বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জাতীয় ঐকমত্য কমিশন ও রাজনৈতিক দলগুলোর অক্লান্ত পরিশ্রমের ফসল জুলাই সনদটি রাজনীতির ঊর্ধ্বে কারণ এখানে আমাদের দেশটাই প্রথম। জামায়াত-এনসিপিকে নির্বাচনে “না” বলেও, যেই জুলাই সনদে এনসিপি ও জামায়াতের অবদানটাই বেশি, সেই সনদটিকে কেন “হ্যাঁ” বলা যায় এবং উচিৎ, সেটা বুঝতে হলে অনুগ্রহ করে সনদটির অন্তর্ভুক্ত ধারাসমূহ ভালো করে জেনে ও বুঝে নিন। নিচে ধারাগুলো গুছিয়ে তালিকা করে দিলাম। কম পড়ুয়া নির্বাচকদেরকে কীভাবে এই সনদটির ধারাসমূহ ও গুরুত্বটি বোঝানো যায় তা আপনার ও আমার উপরে ছেড়ে দিলাম।
লেখাটি জেমিনির সহায়তায় রচিত এবং চ্যাটজিপিটি দ্বারা অনুবাদিত। তারপর আমার দ্বারা পরিমার্জিত। বিষয়বস্তুতে ভুলত্রুটি থাকলে জেমিনিকে ক্ষমা করবেন। জুলাই সনদে পৌঁছতে পারার জন্য আমি ব্যক্তিগতভাবে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন, সেটার সভাপতি ও উপসভাপতি এবং রাজনৈতিক দলগুলোকে আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। লেখাটির শেষের দিকে আমি জুলাই সনদকে কেন্দ্র করে বিএনপিকে নিয়ে কিছু কথা বলেছি যা অবহেলা করবার মতো নয়।
বাংলাদেশের জুলাই সনদে মোট ৮০টির বেশি প্রস্তাব বা অঙ্গীকার রয়েছে। এর মধ্যে ৩০টি হলো বাধ্যতামূলক বিষয়। এই বিষয়গুলো সংবিধান ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর নির্দিষ্ট সংস্কারের সঙ্গে যুক্ত। সনদটি ঘিরে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারিতে যেই গণভোটটি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, সেটাতে যদি জনগণের সম্মতি পাওয়া যায়, অর্থাৎ বেশির ভাগ নির্বাচক গণভোটে “হ্যাঁ” ভোট দেয়, তাহলে পরবর্তী নির্বাচিত সরকার আইনগতভাবে এসব সংস্কার বাস্তবায়নে বাধ্য থাকবে। নিচে এই ৩০টি বাধ্যতামূলক বিষয়ের তালিকা কার্যক্ষেত্র অনুযায়ী ভাগ করে দেওয়া হলো।
নির্বাহী বিভাগ ও নেতৃত্ব সংক্রান্ত সংস্কার
১. প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদের সীমা
একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ দুই মেয়াদ, অথবা মোট দশ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না।
২. দ্বৈত দায়িত্ব নিষিদ্ধ
প্রধানমন্ত্রী (নির্বাহী বিভাগের প্রধান) একই সঙ্গে নিজের দলের সভাপতির দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না, তবে সংসদের নেতা হয়ে থাকতে পারবেন।
৩. রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি
স্বাধীন কমিশনগুলোর, যেমন মানবাধিকার কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন ইত্যাদির প্রধান নিয়োগে রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ছাড়াই সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।
৪. রাষ্ট্রপতির রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা
রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব গ্রহণের সময়ে তিনি কোনো রাজনৈতিক দল এবং/অথবা রাষ্ট্রীয় বা সরকারি পদে থাকতে পারবেন না।
৫. স্বচ্ছ নিয়োগ পদ্ধতি
সংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধানদের নিয়োগ হবে দ্বিদলীয় বা স্বাধীন কমিটির মাধ্যমে, নির্বাহী আদেশে নয়।
সংসদ সংক্রান্ত সংস্কার
৬. দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ
জাতীয় সংসদ, যাকে নিম্নকক্ষ বলা হবে, তার পাশাপাশি ১০০ সদস্যের একটি উচ্চকক্ষ গঠন করা হবে।
৭. আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থা
উচ্চকক্ষের সদস্যরা নির্বাচিত হবেন সাধারণ নির্বাচনে নিম্নকক্ষে দলগুলোর মোট প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে।
৮. সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংস্কার
অর্থবিল ও আস্থাভোট ছাড়া অন্য সব বিষয়ে সংসদ সদস্যরা দলের বিপক্ষে ভোট দিতে পারবেন।
৯. বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার
সংসদের উপ-স্পিকার অবশ্যই বিরোধী দল থেকে নির্বাচিত হবেন।
১০. বিরোধী দলের কমিটি সভাপতিত্ব
গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতিদের একটি অংশ বিরোধী দল থেকে আসবে।
১১. নারী প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি
নিম্নকক্ষে নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসন বাড়িয়ে মোট ১০০ করা হবে, মোট আসন হবে ৪০০।
১২. নারী প্রার্থী কোটা
সরাসরি নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোকে অন্তত ৩৩ শতাংশ নারী প্রার্থী দিতে হবে।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা
১৩. বিচারক নিয়োগ কমিশন
সর্বোচ্চ আদালতের বিচারক নিয়োগের জন্য একটি স্বাধীন কমিশন গঠন করা হবে, যার উপর নির্বাহী বিভাগের কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকবে না।
১৪. প্রধান বিচারপতি নিয়োগ
আপিল বিভাগের সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ বিচারককে প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার ব্যবস্থা পুনর্বহাল হবে।
১৫. বিচার বিভাগের আর্থিক স্বাধীনতা
বিচার বিভাগের নিজস্ব বাজেট থাকবে, যা সর্বোচ্চ আদালত পরিচালনা করবে।
১৬. নিম্ন আদালতের পূর্ণ পৃথকীকরণ
নিম্ন আদালতকে আইন মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ থেকে সম্পূর্ণভাবে আলাদা করা হবে।
নির্বাচন ও রাষ্ট্র সংস্কার
১৭. নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার
জাতীয় নির্বাচনের জন্য সংবিধানে স্থায়ীভাবে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল করা হবে।
১৮. নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা
নির্বাচন কমিশনের পূর্ণ আর্থিক ও প্রশাসনিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হবে এবং কমিশনার নিয়োগের নতুন পদ্ধতি চালু হবে।
১৯. গণভোটের বিধান
ভবিষ্যতে বড় সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে জাতীয় গণভোট বাধ্যতামূলক করা হবে।
২০. গণঅভ্যুত্থানের স্বীকৃতি
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানকে রাষ্ট্রের ইতিহাসের একটি ভিত্তি হিসেবে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
জবাবদিহিতা ও নাগরিক অধিকার
২১. সামাজিক অধিকারের আইনি নিশ্চয়তা
রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতে থাকা শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসহ সামাজিক অধিকারগুলোকে মৌলিক অধিকারের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে, যাতে আদালতে এসব অধিকার দাবি করা যায়।
২২. ন্যায়পাল কার্যালয় সক্রিয়করণ
সরকারি মন্ত্রণালয় ও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তের জন্য ন্যায়পাল কার্যালয় কার্যকর করা হবে।
২৩. দুর্নীতি দমন কমিশন সংস্কার
সরকারের অনুমতি ছাড়াই মামলা করার ক্ষমতা দেওয়া হবে এবং বেসরকারি খাতেও এর এখতিয়ার বাড়ানো হবে।
২৪. স্বাধীন পুলিশ কমিশন
পুলিশের নিয়োগ, বদলি ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থার তদারকির জন্য একটি স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠন করা হবে, যাতে পুলিশের রাজনৈতিক অপব্যবহার বন্ধ হয়।
২৫. ডিজিটাল অধিকার সুরক্ষা
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা সীমিত করে এমন আইন বাতিল বা সংশোধন করা হবে (যেমন সাইবার নিরাপত্তা আইন)।
২৬. সম্পদের ঘোষণা
সব নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ও তাদের নিকটাত্মীয়দের সম্পদের বার্ষিক প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা হবে।
২৭. তথ্য অধিকার শক্তিশালীকরণ
সরকারি ব্যয় ও চুক্তি সংক্রান্ত তথ্য গোপন রাখার বাধা তুলে দেওয়া হবে।
ভাষা ও সংখ্যালঘু অধিকার
২৮. মাতৃভাষার স্বীকৃতি
বাংলা রাষ্ট্রভাষা থাকবে, তবে অন্যান্য সব আদিবাসী ভাষাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে মাতৃভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হবে।
২৯. সংখ্যালঘু সুরক্ষা কমিশন
জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষায় একটি স্থায়ী সংবিধানিক কমিশন গঠন করা হবে।
৩০. স্থানীয় সরকারের ক্ষমতায়ন
জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা হস্তান্তরের বাধ্যবাধকতা সংবিধানে যুক্ত করা হবে।
জুলাই সনদ ও এই সংক্রান্ত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)র আপত্তিসমূহ বা নোটস অফ ডিসেন্ট
বিএনপি জুলাই সনদের স্বাক্ষরকারী হলেও তারা বাধ্যতামূলক কয়েকটি ধারার বিরুদ্ধে তাদের আপত্তি নথিভুক্ত করেছে। ফলে তারা পরবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতায় এলে এই ধারাগুলো কীভাবে, বা আদৌ বাস্তবায়িত হবে কি না, তা নিয়ে আইনি ও রাজনৈতিক ধোঁয়াশা রয়ে গেছে।
১) তারা সবচেয়ে বড় আপত্তি এনেছে সংসদের উচ্চকক্ষের আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থা নিয়ে। সনদ যেখানে ভোটের অনুপাতে উচ্চকক্ষ গঠনের কথা বলছে, বিএনপি সেখানে আসনসংখ্যাভিত্তিক পদ্ধতি চায় যাতে বড় দল সুবিধা পায়, ছোট দলগুলো নয়। বিএনপি ক্ষমতায় এলে চেষ্টায় থাকতে পারে উচ্চকক্ষে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব স্থাপন না করতে।
২) তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বাছাই নিয়েও তাদের আপত্তি গুরুতর। একটি বিশেষ সংসদীয় দ্বিদলীয় কমিটি, প্রধান উপদেষ্টা বাছাইপর্বে চুড়ান্ত ব্যক্তিকে নিয়ে একমত হতে না পারলে সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে শেষ কথা বলার ক্ষমতা দেওয়ার বিএনপির পালটা প্রস্তাবটি হবু প্রধান উপদেষ্টার কার্যত নিরপেক্ষতার ধারণাকেই দুর্বল করে।
৩) সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংস্কারে বিএনপি নীতিগত সমর্থনের কথা বললেও বাস্তবে দলীয় শৃঙ্খলার অজুহাতে তারা তাদের সংসদ সদস্যদের স্বাধীন মতামত বা ভোট দেয়ার অধিকার সীমিত রাখতে চায়। অর্থাৎ অর্থবিল ও আস্থাভোট ছাড়াও আরও অনেক ক্ষেত্রেই বিএনপি চাবে না তাদের সাংসদরা কোনো বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বা দলের এজেন্ডার বিরুদ্ধে ভোট দিক। তার মানে বিএনপি ৭০ অনুচ্ছেদ সংস্কারকে অনেক সীমিত করে ফেলতে চাবে।
৪) সবশেষে, সনদের ‘স্বয়ংক্রিয় বাস্তবায়ন’ ধারাকে তারা অসাংবিধানিক বলে দাবি করেছে। সনদ অনুযায়ী নতুন সংসদ অধিবেশন শুরু হওয়ার ২৭০ দিন পার হওয়ার মধ্যেও যদি ত্রিশটি বাধ্যতামূলক বিষয়াদি নিয়ে সংবিধান সংস্কার সম্পন্ন না হয়, তাহলে সেই ত্রিশটি বাধ্যতামূলক বিষয়াদি নিয়ে সংবিধান সংস্কারগুলোকে সেই ২৭০ দিন পরে আপনা আপনি সংবিধিবদ্ধ হিসেবে গণ্য করা হবে। বিএনপির অবস্থান: সংবিধান বদলাবে শুধু সংসদের ধারবাহিক কর্মকান্ডে, গণভোটে বেধে দেয়া কোনো সময়সীমায় নয়।
জুলাই সনদেই একটি উল্লেখযোগ্য ফাঁক রাখা হয়েছে। যারা ক্ষমতার ম্যান্ডেট পাবে, তারা নিজেদের আপত্তি অনুযায়ী কাজ করতে পারবে। অর্থাৎ কাগজে কলমে উপরে উল্লেখিত ত্রিশটি ধারাসমূহ বাধ্যতামূলক হলেও, বাস্তবে বিএনপি সংস্কারের “পদ্ধতি” বদলে দিয়ে নির্বাচনী কাঠামোসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে চাবে। এখানে বাধা দিতে পারবে একমাত্র বিরোধী সাংসদরা এবং সংবিধান সংস্কার নিয়ে আগামীতে গঠন করা সংসদীয় কমিটিটি।
হাউকাউ বিগ্রেড অর্থাৎ ব্যর্থ আফসোস লীগের সকল সমর্থক, সাথে অগণিত বুমবামদের (বামপন্থী এবং/অথবা সাম্যবাদীদের) উদ্দেশ্য করে বলছি যে গত দেড়টি বছরের বেশি সময় ধরে ফেসবুকে হাউকাউ করা ছাড়া আপনারা আর কিছুই সাধন করতে পারেননি। তবে এবার সময় এসেছে বাংলাদেশের ভবিষ্যতকে কেন্দ্র করে একটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখার।
আমরা যারা বর্তমানে ঘোর আওয়ামী লীগ বিরোধী এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে পূর্ণাঙ্গ নৈতিক সমর্থন দিয়ে এসেছি, তাদের অনেকজনের সাথেই আপনাদের একটি আদর্শগত মিল আছে – জামায়াত বিরোধিতা। উদাহরণস্বরূপ, আমি বর্তমান সরকারকে সমর্থন দিয়ে এসেছি কিন্তু একই সাথে আমি রাজনৈতিক ইসলামের চরম বিরোধী।
হাসিনার কারণে আপনারা সহ বাংলাদেশের অনেক মানুষই হয়তো ভোটের অসীম ক্ষমতার কথা জানেনই না বা ভুলে গেছেন। তাই জোর গলায় বলতে চাই যে ভোটের মাধ্যমে আমরা ও আপনারা সকলেই পারব জামায়াতকে শুধু রাষ্ট্র ক্ষমতার প্রাঙ্গণ থেকেই দূরে রাখতে নয়, তারা যেন প্রধান বিরোধী দল হিসেবেও উদিত না হয়, সেটাও নিশ্চিত করতে। তারা প্রধান বিরোধী দল হয়ে গেলে তারা আগামীতে বিভিন্ন সংসদীয় কমিটিতে স্থান পেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারবে যা আমাদের একেবারেই কাম্য নয়।
আফসোস লীগ যেহেতু নির্বাচনে দাঁড়াচ্ছে না তো কাকে ভোট দেবেন ভাবছেন? বাংলাদেশে বর্তমানে নির্বাচন কমিশনে ৫০টির ঊর্ধ্বে রাজনৈতিক দল নিবন্ধিত আছে। সুযোগ এসেছে দলকানা না হয়ে আপনার নির্বাচনী এলাকায় কোন মানুষরা আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারির সংসদীয় নির্বাচনে দাঁড়িয়েছে, তাদেরকে চিনতে, তাদের কথাবার্তা শুনতে ও তাদের মতাদর্শের সাথে পরিচিত হতে। তারপর দলকানা মানসিকতা ঝেড়ে ফেলে জামায়াতের লোকটি ছাড়া আর কাউকে নিজের বিচারবুদ্ধি অনুযায়ী ভোট দিন। এভাবেই জামায়াতকে আপনি এবং আমি প্রতিহত করতে পারব।
জুলাই সনদের প্রসঙ্গে বলতে হবে যে নিছক বিরোধিতা করার জন্যই আপনারা এই সনদের বিরোধিতা করছেন। তার উপর জুলাই সনদের প্রতি জামায়াত (এবং তাদের নতুন শয্যাসঙ্গী এনসিপি)র অবদান সবচেয়ে বেশি বলে আপনারা সনদটির কোনো প্রকার বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়নও করতে নারাজ। এটাও সত্য যে বাংলাদেশে জুলাই সনদ বাস্তবায়িত হলে হাসিনার মতো স্বৈরাচার আর কখনও আবির্ভূত হবে না। তাই আপনারা অনেকেই জুলাই সনদকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছেন।
অনেক কারণেই ইতিহাস আপনাদেরকে ক্ষমা করবে না। দয়া করে সেই কারণগুলোর সাথে এই কারণটি আর যোগ করবেন না। জুলাই সনদের বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়ন করুন। বিএনপির কারণে এই সনদ প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি সংকুচিত হয়ে গেলেও, তার মধ্যে এখনও যথেষ্ট অঙ্গীকার লিপিবদ্ধ হয়ে আছে যা আগামীতে বাস্তবায়িত হলে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর দিক থেকে বাংলাদেশ একটি সম্মানজনক অবস্থানে পৌঁছাতে পারবে।
তাই নির্বাচনের দিন জুলাই সনদকে কেন্দ্র করে যেই গণভোটটি অনুষ্ঠিত হবে, সেখানে জুলাই সনদকে “হ্যাঁ” বলুন। গণভোটটি পাশ হলে আগামী নির্বাচিত সংসদ ও সরকার সনদে উল্লেখিত অঙ্গীকারগুলো বাস্তবায়ন করতে আইনগতভাবে বাধ্য থাকবে। উপসংহার হিসেবে আপনাদের কাছে আবারো আবেদন করছি যে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি তারিখে ভোট দিয়ে জামায়াতকে “না” বলুন এবং জুলাই সনদকে “হ্যাঁ” বলুন।
Bangladesh just wrapped up its DUCSU election — and I dug into expert opinions to figure out why candidates backed by Islami Chhatra Shibir won big. Here’s what stood out:
1. Back around 2010–2011, under Sheikh Hasina’s government, the exam system was tweaked so that madrasa students could get into Dhaka University more easily.
2. Student groups linked to the Awami League (Chhatra League) and the BNP (Chhatra Dal) both have a history of hijacking campus spaces. Incidentally, Islami Chhatra Shibir—tied to Jamaat-e-Islami—does not.
3. Their opponents are deeply fragmented—with no unified platform or common stage to organize around.
4. Shibir’s advantage? Solid management and strong financial backing.
5. Their politics are oriented around student needs.
6. They’re great at reaching students in smooth, everyday language that connects.
7. Student voters rejected the politics of labeling or tagging people based on who’s “for” or “against” the Liberation War—a divisive tactic others still used.
So here’s the challenge: it is now up to the opponents of the right-wing Shibir to step up and learn from this. Stop simply opposing—start asking: what can we actually offer to campuses and country – because “don’t vote for razakaars (traitors)” just isn’t going to cut it anymore. Instead, let’s focus on what voters can expect from those opposing collaborator-linked forces.
There are two groups of people opposing Shibir: the left-leaning group and the centrist one. And I’d argue: now is the time for centrists in Bangladesh to rise.
Who are these centrists?
They are people who believe in equal dignity and social status for everyone, people who believe in equal laws and fair justice from the state, people who are peripherally religious—and believe in state-level, religious neutrality; people who reject any form of discrimination—whether it is religion, colour, gender, ethnicity, language, sexual orientation, gender identity or physical disability—and believe everyone mentioned above deserves equal rights and responsibilities.
They are supporters of free markets, private enterprise, global trade, and globalization—but also of progressive taxation so the government can help the people at the lower rungs of the economic ladder. They are people who don’t treat health and education as commodities, but see them as basic human rights, to be provided by the state. They are people who believe in moving forward—not getting stuck in endless debates about Bangladesh’s political history, historical figures, all past achievements and wounds, but to build a culture-rooted, AI-enabled society and state, incorporating all the ideals mentioned above.
——————
*DUCSU = Dhaka University Central Students’ Union.
*Islami Chhatra Shibir = The student wing of Bangladesh’s right-wing political party Jamaat-e-Islami, which historically opposed the Liberation War and sided with the Pakistani army; also follows the Maududi ideology.
বাংলাদেশে সদ্য সমাপ্ত ডাকসু* নির্বাচনে ইসলামী ছাত্রশিবির* সমর্থিত প্রার্থীদের বিশাল জয়ের কারণ জানতে গিয়ে কিছু বিশেষজ্ঞদের মন্তব্য পড়ে যা বুঝলাম তা হলো:
১) ২০১০-২০১১ সালের দিকে শেখ হাসিনা সরকারের মেয়াদে মাদ্রাসার ছাত্ররা যেন সহজেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারে তার জন্য পরীক্ষা পদ্ধতির পরিবর্তন।
২) আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ ও বিএনপির ছাত্র সংগঠন ছাত্রদল উভয়েরই ক্যাম্পাস দখলের ইতিহাস যা ঘটনাচক্রে জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেই।
৩) শিবির বিরোধীদের মাঝে শত শত বিভক্তি – কোনো ঐক্যবদ্ধ ভিত্তি ও মঞ্চের অভাব।
৪) শিবিরের সুষ্ঠ ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক স্বচ্ছন্দ।
৫) শিবিরের ছাত্রকেন্দ্রিক রাজনীতি।
৬) সাবলীল ও কথ্য ভাষায় শিবিরের গণসংযোগ।
৭) ছাত্র ভোটারদের মাঝে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ট্যাগিঙের রাজনীতির পরিহার। কে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোক আর কে মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষের লোক, এই শ্রেণিবিন্যাসের বিভক্তিময় রাজনীতির পরিহার।
বিএনপি সহ বাকি শিবির বিরোধীদের এবার এখান থেকে শিক্ষা গ্রহণের পালা। দক্ষিণপন্থা শিবিরের বিপরীতে বাকিরা শিক্ষাঙ্গন তথা দেশকে কী দিতে পারে তা সঠিকভাবে নির্ণয় করতে হবে এবং তা তুলে ধরতে হবে। রাজাকারদের ভোট দিবেন না, এই কথা এখন আর কেউ গিলবে না। রাজাকারের বিপক্ষ শক্তির কাছ থেকে ভোটাররা কী আশা করতে পারে সেটাই হবে আলোচনা।
এই বিপক্ষ শক্তির মধ্যে একটা পক্ষ হচ্ছে বামপন্থী, আরেকটা হচ্ছে মধ্যপন্থী। আমি বলবো যে বাংলাদেশে এখন মধ্যপন্থীদের উত্থানের সময় এসেছে।
কারা এই মধ্যপন্থীগন?
এরা হচ্ছে তারা, যারা সকলের সামাজিক মর্যাদা ও সাম্যতায় বিশ্বাসী, রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সকলের জন্য সমান আইন ও ন্যায় বিচারে বিশ্বাসী, তারা ব্যক্তিগত জীবনে গৌণ ধর্মপ্রবণ মানুষ এবং তারা রাষ্ট্রীয় ধর্মীয় নিরপেক্ষতায় বিশ্বাসী; তারা সকল ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ, জাত, ভাষা, যৌন অভিমুখিতা, লিঙ্গ পরিচয় ও শারীরিক প্রতিবন্ধকতার ভিত্তিতে কোনো প্রকার পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় বৈষম্যের বিরোধী – উল্লেখিত সকল মানুষদের সমান নাগরিক অধিকার ও দায়িত্বে বিশ্বাসী।
তারা মুক্ত বাজার, ব্যক্তিগত ও বেসরকারি উদ্যোগ, বিশ্ব বাণিজ্য ও বিশ্বায়ণে বিশ্বাসী, তারা সরকারের পক্ষ থেকে নাগরিকদের কাছ থেকে প্রগতিশীল কর আদায়ের মাধ্যমে অর্থনীতির মইয়ের নিচের দিকের সকল জনগণের সহায়তা প্রদানে বিশ্বাসী; তারা স্বাস্থ্য ও শিক্ষাকে পণ্য মনে না করে রাষ্ট্রের কাছ থেকে পাপ্য দুটি মৌলিক মানবাধিকারে বিশ্বাসী। তারা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস, ঐতিহাসিক ব্যক্তিগন, সকল অতীত অর্জন ও ক্ষতগুলোর কাসুন্দি না ঘেটে, সেগুলো নিয়ে সীমাহীন বিতর্কে না জড়িয়ে, উপরে উল্লেখিত আদর্শগুলো নিয়ে একটি অগ্রগামী, সংষ্কৃতি নির্ভর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনে নিয়োজিত হয়ে যাওয়ায় বিশ্বাসী।
——————
*ডাকসু = ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ।
*ইসলামী ছাত্রশিবির = বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী ও পাকিস্তানি সেনাদের পক্ষ নেয়া মওদুদীবাদের অনুসারী ও দক্ষিণপন্থা জামায়াতে ইসলাম নামের রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠন।
চ্যাটজিবিটি দ্বারা রচিত ——————————– মওদুদী মতাদর্শের উৎপত্তি
আবুল আ’লা মওদুদী (১৯০৩–১৯৭৯) ছিলেন একজন ভারতীয় মুসলমান চিন্তক। বিলেতি ঔপনিবেশিক শাসনের সময় ১৯৩০ ও ১৯৪০-এর দশকে তিনি তার মতাদর্শ গড়ে তোলেন। ১৯৪১ সালে তিনি অবিভক্ত ভারতে জামায়াতে ইসলামী প্রতিষ্ঠা করেন। তার ধারণা জন্ম নেয় একদিকে পাশ্চাত্যের ধর্মনিরপেক্ষ আধুনিকতার প্রতিক্রিয়া হিসেবে, আরেক দিকে ভারতীয় জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের বিকল্প হিসেবে—কারণ তিনি মনে করতেন, এসব আন্দোলনে ইসলামকে পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা হিসেবে উপেক্ষা করা হচ্ছে। —
মওদুদীর মতাদর্শ (সংক্ষেপে)
১. আল্লাহর সার্বভৌমত্ব: মওদুদীর মতে সার্বভৌমত্ব কেবল আল্লাহর। মানুষ বা রাষ্ট্রের হাতে চূড়ান্ত ক্ষমতা নেই। মানুষের সব আইন কোরআন ও সুন্নাহর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।
২. থিও-ডেমোক্রেসি বা ধর্মভিত্তিক গণতন্ত্র: তিনি পাশ্চাত্যের ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্র প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তার মতে, জনগণের ভোটে নেতা নির্বাচিত হতে পারে, তবে তারা পুরোপুরি শরীয়ার অধীন থাকবে।
