রিয়াজ ওসমানী

২ আগষ্ট ২০২৬

একজন মানুষের “জৈবিক লিঙ্গ” মূলত তার ক্রোমোজোম, হরমোন এবং জন্মগত শারীরিক বৈশিষ্ট্যের ওপর নির্ভর করে। সমাজ এবং আইনের ভাষায় এটাকে “লিঙ্গ” বলা হয়। এছাড়াও রয়েছে তার “লিঙ্গ পরিচয়” — অর্থাৎ নিজের গভীরতম ভেতর থেকে (অনেক সময় শৈশব থেকেই) সে নিজেকে পুরুষ, নারী বা অন্য কোনো পরিচয়ে কীভাবে উপলব্ধি করে।

অধিকাংশ মানুষের ক্ষেত্রে, অর্থাৎ সিসজেন্ডারদের ক্ষেত্রে, এই দুটি বিষয় এক হলেও, কিছু মানুষের ক্ষেত্রে এই দুটি সম্পূর্ণ বিপরীত হতে পারে। এই মানুষগুলো হলো আমাদের রূপান্তরকামী বা ট্রান্সজেন্ডার বন্ধুরা। এই অসামঞ্জস্যতার কারণে তাদের মনে “জেন্ডার ডিসফোরিয়া” নামক একটি গূঢ় মানসিক অবস্থার সৃষ্টি হয়। এই অবস্থাটি অনেকের ক্ষেত্রেই মানসিকভাবে পঙ্গু করে দেয়ার মতো।

আরেক ধরনের মানুষ আছে, যারা জেন্ডার ডিসফোরিয়ার কারণে, তাদের জৈবিক লিঙ্গ যাই থাকুক না কেন, নিজেদের ভেতর থেকে কখনোই অনুভব করতে পারে না যে তারা পুরুষ বা নারী। তারা আমাদের “অদ্বৈত” বা “নন-বাইনারি” বন্ধুরা, এবং তাদের লিঙ্গ পরিচয়ও “নন-বাইনারি”।

একজন মানুষ মায়ের গর্ভে থাকাকালীন সময়ে তার মস্তিষ্কের গঠন এবং তার বাহ্যিক বা শারীরিক অঙ্গসংস্থানের মধ্যে সৃষ্টি হওয়া এক গভীর ও বাস্তব অমিল থেকেই এই জেন্ডার ডিসফোরিয়ার উৎপত্তি। আসুন এবার এর গভীরে চলে যাই।


আমরা সাধারণ চোখে যা দেখি, প্রকৃতি সবসময় অতটা সহজ নয়। আমরা সাধারণত ভাবি, একটি শিশু ছেলে বা মেয়ে হয়ে জন্ম নেওয়া মানেই তার শরীর আর মন জন্ম থেকেই একই রকম হবে। কিন্তু বিজ্ঞান বলে, আমাদের শরীরের গঠন আর আমাদের মনের গঠন দুটো আলাদা সময়ে, আলাদা উপায়ে তৈরি হয়।

যখন এই দুইয়ের মাঝে মিল থাকে না, তখনই জন্ম নেয় এক গভীর মানসিক দ্বন্দ্ব। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এটাকে বলা হয় জেন্ডার ডিসফোরিয়া। কিন্তু এটি আসলে কী এবং কেন হয়? আসুন কোনো কঠিন ডাক্তারি শব্দ ছাড়াই একটি সহজ গল্পের মাধ্যমে বিষয়টি বুঝি।

গর্ভাশয়ের ভেতর দুটি ভিন্ন সময় বা ধাপ

একটি শিশু যখন তার মায়ের গর্ভে বেড়ে ওঠে, তখন তার শরীর কিন্তু এক মুহূর্তে তৈরি হয়ে যায় না। এটি ধাপে ধাপে তৈরি হয়। এই যাত্রায় দুটি প্রধান ধাপ আছে:

  • প্রথম ধাপ: শরীরের গঠন (গর্ভধারণের প্রথম ৩ মাস) – গর্ভাবস্থার প্রথম দিকে শিশুর বাহ্যিক অঙ্গ বা শরীরের গঠন তৈরি হয়। সাধারণ নিয়মে, ক্রোমোজোমের সংকেত অনুযায়ী শরীর ঠিক করে শিশুটি ছেলে হবে না মেয়ে হবে। এই ধাপটি খুব দ্রুত এবং গর্ভাবস্থার একেবারে প্রথম দিকেই শেষ হয়ে যায়।
  • দ্বিতীয় ধাপ: মস্তিষ্কের গঠন (গর্ভধারণের পরবর্তী সময়) – শিশুর বাহ্যিক অঙ্গ তৈরি হয়ে যাওয়ার বেশ কয়েক মাস পর শুরু হয় মস্তিষ্কের সূক্ষ্ম তারগুলো সাজানোর কাজ। গর্ভাবস্থার দ্বিতীয় ও তৃতীয় ট্রাইমিস্টারে মস্তিষ্কের যে অংশটি আমাদের ‘আমি কে’ বা আত্মপরিচয় নিয়ন্ত্রণ করে, সেটি তৈরি হতে থাকে। এই সময়ে মায়ের শরীরের হরমোনের মাত্রা শিশুর মস্তিষ্কের গঠনের ওপর বড় প্রভাব ফেলে।

যখন দুই ধাপের ঘড়ি দুই রকম চলে

সবকিছু স্বাভাবিকভাবে চললে, প্রথম ধাপে যে শরীর তৈরি হয়েছিল, দ্বিতীয় ধাপে গিয়ে মস্তিষ্কও সেই একই ছাঁচে তৈরি হয়। কিন্তু প্রকৃতি মাঝে মাঝে একটু ভিন্ন পথ ধরে।

যেহেতু শরীর তৈরির সময় এবং মস্তিষ্ক তৈরির সময় — এই দুটির মাঝে কয়েক মাসের ব্যবধান থাকে, সেহেতু মাঝের এই সময়ে যদি কোনো কারণ ঘটে (যেমন: হরমোনের মাত্রায় সাময়িক পরিবর্তন, জেনেটিক প্রভাব বা কোষের বার্তা গ্রহণের ভিন্নতা), তাহলে একটি বিশেষ ঘটনা ঘটে: শরীর একভাবে গড়ে ওঠে, আর মস্তিষ্কের ভেতরের মানচিত্রটি অন্য মানসিকতার ছাঁচে তৈরি হয়ে যায়।

সহজ কথায়: একজন শিশু হয়তো জন্ম নিল একটি ছেলের শরীর নিয়ে (কারণ প্রথম ৩ মাসে তার অঙ্গ সেই ছাঁচেই তৈরি হয়ে গিয়েছিল)। কিন্তু গর্ভাবস্থার শেষের দিকে তার মস্তিষ্কের ভেতরের আত্মপরিচয়ের অংশটি গড়ে উঠল একজন মেয়ের মানসিকতার ছাঁচে — অথবা দুটোই ঠিক উল্টোটি।

শিশুটির যখন বয়স বাড়ে, সে অনুভব করতে শুরু করে যে তার চারপাশের মানুষ তাকে যে নামে ডাকছে বা যে পোশাকে দেখতে চাইছে, তার আসল সত্তা বা মনের ভেতরের মানুষটি তার থেকে একেবারেই আলাদা। নিজের শরীরের সাথেই নিজের মনের এই যে অমিল এবং তার থেকে তৈরি হওয়া তীব্র মানসিক কষ্ট — এটাই হলো জেন্ডার ডিসফোরিয়া।

এটি কোনো ইচ্ছা, শখ বা বিলাসিতা নয়

বিজ্ঞান স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, এটি কেবল মনগড়া কোনো ভাবনা বা হঠাৎ জেগে ওঠা বায়না নয়। নিউরোসাইন্সের গবেষণাগুলোতে দেখা গেছে, যাদের জেন্ডার ডিসফোরিয়া রয়েছে, তাদের মস্তিষ্কের গঠন ও কার্যপ্রণালী তাদের জন্মগত শরীরের চেয়ে তাদের মনের পরিচয়ের সাথেই বেশি মেলে। অর্থাৎ, এটি মায়ের গর্ভে থাকার সময় মস্তিষ্কের স্বাভাবিক গঠনেরই একটি জৈবিক ভিন্নতা।


