ্গরাষ্ট্রের “এন আরবার” উপশহরে আর তিনি থাকতেন বাংলাদেশের চট্টগ্রামে। কিন্তু এই দুই প্রান্ত থেকেই আমরা বিদেশি প্রশ্নদাতাতের সাহায্য করতে থাকি এবং সময়ের সাথে সাথে নিজেদের মধ্যে একটা গভীর বন্ধুত্ব তৈরি করে ফেলি।

আমি আস্তে আস্তে তার একটা আসক্তির সাথে পরিচিত হই। তিনি একটি ভ্রমণ সংস্থা চালাতেন যার নাম বাংলাদেশ ইকোট্যুরস (Bangladesh Ecotours). এ কোনো পাঁচ-দশটা ট্রাভেল এজেন্সির মত ছিল না। এ ছিল বাংলাদেশের বিভিন্ন আদিবাসীদের নিয়ে একটা অলাভজনক সংস্থা। বিদেশি বা প্রবাসী বাংলাদেশি পর্যটকরা অল্প সংখ্যায় কিন্তু প্রতিনিয়ত বেড়াতে এসে আদিবাসী পল্লীগুলোতে আতিথেয়তা গ্রহণ করতেন স্থানীয় প্রাকৃতিক পরিবেশ ও রীতিনীতির প্রতি শ্রদ্ধা রেখে। বিনিময়ে অতিথিরা পেতেন এক অনন্য অভিজ্ঞতা। এবং এর থেকে পাওয়া উপার্জনের সিংহভাগই ব্যয় করা হত আদিবাসী পরিবারগুলোর কল্যাণে।

আমি এতটাই অভিভূত হয়ে গিয়েছিলাম তার এই উদ্যোগে যে আমি ক্ষণিক সময়ের জন্য আমার তখনকার আরামদায়ক জীবন ছেড়ে দিয়ে চলে আসতে চেয়েছিলাম তার কাছে। চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম – এইসব জায়গায় ঘাটি করে তার সাথে কাজ করবো পর্যটক আর আদিবাসী পরিবারের কল্যাণে। সাথে তার ব্যবসার সহায়তা আর প্রসার করে বাংলাদেশের পর্যটন ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখারও সুযোগ পেতাম। কিন্তু তা আর হয়নি নানা কারণে (তিনিই আমাকে নিরুৎসাহিত করেছিলেন)। তবে যুক্তরাষ্ট্র থেকেই কীভাবে তার পাশে দাঁড়াতে পারি সেই নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যাই। এবং সেই থেকেই তার আরেকটি লক্ষনীয় ব্যাপার সম্বন্ধে জানতে পারি।

তিনি নিজে ছিলেন একজন সমকামী পুরুষ। আমার যত দূর মনে পড়ে, তিনি অর্ধেক বাংলাদেশি আদিবাসী আর অর্ধেক ক্যানাডিয়ান অর্থাৎ মিশ্র জাতির ছিলেন। আমার সাথে পরিচয় হওয়ার সময়ে তার বয়স চল্লিশ থেকে পঞ্চাশের মত হবে। দীর্ঘ দিন ক্যানাডাতে বড় হওয়া ও বাস করার পর তিনি বাংলাদেশে চলে আসেন আদিবাসীদের কল্যানে বাকিটা জীবনটা উৎসর্গ করে দিতে। ভদ্রলোকের নাম ছিল রেঙ্গু। তবে তিনি খালি ম্রো, চাকমা, ইত্যাদি মানুষদের জন্যই নিজেকে নিবেদিত করেননি – তিনি সতর্কতার সাথে বাংলাদেশের বিভিন্ন সমকামীদেরকেও সহায়তা করতেন। তিনি ইয়াহুতে (Yahoo) যথাযথ নাম দিয়ে একটি গোষ্ঠির পাতা খুলেন যেখানে নেটের মাধ্যমে দেশের সমকামীরা নিজের গোপনীয়তা বজায়ে রেখে একে অন্যের সাথে মিলিত হতে পারতো, কথা বলতে পারতো। আমার জানা মতে এটাই ছিল বাংলাদেশি যৌন সংখ্যালঘুদের জন্য প্রথম আন্তর্জাল ভিত্তিক একটি মিলন স্থান। এখানে তিনি ডেভিড (David) নামে সবার কাছে পরিচিত ছিলেন এবং তখন শুধু ইংরেজিতেই কথোপকথনের ব্যবস্থা ছিল।

আমি তো এত দিন ভেবে বসেছিলাম যে আমিই একমাত্র বাংলাদেশি সমকামী! বাংলাদেশে আর কোনো সমকামী নেই, থাকতেও পারে না। কিন্তু সেখানে ঢুকে দেখি অজস্র প্রোফাইল। সময়ের সাথে সাথে বাংলাদেশি গে দের সাথে কথাবার্তাও শুরু হয়ে গেল। আমি নতুন এক ভুবন আবিষ্কার করলাম। আমার প্রাক্তন ভালবাসার এক মানুষ আমাকে বলেছিল যে সে নাকি তখন থেকেই আমাকে চেনে। এবং এর সব কিছুরই উদ্যোক্তা ছিলেন রেঙ্গু। আমি আর রেঙ্গু তারপর প্রায়ই চিন্তা করতাম কীভাবে বাংলাদেশ ইকোট্যুরসে বিদেশি সমকামী পর্যটকদেরকেও আকৃষ্ট করা যায়।

বেশ কিছু দিন তার কোনো খবর না পাওয়ার পর তাকে একটা ইমেল পাঠাই খোঁজ নেয়ার জন্য। অনেক দিন পর একটা উত্তর এলো তার এক ঘনিষ্ট বাঙ্গালী সহকর্মীর কাছ থেকে যে রেঙ্গু আর নেই – পার্বত্য এলাকায় ভ্রমণের সময়ে তিনি এক প্রকার মশার কামড়ের ফলে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হন। তারপর তিনি মারা যান। এই খবর আমি কীভাবে হজম করতে পেরেছি এখন আর মনে নেই। নিজের জীবন তখন বেশ চড়াই উৎরাইয়ের ভেতর দিয়ে যাচ্ছিল এবং আমি ২০০৩ সালে বিলেতের লন্ডনে নতুন জীবন শুরু করি। সেজন্যই বোধহয় শোক প্রকাশ করার সময় পাইনি। কিন্তু আজ তার কথা মনে না করলেই নয়। আমার জীবনে দুইজন মানুষ আমাকে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রাণিত করেছে। দুইজনই বাংলাদেশের ভ্রমণ শিল্পের সাথে জড়িত ছিলেন আর দুইজনই আজ আর নেই। আর বেঁচে থাকার সময়ে রেঙ্গু বাংলাদেশের সমকামীদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য যেই অবদান রেখে গেছেন তার জন্য বাংলাদেশের যৌন সংখ্যালঘুরা চিরকাল ঋণী হয়ে থাকবে। তিনিই বলতে গেলে বাংলাদেশে তখন নবাগত আন্তর্জালের মাধ্যমে সামান্য হলেও সাংগঠনিক কাজ শুরু করে দিয়ে গেছেন আমাদের জন্য। আর আদিবাসীদের জন্য তিনি যা করে গেছেন সেটা তো প্রশংসার দাবিদার বটেই। বাংলাদেশ ইকোট্যুরসকে ভুলে না গিয়ে আমরা সেটাকে সমর্থন করতে পারি। রেঙ্গুর অনুসারীরা এখনও সেটা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে আমার বিশ্বাস।

—————————————————–

দ্বিতীয় ব্যক্তি যিনি আমাকে অনুপ্রাণিত করেছেন তিনি হচ্ছেন মাহমুদ হাসান খান যার সাথেও থর্নট্রি’র বাংলাদেশ শাখায় পরিচয়। তিনি নিজের সফল কর্মজীবনের বাইরে দেশপ্রেমে উদবুদ্ধ হয়ে বিদেশি ও কিছু প্রবাসী বাংলাদেশিদের দেশ ভ্রমণ নিয়ে সব রকম সহায়তা করতেন। প্রাথমিক তথ্য বিলি থেকে শুরু করে বিমানবন্দরে স্বাগত জানানো, সকল বাজেট অনুযায়ী আবাস জোগাড় করে দেয়া, সকল ট্রেন, বাস, লঞ্চের টিকিট কেটে দেয়া এবং সুযোগ পেলে বরিশালে তার গ্রামের বাড়ির দেশে আতিথেয়তা প্রদান করা – কোনো কিছুই বাকি রাখেননি তিনি। এবং এগুলো সব তিনি অনেক বছর করেছেন সম্পূর্ণ বিনে পয়সায় এবং দেশব্যাপী তার স্বেচ্ছাসেবক মানুষদের কাজে খাটিয়ে। পরে বিদেশিদেরই অধিক অনুরোধে তিনি একটি ভ্রমণ সংস্থা ট্রিপটুবাংলাদেশ (Trip To Bangladesh) খুলে বসেন স্বল্প বাজেটের বিদেশি পর্যটক বা ব্যাকপ্যাকারদের স্বল্প মূল্যে সকল প্রকার সেবা প্রদান করার উদ্দেশ্যে। সেই সাথে ফেসবুক গোষ্ঠী “বেড়াই বাংলাদেশ”-এর মাধ্যমে তিনি দেশের ভেতরে বিভিন্ন জানা অজানা জায়গায় দেশি ভাই-বোনদের বেড়ানোর একটা চল শুরু করে দিয়েছেন। সমকামী জগতের সাথে তার অবশ্য কোনো পরিচয় একেবারেই ছিল না।

রেঙ্গুর সাথে দেখা করার সৌভাগ্য আমার হয়নি। কিন্তু মাহমুদ ভাইয়ের সাথে দেশে দেখা হয়েছে অনেক বার। তিনি ঢাকায় বসে কাজ করতেন, আমি ছিলাম লন্ডনে অবস্থিত তারই এক সহকর্মীর মত। তবে কিছু সময় পার হয়ে গেছে তিনি হৃদ রোগে আক্রান্ত হয়ে অকালে তার ছোট্ট পরিবার ও আমাদেরকে ছেড়ে চলে গেছেন। দেশ-বিদেশের বহু অনুরাগী এই শোকে এখনো মর্মাহত।

Bangladesh Ecotours

Trip 2 Bangladesh

**********************

বাংলাদেশের সংবিধানে বিসমিল্লাহ এবং রাষ্ট্রধর্ম

রিয়াজ ওসমানী

৫ জানুয়ারী ২০২২

১৯৭২ সালে ডঃ কামাল হোসেন এবং তার সহকর্মী দ্বারা লিখিত বঙ্গবন্ধুর যুগান্তকারী বাংলাদেশের সংবিধানের “ধর্মনিরপেক্ষতা” নামক মূলমন্ত্রের সাথে সাংঘর্ষিক পঞ্চম সংশোধনী এনে সংবিধানের শুরুতে জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সালে “বিসমিল্লাহ” লিখলেন। তারপর ১৯৮৮ সালে অষ্টম সংশোধনী এনে এরশাদ সাহেব সংবিধানে “রাষ্ট্রধর্ম” আনলেন। ২০০৮ সালে শেখ হাসিনা পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশের উচ্চ আদালত পঞ্চম এবং অষ্টম সংশোধনীকে বাতিল ঘোষণা করে। এর ফলে সংবিধানে কোথাও বিসমিল্লাহ এবং রাষ্ট্রধর্ম থাকার অবকাশ ছিল না। কিন্তু ২০১১ সালে সংবিধান পুনঃপ্রকাশ করার সময়ে শেখ হাসিনা ভোটের রাজনীতি করতে গিয়ে সংবিধানে বিসমিল্লাহ আর রাষ্ট্রধর্ম বহাল রাখলেন। আদালত অবমাননা ছাড়াও সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক হওয়ার আদলে শেখ হাসিনার এই কীর্তিকে অবৈধ হিসেবে ঘোষণা করার জন্য উচ্চ আদলতের হস্তক্ষেপ কামনা করছি। তবে এই ব্যাপারে উচ্চ আদালতের সদিচ্ছা এবং সৎ সাহস নেই সেটা জেনেই এই ব্লগটা লিখলাম।

বাহাত্তরের সংবিধানে ফিরে যাব। কিন্তু তার অর্থ কী এবং কেন?

রিয়াজ ওসমানী

২৬ অক্টোবর ২০২১

বাহাত্তর সনে লিখিত বাংলাদেশের সংবিধানের চারটা মূলমন্ত্রের দুটো থেকেই বাংলাদেশ আজ বিচ্যুত। এই দুটো হচ্ছে ধর্মনিরপেক্ষতা এবং সমাজতন্ত্র। বাকি দুটো হচ্ছে গণতন্ত্র এবং জাতীয়তাবাদ। বর্তমান সময়ে বাংলাদেশে গণতন্ত্রও মৃত্যু সজ্জায় কিন্তু সেই আলাপ আরেক দিনের। আজকে ধর্মনিপেক্ষতায় কেন এবং কীভাবে ফিরে যাব সেটা নিয়ে আলাপ। এর সাথে সমাজতন্ত্রের মূল আদর্শের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে বর্তমান মুক্ত বাজার ব্যবস্থা কিভাবে চলমান রাখা সম্ভব সেটা নিয়েও আলাপ থাকছে। সমাজতন্ত্র কায়েম করতে হবে বর্তমান যুগের বাস্তবতা থেকেই। প্রাতিষ্ঠানিক সাম্যবাদ (কমিউনিজম) একটা ব্যর্থ রূপরেখা। এই রূপরেখা নিয়ে যারা এখনো দিবা স্বপ্ন দেখেন তারা নতুন করে দেশকে কিছু দেয়ার ক্ষমতা রাখেন না। মানুষে মানুষে সাম্যতার আরেকটা ব্যাখ্যা হতে পারে মানুষে মানুষে বৈষম্য কমিয়ে আনা। এবং সেটা কায়েম করার রূপরেখা পৃথিবীতে আজ প্রতিষ্ঠিত। এই লেখার শেষাংশে সেটা নিয়ে আলাপ হবে। বাহাত্তর সনে ফিরে যাওয়ার অর্থ হচ্ছে রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষতা পূর্ণাঙ্গভাবে ফিরিয়ে আনা এবং সমাজতন্ত্রের একটি পরিবর্তিত ব্যাখ্যা মেনে নিয়ে বাংলাদেশে সেটার বাস্তবায়ন করা।

প্রশ্নঃ বাহাত্তর সনের সংবিধানে কেন ফিরে যাবো? উত্তরঃ কারণ সেই সংবিধান থেকে বিচ্যুত হওয়ার ফলে আজ বাংলাদেশ একটা সাম্প্রদায়িক, অচেনা দেশ এবং যেই দেশে মানুষে মানুষে বৈষম্য বেড়েই চলছে, যেটা অর্থনৈতিক এবং সামাজিক উভয়ই। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাই বলুন আর সংবিধান লেখকদের দর্শনই বলুন, দুটোর কোনটাই বাংলাদেশের বর্তমান চেহারার উৎস বলে মনে হওয়ার কোনো কারণ নেই। শহীদ মুক্তিযোদ্ধারা আজ অপরপ্রান্ত থেকে দীর্ঘশ্বাস ব্যতীত আর কিছু ফেলছে বলে মনে করলে ভুল হবে। সংবিধানের লেখকরা চেয়েছিলেন এমন একটা দেশ যেখানে সকল ধর্মের সকল মানুষ রাষ্ট্র ও সমাজে সমান। সেখানে মানুষে মানুষে বৈষম্যও থাকবে না। আজ সমাজ নিয়ে কথা নয়, কথা রাষ্ট্র নিয়ে। ধর্মনিরপেক্ষতার মানেই হচ্ছে রাষ্ট্রের চোখে সকল ধর্মের মানুষ হবে সমান। এর অর্থ এও দাঁড়ায় যে সকল ধর্ম হবে সমান। রাষ্ট্রের চোখে বিশেষ কোনো ধর্মকে প্রাধান্য দেয়া যাবে না। দিলেই বাকি ধর্মগুলোর অবস্থান নিম্নতর পর্যায় চলে যায় এবং সেই বাকি ধর্মের অবলম্বনকারীরাও সেই নিম্নস্তরে চলে আসে।

বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ অর্থাৎ মুসলমানদের কাছে জেনারেল এরশাদ তার সামরিক ক্ষমতা আরো জনপ্রিয় করে তোলার জন্য ১৯৮৮ সালে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম বানিয়ে বাংলাদেশের হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্ট ধর্মালম্বী, অন্যান্য ধর্মালম্বী এবং নাস্তিকদেরকে যে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক বানিয়ে ফেলেছেন সেটা কি নব প্রজন্মের কাছে অধিক যুক্তি দিয়ে বোঝানোর প্রয়োজন আছে? ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা দেয়ার পর রাষ্ট্রব্যবস্থা ও সমাজের বিভিন্ন স্তরে সেই ধর্ম সময়ের সাথে সাথে যে অধিক পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছে সেগুলোর জলজ্যান্ত প্রমাণ তুলে ধরার প্রয়োজন আছে কি? এই অধিক পৃষ্ঠপোষকতা এবং তার বাহ্যিক প্রতিফলন যে ধর্মনিরপেক্ষতা নামক সাংবিধানিক স্তম্ভের পরিপন্থী সেটার বিশ্লেষণ কি তুলে ধরা দরকার? আর একটা রাষ্ট্রধর্ম থাকার ফলে সেই ধর্মের বাইরের মানুষদের নিম্নস্তরে চলে আসাটা যে গণতন্ত্রের সাথে সাংঘর্ষিক সেটা কি উল্লেখ করে দিতে হবে? অনেক মুমিনদের মুখে শুনেছি যে দেশের ৯০% মানুষ (অর্থাৎ মুসলমান)রা যা চাইবে সেটাই গণতন্ত্র। কখনোই না। হ্যাঁ! ভোটের বাক্সে সংখ্যাগরিষ্ঠদের ইচ্ছাই পূরণ হবে। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্র আরেক জিনিষ। প্রকৃত গণতন্ত্রের চর্চা হচ্ছে সংখ্যাগরিষ্ঠদের ইচ্ছা এমনভাবে পূরণ করতে হবে যে (যে কোনো) সংখ্যালঘুদের স্বার্থ যেন ক্ষুণ্ণ না হয়। এই পরস্পর বিরোধী রাজনৈতিক লড়াইটার নাম গণতন্ত্র।

মুমিন থেকে শুরু করে সুশীল সমাজের অনেকেই বলে থাকেন যে ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়। অবশ্যই তা নয়। রাষ্ট্রীয় ধর্মনিরপেক্ষতার ব্যাখ্যা সেভাবে কে দিয়েছে? ধর্ম তো বিশ্বাস ও পালন করছে মানুষ। রাষ্ট্র তো ধর্ম পালন করছে না! রাষ্ট্রের কোনো ধর্ম না থাকলেও মানুষ যে ধর্ম পালন করবে সেখানে বাধা আসছে কোথা থেকে? মুমিনদেরকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে মারছি কোরআনের আয়াত এবং হাদিসের উক্তি দিয়ে দেখিয়ে দিতে বাংলাদেশের সংবিধান থেকে রাষ্ট্রধর্ম উঠিয়ে দিলে ইসলামের ক্ষতি কীভাবে হচ্ছে! রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়াও বাংলাদেশে আগে কি মুসলমান ছিল না? সমস্যাটা কোথায়? আমি বলি সমস্যাটা কোথায়। সমস্যাটা অনুভূতি নামক এক অযৌক্তিক জায়গায়। এই জায়গায় যুক্তির কোনো ঠাই নেই। আছে অজ্ঞতা এবং অন্ধবিশ্বাসের একটা বিষফোঁড়া। আছে অনুর্বর মস্তিষ্ক এবং চেতনার একটা ফাঁকা ও উত্তপ্ত আবেগ।

এই আবেগটাকে যে জেনারেল এরশাদ কীভাবে কাজে লাগিয়ে মুমিন সবাইকে কদু বানিয়েছেন তার ব্যাখ্যার প্রয়োজন আছে কি? ব্যক্তিগতভাবে একজন লম্পট মানুষ কি ইসলামের প্রতি তার অগাধ ভালোবাসা থেকে সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম এনেছিলেন? না, সেই কারণে আনেননি। এনেছিলেন বাংলাদেশের অধিক মানুষদেরকে কদু বানাতে এবং সেই কাজে তিনি সাঙ্ঘাতিকভাবে সফল হয়েছেন। সেই ধারা অনুসরণ করে বিএনপি-জামাত দেশ চালিয়েছে এবং আওয়ামী লীগ হেফাজত লালন করেছে। উল্লেখ্য যে এরশাদ সাহেব সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম আনার পর প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলই সেটার বিরোধিতা করেছিল। আজ ক্ষমতার লোভে এরা সংবিধানের এই জায়গাটি স্পর্শ করতে অপারগ এবং তার একটি মাত্র কারণ মানুষের সেই অযৌক্তিক আবেগের ভয়।