৩. ইসলাম পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা: ইসলাম কেবল ধর্ম নয়; বরং রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতিসহ জীবনের সবক্ষেত্রকে নিয়ন্ত্রণকারী পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা। ধর্ম ও রাষ্ট্রকে আলাদা করা তার কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না।
৪. রাষ্ট্রের ভূমিকা: রাষ্ট্রের কাজ হবে শরীয়া আইন কার্যকর করা, সমাজকে ইসলামী নীতিমালার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা এবং অ-ইসলামী কার্যকলাপ বন্ধ করা।
৫. ধর্মনিরপেক্ষতা ও পাশ্চাত্য মতাদর্শের বিরোধিতা: ধর্মনিরপেক্ষতা, জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র ও উদারনীতি — এসবকে তিনি ইসলামের জন্য হুমকি মনে করতেন।
৬. জিহাদ বা সংগ্রাম: মওদুদীর কাছে জিহাদ মানে শুধু সামরিক লড়াই নয়; বরং এমন এক বৃহৎ সভ্যতাগত সংগ্রাম, যার লক্ষ্য ইসলামকে শাসনব্যবস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। জামায়াতে ইসলামীকে তিনি এই সংগ্রামের অগ্রদূত ভাবতেন।
৭. ক্রমিক পরিবর্তন: হঠাৎ সহিংস বিপ্লবের বদলে ধীরে ধীরে সমাজ পরিবর্তন, শিক্ষা, প্রচার ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথকেই তিনি সঠিক মনে করতেন। —
বাংলাদেশে প্রভাব
মূল ভিত্তি: বাংলাদেশের জামায়াতে ইসলামী সরাসরি মওদুদীর চিন্তাধারার ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়। ইসলামকে পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা হিসেবে দেখা ও ধর্মনিরপেক্ষতার বিরোধিতা ছিল এর মূল ভিত্তি।
মুক্তিযুদ্ধ ১৯৭১: জামায়াত স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল। তাদের মতে, একটি মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তানকে ভাঙা ইসলামের পরিপন্থী। তাদের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র সংঘ পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগী ছিল এবং নৃশংসতায় জড়িত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
স্বাধীনতার পর রাজনীতিতে ফেরা: ১৯৭১ সালের পর জামায়াত নিষিদ্ধ হয়। তবে ১৯৭০-এর শেষ দিকে সামরিক শাসকরা (জিয়াউর রহমান ও পরে এরশাদ) ধর্মনিরপেক্ষ শক্তিকে দুর্বল করার জন্য তাদেরকে রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনে। পরে জামায়াত বিএনপির সঙ্গে জোট গড়ে সংবিধানে ইসলামী ধারা যুক্ত করতে ভূমিকা রাখে।
সামাজিক বিস্তার: কেবল রাজনীতিতেই নয়, জামায়াত স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয়, দাতব্য সংস্থা ও এনজিওর মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করে। শিক্ষার্থী ও মধ্যবিত্তের মধ্যে মওদুদীর ধারণা ছড়িয়ে দেয়।
সমাজে প্রভাব: এতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক আলোচনায় এক ধরনের পরিবর্তন আসে। মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদ ধীরে ধীরে ইসলামী পরিচয়কেন্দ্রিক বিতর্কে রূপ নেয়।
সমালোচনা ও পতন: ধর্মনিরপেক্ষ শক্তি জামায়াতকে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের সাথে বিশ্বাসঘাতক মনে করে। ২০১০-এর দশকে যুদ্ধাপরাধের বিচারে জামায়াতের শীর্ষ কয়েকজন নেতা দোষী সাব্যস্ত হয় এবং দলটি রাজনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। তবে তাদের ছড়িয়ে দেওয়া মওদুদী চিন্তাধারা আজও বাংলাদেশের ইসলামপন্থী ধারা ও বিতর্কে প্রভাব বিস্তার করে।
সারসংক্ষেপ: ১৯৩০–৪০-এর দশকে উপনিবেশিক ভারতে জন্ম নেওয়া মওদুদীর মতাদর্শ — আল্লাহর সার্বভৌমত্ব, ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ও ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্রের প্রত্যাখ্যান — জামায়াতে ইসলামীকে তার পরিচয় ও কর্মপন্থা দিয়েছে। বাংলাদেশে এটি জামায়াতকে এক বিতর্কিত কিন্তু স্থায়ী শক্তি বানিয়েছে, যারা রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ ভিত্তির বিরোধিতা করেছে এবং রাজনীতি, শিক্ষা ও সমাজে গভীর ছাপ রেখেছে।
এক্স (X)-এর মাধ্যমে বাংলাদেশের বেশ কিছু “পণ্ডিত”দের কাছ থেকে জানতে পারলাম যে একটি মানুষের যৌন অভিমুখিতা এবং/অথবা লিঙ্গ পরিচয় নির্ভর করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরকার যৌন সংখ্যালঘু (এলজিবিটি)দের বিভিন্ন সংস্থা বা গবেষণার পেছনে কতটুকু ব্যয় করে তার উপর! ট্রাম্প প্রশাসন দ্বারা অর্থায়নের কাটছাট আর প্রচারণার কমতি হবে জেনে তারা এখন প্রফুল্ল যে বাংলাদেশ সহ সবখানেই যৌন সংখ্যালঘুদের অস্তিত্ব বা সংখ্যা এখন কমে আসবে।
এর থেকে আজগুবি বোধশক্তি মানুষের আর কী হতে পারে তা আমার বোধগম্য নয়। এই পণ্ডিতদের ধারণা যে মার্কিন তথা পশ্চিমা দুনিয়ার একটি বিশেষ “এজেন্ডা” ভিত্তিক প্রচারণার ফলে সারা দুনিয়া সহ বাংলাদেশেও অনেক তরুণরা সমকামী হয়ে যাচ্ছে বা সমকামিতার পথ বেছে নিচ্ছে বা সমকামিতায় “আসক্ত” হয়ে যাচ্ছে! কেউ কেউ ছেলে হয়ে মেয়ে হয়ে যাচ্ছে, মেয়ে হয়ে ছেলে হয়ে যাচ্ছে। লিঙ্গ ভাগ এখন বাড়তে বাড়তে একশত একে গিয়ে পৌছেছে!
পশ্চিমা দুনিয়ার একটি স্বার্থান্বেষী মহল (এলজিবিটি) বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে তদবির করে তাদের এই কুরুচিপূর্ণ, বিক্রিত ও অপ্রাকৃতিক যৌনাচার এবং জীবনধারণকে স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক হিসেবে ঘোষিত করে নিয়েছে। এখন তারা চক্রান্ত করে বাংলাদেশের মতো রক্ষণশীল দেশগুলোর ধর্ম, সমাজ ও রাষ্ট্রকে ধ্বংস করার পাঁয়তারায় লিপ্ত! বাংলাদেশে আগে কোনো সমকামী ছিল না, এলজিবিটি বলতে কিছু ছিল না। এখন উদিত হওয়া এই জঘন্য নরকের কীটরা উলঙ্গ হয়ে গায়ে রঙ মেখে পতাকা উড়িয়ে উড়িয়ে “প্রাইড র্যালি” করতে চায়। মদ খেয়ে বা মাদক সেবন করে নাইটক্লাবে নাচানাচি করতে চায়, সবার সাথে সবখানে যৌন মিলন করতে চায়।
বলাই বাহুল্য যে উপরের শেষের বাক্যটি বাংলাদেশের বহু তরুণদেরই সুপ্ত বাসনা – সমকামী (গে), উভকামী (বাইসেক্সুয়াল), বিষমকামী (স্ট্রেইট) যেই হউক না কেন! কিন্তু আমার এই লেখাটির উদ্দেশ্য সেটাকে বিশ্লেষণ করা নয়। উদ্দেশ্য হচ্ছে যে অজ্ঞতা আর ধর্ম দ্বারা অনুপ্রাণিত সমকামী-বিদ্বেষ (হোমোফোবিয়া) ও রূপান্তরকামী-বিদ্বেষ (ট্রান্সফোবিয়া)র আড়ালে যে সত্যগুলো লুকিয়ে রয়েছে তা নিয়ে কথা বলা। আমি বাংলাদেশে যৌন সংখ্যালঘুদের নিয়ে প্রচলিত কিছু বদ্ধ ধারণাগুলো একে একে নির্মূল করার চেষ্টা করবো।
১) সমকামিতা একটা মানসিক বা শারীরিক রোগ!
কোনো গোষ্ঠীর তদবিরের কারণে নয়, বরং গবেষণার খাতিরেই পশ্চিমা দুনিয়ার অনেক চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা সমকামীদের নিয়ে গবেষণা করেছে যে তাদের যে ব্যতিক্রমী যৌন অভিমুখিতা (সেক্সুয়াল ওরিয়েন্টেশন), অর্থাৎ সমলিঙ্গের প্রতি তাদের যেই যৌন আকর্ষণ, প্রেম ও ভালোবাসা, সেটা কোনো প্রকার রোগের ছকে পড়ে কি না। কোনো প্রকার রোগবালাই হলে, হোক সেটা মানসিক বা শারীরিক, তার অনেক উপসর্গ থাকে যা সহজেই চিহ্নিত করা যায়। মানুষটার উপর সেই উপসর্গগুলো বিভিন্ন রকমের প্রভাব ফেলে। এর উদাহরণস্বরূপ শারীরিক যন্ত্রনা, দুর্বলতা, নিষ্ক্রিয়তা, মানসিক যন্ত্রণা, ও ভারসাম্যহীনতাকে অন্তর্ভুক্ত করা যায়।
অথচ সমকামীদেরকে পর্যবেক্ষণ করে বার বার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে শুধু তাদের এই যৌন অভিমুখিতার কারণে তাদের মধ্যে উপরে উল্লেখিত কোনো শারীরিক উপসর্গ লক্ষ্য করা যায়নি এবং মানসিক যন্ত্রণা উপস্থিত থাকলে তা ছিল পরিবার, সমাজ, ধর্ম ইত্যাদি থেকে অবিরাম নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার কারণে, স্রোতের বিপরীতে চলতে বাধ্য হওয়ার কারণে। দুটো ব্যক্তি, যাদের মধ্যে স্বাস্থ্যজনিত বা মানসিক কোনো পার্থক্য নেই এবং প্রায় সব কিছুই এক, অথচ তাদের যৌন অভিমুখিতা ভিন্ন (একজন বিষমকামী, আরেকজন সমকামী), তাদের মধ্যে সেই যৌন অভিমুখিতা ছাড়া আর কোনো পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়নি। ব্যাপারটা অনেকটা ডান হাত আর বাম হাত দিয়ে লেখার মাঝেকার পার্থক্যটার মতো।
কাজেই সমকামিতা নামক যৌন অভিমুখিতাকে অন্তত চিকিৎসা বিজ্ঞানের জগতে কোনো প্রকার শারীরিক বা মানসিক রোগ বলে নির্ণয় করে যাওয়া সম্ভব হয়নি। এই পরিবর্তনটা কোনো প্রকার তদবিরের কারণে আসেনি। বিজ্ঞানীরা তদবিরের উপর তাদের কর্ম নির্ধারণ করে চলে না।
২) এলজিবিটিদের মানসিক ও হরমোন চিকিৎসার প্রয়োজন!
সমকামী (গে, হোমোসেক্সুয়াল)
সমকামিতা নামক যৌন অভিমুখিতাটি যেহেতু কোনো রোগবালাইয়ের মধ্যে পড়ে না, স্বাভাবিকভাবেই সেটার চিকিৎসারও কোনো প্রসঙ্গ আসে না। তবে সেটার চেষ্টা যে করা হয়নি তা নয়! কাউন্সেলিং থেকে শুরু করে বৈদ্যুতিক শক, ঝাঁড়ফুক, সম্মোহন, ধর্মীয় বুটক্যাম্প, হরমোন প্রয়োগ, বিপরীত লিঙ্গের কারো সাথে অনিচ্ছা সত্বেও যৌন মিলন, কোনো কিছুই বাদ রাখা হয়নি।
বিগত শতাব্দীর মধ্যম সময়ে কয়েক যুগ ধরে চালিয়ে যাওয়া এই সকল চিকিৎসা নামক প্রহসনগুলো কখনোই কারো যৌন অভিমুখিতা পাল্টে ফেলতে পারেনি। বরং যাদের উপর এই অন্যায়গুলো চালিয়ে যাওয়া হয়েছে, তাদেরকে উলটো বিষণ্ণতা এমন কি আত্মহত্যার দিকেও ঠেলে দেয়া হয়েছে। এসকল হৃদয়বিদারক বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে এটাই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে একটি মানুষের যৌন অভিমুখিতা, সেটা যেটাই হোক, সেটাকে কোনোভাবেই পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। অর্থাৎ কোনোভাবেই সমকামীদেরকে বিষমকামী বানিয়ে দেয়া যায় না এবং বিষমকামীদেরকে সমকামী বানিয়ে দেয়া যায় না।
রূপান্তরকামী (ট্রান্সজেন্ডার)
যৌন সংখ্যালঘুদের মাঝেই ছোট একটি গোত্র আছে যাদের মানুষরা “জেন্ডার ডিসফোরিয়া” নামক একটি মর্মস্পর্শী অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে জীবন অতিবাহিত করে। এদের বাহ্যিক শরীর একটি ছেলের হলেও, অতি অল্প বয়স থেকেই এরা দিন, রাত, জেগে থাকা এমন কি ঘুমন্ত অবস্থায়েও মনের গভীরতম স্তর থেকে অনুভব করে যে এরা একটি ভুল শরীরে বসবাস করছে। এই উদাহরণটিতে এরা আসলে একটি মেয়ে। ঠিক এই উলটো চিত্রটিও বিরাজমান! এরা কেউ কেউ মেয়ের শরীরে জন্মগ্রহণ করেছে, কিন্তু রন্ধ্রে রন্ধ্রে তারা জানে যে তারা আসলে একটি ছেলে।
এই লেখাটির শুরুতে যে সকল পণ্ডিতদের কথা উল্লেখ করেছি, তারা এই স্পর্শকাতর ভুবনে একটি “আইডিলজি” বা সামাজিক ও রাজনৈতিক আদর্শ এবং “প্রপাগান্ডা” বা প্রচারণা খুঁজে পায়, যেন এটা একটা বহিরাগত ষড়যন্ত্র! কেউ কেউ এই ভুবনটিকে “উয়োউক” সংস্কৃতির বহি:প্রকাশ হিসেবে দেখে। অথচ এরা কেউই ব্যাপারটার গভীরে যাওয়ার চেষ্টা করে না – উল্টো বলে বেড়ায় যে রূপান্তরকামীদের অবদানের ফলে এখন একশত একটা লিঙ্গ প্রকার আবিষ্কার করা হয়েছে!
জেন্ডার ডিস্ফোরিয়াকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের জগতে কোনো মানসিক বা শারীরিক রোগ হিসেবে নির্ণয় করা হয়নি। অতএব এর কোনো চিকিৎসারও প্রসঙ্গ অবান্তর। তবে যারা জেন্ডার ডিস্ফোরিয়া অনুভব করে, তাদের যন্ত্রণা অসহনীয়। এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাওয়ার পথ বেশ প্রসারিত এবং প্রশিক্ষিত বিশেষজ্ঞদের সাথে আলোচনা সাপেক্ষে এরা সিদ্ধান্ত নিতে পারে তারা হরমোন প্রয়োগ করেই ক্ষান্ত থাকবে, না কি দীর্ঘ অস্ত্রপ্রচারের মাধ্যমে শরীরটাকে বদলে ফেলবে যাতে মনের ভেতরের মানুষটা বাইরের মানুষটার সাথে এক হয়ে যেতে পারে। অর্থাৎ এদের বাহ্যিক লিঙ্গ আর অন্তর্নিহিত লিঙ্গ পরিচয়ের অসামঞ্জস্যতা দূর হয়ে যেতে পারে। সিদ্ধান্ত যেটাই হবে, সেটাই তাদেরকে জেন্ডার ডিস্ফোরিয়ার যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দিবে। রূপান্তরকামীদের ক্ষেত্রে আর কোনো চিকিৎসার প্রসঙ্গ আসে না।
অদ্বৈত (নন-বাইনারি)
যৌন সংখ্যালঘুদের মধ্যে আরেকটি গোত্র আছে যারা জেন্ডার ডিস্ফোরিয়ার কারণে নিজেদেরকে নারী বা পুরুষ, এই ছকেই ফেলতে পারে না। তাদের বাহ্যিক শরীর যেটাই থাকুক না কেন, তারা নিজেকে নারীও ভাবতে পারে না, পুরুষও ভাবতে পারে না। এদের লিঙ্গ পরিচয় অনির্ধারিত। এরা অদ্বৈত। এরা এইভাবেই নিজেদেরকে নিয়ে সন্তুষ্ট। এখানেও কোনো রোগবালাই নেই এবং কোনো প্রকার চিকিৎসাও অপ্রাসঙ্গিক।
আন্তলিঙ্গ (ইন্টারসেক্স)
কারো কারো জন্ম হয় এমনভাবে যে তাদের যৌনাঙ্গ পুর্ণাঙ্গভাবে নারী বা পুরুষদের মতো নয়, অথবা তাদের যৌনাঙ্গে নারী ও পুরুষ উভয়েরই বৈশিষ্ট বিদ্যমান। এদের জন্মের সময়ে তাদের অভিভাবকগণ ডাক্তারের সাহায্যে কী পদক্ষেপ নেয় তা নৈতিকতা বা নীতিশাস্ত্রের আওতায় এসে পড়ে৷ কিন্তু এরাও এলজিবিটি সম্প্রদায়েরই অংশ এবং এদেরও মানবাধিকার সকল মানুষের মতোই গুরুত্বপূর্ণ।
৩) বাংলাদেশ সহ সারা দুনিয়াতে এলজিবিটি হওয়া একটা ফ্যাশন বা চল!
স্রোতের বিপরীতে চলে, নিজের সাথে যুদ্ধ করে, পরিবার, সমাজ এমন কি রাষ্ট্রের কাছ থেকেও নিগ্রহের শিকার হয়ে ও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কার এত ফ্যাশন করার শখ হয়েছে, পণ্ডিতদের কাছে সেই প্রশ্নটাই রাখছি। যৌন অভিমুখিতা এবং লিঙ্গ পরিচয় সংক্রান্ত জ্ঞানের পরিধি সময়ের সাথেই বাড়ছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী একটি মানুষের যৌন অভিমুখিতা নির্ণিত হয় তার বিভিন্ন বংশাণুর (জিনের) একটি জটিল মিথস্ক্রিয়ার ফলন হিসেবে। অর্থাৎ সমকামীদের ক্ষেত্রে তার জিনগুলো একভাবে একত্রে কাজ করে। উভকামী ও বিষমকামীদের ক্ষেত্রে তাদের বংশাণুগুলো ভিন্নভাবে একত্রে কাজ করে। যে সকল পণ্ডিতগণ বলে বেড়ায় যে কোনো “গে জিন” আবিষ্কৃত হয়নি, তাদেরকে জানিয়ে রাখছি যে কোনো “স্ট্রেইট জিন”ও আবিষ্কৃত হয়নি। জেন্ডার ডিসফোরিয়াও একটি মানুষের বিভিন্ন বংশাণুর একটি জটিল মিথস্ক্রিয়ার ফলন। এটা নিয়ে আরো অনেক গবেষণা চলছে।
৪) সারা দুনিয়া সহ বাংলাদেশেও সমকামিতাকে “প্রমোট” করা হচ্ছে!
একটি মানুষের যৌন অভিমুখিতা যেহেতু তার বিভিন্ন বংশাণুর একটি জটিল মিথস্ক্রিয়ার ফলন, সেহেতু সমকামিতাকে “প্রমোট” করার ধারণাটি একেবারেই হাস্যকর এবং অবাস্তব। ইহাকে প্রমোট করা যায় না এবং প্রমোট করারও কিছু নেই। কাওকে প্রলোভন দেখিয়ে সমকামী বানিয়ে দেয়া যায় না এবং ঠিক তার উল্টাটাও সত্যি। কিছু অনুকাহিনী অনুযায়ী শোনা যায় যে অমুক ছেলেটি কোনো বড় ভাই, চাচা-মামা-ফুপা, হুজুর বা বন্ধু দ্বারা ছোট বেলায় ধর্ষিত হয়ে বড় হয়ে সমকামী হয়ে গিয়েছে। এর কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই৷ এই ক্ষেত্রে ছেলেটি বরাবরই সমকামী ছিল। ধর্ষকটি সমকামী, উভকামী বা শিশুকামী (পেডোফাইল) জাতীয় কেউ একজন ছিল। মেয়ে সমকামীদের বেলায়েও একই যুক্তি প্রযোজ্য। অন্য কোনো নারীর স্পর্শে কেউ লেজবিয়ান হয়ে যায়নি।
৫) কেউ কি আসলেই সমকামী হয়ে জন্মগ্রহণ করে?
এই ব্যাপারে চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা এখনও এক জায়গায় পৌছতে সক্ষম না হলেও এটা বলা যায় যে যেহেতু একটি মানুষের বিভিন্ন বংশাণুর জটিল মিথস্ক্রিয়া তাকে গে, স্ট্রেইট বা বাইসেক্সুয়াল বানিয়ে দেয়, সেহেতু সংশ্লিষ্ট যৌন অভিমুখিতাটি জন্মের আগে নির্ধারত হয়েছে, না কি জন্মের পরে, তা একেবারেই মুখ্য নয়। যেটা মুখ্য, তা হচ্ছে যে যৌন অভিমুখিতাটি যখনই নির্ধারিত হউক না কেন, তা একবার নির্ধারিত হয়ে যাওয়ার পর আর বদলানো যায় না।
৬) বাংলাদেশে এলজিবিটিদের সংখ্যা নগণ্য!
নগন্য ধারনাটা আপেক্ষিক কারণ একজন মানুষও একটি মানুষ। যেহেতু নানাভাবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে যে পৃথিবীর ৫-১০% মানুষ যৌন সংখ্যালঘু, এবং এদের বংশাণুগত বৈশিষ্টগুলো দেশ, সংস্কৃতি ও ধর্মগুলোকে আমলে নেয় না, সেহেতু নির্দিধায় বলা যায় যে বাংলাদেশের জনসংখ্যারও ৫-১০% যৌন সংখ্যালঘু। পৃথিবী জুড়ে এই শতাংশের হারটি বাড়ছে বা কমছে বলে কোনো তথ্য নেই। বলা যায় যে বৈচিত্র্যময় প্রকৃতিতে এই সংখ্যাটি বরাবরই বিদ্যমান ছিল, আছে এবং থাকবে।
৭) সমকামিতা অপ্রাকৃতিক!
সমকামীরা যেহেতু প্রকৃতিরই অংশ সেহেতু তাদের বংশাণুগত এবং অপরিবর্তনীয় যৌন অভিমুখিতাটি অবশ্যই প্রাকৃতিক। তাছাড়া প্রাণী জগতে সমকামিতা বিস্তর। ব্যক্তিগত পর্যায় কার কাছে কোনটা প্রাকৃতিক সেটা সম্পূর্ণ আপেক্ষিক। একজন সমকামীর পক্ষে বিপরীত লিঙ্গের কারো সাথে যৌন মিলন করাটা একেবারেই অপ্রাকৃতিক বা আনন্যাচারাল। বরং সমলিঙ্গের কারো সাথে যৌন মিলন করাটাই স্বাভাবিক। আবার বিষমকামীদের পক্ষে সমলিঙ্গের কারো সাথে যৌন মিলন করাটা একেবারেই অপ্রাকৃতিক বা আনন্যাচারাল। বরং বিপরীত লিঙ্গের কারো সাথে যৌন মিলন করাটাই স্বাভাবিক।
৮) সমকামীরা বাচ্চা দিতে পারে না। কাজেই সমকামিতা প্রাকৃতিক হলো কীভাবে? এটা তো প্রকৃতি বিরুদ্ধ কাজ!
এই বিষয়ে বিবর্তন বিশেষজ্ঞরা বুঝিয়েছেন যে জন্ম দেয়াটাই প্রাণীর মূল উদ্দেশ্য নয়৷ প্রাণীটা যেন সময়ের সাথে সাথে টিকে থাকে পারে সেটাই প্রাণীর মূল উদ্দেশ্য। বাচ্চা জন্ম দেয়াটা সেই উদ্দেশ্য হাসিল করার একটি পন্থা, কিন্তু একটি মাত্র পন্থা নয়! যাদের জন্ম দেয়া হচ্ছে তাদের লালন-পালন এবং সার্বিক বিকাশেরও প্রয়োজন আছে৷ প্রাণী জগতে জন্ম দিতে পারে না এমন প্রাণের অবদান দেখা গিয়েছে একটি প্রাণী গোষ্ঠীর সার্বিক বিকাশের ক্ষেত্রে। মানুষের ক্ষেত্রে ইতিহাস জুড়ে যৌন সংখ্যালঘুরা সভ্যতাকে যা দিয়ে এসেছে তাতে মানব সভ্যতাই সমৃদ্ধ হয়েছে যা বিবর্তনে টিকে থাকারই প্রয়াস। ইতিহাস জুড়ে এই যৌন সংখ্যালঘুদের কিছু নাম হচ্ছে:
আলেকজ্যান্ডার দ্যা গ্রেট
লিওনার্দো দা ভিঞ্চি
আলেন টুরিং
চায়কফস্কি
ঋতুপর্ণ ঘোষ
আধুনিক উপায়ে সমকামীরা এখন বাচ্চা নিতে পারছে অনেকটা বন্ধ্যা বিবাহিত দম্পতিদের মতো করে। তাদের এই বাচ্চা নেয়াটা অপ্রাকৃতিক হলে বন্ধ্যা দম্পতিদের বাচ্চা নেয়াটা বা যৌন মিলন করাটাও অপ্রাকৃতিক, যা একেবারেই উদ্ভট একটি ধারণা। তাছাড়া পৃথিবীতে এত এতিম শিশু পড়ে আছে। তাদের কাওকে সমকামীরা দত্তক নিলে মানব জাতিরই তো কল্যান! সেই শিশুরা যে বড় হয়ে সমকামী হয়ে যাবে সেটার একেবারেই কোনো ভিত্তি নেই। তবে কাকতালীয়ভাবে হলে কোনো সমস্যাও নেই। আর জেনে রাখা উচিৎ যে বিষমকামীদেরও একাংশ বিভিন্ন কারণে কোনো বাচ্চা জন্ম না দিয়েই মারা যায়।
৯) আপনার বাবা বা মা সমকামী হলে আপনি পৃথিবীতে আসতেন না!
না আসলেই কি পৃথিবীটা জনশূন্য হয়ে যেত? আমি না আসলেও অন্য ঘরে অনেক প্রতিভাবান মানুষের জন্ম হতো এবং মনুষ্যজাতি সমৃদ্ধ হয়ে টিকে থাকতো। সবাই যে সমকামী হবে সেটা যে প্রকৃতি মা চেয়েছে তার কোনো ইঙ্গিত নেই। তাছাড়া বাবা বা মা সমকামী হলে অন্য কোনো যুগলের মাধ্যমেও আমার/আপনার জন্ম হতে পারত।
১০) পর্ণ ছবি ও আন্তর্জাল (ইন্টার্নেট) ও পশ্চিমা জনপ্রিয় সংষ্কৃতির আগ্রাসন প্রসারিত হওয়ার পর বাংলাদেশে এলজিবিটিদের সংখ্যা বেড়ে গিয়েছে!
সেটা কখনোই সম্ভব না। যেহেতু যৌন অভিমুখিতা এবং লিঙ্গ পরিচয়ের ভিত্তিটি জৈবিক, সেহেতু কে কী পর্ণ দেখলো, মার্কিন প্রশাসন কোন সংস্থাকে কত টাকা অনুদান করলো ইত্যাদি একেবারেই অপ্রাসঙ্গিক। আধুনিকতার এই সব ছোঁয়ার আগেও বাংলাদেশে সমকামী, রূপান্তরকামী সকলেই ছিল। কিন্তু অধিকাংশজনই নিজের জীবনে কী ঘটছিল তা সহজে অনুধাবন করতে পারেনি। তারা জানতো যে তারা আর পাঁচ-দশটা মানুষের চেয়ে যথেষ্ট ভিন্ন। এই ভিন্নতা থেকে মুক্তি পেতে তারা অনেকেই দিনরাত তাদের সৃষ্টিকর্তার কাছে কেঁদেছে৷ কেউ কেউ আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে৷ অনেকেই বিপরীত লিঙ্গের মানুষকে বিয়ে করে পরিবার ও সমাজকে চুপ রেখেছে৷ কিন্তু সেই বিবাহিত জীবন ছিল অপূর্ণ, ব্যক্তিগত অত্যাচারে ডুবন্ত, মিথ্যায় জর্জরিত এবং পরকিয়ায় কলুষিত।
তথ্যপ্রযুক্তি ও বিদেশি টিভি চ্যানেলের যুগে বহির্বিশ্বের সাথে তরুণ সমাজের ঘন পরিচিতি স্থাপিত হওয়ার পর এখন আর কেউ নিজের জীবন নিয়ে রহস্যের মধ্যে পড়ে থাকে না। যারা এলজিবিটি, তারা আগের চেয়ে অনেক সহজেই বুঝে ফেলে যে তারা সেটা। এর সাথে যুক্ত হয়েছে যৌন সংখ্যালঘু হিসেবে তাদের যে তাদের মতো করে বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে, সেই সচেতনতা। এখন আর সমাজের অন্তরালে বাস করার কোনো যৌক্তিকতা নেই৷ সমাজের চোখে একটি মিথ্যা চেহারা প্রদর্শন করে বাস করার কোনো কারণ নেই। এই সকল কারণেই পণ্ডিতদের কাছে মনে হচ্ছে যে বাংলাদেশে আস্তে আস্তে সমকামীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাস্তবতা হচ্ছে আত্মপ্রকাশ করে নিজেদের কাছে সৎ হয়ে বাঁচার চেষ্টা করছে এমন সমকামীদের সংখ্যা বাংলাদেশে বাড়ছে। আগে সমকামীরা মিথ্যা জীবনযাপন করতো।
১১) সমকামীরা বাংলাদেশ সহ সারা দুনিয়াতে এইডস রোগ ছড়াচ্ছে!
এই দোষ সমকামী, উভকামী, বিষমকামী সকলেরই। বাংলাদেশে যেসকল ট্রাক চালকরা নিয়মিত পতিতালয়ে যায় কিন্তু যৌন মিলনের সময়ে কন্ডম ব্যবহার করে না, তারা কি এইডস ছড়াচ্ছে না? যৌন রোগ ছড়ানো রোধ করার দায়িত্ব সকলের। এই বিষয়ে বিশ্বের সকল সমকামীরাই আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন। কন্ডম ব্যবহার করা ছাড়াও বর্তমানে প্রতিরোধক ওষুধও বের হয়েছে। একজনের এইডস ধরা পড়লে সে যেন আরেকজনকে সেটা দিয়ে সংক্রমণ না করে তার জন্য পরামর্শ দেয়া আছে।
ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলুন, এইড থেকে বাঁচুন – এই সকল বুলি আওড়িয়ে যৌন রোগের ব্যাপকতা কমানো সম্ভব নয় কারণ ধর্মের ঢালের নিচেই মানুষ (সমকামী, উভকামী এবং বিষমকামী)রা “অপকর্ম” করে। রোগবালাই ছড়ানোর পথ বন্ধ করার পন্থা হচ্ছে নিরাপদ যৌনাচার নিশ্চিত করা অর্থাৎ যৌন মিলনের সময়ে অন্তত একজন পুরুষ থাকলে সেখানে কন্ডমের ব্যবহার নিশ্চিত করা। বিবাহিত দম্পতি, যারা একে অপরের প্রতি অনুগত, তাদের ক্ষেত্রে এই নিয়ম প্রযোজ্য হওয়ার কারণ নেই। তবে তাদের বেলায় কন্ডমকে একটি জন্ম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি হিসেবে ব্যবহার করা যায়। জেনে রাখা উচিৎ যে এইচআইভি ভাইরাস বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়াতে পারে, যার মধ্যে যৌন মিলন একটি।
১২) বাংলাদেশে সমকামিতা স্বীকৃতি পেলে এবং সমকামী যুগলদের সন্মান করলে আমাদের পরিবার ও পারিবারিক মূল্যবোধ ধ্বংস হয়ে যাবে। পারিবারিক বন্ধন নষ্ট যাবে!
৫-১০% মানুষ সমাজের বাকি মানুষদের পারিবারিক জীবনে কীভাবে প্রভাব ফেলবে তার যুক্তি খুঁজে পাওয়া কঠিন। আর পশ্চিমা দুনিয়াতে সমকামী দম্পতিদের স্বীকৃতি দেয়ার পর সমকামীরা বেশি করে সম্পর্কে আবদ্ধ হতে শুরু করেছে৷ বিষমকামী সম্পর্কগুলোর উপর তা একেবারেই কোনো প্রভাব ফেলেনি। পরিবার বলতে কিছুরই ধ্বংস হয়নি, বরং পরিবারের সংজ্ঞাটি একটু বিস্তৃত হয়েছে যা সমাজকেই করেছে আরও শক্তিশালী। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে যে পশ্চিমা দুনিয়াতে দেখা গেছে যে বাচ্চারা একটি বিষমকামী যুগলের মধ্যেকার ভালোবাসা আর একটি সমকামী যুগলের মধ্যেকার ভালোবাসার মধ্যে একেবারেই কোনো পার্থক্য খুঁজে পায় না।
১৩) সমকামীরা এবং রূপান্তরকামীরা বাংলাদেশকে ধ্বংস করে ফেলবে!
সমকামী আর রূপান্তরকামীরা পৃথিবীর কোনো দেশ আজ পর্যন্ত ধ্বংস করেনি। আর লুত ধ্বংস হয়ে যাওয়ার কাহিনীটি শুধু একটি কল্পকাহিনী মাত্র। এর কোনো ঐতিহাসিক প্রমাণাদি নেই। তাছাড়া যারা এই সকল উদ্ভট ভীতিতে ভুগে, তারা ঠিকই পশ্চিমা দেশগুলোর ভিসার জন্য সবার আগে কাতারে দাঁড়ায়, যেই দেশগুলোতে যৌন সংখ্যালঘুদের মৌলিক মানবাধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে।
১৪) সমকামীরা খালি সেক্স, সেক্স, আর সেক্স নিয়ে ব্যস্ত। চুপচাপ করলেই তো পারে। এত স্বীকৃতির কি আছে?
সারাক্ষণ ইয়ে করার কথা কি শুধু সমকামীরাই ভাবে? তাছাড়া সমকামীদের অধিকারকে খালি সেক্স করার অধিকার ভাবলে সেটা অজ্ঞতা ছাড়া আর কিছু হবে না। সমকামীরাও ভালোবাসতে জানে, একজন জীবন সঙ্গীর বাসনা ধারণ করতে পারে, তার সাথে জীবন কাটানোর স্বপ্ন দেখতে পারে। সেই ভালোবাসা, আবেগ, অনুভূতি, সুখ ও দু:খ বিষমকামীদের বেলায় যা, সমকামীদের বেলায়েও ঠিক তা।
১৫) বাংলাদেশে এই পশ্চিমা হালচাল গ্রহণযোগ্য না!
বাংলাদেশে পশ্চিমা কোন হালচালটার ছোঁয়া লাগেনি? তবে দেশে যৌন সংখ্যালঘুদের মৌলিক মানিবাধিকার নিশ্চিত হওয়া মানেই ঢাকার রাস্তায় প্রাইড পদযাত্রার অনুমতি নয়, যদিও দেশীয় কৃষ্টির প্রতি সন্মান রেখেই সেই পদযাত্রা অনুষ্ঠিত করা যায়। সমকামীদের মৌলিক মানবাধিকার নিশ্চিত হওয়া মানে দেশের দন্ডবিধি থেকে ৩৭৭ ধারা অপসারণ করা। সকল যৌন সংখ্যালঘুদের মৌলিক মানবাধিকার নিশ্চিত হওয়া মানে সংবিধানে বৈষম্য করা যাবে না এমন উল্লেখিত নির্ণায়কের তালিকায় যৌন অভিমুখিতা এবং লিঙ্গ পরিচয়কে অন্তর্ভুক্ত করা। আমরা তাহলে নিজের পায়ের নিচে নিজের দেশের মাটিটা খুঁজে পাব। চাকুরিদাতা বা বাড়িয়ালার কাছ থেকে বৈষম্য থেকে রক্ষা পাব। পরিবার, আত্মীয় বা প্রতিবেশির কাছ থেকে শারীরিক হুমকির মধ্যে পড়লে পুলিশ প্রশাসনের কাছে আশ্রয় চাইতে পারব। সমকামীদের অধিকার মানেই নাইটক্লাব, মদ ও মাদকসহ ভোগ বিলাসের জীবন নয়। সমকামীরাও দাম্পত্য জীবনযাপন করতে জানে। তাদের অধিকার হচ্ছে তাদের সেই ভালোবাসার পারিবারিক ও সামাজিক স্বীকৃতি।
১৬) বাংলাদেশে সমকামিতার বৈধতা দিলে ইসলাম ধর্মের অবমাননা হবে!
