
রিয়াজ ওসমানী
২০ জুলাই ২০২৬
১৯৭১ সালে বাংলাদেশ কেন পৃথিবীর অন্যতম চরম দরিদ্র অঞ্চল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল? একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা শুরুতেই বলে নেওয়া দরকার: আজকের বাংলাদেশ মোটেও সেই অবস্থায় নেই।
এই বাস্তবতার পেছনে ছিল তিনটি প্রধান কারণ:
১) দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সম্পদ নিঃশেষ — (বিলেতি শাসন, ১৭৫৭–১৯৪৭)
বিলেতি শাসনের আগে বাংলা বা বঙ্গ, যার মধ্যে আজকের বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ অন্তর্ভুক্ত, ছিল পৃথিবীর অন্যতম সমৃদ্ধ ও শিল্পোন্নত অঞ্চল। বিশেষ করে মসলিনসহ সূক্ষ্ম বস্ত্রশিল্প এবং কৃষিজ উদ্বৃত্তের জন্য এই অঞ্চল বিশ্বজুড়ে পরিচিত ছিল। কিন্তু প্রায় দুই শতকের বিলেতি শাসন এই শক্তিশালী অর্থনৈতিক কাঠামোকে উল্টে দেয়।
- শিল্পহ্রাস: বিলেতিরা এমন বাণিজ্যনীতি প্রয়োগ করে, যার ফলে স্থানীয় শিল্প ধীরে ধীরে ধ্বংস হয়ে যায়। উদ্দেশ্য ছিল স্পষ্ট — যুক্তরাজ্যের ল্যাঙ্কাশায়ারের তুলা কলগুলোর জন্য প্রতিযোগিতা সরিয়ে দেওয়া। এর ফলে বাংলা একটি শিল্পসমৃদ্ধ অঞ্চল থেকে কাঁচামাল রপ্তানিনির্ভর প্রান্তিক অর্থনীতিতে পরিণত হয়।
- রাজস্ব নিঃশেষ: ১৭৯৩ সালের স্থায়ী বন্দোবস্তের মতো ব্যবস্থার মাধ্যমে জমি থেকে সর্বোচ্চ রাজস্ব আদায় নিশ্চিত করা হলেও গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে কোনো গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। এর ফলে অঞ্চলটি ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে — যার সবচেয়ে নির্মম উদাহরণ ১৯৪৩ সালের বঙ্গদুর্ভিক্ষ।
২) পদ্ধতিগত শোষণ — (পাকিস্তানি শাসন, ১৯৪৭–১৯৭১)
১৯৪৭ সালে বিলেতি শাসনের অবসানের পরও পূর্ব বাংলার জন্য প্রকৃত অর্থে পুনরুদ্ধার ঘটেনি। পাকিস্তান রাষ্ট্রের অধীনে এই সময়কাল কার্যত এক ধরনের অভ্যন্তরীণ উপনিবেশে পরিণত হয়। পশ্চিম ও পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশের) মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য ছিল স্পষ্ট এবং ইচ্ছাকৃত।
- পাটের সম্পদ সরিয়ে নেওয়া: পূর্ব পাকিস্তানের “সোনালী আঁশ” পাট ছিল পুরো দেশের প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের উৎস। কিন্তু এই আয়ের বড় অংশ পশ্চিম পাকিস্তানের শিল্পায়ন এবং নতুন রাজধানী ইসলামাবাদ নির্মাণে ব্যয় করা হয়।
- সম্পদ বণ্টনের বৈষম্য: বৈদেশিক সাহায্য ও কেন্দ্রীয় উন্নয়ন বাজেটের বড় অংশ (অনেক ক্ষেত্রে প্রায় ৭০ শতাংশ পর্যন্ত) পশ্চিম পাকিস্তানে বরাদ্দ দেওয়া হতো, যদিও জনসংখ্যার বড় অংশ ছিল পূর্ব পাকিস্তানে। পূর্বাঞ্চল তুলনামূলকভাবে খুবই কম অংশ পেত।
৩) তীব্র ভৌত আঘাত — (১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ)
নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধ শুধু বিপুল প্রাণহানিই ঘটায়নি — এটি রাষ্ট্রের ভৌত ও অর্থনৈতিক ভিত্তিকে সম্পূর্ণভাবে ভেঙে দেয়।
- অবকাঠামোর ধ্বংস: যুদ্ধের সময়ে পরিবহন ব্যবস্থা এবং চট্টগ্রাম বন্দর মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পাকিস্তানি সামরিক আক্রমণ, মুক্তিবাহিনী দ্বারা পাকিস্থানিদের সরবরাহ লাইন ভেঙে দেওয়ার অভিযান, এবং শেষ পর্যায়ে ভারতীয় নৌ অবরোধ — সব মিলিয়ে এই ধ্বংস আরও তীব্র হয়।
- আর্থিক ও মানবসম্পদের পতন: ব্যাংকিং ব্যবস্থা কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ে, মুদ্রা অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে, এবং ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে পরিকল্পিতভাবে বুদ্ধিজীবী, পেশাজীবী ও দক্ষ জনশক্তিকে হত্যার ফলে নতুন রাষ্ট্রটি এক গভীর প্রাতিষ্ঠানিক শূন্যতায় পড়ে যায়।
পর্যবেক্ষণ
১৯৭১ সালে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকেরা যখন নবগঠিত বাংলাদেশকে উন্নয়নের দিক থেকে একটি তলাবিহীন ঝুড়ি হিসেবে দেখেছিল — সেটি কোনোভাবেই দেশের মানুষের সক্ষমতার অভাবের কারণে ছিল না। বরং কারণ ছিল এই যে, আধুনিক ইতিহাসে খুব কম দেশই এমন এক ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে নতুন করে রাষ্ট্র গঠন করতে বাধ্য হয়েছে — যা ধারাবাহিক শাসন, বৈষম্যমূলক নীতি, যুদ্ধ এবং কিছু প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে প্রায় সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছিল।