
রিয়াজ ওসমানী
২৩ মে ২০২২
বাংলাদেশের কিছু সমকামী ব্যক্তি তাদের অধিকারকে মূলত সমলিঙ্গের মানুষের মধ্যে বিবাহের স্বীকৃতি ও আইনগত বৈধতা হিসেবে ব্যাখ্যা করে। আমি বলব — বাংলাদেশে সমলিঙ্গের বিবাহের প্রশ্ন উত্থাপন করার সময় এখনো আসেনি।
বরং, আমাদের মনোযোগ দেওয়া উচিত এই বিষয়গুলোতে: ১) বাংলাদেশের সংবিধানের ২৮ নম্বর অনুচ্ছেদকে সম্প্রসারিত করে সেখানে “যৌন অভিমুখিতা” এবং “লিঙ্গ পরিচয়”কে অন্তর্ভুক্ত করা — যেই মানদণ্ডগুলোর ভিত্তিতে রাষ্ট্র কারো বিরুদ্ধে বৈষম্য করতে পারবে না; ২) দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারা বাতিল বা সংশোধন করা; এবং ৩) দৃশ্যমানতার মাধ্যমে — অনলাইনে এবং ব্যক্তিগত যোগাযোগের ভেতর দিয়ে — আমাদের অবদান, অধিকার এবং অস্তিত্ব সম্পর্কে জনসাধারণের (এবং আমাদের নিজেদের সম্প্রদায়ের মধ্যে) ইতিবাচক মনোভাব গড়ে তোলা (যদিও একটি মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে এটি পাহাড় সরানোর চেয়েও কঠিন হতে পারে)। এই লক্ষ্যগুলো অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত সমলিঙ্গের বিবাহ নিয়ে আলোচনা করাটা আগাম ও অকালপক্ব।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও রয়েছে। বাংলাদেশে বিবাহ সম্পর্কিত রাষ্ট্রীয় নীতিমালাগুলো মূলত ধর্মীয় বিধানগুলোর সীমার ভেতরেই আবদ্ধ। অধিকাংশ নাগরিকের ক্ষেত্রে বিবাহ পরিচালিত হয় তাদের নিজ নিজ ধর্মীয় ব্যক্তিগত আইনের অধীনে — মুসলিম পারিবারিক আইন, হিন্দু প্রথা, বা খ্রিস্টীয় বিবাহ আইন, ১৮৭২ — এবং তা একজন পুরুষ ও একজন নারীর মধ্যকার বন্ধনেই সীমাবদ্ধ।
ধর্মীয় মতবাদকে পরিবর্তন করার চেষ্টা সময়ের অপচয় বৈকি। তা না করে আমরা বরং অন্য দিকে মনোযোগ দেই। বাংলাদেশে কাগজে-কলমে একটি ধর্মীয় আচারবিহীন বিকল্প রয়েছে: বিশেষ বিবাহ আইন, ১৮৭২ — উপনিবেশিক আমলের একটি আইন, যা সরকার-নিযুক্ত একজন বিবাহ নিবন্ধকের মাধ্যমে কোনো ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াই একজন পুরুষ ও একজন নারীর মধ্যে বিবাহ সম্পন্ন করার সুযোগ দেয়, এমনকি ভিন্ন ধর্মাবলম্বী বা কোনো ধর্মে বিশ্বাসী নয় — এমন ব্যক্তিদের মধ্যেও। নীতিগতভাবে, এটি ঠিক সেই ধরনের দেওয়ানি বিবাহব্যবস্থা, যার দাবি তোলা যেতে পারে। কিন্তু বাস্তবে এটি একটি জরাজীর্ণ পুরোনো কাঠামো, যার জরুরি সংস্কারের প্রয়োজন।
এই আইনের অধীনে এখনো এমন শর্ত রয়েছে যে স্বীকৃত কোনো ধর্ম (ইসলাম, খ্রিস্টধর্ম, হিন্দুধর্ম ইত্যাদি) অনুসরণকারী ব্যক্তিরা এই আইনের অধীনে বিবাহ করতে চাইলে আনুষ্ঠানিকভাবে তাদেরকে সেই ধর্ম ত্যাগের ঘোষণা দিতে হয়। ভারত একই উপনিবেশিক কাঠামো থেকে উঠে এসে ১৯৫৪ সালে নিজেদের সংস্কার করার সময় এই শর্তটি বাতিল করে। বাংলাদেশ তা কখনো করেনি।
এই আইনের অধীনে তালাকের বিষয়টি এখনো বিবাহ বিচ্ছেদ আইন, ১৮৬৯-এর মাধ্যমে পরিচালিত হয়, যেখানে স্বামী ও স্ত্রীর জন্য অসম ভিত্তি নির্ধারিত রয়েছে। এটি এমন একটি বিধান, যা বাংলাদেশের নিজস্ব আইন কমিশন পর্যন্ত সংবিধানের সমতার নিশ্চয়তার সঙ্গে অসঙ্গত বলে চিহ্নিত করেছে।
আইনটির ভাষা সম্পূর্ণভাবে “স্বামী” ও “স্ত্রী” — এই পরিভাষার মধ্যে সীমাবদ্ধ এবং এতে কোনো লিঙ্গ-নিরপেক্ষ কাঠামো নেই। ধর্মত্যাগের শর্ত এবং জটিল প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার কারণে ধর্মীয় বিবাহের তুলনায় এই আইনটি অপ্রচলিত এবং খুব কম ব্যবহৃত। ফলে এই ব্যবস্থাটি পুরোনো, নিরুৎসাহজনক এবং বাস্তব প্রয়োজনের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
সুতরাং প্রথম পদক্ষেপ হওয়া উচিত বিশেষ বিবাহ আইনকে সংস্কার ও আধুনিকায়ন করা — ধর্মত্যাগের শর্ত অপসারণ করা, তালাক সংক্রান্ত বিধানগুলোকে সংবিধানসম্মত সমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা, এবং পুরো প্রক্রিয়াটিকে বাস্তবিক অর্থে সহজলভ্য করা, যাতে ভিন্ন ধর্মাবলম্বী বা কোনো ধর্মে বিশ্বাসী নয় — এমন মানুষরা প্রতীকী বা প্রশাসনিকভাবে অপদস্ত হওয়া ছাড়াই সমান মর্যাদায় বিবাহ করতে পারে।
এই সংস্কারের নিজস্ব গুরুত্বও রয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে ভিন্ন ধর্মাবলম্বী ব্যক্তি বা নাস্তিকদেরকে শুধুমাত্র বিবাহ করার জন্য এমন একটি ধর্মে ধর্মান্তরিত হওয়ার মতো চরম পদক্ষেপ নিতে হবে না, যেটিতে তারা বিশ্বাসই করে না। কেবলমাত্র বিবাহের জন্য নিজের বিশ্বাসবিরুদ্ধ ধর্মীয় রূপান্তর হতে বাধ্য হওয়াটা অমানবিক।
পাশ্চাত্য বিশ্বে ধর্মীয় আচারবিহীন বিবাহ নতুন কিছু নয়, এবং বাংলাদেশেও তা একটি কঙ্কালসার রূপে উপস্থিত। বিপ্লবাত্মক বিষয়টি হবে এটিকে কার্যকর করা, অর্থাৎ দৃশ্যমান, মর্যাদাপূর্ণ এবং সমানভাবে সবার জন্য তাকে প্রযোজ্য করা। একটি সংস্কারকৃত বিশেষ বিবাহ আইন ধর্মীয় বিবাহ ব্যবস্থায় কোনো হস্তক্ষেপ করবে না। এটি কেবল তাদেরই জন্য একটি আলাদা পথ তৈরি করবে, যারা ধর্মীয় সীমার ভেতরে বিবাহ করতে পারে না বা করতে চায় না, কিন্তু একে অপরকে ভালোবাসে এবং একসঙ্গে জীবন গড়তে চায় — যাতে তাদের অঙ্গীকারকে রাষ্ট্র সমান মর্যাদায় স্বীকৃতি দিতে পারে।
এই সংস্কার অর্জনের পরেই সমলিঙ্গের বিবাহের প্রশ্ন উত্থাপন করা যেতে পারে — তার আগে নয়। বাংলাদেশ এখনো রাষ্ট্র-পরিচালিত দেওয়ানি বিবাহের ধারণাকে সেই পুরুষ-নারী কাঠামোর বাইরে সম্প্রসারিত করেনি, যা ১৮৭২ সাল থেকেই বাস্তবতা হিসেবে গেঁথে আছে।
যদি বিশেষ বিবাহ আইনকে প্রথমে আধুনিক ও কার্যকর করা যায়, তাহলে তার পরবর্তীতে আরও কঠিন আলোচনাটি — অর্থাৎ এই একই দেওয়ানি কাঠামোকে “লিঙ্গ” ও “লিঙ্গ পরিচয়ের” ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ করা, যাতে সমকামী, রূপান্তরকামী, আন্তঃলিঙ্গ এবং অদ্বৈত ব্যক্তিরা ধর্মীয় মতবাদ বা পুরুষ-নারী দ্বৈততার পরিবর্তে নিজেদের স্ব-নির্ধারিত পরিচয়ের ভিত্তিতে বিবাহ করতে পারে — তা কল্পনাযোগ্য হয়ে উঠবে।
তার আগে পর্যন্ত এটি এমন একটি প্রস্তাবনা, যার দাঁড়িয়ে থাকার মতো কোনো আইনগত ভিত্তি নেই।
******************************