অথচ আজ বাংলাদেশের একটা রূপ বিশ্লেষণ করি? ১৯৭৫ সালের পর জেনারেল জিয়াউর রহমানের কেরামতির ফলে ধীরে ধীরে বিদেশ থেকে পুনর্বাসিত জামাতে ইসলামী সমাজের প্রতিটি রন্ধ্রে প্রবেশ করে মুসলমানদেরকে শিখিয়েছে যে অন্যদের তুলনায় তারাই শ্রেষ্ঠ, তাদের ধর্মই প্রকৃত ধর্ম। ভিন্ন ধর্মালম্বী এবং নাস্তিকরা সৃষ্টির সেরা জীব তো নয়ই বরং তারা হচ্ছে বর্জ্য পদার্থ। এই চিত্রটির সাথে যোগ হয়েছে আলেম সমাজ যেভাবে রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী এবং অন্যান্য পেশাজীবীদের দ্বারা ব্যবহৃত হয়েছে। এর ফলে মসজিদ, মাদ্রাসা ও ওয়াজ মাহফিলে কীভাবে দায়মুক্তভাবে বিভিন্ন “ধর্মীয়” বক্তারা ভিন্ন ধর্মালম্বীদের উদ্দেশ্যে বিষদগার ছড়িয়েছে, সাধারণ মুসলমানদের মনে অন্য ধর্মালম্বী এবং নাস্তিকদের বিষয়ে বিষ ঢুকিয়ে দিয়েছে, তার ফল আমরা আজ দেখছি। সম্প্রতি শারদীয় পূজার সময়ে হনুমানের পায়ে কোরআন রাখা হয়েছে শুনে কানে হাত না দিয়েই চিলের পেছনে দৌড়ে পশুতুল্য কিছু মানুষ দেশ জুড়ে অনায়াসে অজস্র মন্দির ও হিন্দু বাড়িঘর ভেঙ্গে ফেললো। কিছু মানুষের প্রাণহানিও ঘটলো। আবার দিনের শেষে দেখা গেল মুসলমান নামের এক ব্যক্তিই হনুমানের পায়ে কোরআনটি রেখেছিল হিন্দুদের সর্বনাশ ডেকে আনার জন্য, যেই লক্ষ্যে সেই ব্যক্তিটি সম্পূর্ণ সফল হলো।

সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো যে এই ধরণের ঘটনা বাংলাদেশে নতুন নয়। বাংলাদেশের এই সাম্প্রদায়িক পরিবর্তন বহু দিনের এবং ৭৫ সালের পর থেকেই সেটাকে কৌশলে পরিচালনা করা হয়েছে। ৭৫ সালের পর বলছি কেন? কারণ তারপরেই জেলারেল জিয়া ক্ষমতায় এসে সংবিধানে বিসমিল্লাহ বসিয়ে সংবিধানের ইসলামিকরণ শুরু করলেন। সংবিধানটা যেন শুধু মুসলমানদের। তিনি সংবিধানে আরো কিছু ইসলামী বিষয় ঢুঁকিয়েছিলেন যেগুলো শেখ হাসিনা ২০০৮ সালে ক্ষমতায় আসার পর সংবিধান থেকে মুছে ফেলতে সক্ষম হয়েছিলেন। কিন্তু উপরে উল্লেখিত আবেগের ভয়ে তিনি সংবিধান থেকে বিসমিল্লাহ আর রাষ্ট্রধর্ম সরাননি। বাকিটা ইতিহাস। বাংলাদেশের আলেম সমাজ নিজেদেরকে অন্যদের তুলনায় কিছুটা ঊর্ধ্বে মনে করে এসেছে – তারাই রাজা, বাকিরা প্রজা। তারা অন্যায় করলে তাদের বিরুদ্ধে কথা বলতে বাকিরা নারাজ – ইসলামের ক্ষতি হবে এই ভয়ে। আইন শৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনও তাদের ব্যাপারে মুখ ফিরিয়ে চলেছে যার ফলে কওমি মাদ্রাসাগুলোতে এত দিন ধরে ঘটে আসা বালক ধর্ষণ ও অন্যান্য নির্যাতন ছিল ধামাচাপা দেয়া।

আমার মতে বাংলাদেশের এই সাম্প্রদায়িক ও মুসলমান কেন্দ্রিক চেহারা সংবিধানে বিসমিল্লাহ এবং রাষ্ট্রধর্ম আসার পরেই জাগ্রত হতে শুরু করে। এবং এখান থেকে ধীরে ধীরে ফিরে আসার শুরুটাও করতে হবে সংবিধান থেকে বিসমিল্লাহ এবং রাষ্ট্রধর্ম সরিয়ে দিয়ে। এতে মানুষ রাতারাতি অসাম্প্রদায়িক হয়ে যাবে না, যেমনি মানুষ রাতারাতি সাম্প্রদায়িক হয়ে যায়নি। তবে অসাম্প্রদায়িক যাত্রার শুরুটা করা যাবে। বিভিন্ন বক্তব্যদাতা এবং সাংবাদিকরা অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ে তোলার জন্য মুখে বড় বড় ফ্যানা তুলেন। কিন্তু আসল জায়গায় সকলে যেতে নারাজ। বিসমিল্লাহ এবং রাষ্ট্রধর্ম সরিয়ে ফেলার কথা বললে নিজের ধর্ম বিশ্বাসের ভিত্তি নড়ে যায়, এমন অবস্থা। তাই বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে তারা হাওয়া বাতাস নিয়ে কথা বলেন। তবে সম্প্রতি বাংলাদেশের বর্তমান তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী বাহাত্তরের সংবিধানে ফিরে যাওয়ার অঙ্গীকার করে যেই বক্তব্যগুলো রেখেছেন সেটা উল্লেখযোগ্য। সরকার হয়তো এর মাধ্যমে জনমত যাচাই করার চেষ্টা করছে। আমার মতে তিনি এই বিষয়ে একটা ছোটখাটো ঢেউ তুলে দিয়ে গেছেন। আমাদের এখন উচিৎ বজ্রকণ্ঠে এই ঢেউটিকে হিমালয়ের সমান উঁচু করে ফেলা। এবং সেটা করতে হবে রাষ্ট্রের স্বার্থে, আমাদের সংবিধানের স্বার্থে, সকল ধর্মালম্বী এবং নাস্তিকদের সমান অবস্থানের স্বার্থে। বাংলাদেশের সংবিধান থেকে বিসমিল্লাহ এবং রাষ্ট্রধর্ম উঠিয়ে ফেলতে হবে। এই ব্যাপারে জনমত তৈরি করা আমাদের দায়িত্ব। জনমত তৈরি হলেই সরকার তা করবে। ধর্ম যার যার, সংবিধান সবার।

*********************

এবার আসি সমাজতন্ত্র নিয়ে। আগেই বলেছি যে প্রাতিষ্ঠানিক সাম্যবাদ একটি ব্যর্থ রূপরেখা। কিন্তু মানুষে মানুষে সাম্যতা একটি মহৎ আদর্শ। মুক্তবাজার অর্থনীতি বলবৎ রেখেই মানুষে মানুষে বৈষম্য কমিয়ে আনার রূপরেখা আমরা পাই পশ্চিমা ইউরোপের দেশগুলো থেকে। সেখানে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে “কল্যাণমুখী রাষ্ট্রব্যবস্থা” যার ইংরেজি হচ্ছে ওয়েলফেয়ার স্টেইট (welfare state). এখানে সরকার বিত্তবান সহ সকল মানুষদের কাছ থেকে প্রগতিশীল কর (আয় অনুপাতে বেশি হারের কর) আদায় করে একটা সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী বহাল রাখে। এটা গড়ে তুলতে সময় লাগে। কিন্তু এর ফলে মানুষের কিছু মৌলিক চাহিদা পূরণ করা হয়। একেক পশ্চিমা দেশে এই সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর পরিধি একেক রকম। আমার মতে বাংলাদেশে এটার পরিধি হওয়া উচিৎ সকলের জন্য সমানভাবে লভ্য উন্নত সরকারি শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থা। মানুষের মাঝে বৈষম্য কমাতে হলে শিক্ষা ব্যবস্থা অবশ্যই হতে হবে একমুখী, ধর্মনিরপেক্ষ এবং সমানভাবে লভ্য। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে ব্যবসা আর চলবে না। আর যার অর্থ আছে শুধু সেই ভালো চিকিৎসা পাবে, সেটা অনৈতিক। এই ব্যবস্থা কায়েম করতে হলে বাংলাদেশ সরকারকে প্রতি বছর বাজেটের ১০% উভয় ক্ষেত্রে ব্যয় করতে হবে। এই দুটো খাত ছাড়াও দরিদ্র, বৃদ্ধ, বিধবা, দিন মজুর, কৃষক, এদের জন্য অর্থনৈতিক নিরাপত্তা আরো জোরদার করতে হবে। বেকারদের নূন্যতম ভাতার কথাও চিন্তা করতে হবে। শেষের কয়েকটি প্রকল্প বাংলাদেশে বর্তমানে বিদ্যমান। এগুলোর পরিধি বাড়াতে হবে। জনগণের দায়িত্ব থাকবে সকলের ন্যায্য পরিমাণ কর কোষাগারে পৌছে দিতে একনিষ্ঠ হওয়া এবং প্রশাসনকে এই ব্যাপারে সহযোগিতা করা।

এই সমাজ ব্যবস্থায় একটি মানুষের ব্যক্তিগত অগ্রগতি কখনই নির্ভর করবে না তার অভিভাবকের অর্থের উপর। যার উপর তা নির্ভর করবে তা হচ্ছে তার মেধা, চেষ্টা ও শ্রম। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র বাধ্য থাকবে। বাকিটা তার নিজের উপর। কল্যাণমুখী রাষ্ট্রব্যবস্থায় পেনশনের উপরেও জোর দিতে হবে বৃদ্ধ বয়সে কাওকে যেন তার সন্তানের উপর নির্ভর করতে না হয়। আমাদের সংবিধানে সমাজতন্ত্রের এরকম একটা ব্যাখ্যা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করে দেয়া থাকতে হবে। বাংলাদেশে সমাজতন্ত্র কায়েম করার পন্থা হবে একটা কল্যাণমুখী রাষ্ট্রব্যবস্থা। তাহলেই বাহাত্তরের সংবিধানে ফিরে যাওয়া নিয়ে পুঁজিবাদীদের আর আপত্তি থাকবে না, বামপন্থীরাও কথায় কথায় “পশ্চিমা বেনিয়া”, “পুঁজিবাদীদের আগ্রাসন” ইত্যাদি উচ্চারণ করে বাতাস ভারি করে ফেলবে না। বরং বাংলাদেশকে তার জন্মকালীন কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছাতে সকলেই একমত হতে পারবে।

**********************

মৌলবাদ, সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গিবাদের ক্ষেত্রে কোরআন ও হাদিসের ভূমিকা কী?