স্বচ্ছতার খাতিরে বলে দেয়া যাচ্ছে যে এই নিবন্ধটির বেশির ভাগই জেমিনি দ্বারা রচিত।

গ্রন্থপঞ্জি

  1. Swaab, D. F. (2007). Sexual differentiation of the human brain: Relevance for gender identity, transsexualism and sexual orientation. মানবের মস্তিষ্কের যৌনভিত্তিক ভিন্নতা: লিঙ্গ পরিচয়, ট্রান্সসেক্সুয়ালিজম এবং যৌন অভিমুখিতার ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব। সারসংক্ষেপ: এই গবেষণাপত্রে ড. সোয়াব ব্যাখ্যা করেছেন কীভাবে গর্ভাবস্থায় শরীরের অন্যান্য অঙ্গ এবং মস্তিষ্কের বিকাশ দুটি ভিন্ন সময়ে ঘটে। গর্ভকালীন হরমোনের প্রভাব কীভাবে মানুষের জেন্ডার আইডেন্টিটি বা আত্মপরিচয় গঠনে স্থায়ী ছাপ ফেলে, তা এতে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।
  2. Bao, A. M., & Swaab, D. F. (2011). Sexual differentiation of the human brain: Relation to gender identity and sexual orientation. মানবের মস্তিষ্কের যৌনভিত্তিক ভিন্নতা: লিঙ্গ পরিচয় এবং যৌন অভিমুখিতার সাথে এর সম্পর্ক। সারসংক্ষেপ: এই গবেষণায় মস্তিষ্ক গঠনের জৈবিক প্রক্রিয়াগুলোর ওপর আলোকপাত করা হয়েছে। এতে দেখানো হয়েছে যে গর্ভস্থ ভ্রূণের জিনগত বৈশিষ্ট্য এবং হরমোনের তারতম্য কীভাবে পরবর্তীতে একজন মানুষের মন ও শরীরের পরিচয়ের মধ্যে অমিল বা জেন্ডার ডিসফোরিয়া তৈরি করতে পারে।
  3. Zhou, J. N., Hofman, M. A., Gooren, L. J., & Swaab, D. F. (1995). A sex difference in the human brain and its relation to transsexuality. মানুষের মস্তিষ্কে লিঙ্গভিত্তিক পার্থক্য এবং ট্রান্সসেক্সুয়ালিটির সাথে এর সম্পর্ক। সারসংক্ষেপ: এটি একটি যুগান্তকারী গবেষণা, যেখানে প্রথমবার পোস্ট-মর্টেম পরীক্ষার মাধ্যমে মস্তিষ্কের ‘BSTc’ নামক একটি বিশেষ অংশের আকার ও গঠন পর্যবেক্ষণ করা হয়। এতে দেখা যায়, ট্রান্স নারীদের মস্তিষ্কের ওই নির্দিষ্ট অংশের গঠন জন্মগত নারীদের মস্তিষ্কের মতোই।
  4. Endocrine Society Clinical Practice Guideline (2017). Endocrine Treatment of Gender-Dysphoric/Gender-Incongruent Persons. জেন্ডার ডিসফোরিয়া বা জেন্ডার-ইনকনগ্রুয়েন্ট ব্যক্তিদের হরমোনজনিত চিকিৎসা সংক্রান্ত ক্লিনিকাল নির্দেশিকা। সারসংক্ষেপ: বিশ্বের অন্যতম প্রধান হরমোন বিশেষজ্ঞদের সংস্থা ‘এন্ডোক্রাইন সোসাইটি’র এই গাইডলাইনে জেন্ডার ডিসফোরিয়ার বৈজ্ঞানিক ও জৈবিক ভিত্তি স্বীকার করে এটি চিকিৎসা ও হরমোন থেরাপির আন্তর্জাতিক নিয়মাবলী নির্ধারণ করেছে।
  5. Kruijver, F. P., et al. (2000). Male-to-female transsexuals have female neuron numbers in a limbic nucleus. পুরুষ-থেকে-নারী ট্রান্সসেক্সুয়াল ব্যক্তিদের মস্তিষ্কের লিম্বিক নিউক্লিয়াসে নিউরনের সংখ্যা নারীদের অনুরূপ। সারসংক্ষেপ: ১৯৯৫ সালের গবেষণার ধারাবাহিকতায় তৈরি এই নিবন্ধ প্রমাণ করে যে মস্তিষ্কের গভীরে থাকা নির্দিষ্ট অংশের নিউরন বা স্নায়ুকোষের সংখ্যা জন্মগত শারীরিক লিঙ্গের চেয়ে ব্যক্তির নিজস্ব মানসিক জেন্ডার পরিচয়ের সাথে হুবহু মিলে যায়।

Leave a Reply