রিয়াজ ওসমানী

২৪ অক্টোবর ২০২১

ইসলাম যে সন্ত্রাসবাদ, জঙ্গিবাদ, হত্যা ইত্যাদি সমর্থন করে না এই বক্তব্যগুলো রাজনীতিবীদ থেকে শুরু করে অনেক মুসলমানদের মুখে দিন রাত শোনা যায়। আর নাস্তিকরা প্রায়ই উলটা বলে থাকে যে মৌলবাদ, সন্ত্রাসবাদ, জঙ্গিবাদ ইত্যাদির ভিত্তি ইসলামেই আছে এবং কোরআনের বিভিন্ন আয়াত এবং হাদিসের বিভিন্ন উক্তি থেকে সন্ত্রাসীরা তাদের অনুপ্রেরণা পায়।

অতএব কোরআন-হাদীস থেকেই এই প্রসঙ্গে কিছু আয়াত বা উক্তি পর্যবেক্ষণ করা যাক।

সংগৃহিত

সূরা আল বাকারা (البقرة), আয়াত: ২১৬

كُتِبَ عَلَيْكُمُ ٱلْقِتَالُ وَهُوَ كُرْهٌ لَّكُمْ وَعَسَىٰٓ أَن تَكْرَهُوا۟ شَيْـًٔا وَهُوَ خَيْرٌ لَّكُمْ وَعَسَىٰٓ أَن تُحِبُّوا۟ شَيْـًٔا وَهُوَ شَرٌّ لَّكُمْ وَٱللَّهُ يَعْلَمُ وَأَنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ

অর্থঃ তোমাদের উপর যুদ্ধ ফরয করা হয়েছে, অথচ তা তোমাদের কাছে অপছন্দনীয়। পক্ষান্তরে তোমাদের কাছে হয়তো কোন একটা বিষয় পছন্দসই নয়, অথচ তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর। আর হয়তোবা কোন একটি বিষয় তোমাদের কাছে পছন্দনীয় অথচ তোমাদের জন্যে অকল্যাণকর। বস্তুতঃ আল্লাহই জানেন, তোমরা জান না।

সূরা আত-তাওবাহ্‌ (التوبة), আয়াত: ৫

فَإِذَا ٱنسَلَخَ ٱلْأَشْهُرُ ٱلْحُرُمُ فَٱقْتُلُوا۟ ٱلْمُشْرِكِينَ حَيْثُ وَجَدتُّمُوهُمْ وَخُذُوهُمْ وَٱحْصُرُوهُمْ وَٱقْعُدُوا۟ لَهُمْ كُلَّ مَرْصَدٍ فَإِن تَابُوا۟ وَأَقَامُوا۟ ٱلصَّلَوٰةَ وَءَاتَوُا۟ ٱلزَّكَوٰةَ فَخَلُّوا۟ سَبِيلَهُمْ إِنَّ ٱللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ

অর্থঃ অতঃপর নিষিদ্ধ মাস অতিবাহিত হলে মুশরিকদের হত্যা কর যেখানে তাদের পাও, তাদের বন্দী কর এবং অবরোধ কর। আর প্রত্যেক ঘাঁটিতে তাদের সন্ধানে ওঁৎ পেতে বসে থাক। কিন্তু যদি তারা তওবা করে, নামায কায়েম করে, যাকাত আদায় করে, তবে তাদের পথ ছেড়ে দাও। নিশ্চয় আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।

সূরা আস-সাফ (الصّفّ), আয়াত: ১১

تُؤْمِنُونَ بِٱللَّهِ وَرَسُولِهِۦ وَتُجَٰهِدُونَ فِى سَبِيلِ ٱللَّهِ بِأَمْوَٰلِكُمْ وَأَنفُسِكُمْ ذَٰلِكُمْ خَيْرٌ لَّكُمْ إِن كُنتُمْ تَعْلَمُونَ

অর্থঃ তা এই যে, তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করবে এবং আল্লাহর পথে নিজেদের ধন-সম্পদ ও জীবনপণ করে জেহাদ করবে। এটাই তোমাদের জন্যে উত্তম; যদি তোমরা বোঝ।

সূরা আল আনফাল (الأنفال), আয়াত: ৫৭

فَإِمَّا تَثْقَفَنَّهُمْ فِى ٱلْحَرْبِ فَشَرِّدْ بِهِم مَّنْ خَلْفَهُمْ لَعَلَّهُمْ يَذَّكَّرُونَ

অর্থঃ সুতরাং যদি কখনো তুমি তাদেরকে যুদ্ধে পেয়ে যাও, তবে তাদের এমন শাস্তি দাও, যেন তাদের উত্তরসূরিরা তাই দেখে পালিয়ে যায়; তাদেরও যেন শিক্ষা হয়।

সূরা আল বাকারা (البقرة), আয়াত: ১৯১

وَٱقْتُلُوهُمْ حَيْثُ ثَقِفْتُمُوهُمْ وَأَخْرِجُوهُم مِّنْ حَيْثُ أَخْرَجُوكُمْ وَٱلْفِتْنَةُ أَشَدُّ مِنَ ٱلْقَتْلِ وَلَا تُقَٰتِلُوهُمْ عِندَ ٱلْمَسْجِدِ ٱلْحَرَامِ حَتَّىٰ يُقَٰتِلُوكُمْ فِيهِ فَإِن قَٰتَلُوكُمْ فَٱقْتُلُوهُمْ كَذَٰلِكَ جَزَآءُ ٱلْكَٰفِرِينَ

অর্থঃ আর তাদেরকে হত্যাকর যেখানে পাও সেখানেই এবং তাদেরকে বের করে দাও সেখান থেকে যেখান থেকে তারা বের করেছে তোমাদেরকে। বস্তুতঃ ফেতনা ফ্যাসাদ বা দাঙ্গা-হাঙ্গামা সৃষ্টি করা হত্যার চেয়েও কঠিন অপরাধ। আর তাদের সাথে লড়াই করো না মসজিদুল হারামের নিকটে যতক্ষণ না তারা তোমাদের সাথে সেখানে লড়াই করে। অবশ্য যদি তারা নিজেরাই তোমাদের সাথে লড়াই করে। তাহলে তাদেরকে হত্যা কর। এই হল কাফেরদের শাস্তি।

সূরা আল আনফাল (الأنفال), আয়াত: ১২

إِذْ يُوحِى رَبُّكَ إِلَى ٱلْمَلَٰٓئِكَةِ أَنِّى مَعَكُمْ فَثَبِّتُوا۟ ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ سَأُلْقِى فِى قُلُوبِ ٱلَّذِينَ كَفَرُوا۟ ٱلرُّعْبَ فَٱضْرِبُوا۟ فَوْقَ ٱلْأَعْنَاقِ وَٱضْرِبُوا۟ مِنْهُمْ كُلَّ بَنَانٍ

অর্থঃ যখন নির্দেশ দান করেন ফেরেশতাদিগকে তোমাদের পরওয়ারদেগার যে, আমি সাথে রয়েছি তোমাদের, সুতরাং তোমরা মুসলমানদের চিত্তসমূহকে ধীরস্থির করে রাখ। আমি কাফেরদের মনে ভীতির সঞ্চার করে দেব। কাজেই গর্দানের উপর আঘাত হান এবং তাদেরকে কাট জোড়ায় জোড়ায়।

গ্রন্থের নামঃ সূনান নাসাঈ (ইফাঃ)
হাদিস নম্বরঃ (3979)
অধ্যায়ঃ ৩৮/ হত্যা অবৈধ হওয়া
পাবলিশারঃ ইসলামিক ফাউন্ডেশন
পরিচ্ছদঃ ১. মুসলিমকে হত্যা করার অবৈধতা
৩৯৭৯. ইসহাক ইবন ইবরাহীম (রহঃ) … আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ না বলা পর্যন্ত আমি লোকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে আদিষ্ট হয়েছি। যদি তারা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্’ বলে, তবে আমার পক্ষ হতে তাদের জানমাল রক্ষা করে নেবে কিন্তু এর হক ব্যতীত। আর তাদের হিসাব আল্লাহর যিম্মায়।
তাহক্বীকঃ সহীহ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

গ্রন্থের নামঃ সহীহ মুসলিম (ইফাঃ)
হাদিস নম্বরঃ (4399)
অধ্যায়ঃ ৩৩/ জিহাদ ও এর নীতিমালা
পাবলিশারঃ ইসলামিক ফাউন্ডেশন
পরিচ্ছদঃ ৯. রাতের অতর্কিত আক্রমনে অনিচ্ছাকৃতভাবে নারী ও শিশু হত্যায় দোষ নেই
৪৩৯৯। ইয়াহইয়া ইবনু ইয়াহইয়া, সাঈদ ইবনু মনসুর ও আমর আন নাকিদ (রহঃ) … সা’ব ইবনু জাছছামা (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে মুশরিকদের নারী ও শিশু সন্তান সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলো, যখন রাতের আধারে অতর্কিত আক্রমণ করা হয়, তখন তাদের নারী ও শিশুরাও আক্রান্ত হয়। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তারাও তাদের (মুশরিকদের) অন্তর্ভুক্ত।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

সূরা বাইয়্যিনাহ (البينة), আয়াত: ৬

إِنَّ ٱلَّذِينَ كَفَرُوا۟ مِنْ أَهْلِ ٱلْكِتَٰبِ وَٱلْمُشْرِكِينَ فِى نَارِ جَهَنَّمَ خَٰلِدِينَ فِيهَآ أُو۟لَٰٓئِكَ هُمْ شَرُّ ٱلْبَرِيَّةِ

অর্থঃ আহলে-কিতাব ও মুশরেকদের মধ্যে যারা কাফের, তারা জাহান্নামের আগুনে স্থায়ীভাবে থাকবে। তারাই সৃষ্টির অধম।

মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
পর্ব-২৫ঃ শিষ্টাচার
পরিচ্ছেদঃ ১৬. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ – আল্লাহ তা‘আলার প্রতি ভালোবাসা এবং আল্লাহ তা‘আলার জন্য বান্দার প্রতি ভালোবাসা
৫০১৮-(১৬) আবূ সা‘ঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছেন, তিনি বলেন, মু’মিন ব্যতীত অন্য কাউকে বন্ধু বানাবে না এবং তোমার খাদ্য আল্লাহভীরু লোক ছাড়া যেন অন্য কেউ না খায়। (তিরমিযী, আবূ দাঊদ ও দারিমী)(1)
(1) হাসান : তিরমিযী ২৩৯৫, আবূ দাঊদ ৪৮৩২, সহীহুল জামি‘ ৭৩৪১, সহীহ আত্ তারগীব ৩০৩৬, সহীহ ইবনু হিব্বান ৫৫৪, আহমাদ ১১৩৩৭, আবূ ইয়া‘লা ১৩১৫, দারিমী ২০৫৭, শু‘আবুল ঈমান ৯৩৮২, হিলইয়াতুল আওলিয়া ৭/৭৪, আল মু‘জামুল আওসাত্ব ৩১৩৬, আল মুসতাদরাক ৭১৬৯।
হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)
বর্ণনাকারীঃ আবূ সা’ঈদ খুদরী (রাঃ)

গ্রন্থঃ সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত)
অধ্যায়ঃ ৩৬/ শিষ্টাচার
হাদিস নম্বরঃ ৪৮৩২
১৯. যার সংস্পর্শে বসা উচিত
৪৮৩২। আবূ সাঈদ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তুমি মু‘মিন ব্যক্তি ব্যতীত অন্য কারো সঙ্গী হবে না এবং তোমার খাদ্য যেন পরহেযগার লোকে খায়।(1)
হাসান।
(1). তিরমিযী, আহমাদ।
হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)

নাস্তিকদের প্রসঙ্গে

রিয়াজ ওসমানী

১৪ অক্টোবর ২০২১

নাস্তিকরা নাকি ইসলাম ধর্মেরই বেশি গালমন্দ করে। আসলেই কি তাই?

প্রাক্তন মুসলমান নাস্তিকরা ইসলাম ধর্ম নিয়েই বেশি কথা বলবে কারণ সেটাই তারা অন্তরঙ্গভাবে চিনে। ঠিক তেমনি প্রাক্তন হিন্দু নাস্তিকরা হিন্দু ধর্ম নিয়ে, প্রাক্তন খ্রিস্ট ধর্মালম্বীরা খ্রিস্ট ধর্ম নিয়ে ইত্যাদি। সেটাই স্বাভাবিক। যে যার প্রাক্তন ধর্মেরই জ্ঞান সবচেয়ে বেশি ধারণ করে কারণ তারা সেই ধর্মটাই পালন করতো।

মুসলমান মৌলবাদী, উগ্রপন্থী, সন্ত্রাসী ইত্যাদি মানুষরা কোরআনের বিভিন্ন আয়াত এবং হাদিসের বিভিন্ন উক্তি থেকেই তাদের বিশ্বাস এবং কার্যকলাপের অনুপ্রেরণা পায়। এবং সেগুলোর বিস্তারিত নথি সংশয় ডট কম নামের ওয়েব পাতায় অথবা সেটার অ্যাপএ পাওয়া যাবে। আমাদের দেশে বাংলা ভাষায় কোরআন ও হাদিস পড়ার উপর ইচ্ছা করেই আলেম সমাজ কোনো গুরুত্ব দেয়নি, কারণ সেটা দিলেই সবাই ইসলামের গলদগুলো জেনে যেত।

হ্যাঁ, ইসলামে (কোরআন ও হাদিসে) ভালো আর খারাপ দুটোই আছে। কেউ যদি এখন বলে যে খারাপটা উপেক্ষা করে ভালোটা মেনে চললেই হলো, তাহলে আমি বলবো যে সেটা করলে ইসলাম মানা হলো না, ইসলামের একটা অংশ মানা হলো। এবং ঠিক এই সুবিধাবাদী কাজটাই মধ্যপন্থী মুসলমানরা করে। কিন্তু নাস্তিকরা খারাপ জিনিষগুলোর জন্য পুরা ধর্মটাকেই ত্যাজ্য করেছে। সুবিধাবাদী কাজটা তারা করে না।

**********************

তৃতীয় লিঙ্গের প্রসঙ্গে

রিয়াজ ওসমানী

২৯ সেপ্টেম্বর ২০২১

ধীরে ধীরে বাংলাদেশ তার যৌন সংখ্যালঘুদের উন্নততর দিনগুলোর দিকে অগ্রসর হচ্ছে – তাদের মাঝে সমকামী নারী ও পুরুষদের জন্য নয়, তবে রূপান্তরকামী, অদ্বৈত এবং আন্তঃলিঙ্গ মানুষদের জন্য –  অর্থাৎ তাদের জন্য, যাদের জীবনের কোন এক সময়ে তাদের “লিঙ্গ পরিচয়”টা মুখ্য হয়ে উঠে জন্মের সময়ে অর্পিত “শারীরিক লিঙ্গ”-এর সাথে সেটার অসামঞ্জস্যতার কারণে। ডাক্তারি ভাষায় এই অসামঞ্জস্যতাটিকে আখ্যায়িত করা হয় “জেন্ডার ডিসফোরিয়া” নামে।

বিগত সময়ে সরকার এই মানুষদেরকে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে (যদিও আমার মতে এটা একটি ভুল শ্রেণিবিন্যাস)। এখন থেকে সকল প্রাথমিক পর্যায়ের বিদ্যালয়ের কাগজপত্রে নিজের লিঙ্গ পরিচয় উল্লেখ করার সময়ে নারী, পুরুষ এবং তৃতীয় লিঙ্গ থেকে যে কোনো একটা বাছাই করার উপায় থাকবে। এটা অনুমেয় যে আগামী দিনগুলোতে সকল সরকারি কাগজপত্রেই এই ব্যবস্থাটি থাকবে (কিছু জায়গায় তা ইতিমধ্যে বিদ্যমান)। সরকার আরো সিদ্ধান্ত নিয়েছে তৃতীয় লীঙ্গের মানুষদের বিষয়টি পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা হবে, যাতে করে অল্প বয়সীরা তাদের মাঝেকার সেই মানুষগুলোর উপস্থিতি এবং মূল্য সম্বন্ধে আরো দীক্ষিত হয়। জন্মের সময়ে অর্পিত শারীরিক লিঙ্গের তুলনায় পরে একটি নতুন লিঙ্গ পরিচয় জানানোর মুহূর্ত আসলে ভবিষ্যতে তা সকল সরকারি খাতায় পরিবর্তন করার সুযোগ থাকবে।

একটি সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান দেশে এসব ব্যাপার একটু আশ্চর্য করে দিতে পারে। কিন্তু বংশ পরম্পরায় এটা অনেকেরই জানা যে এই মানুষগুলোর অস্তিত্ব চিরকালই ছিল। তা না হলে কীভাবে দক্ষিণ এশিয়ায় হিজরা সম্প্রদায় নামের একটি কৃত্রিম সামাজিক গঠনের ব্যাখ্যা দেবেন, যেখানে অনাদিকাল থেকে অনেক যৌন সংখ্যালঘু মানুষরা পরিবার এবং মূলধারার সমাজ থেকে ত্যাজ্য হয়ে আশ্রয় নিয়ে এসেছে? ইসলাম ধর্মও – যাদেরকে (ভুলভাবে) তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে ধরা হয়েছে – তাদের প্রতি কম কঠোর, বিশেষ করে সমকামী নারী ও পুরুষদের প্রতি সেই ধর্মের অচরণের তুলনায়। এবং মুসলমানরা সাধারণত এটা মেনে নেয় যে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদেরকে আল্লাহ্ – ভালোর কারণেই হোক বা মন্দের কারণে হোক – সেইভাবেই বানিয়েছেন। এখানে বলে রাখতে হবে যে এই দয়াশীল ভাবনাটি সমকামী নারী ও পুরুষদের প্রতি একেবারেই প্রদর্শন করা হয় না।

অতএব ক্ষুদ্র বিজয়গুলোর গুণগ্রহণ করা দরকার। আমি জানতে পেরেছি যে আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী যৌন সংখ্যালঘু বান্ধব, এবং নিঃসন্দেহে উনার যুক্তরাষ্ট্রে শিক্ষিত বয়ঃপ্রাপ্ত ছেলেমেয়েরা বাংলাদেশের রূপান্তরকামী, অদ্বৈত এবং আন্তঃলিঙ্গ মানুষদের ক্ষেত্রে একটি বলিষ্ঠ সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য তাকে উৎসাহ দিয়েছেন। কৃতিত্ব সেই সকল স্থানীয় সংগঠনগুলোর, যেগুলো বছরের পর বছর উল্লেখিত মানুষদের নিয়ে কাজ করেছে এবং সেই মানুষগুলোর দুর্দশা সামনে এনে তুলেছে। বাংলাদেশের কিছু বিশিষ্ট রূপান্তরকামী মানুষ, যারা অন্যদের কাছে নিজেদেরকে একটি উজ্জ্বল উদাহরণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য নিরলস চেষ্টা চালিয়ে গেছেন, তাদেরকে বিশেষভাবে কদর করা উচিৎ। এর পরবর্তী পদক্ষেপ হতে হবে প্রয়োজন ক্ষেত্রে লিঙ্গ পরিবর্তন করার জন্য সকল প্রকার সরকারি ও বেসরকারি সহায়তার লভ্যতা।

সংবাদ সূত্রঃ বিবিসি বাংলা

কিছু শব্দের ব্যাখ্যা

যৌন সংখ্যালঘুঃ ১) যৌন প্রবৃত্তি (সেক্সুয়াল ওরিয়েন্টেশন; sexual orientation), যার অর্থ দাঁড়ায় একটা মানুষ কোন লিঙ্গের মানুষদের প্রতি যৌন আকর্ষণ বোধ করে সেটার যেই বংশাণু ভিত্তিক (জেনেটিক) নির্ণয়কারী, তার কারণে; অথবা ২) জেন্ডার ডিসফোরিয়া বা অন্য কিছুর ভিত্তিতে শারীরিক লিঙ্গের সাথে অন্তর্নিহিত লিঙ্গ পরিচয়ের অসামঞ্জস্যতার কারণে; অথবা ৩) যৌনতা এবং লিঙ্গ পরিচয় ভিত্তিক আরো বহুবিধ কারণে মূলধারার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষদের তুলনায় যারা ভিন্ন এবং সংখ্যালঘু। ইংরেজিতে এদেরকে বিভিন্ন শব্দের সংক্ষিপ্তকরণে এলজিবিটি (LGBT) বলা হয়। এলজিবিটির বর্ধিত ইংরেজি সংক্ষিপ্তকরণগুলো হচ্ছে এলজিবিটিকিউ (LGBTQ), এলজিবিটিকিউআইএ (LGBTQIA) ইত্যাদি।

রূপান্তরকামীঃ বয়ঃসন্ধিকাল বা তার আগে থেকেই যারা পূর্ণাঙ্গভাবে অনুধাবন করে যে তাদের অন্তর্নিহিত লিঙ্গ পরিচয়টি জন্মের সময়ে পাওয়া তাদের শারীরিক লিঙ্গ থেকে সম্পুর্ণ উলটো। এর অর্থ দাঁড়ায় যে তাদের বাহ্যিক চেহারা ছেলেদের মতো কিন্তু ভেতরে তাদের সত্ত্বাটি ঠিক মেয়েদের, অথবা ঠিক এর উল্টাটা (মেয়েদের শরীর কিন্তু ছেলেদের সত্ত্বা)। একজন মানুষের শারীরিক (বাহ্যিক) লিঙ্গ এবং তার অন্তরঙ্গ চেতনায় প্রতিষ্ঠিত লিঙ্গ পরিচয়ের মাঝেকার অসামঞ্জস্যতাটিকে জেন্ডার ডিসফোরিয়া (Gender Dysphoria) নামে আখ্যায়িত করা হয়। এই অবস্থাটি কিছু ছেলেদের মেয়েলীপনা ভাব অথবা কিছু মেয়েদের পুরুষালী ভাবের চেয়ে যথেষ্ট ভিন্ন এবং আরো অনেক গভীর। এই পরিণতিটি মানুষের জন্য অসম্ভব বেদনাদায়ক এবং নিঃসঙ্গ। এটার বিরতিহীন যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাওয়ার একটিই উপায়। আর তা হচ্ছে নানা চিকিৎসার মাধ্যমে শরীরটাকে বদলে ফেলা যাতে করে ভেতরের সত্ত্বা আর বাইরের রূপটির মিলন হয়। ইংরেজিতে রূপান্তরকামীদেরকে ট্রান্সজেন্ডার (transgender) বলা হয়।

অদ্বৈতঃ বিশেষ কোনো কারণে যারা নিজেদেরকে নারী বা পুরুষ, এই দুইটা লিঙ্গের আওতায় নিজেদেরকে মনে করতে পারে না। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষরা আদীকাল থেকেই নারী বা পুরুষ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে এসেছে এবং তাদের শারীরিক লিঙ্গ এবং লিঙ্গ পরিচয় সেইভাবেই ফুঁটে উঠেছে। লিঙ্গের ছকটা যেন নারী ও পুরুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু অদ্বৈতরা নিজেদেরকে এই ছকে ফেলতে পারে না। তারা নারীও নয়, পুরুষও নয়। তবে তারা তৃতীয় কোনো লিঙ্গ বলেও দাবী করে না কারণ তারা লিঙ্গ ব্যাপারটাই মানে না। তাদের প্রশ্ন হলো তাহলে প্রথম লিঙ্গ কারা আর দ্বিতীয় লিঙ্গ কারা? এই মানুষরা লিঙ্গের দ্বৈততা মানতে নারাজ। কাজেই তারা অদ্বৈত। ইংরেজিতে এদেরকে বলা হয় নন-বাইনারী (non-binary). বাহ্যিকভাবে এরা নারীর মতো দেখতে হতে পারে, পুরুষের মতো দেখতে হতে পারে বা মাঝামাঝি কিছু। এদের শারীরিক লিঙ্গ অনেকটা অপ্রাসঙ্গিক।

আন্তঃলিঙ্গঃ জন্ম থেকে যাদের যৌনাঙ্গ (এবং/অথবা প্রজনন অঙ্গ) পূর্ণাঙ্গ নারী বা পুরুষদের মতো নয়, অথবা নারী বা পুরুষ উভয়দেরই যৌনাঙ্গ (এবং/অথবা প্রজনন অঙ্গ) যাদের মধ্যে বিদ্যমান। এই অবস্থার ফলে এরা কীভাবে নিজেদের আত্মপরিচয় প্রকাশ করবে তা তারাই নির্ধারণ করে। তবে অনেকের জন্মের সময়েই ডাক্তাররা অস্ত্রপ্রচারের মাধ্যমে তাদেরকে নারী বা পুরুষের যৌনাঙ্গ বা প্রজনন অঙ্গ নির্ধারণ করে দেয়ার চেষ্টা করে। এই মানুষদের জীবন ও ভবিষ্যৎ নিয়ে এবং এখানে সংশ্লিষ্ট নৈতিকতা বিবেচনায় রেখে সমাজে আরো খোলামেলা আলোচনার অবকাশ আছে। ইংরেজিতে এদেরকে ইন্টারসেক্স (intersex) বলা হয়।

শারীরিক লিঙ্গঃ জন্মের সময়ে যৌনাঙ্গ (এবং/অথবা প্রজনন অঙ্গ) পর্যবেক্ষণ করে ডাক্তার বা পরিবারগন শিশুকে নারী/পুরুষ ছকের যেই ভাগে ফেলে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষিত করে, সেটাই শারীরিক লিঙ্গ। ইংরেজিতে এটাকে জেন্ডার (gender) বা বাইয়োলজিকাল সেক্স (Biological Sex) বা শুধু সেক্স (sex) বলে।

লিঙ্গ পরিচয়ঃ একটি মানুষ লিঙ্গ ভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাসে মনের গভীরের স্তর থেকে কীভাবে নিজেকে অনুভব করে এবং সেটার আদলে কীভাবে নিজেকে বাইরের দুনিয়ার কাছে উপস্থাপন করে, সেটাই লিঙ্গ পরিচয়। অধিকাংশ মানুষের ক্ষেত্রে এই অনুভূতি ও উপস্থাপনা সেই মানুষটার জন্ম থেকে পাওয়া শারীরিক লিঙ্গের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কিন্তু অল্প কিছু মানুষের জন্য সেই দুটো বিষয় তাদের শারীরিক লিঙ্গ থেকে ভিন্ন তো বটেই, অনেক সময়ে সেটার ঠিক উলটো। ইংরেজিতে লিঙ্গ পরিচয়কে জেন্ডার আইডেনটিটি (Gender Identity) বলা হয়।

জেন্ডার ডিসফোরিয়াঃ একটি মানুষের শারীরিক লিঙ্গ এবং পরবর্তিতে অনুভূত এবং অনুধাবিত হওয়া লিঙ্গ পরিচয়ের অসামঞ্জস্যতার কারণে প্রতিটি মুহুর্তের চরম অস্বস্তি, উৎকন্ঠা, উত্তেজনা, বিষণ্ণতা ইত্যাদি। রূপান্তরকামীরা এই অনুভূতিগুলোর নির্মম শিকার। Gender Dysphoria-কে কোনো মানসিক রোগের আওতায় ফেলা হয়নি। তবে উপরে উল্লেখিত উপসর্গগুলোর কারণে ডাক্তারি জগত থেকে যত্ন ও সমর্থনের প্রয়োজন। অনেক সময়ে এই অবস্থা থেকে সম্পূর্ণ নিরাময় সম্ভব নানা চিকিৎসার মাধ্যমে বাহ্যিক শরীর বদলে ফেলে।

**********************

On the Issue Of Third Gender

Riaz Osmani

September 20, 2021

Slowly but surely, Bangladesh seems to be marching towards better days for the LGBTQIA population – not necessarily gays and lesbians among them but the transgender, non-binary and intersex people, i.e. for whom gender identity becomes an issue at some point in their lives for it contradicting the physical gender assigned at birth. This is known in medical terms as gender dysphoria.

The government had previously recognised such people (incorrectly in my opinion) as belonging to a third gender. From now on, all paperwork relating to schooling will have the option to fill out one’s gender as male, female or third gender. It is conceivable that all official papers in the country will have this option in the future (some already do). The government has also taken the decision to incorporate the issue of third gender people in the school curriculum to better educate youngsters about the presence and value of such people among them. When the time comes to declare a new gender identity compared to the physical gender assigned at birth, it will, in the near future, be possible to have that changed in all official documents.

This may seem surprising for a Muslim majority country. But it has been known through generations that such people have existed for ever. How else do you explain the presence of the artificial social construct in South Asia called the Hijra community where many LGBTQIA people have taken refuge over time immemorial to find shelter after being shunned by family and mainstream society? The Islamic faith also seems less harsh on those classified (incorrectly) as belonging to the third gender (as opposed to those who are gay or lesbian), and Muslims generally accept that God made these people as they are for better or for worse. The generosity of this thought is not afforded to gays and lesbians, it must be added.

So one has to appreciate the little victories. I am told that the current Prime Minister of Bangladesh Sheikh Hasina is personally LGBT friendly and it is no doubt that it is her American educated adult children who have encouraged her to take a bold decision regarding the country’s transgender, non-binary and intersex people. Credit also goes to the local organisations that have worked with them over the years and have highlighted their plight. Some eminent transgender persons in Bangladesh who have tirelessly gone about setting personal examples to others must be highly applauded. The next step must be government and private efforts to support in all manner the issue of gender reassignment when required.

News source: BBC Bangla

**********************

উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া ধ্যান-ধারনা, জল্পনা-কল্পনা, ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত

রিয়াজ ওসমানী

২৪ আগষ্ট ২০২১

তালেবান এবং আল-কায়দা যুক্তরাষ্ট্রের সৃষ্টি, বা যুক্তরাষ্ট্র মুসলমান দুনিয়ায় চরমপন্থী মুসলমান গোষ্ঠীগুলোকে উস্কানি দিয়ে পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করেছে, এগুলো চিরচারিত অলস ব্যাখ্যা যা একই সঙ্গে সুবিধাবাদী। এই ব্যাখ্যাগুলোর মাধ্যমে মুমিনরা সহজেই নিজেদের দোষ বা কমতির দায় আমেরিকার উপর চাঁপিয়ে দিয়ে হাফ ছেড়ে বাঁচে। আর বামরাও “পুঁজিবাদী” যুক্তরাষ্ট্রকে হেয় করার আরেকটা হাতিয়ার খুঁজে পায়। অথচ বাস্তবতা আরও অনেক জটিল যা অনুধাবন করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র এবং প্রাক্তন সোভিয়েট ইউনিয়নের মধ্যকার স্নায়ুযুদ্ধ সম্বন্ধে জানতে হবে এবং ১৯৭৯ সালে সেই সোভিয়েট ইউনিয়ন একটি আফগান সাম্যবাদী সরকারকে সহায়তা করার নামে যেভাবে আফগানিস্তানকে ১০ বছরের জন্য সামরিকভাবে দখল করে ফেললো সেটার সম্বন্ধে অবহিত হতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য পশ্চিমা দেশ তখন পশ্চিম এশিয়ায় সাম্যবাদ ঠ্যাকাতে সাম্যবাদ বিরোধী ইসলামপন্থী আফগান মুজাহিদীনদেরকে সহায়তা করেছিল।

মুজাহিদীনদের অবির্ভাব হয়েছিল কয়েকটি গেরিলা গোত্রের সমন্বয় হিসেবে তাদের দেশে আগ্রাসনবাদী সোভিয়েটদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য এবং স্থানীয় সাম্যবাদী সরকারকে উৎখাত করার জন্য। কিন্তু তালেবানের জন্ম তার কিছু পর আফগানিস্তানের বিভিন্ন দেওবন্দী মাদ্রাসায়। ১০ বছর পর মুজাহিদীনদের হাতে হেরে যাওয়ার পর আফগানিস্তান থেকে সোভিয়েট সেনা প্রত্যাহারের পর মুজাহিদীনদের মধ্যেই ক্ষমতার জন্য লড়াই শুরু হয়ে যায়। সেই সময়ে মুজাহিদীনদের বিপক্ষ শক্তি হিসেবে তালেবানদের প্রকৃত উত্থান হয়। তারা আফগানিস্তান দখল করতে সক্ষম হয় এবং তাতে তারা পাকিস্তানের গোয়েন্দা বিভাগ আইএসআই-এর সহায়তা পায়।

আল-কায়দা অন্য দিকে ছিল সোভিয়েটদের বিরুদ্ধে লড়াই করা মধ্যপ্রাচ্য ভিত্তিক একটি ইসলামী গোষ্ঠী যেটা আফগান মুজাহিদীনদেরকে সহায়তা করেছিল৷ মার্কিন গোয়েন্দা বিভাগ সিআইএর বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে যে আল-কায়দা যখন মুজাহিদীনদের সমর্থন করছিল তখন তারা সিআইএর সমর্থন পেয়েছিল। এই অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা সম্ভব নয় যেহেতু গোয়েন্দাদের কার্যকলাপ প্রকাশ্যে হয় না। তবে পাকিস্তান যে তালেবানদের সহায়তা করেছিল সেটা হয়েছিল প্রকাশ্যে। সোভিয়েট সেনাদের বিদায়ের পর আফগানিস্তান প্রথমে মুজাহিদীন ও তারপর তালেবানদের অধীনে চলে আসার পর আরব নাগরিক ওসামা বিন লাদেনের নেতৃত্বে আল-কায়দা গোষ্ঠীটি আফগানিস্তানে ঘাটি খুলে বসে।

সাম্যবাদীদের বিরুদ্ধে এত দিন সংগ্রাম করে বিন লাদেন ১৯৯৬ সালে উলটা যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধেই চলে যায়। ১৯৯১ সালে আমেরিকা কুয়েতকে ইরাকের আগ্রাসন থেকে মুক্ত করার পর মক্কা-মদিনার দেশে মার্কিন সেনার উপস্থিতি বিন লাদেন সহ্য করতে পারেনি এবং ইহুদি-খ্রিস্ট সম্প্রদায়ের উপর লাদেন জিহাদ ঘোষণা করে। ২০০১ সালের ১১ই সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের উপর আল-কায়দার ভয়াবহ আত্মঘাতি বিমান হামলা সেই জিহাদ ডাকেরই পরবর্তি অধ্যায়। বাকিটা ইতিহাস।

সিআইএর বিরুদ্ধে উপরে উল্লেখিত অভিযোগটি সত্য হলেও এর অর্থ কি এই দাঁড়ায় যে আমেরিকাই তালেবান ও আল-কায়দা তৈরি করেছে? এরকম সস্তা ব্যাখ্যা বংশের পর বংশ সবাই গিলেছে যা উপমহাদেশীয় মুসলমানদের মধ্যে একটি “বলির পাঠা” মানসিকতার জন্ম দিয়েছে যা উলটো জঙ্গিবাদ ছড়িয়েছে। সকলের উচিৎ নিজ ক্ষমতা অনুযায়ী বিস্তারিত জানার চেষ্টা করা। অন্তত জানার ইচ্ছাটা থাকতে হবে। আমি উইকিপিডিয়া ঘেটে এই সারমর্মটা লিখলাম এবং এর মধ্যে ভুলভ্রান্তি থাকতে পারে যা আমি আমার পাঠকদেরকে তুলে ধরার জন্য আমন্ত্রন জানাচ্ছি। আমি তখন ব্যাপারটা আরো ঘেটে দেখবো। কিন্তু সবার প্রতি অনুরোধ উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া ধ্যান-ধারনা, জল্পনা-কল্পনা, ষড়যন্ত্র, চক্রান্ত ইত্যাদি থেকে বের হয়ে আসার চেষ্টা করুন। এখন আর স্নায়ুযুদ্ধের মৌসুম নেই।

বিঃ দ্রঃ একটু হালনাগাদ, মার্চ ২০২২। ইউক্রেনকে ঘিরে পশ্চিমা বিশ্ব আর রাশিয়ার মধ্যে আবার নতুন করে স্নায়ু যুদ্ধ শুরু হয়েছে।

*********************

এবার আসছি ইসলামিক স্টেট (আইএস)-এর প্রসঙ্গে। ২০০৪ সালে ইরাকে আল-কায়দার অবশিষ্ট একটি দল “আবু মুসাব আল জারকাউই” নামের একজনের নেতৃত্বে ইসলামিক স্টেট, আইসিস, আইসিল, আইএস বা দায়েশ নামে উদিত হয়। ২০০৭ সালে ইরাকে মার্কিন সেনার উপস্থিতি বৃদ্ধি করার পর দলটি কয়েক বছরের জন্য লুকিয়ে যায়। তবে ২০১১ সালে গোষ্ঠিটি আবার নতুন করে তার রূপ প্রকাশ করে। তারা ইরাক এবং সিরিয়ায় তখনকার অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে বিভিন্ন আক্রমণাত্বক অভিযানের মাধ্যমে তাদের দল ভারি করতে শুরু করে। ইরাকে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির জন্য ২০০৩ সালে শুরু করা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হামলা ও দখল অনেকাংশে দায়ী। আর সিরিয়ার অস্থিতিশীল পরিবেশ ছিল মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে “আরব স্প্রিং” নামের গনজাগরণের ধারাবাহিকতা যেখানে সিরিয়ার বহু নাগরিক স্বৈরাচারী নেতা বাশার আল-আসাদের বিরুদ্ধে জেগে উঠেছিল। ২০১৪ সালে ইরাকের মসুল আর তিক্রিত অঞ্চল দখল করে নিয়ে ইসলামিক স্টেটের পরের নেতা “আবু বাকর আল বাগদাদি” সিরিয়ার আলেপো থেকে শুরু করে ইরাকের দীয়ালা পর্যন্ত একটি ইসলামী খেলাফত তৈরির ঘোষণা দেয়।

তারপরেই বিশ্ববাসী তাদের বিভৎস রূপ দেখতে পায়। তাদের দখল করে নেয়া স্থানগুলোতে কীভাবে অজস্র স্থানীয় পুরুষদেরকে গরুর মতো জবাই করা হয় এবং নারীদেরকে বন্দী এবং/অথবা ধর্ষণ করা হয়, তা ছিল অবিশ্বাস্য। তলোয়ার দিয়ে বিদেশি সাংবাদিকদের গলা কর্তনের ভিডিও আইএসের লোক আন্তর্জালে ছড়িয়ে দেয়। যারাই খেলাফতের নামে মাত্র বিরোধিতা করেছে, তাদেরই বরণ করে নিতে হয়েছে তলোয়ারের ধারে বা বন্দুকের গুলিতে মৃত্যু। সমকামীদেরকে উঁচু দালান বা পাহাড় থেকে নিক্ষেপ করার ভিডিও প্রকাশিত হয়েছে। এই খেলাফতের দানবরা আরও যেটা করেছে তা হলো অজস্র স্থানীয় ইয়াজিদি নারীদের দাসী হিসেবে আটক করে ফেলে তাদেরকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ধর্ষণ এবং/অথবা খুন।

দানবরা এতটাই নেট বিশেষজ্ঞ ছিল যে তারা সুকৌশলে প্রচারণা করে সারা বিশ্বের বহু তরুণ ও তরুণীদেরকে এই খেলাফত প্রতিষ্ঠার ডাকে সারা দিতে সফল হয়। তাদেরকে একটা রোমাঞ্চকর চিত্র তুলে দিয়ে মুসলমান হওয়ার দায়িত্ব পালনের ডাক দেয়া হয়। এর প্রত্যুত্তরে প্রাথমিকভাবে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকা থেকে বাংলাদেশি ও পাকিস্তানি বংশদ্ভুত বিলেতি, মার্কিন ও ক্যানাডিয়ান তরুণ নাগরিকরা পরিবার, বন্ধুবান্ধব ও প্রশাসনের নাকের ডগায় তুরস্ক হয়ে দায়েশে গিয়ে হাজির হয়। পরে আরও অনেক জায়গা থেকে মানুষ এসে ইসলামিক স্টেটের জনসংখ্যা বাড়াতে থাকে। আর সেই সাথে চলতে থাকে অভিযান, খুন আর ধর্ষণের মাধ্যমে খেলাফতের আয়তন বাড়ানো। বাইরে থেকে সেখানে আগত তরুণীদেরকে আইএস তরুণদের সাথে বিয়ে দিয়ে দেয়া হয়। তবে পাশাপাশি ইয়াজিদি দাসীদের ধর্ষণ চলতে থাকে।

২০১৪ সালেই যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ইরাক ও সিরিয়ায় আইএসের বিরুদ্ধে বিশাল অভিযান শুরু করা হয়। এতে ইরাকের অঞ্চলে জঙ্গি সংঘটনটি ব্যাপক এলাকা হারিয়ে ফেলে। কিন্তু সিরিয়ার আলেপো এবং রাক্কায় তাদের ঘাটি আরও শক্ত হয়। ২০১৫ সালে তারা অন্ততপক্ষে আরও আটটি দেশে তাদের বিভিন্ন শাখা স্থাপন করতে সক্ষম হয়। সেগুলোর মাধ্যমে ইসলামিক স্টেট তার খেলাফতের সীমানার বাইরেও অনেক আক্রমণ শুরু করে। একই বছরের অক্টোবর মাসে মিশরের আইসিস শাখা রুশের একটি বিমানকে বোমা মেরে সকল ২২৪ জন যাত্রিকে নিহত করে। নম্ভেম্বর মাসে ফ্রান্সের আইসিস শাখা প্যারিসে সন্মিলিত হামলা করে ১৩০ জনকে হত্যা করে এবং ৩০০ জনকে আহত করে। ২০১৬ সালের জুন মাসে যুক্তরাষ্ট্রে আইসিসের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করা এক ব্যক্তি ফ্লোরিডায় একটি সমকামীদের নাইটক্লাবে গুলি চালিয়ে অন্তত চার ডজন মানুষকে খুন করে।

তবে দায়েশের বিরুদ্ধে ইরাকের নেতৃত্বে আভিযান চলতে থাকে এবং ২০১৭ সালের ডিসেম্বর নাগাদ জঙ্গি সংঘটনটি ইরাক ও সিরিয়া মিলে তার ৯৫ শতাংশ এলাকা হারিয়ে ফেলে। ইরাকে আইএসের বিরুদ্ধে জয় ঘোষণা করা হলেও তারা সারা দুনিয়াতে কিছু মানুষদের অনুপ্রাণিত করে বিভিন্ন আক্রমণ চালিয়ে যেতে সক্ষম হতে থাকে, উদাহরণ স্বরূপ নিউইয়র্ক শহরে। আইসিসকে নির্মূল করে দেয়ার জন্য ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে “সিরিয়ান ডেমোক্র্যাটিক ফোর্সেস” নামের একটি সামরিক বাহিনী সিরিয়ায় আইএসের অবশিষ্ট ঘাটিগুলোতে অভিযান চালায়। হাজিন নামের একটি শহর জঙ্গিদের কাছ থেকে নিয়ে নেয়ার পর তাদের দখলে বাকি থাকে ইরাকের সীমান্তে ইউফ্রেটিস নদীর তীর ঘেঁষে কিছু গ্রাম।

২০১৮ সালের ১৯ ডিসেম্বর তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডনাল্ড ট্রাম্প আইসিসের বিরুদ্ধে জয় ঘোষণা করলেও পরের বছর সিরিয়ান ডেমোক্র্যাটিক ফোর্সেস সিরিয়ার বাঘুজ নামের একটি স্থানে আইএসের শেষ ঘাটিটিতে আক্রমণ চালায়। সেই বছরের ২৩ মার্চে সামরিক বাহিনীটি বাঘুজকে ফিরিয়ে নিতে সক্ষম হয় এবং তারপর খেলাফতের আর কোনো অবশিষ্ট স্থান বলে কিছু বাকি থাকেনি। সকল জঙ্গি ও তাদের পরিবারগুলো গণহারে আত্মসমর্পণ করে। ২০১৯ সালের ২৬ অক্টোবরে সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলে একটি মার্কিন অভিযানে ইসলামিক স্টেটের নেতা আবু বাকর আল বাগদাদিকে হত্যা করে ইতিহাসের এই বিভৎস অধ্যায়ের আপাত ইতি টেনে আনা হয়।

তাহলে এবার আসি বাংলাদেশের প্রসঙ্গে। দেশটির অগারাম গণমাধ্যম মধ্যপ্রাচ্যে ঘটে যাওয়া এত বড় একটা ক্যান্সারের ফিরিস্তি জনগনের কাছে তুলে ধরতে প্রয়োজন বোধ করেনি। দেশের মানুষ এই বিষয়ে কিছুই জানতে পারেনি। ছিটেফোঁটা যা জেনেছে তা সম্ভব হয়েছে মুমিনদের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মিথ্যা প্রচারণার মাধ্যমে। প্রথমে কারো কারো মুখে শুনেছি আল-কায়দার মতো ইসলামিক স্টেটকেও আমেরিকা তৈরি করে দিয়েছে মুসলমানদের মানহানি করা জন্য। আমি আরও আশ্চর্য হয়েছি এটা দেখে যে আইএস মানে যে “ইসলামিক স্টেট” সেটাও মানুষের অগোচরে আসেনি। এই সুযোগে অনেকে বলতে শুরু করেছিল আইএস মানে “ইসরায়েলি স্টেট”। ইহুদিরাই এই জঙ্গি সংঘটন তৈরি করে দিয়েছে ইসলামের নামে সন্ত্রাসবাদ ছড়ানোর জন্য।

তার উপর মুসলমানরা কখনও এই ধরণের কাজ করতে পারে না – এই জাতীয় প্রলাপ বাংলাদেশের জনগনকে আইএসের ব্যাপারে পাত্তা না দিতে সহায়তা করেছে। ইসলাম সন্ত্রাসবাদ সমর্থন করে না ইত্যাদি বক্তৃতা বহু পুরানো। তবে কোরআন ও হাদিসেই যে খেলাফত সৃষ্টি ও তার (বর্বর) মাধ্যমের সকল উৎপত্তি খুঁজে পাওয়া যায়, বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ সেই বাস্তবতার সাথে এখনো পরিচিত হয়নি।

তথ্য সূত্রঃ উইকিপিডিয়া এবং Wilson Center.

দারিদ্র ও দাসত্ব বনাম জালেম ও পরগাছাবৃন্দ

রিয়াজ ওসমানী

৬ জুলাই ২০২১

বাংলাদেশের পুঁথিগত মুখস্ত বিদ্যা এবং বিভিন্ন পেশা দেশের মানুষদেরকে কোন ধরণের জ্ঞান দান করেছে তা আমার বোধগম্য নয়। কয়েক দিন পরপরই শুনতে পাই গৃহকর্মীকে নির্যাতন করার জন্য আইনজীবী বা ডাক্তার গ্রেফতার। অভিযুক্তদের পেশা অবশ্য এখানে মুখ্য বিষয় নয়। তবুও শিক্ষার আদলে প্রতিষ্ঠিত পেশাজীবীরাও যখন এই সব কাজে লিপ্ত হয়, তখন প্রশ্ন জাগতেই পারে যে এদের শিক্ষার আলো কতটুকু ছিল।

ঠিক এরকম আরো ঘটনার খবর সামাজিক মাধ্যমের যুগে বেড়িয়ে আসছে যার একই রকম পুরানো ঘটনাগুলো বিগত দশকের পর দশক ছিল ধামাচাপা দেয়া। নিজের চোখে দেখেননি এগুলো? নিজেও এতে কখনো অংশগ্রহণ করেননি? এই অবস্থাটি যে বাংলাদেশের সমাজের আরেকটি ক্যান্সার সেটা উপলব্ধি করার ক্ষমতা কি আপনাদের আছে? এগুলো চিরতরে বন্ধ করার দায়িত্ব যে আমাদের সবার সেই হুঁশ কি আপনাদের নেই? প্রতিবেশি হয়ে আমাদের সকলের দায়িত্ব কোথাও থেকে গৃহকর্মীদের আর্তনাদের আওয়াজ আসতে শুরু করলে ৯১১ নম্বরে যোগাযোগ করা, নিজের চোখে গৃহকর্মীদের গায়ে খতের দাগ দেখলে মোবাইলের মাধ্যমে তা কতৃপক্ষের নজরে আনা। এবং এগুলো করতে হবে অত্যাচারকারীরা আপনার আপন পরিবারের মানুষজন হলেও।

সেই ছোট বেলা থেকেই দেখে এসেছি আমার আগের প্রজন্ম এবং তারও আগের প্রজন্মের মানুষরা কীভাবে অসহায় অবস্থায় কৃতদাস হিসেবে কাজ নেয়া গৃহকর্মীদেরকে (শিশু মেয়ে ও ছেলে থেকে শুরু করে বয়স্ক মহিলা পর্যন্ত) পান থেকে চুন খসার মত সামান্য অপরাধেই নির্মমভাবে প্রহার করেছে। সবার মধ্যেই ছিল এদের অসহায়ত্বের সুযোগ নেয়ার প্রতিযোগিতা। এদেরকে মানুষ হিসেবে গণ্য করার ক্ষমতা পরিবারের কারোরই ছিল না। অভিভাবকদের উদাহরণ দেখে দেখে মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত বাচ্চারা অনেকেই এই সব গৃহকর্মীদের সাথে ন্যূনতম শ্রদ্ধাবোধ রেখে কথা বলতে শিখতো না।

এই কাজের মানুষদের চরম দারিদ্রের কারণে এদেরকে বিনা বেতনেই রাখা যেত। মাথার উপর একটা ছাদ, থালায় একটু খাবার আর শোয়ার জন্য মেঝের উপর একটা মাদুর দিলেই এদেরকে ঝাঁকে ঝাঁকে পাওয়া যেত। এরাও তাদের নিয়তি মেনে নিয়ে ছাদ, থালা আর মাদুরের সাথে বিলি করে দেয়া সকল মানসিক ও শারীরিক অত্যাচার মেনে নিত।

আবার এটাও দেখতাম যে কোনো পরিবারে একটা কাজের মানুষ বেশি দিন থাকতে পারতো না। এই সব অত্যাচার সহ্য করার ক্ষমতা শেষ হয়ে যাওয়ার পর জান বাঁচানোর জন্যই তারা চলে যেত। ওমা! তখন দেখি সেই সব বাড়িতে খনিকের জন্য রান্নাঘরে ভাত বসতো না, বাড়িঘর পরিষ্কার হতো না, কাপড়-চোপড় ধোয়া হতো না ইত্যাদি। অর্থাৎ জালেমরা যাদের সাথে দিনরাত অবাঞ্ছিত কুকুরের মতো ব্যবহার করতো, সেই কুকুরদেরই উপর তারা আবার পরগাছা হয়ে বাস করতো। দাসদের সেবা ছাড়া এনারা যেন নিশ্বাসও নিতে পারতো না।

আমি মনে প্রাণে কামনা করছি যে আমাদের দেশের অর্থনৈতিক উন্নতির সাথে সাথে এমন একটা সময় আসবে যখন গৃহকর্ম করতে ইচ্ছুক এরকম একটা মানুষও খুঁজে পাওয়া যাবে না। সবাই পোশাক শিল্প বা অন্য কোথাও আত্মমর্যাদা নিয়ে কাজ করে বেঁচে থাকতে পারবে। আমাদের মাঝে সকল পরগাছারাও দাসদের উপর নির্ভরশীল না হয়ে নিজের ঘর গোছানো ও পরিষ্কার করা, কাপড় ধোয়া, এমন কি নিজের রান্নার কাজটাও শিখে নেবে৷ এবং সেখানে নারী ও পুরুষ বলতে পৃথক কিছু থাকবে না। সবাই রোজকার করবে আবার সমান ভাগে সংসারের কাজও সেরে নেবে। এই সমাজ না আসা পর্যন্ত “উন্নত দেশ” কথাটা বাংলাদেশের বেলায় খাটানো যাচ্ছে না।

*********************

ইসরায়েলের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করার সময় এসেছে কি?

রিয়াজ ওসমানী

৩ জুন ২০২১

বাংলাদেশের রাজনীতিবীদ এবং আমজনতাকে এই বিষয়টা নিয়ে এক সময়ে নতুন করে ভাবতে হবেই। তবে সেই সময়টা এখন এসেছে কি না সেটা নিয়ে তর্ক বিতর্ক থাকতেই পারে। ফিলিস্তিনিদের প্রতি অঢেল সংহতির মধ্যে দোষের কিছু নেই। কিন্তু ৭১ সালে বাংলাদেশের প্রতি ইসরায়েলের ইতিবাচক ভূমিকা আমরা কি উপেক্ষা করতে পারি? আবার সেটারই অপর পৃষ্ঠে আমরা দেখি যে বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রতি আরব দুনিয়ার কোনো সমর্থন ছিল না। আমরা তাহলে কাদের অনুসরণ করে চলি? আমরা কাদের খুশি করার চেষ্টায় লিপ্ত? ইসরায়েলের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করে ফিলিস্তিনিদের বিষয়ে ইসরায়েলকে চাপ দেয়ার ক্ষমতা আমরা কি কল্পনা করতে পারি না? সবচেয়ে প্রথমে আমাদের মধ্য থেকে যেটা দূর করতে হবে সেটা হচ্ছে ইহুদি বিদ্বেষ। মুসলমান বিদ্বেষের চেয়ে সেটা কি ভিন্ন?