এই কথাটি ইসলামি রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, যেই দেশের সংবিধান, দন্ডবিধি ও দেওয়ানিবিধি শরীয়া আইন দ্বারা গঠিত। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই ধারণাটির কোনো স্থান নেই যদিও দেওয়ানিবিধিতে নারী ও পুরুষদের নিয়ে কিছু ধর্মীয় বিষয়কে আমলে নেয়া হয়েছে। যেসকল সমকামীরা ইসলাম বা অন্য যে কোনো ধর্মের অনুসারী, তাদের যৌন অভিমুখিতা আর ধর্মবিশ্বাসের বিরোধটির সামাল দেয়ার এখতিয়ার শুধু সেই সমকামীদের, রাষ্ট্রের না। আর ইসলাম ধর্ম কি এতটাই দুর্বল যে ৫-১০% মানুষের কারণে সেই ধর্মটির ক্ষতি সাধন হবে?
আহাম্মকের প্রশ্ন: গত ৯-১০ মাসে তো কোনো সংস্কারই চোখে পড়লো না। এখন সংস্কারের কথা বলে বলে নির্বাচন পেছানোর পায়তারা চলছে কেন?
উত্তর: বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিগত ৯-১০ মাস কেটে গেছে প্রতিদিন বিভিন্ন মানুষ ও গোষ্ঠীর লাগিয়ে দেয়া আগুন নেভানো, তাদের বিভিন্ন দাবিদাওয়ার দিকে মনোযোগ দেয়া, একটি অসহযোগিতামূলক আমলাতন্ত্রের সাথে কাজ করতে শেখা, বিভিন্ন খাতে বিভিন্ন সংস্কারের জন্য গঠন করে দেয়া বিভিন্ন কমিশনের সুপারিশমালা তৈরি করা, আরও কত কিছু নিয়ে (গত বছরের বন্যার কথা তো সবাই ভুলেই গেছে)!
এর মধ্যেই ব্যাংকিং খাতে এসেছে বিপুল সংস্কার। মরা খাতকে সরকার সবল করতে সক্ষম হয়েছে। প্রচুর বিদেশি ঋণের বকেয়া শোধ করতে পেরেছে। রপ্তানি বৃদ্ধি ও রেমিট্যান্স বৃদ্ধির সুষ্ঠ ব্যবস্থাপনার কারণে দেশে বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ আবারও উপরের দিকে উঠতে শুরু করেছে। মূল্যস্ফীতি কমতে শুরু করেছে। এখন থেকে টাকার মান বাণিজ্যিক ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হবে বলে সেই মানটা হবে বাস্তবতার নিরিখে। মোটা দাগে দেশের অর্থনীতি বর্তমানে ঘোড়ার বেগে না দৌড়ালেও তা স্থিতিশীল রয়েছে৷ দেশি বিদেশি বিনিয়োগ আসার দুটো পূর্ব শর্তের মধ্যে বর্তমান সরকার একটি শর্ত পূরণ করতে সক্ষম হয়েছে। আর তা হচ্ছে অর্থনৈতিক স্থিতিশিলতা।
দ্বিতীয় শর্তটি হচ্ছে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। আর এখানেই বিএনপি বাংলাদেশকে এই শর্ত পূরণে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ক্ষমতার লোভ সামলাতে না পেরে এই বছরের ডিসেম্বর মাসেই নির্বাচনের জোর দাবি জানিয়ে বিএনপি বাংলাদেশকে রাজনৈতিকভাবে অস্থিতিশীল করে তুলছে। অথচ বিএনপি সহ বিভিন্ন অংশীজনদের নিয়েই জাতীয় ঐক্য কমিশন আগামী সংস্কারগুলোর পরিধি নির্ধারণ করে যাচ্ছে যার প্রক্রিয়া এই বছরের জুলাই মাসে শেষ হবে একটি জুলাই সনদের ঘোষণার মাধ্যমে, এবং যেই সনদে সকল অংশীজন সই করবে।
বিএনপি এক দিকে এই প্রক্রিয়াটার সাথে যুক্ত, অন্য দিকে নির্বাচন নির্বাচন বলে রাজনীতিকে উত্তপ্ত করে ফেলছে। এটা তাদের হঠকারিতা। তারা খুব ভালো করেই জানে যে জুলাই সনদ প্রকাশিত হবার সময়ে আমরা সংস্কার পরিধির যেই রূপটি পাবো, সেটাই নির্ধারণ করে দেবে আগামী নির্বাচন কবে হতে পারে এবং সেই নির্বাচনের পথনির্দেশিকা কী হতে পারে। প্রধান উপদেষ্টা এই ব্যাপারে কিছুটা নিশ্চয়তা দেয়ার জন্য বার বার পরিষ্কার করে বলে দিয়েছেন যে সংস্কার পরিধি যাই হোক না কেন, নির্বাচনের তারিখ কোনো অবস্থাতেই ২০২৬ সালের জুন মাস অতিক্রম করবে না।
অর্থাৎ এই বছরের ডিসেম্বর থেকে শুরু করে আগামী বছরের জুনের শেষ পর্যন্ত যত খানি সময়, তার মধ্যেই কোনো এক দিন নির্বাচন হবে। এবং সেই তারিখটা আমরা কয়েকটি সপ্তাহ পরেই জুলাই সনদ প্রকাশের পরপরই জানতে পারব। চরিত্রহীন বিএনপির (এবং সিপিবির) কি এই সামান্যতম ধৈর্য দেখানোর ক্ষমতা নেই?
বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কিছু সময় আগে একটি নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশন গঠন করে, যা সম্প্রতি প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ইউনুসের কাছে তাদের প্রতিবেদন হস্তান্তর করে। গণমাধ্যমে প্রতিবেদনটির কিছু সুপারিশ বের হয়ে আসার পর হেফাজতে ইসলাম নামক দেশটির ইসলামি মৌলবাদী গোষ্ঠী কমিশনটির বিলুপ্তির আহ্বান করে। এর কারণ হচ্ছে প্রতিবেদনটিতে নারীদের ব্যক্তিগত বিষয়াদি নিয়ে কিছু দাবি দাওয়া ছিল, যা তাদের চোখে মনে হয়েছে ইসলাম বিরোধী। আসুন এবার এসবের রাজনীতিতে মনোনিবেশ করি।
বাংলাদেশে সাধারণ অপরাধ সংক্রান্ত দণ্ডবিধির বাইরে কিছু দেওয়ানি আইন রয়েছে যার মধ্যে ব্যক্তিগত আইন অন্তর্ভুক্ত, যার কিছু অংশ লিখিত, কিছু অংশ অলিখিত। এই ব্যক্তিগত আইনগুলোই বিবাহ, তালাক, উত্তরাধিকার ইত্যাদি বিষয়াদি নিয়ন্ত্রণ করে। এখানেই মুসলমান, হিন্দু, খ্রিস্টান ইত্যাদি মানুষদের জন্য ভিন্ন ভিন্ন ধর্মীয় অনুশাসন প্রযোজ্য হয়ে পড়ে, যা তাদের নিজেদের মতো করে নারীদের বিরুদ্ধে বৈষম্য করে।
বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থা থেকে এই ধর্মভিত্তিক বৈষম্যগুলো অপসারণ করার একটি মাত্র উপায় হচ্ছে দেওয়ানি আইনগুলো, যার মধ্যে ব্যক্তিগত আইনগুলো বিদ্যমান, তা প্রতিস্থাপন করে একটি নতুন, সম্পূর্ণভাবে লিখিত এবং অভিন্ন দেওয়ানি কার্যবিধি (সিভিল কোড) প্রতিষ্ঠা করা।
এই নতুন দেওয়ানি কার্যবিধিতে বিবাহ, তালাক, উত্তরাধিকার ইত্যাদি ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষরা সমান সুবিধা ভোগ করবে। বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থায় কোনো ধর্মভিত্তিক বৈষম্য অবশিষ্ট থাকবে না। বাংলাদেশের সকল ধর্মের নারী ও পুরুষের ক্ষেত্রে এই দেওয়ানি কার্যবিধি সমানভাবে প্রযোজ্য হবে, হোক তারা মুসলমান, হিন্দু, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ এবং অন্যান্য। পুরুষরা কোনো নতুন বৈষম্যের শিকার হতে পারবে না।
এখানেই সমস্ত প্রতিকূলতার উদয় হতে পারে। বাংলাদেশের আইনি ব্যবস্থা, যা নিধার্মিক বিলেতি সাধারণ আইন (কমন লও)-এর ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত, সেখানে ব্যক্তিগত আইনই একটি মাত্র ক্ষেত্র যেখানে ধর্মীয় অনুশাসনগুলোকে স্থাপন করা হয়েছে, হোক সেগুলো মুসলমানদের, হিন্দুদের, খ্রিস্টানদের ইত্যাদি। সম্ভাব্য প্রয়োজনীয়তার খাতিরেই বিলেতি শাসকরা তা করেছিল।
মুসলমান অথবা হিন্দুরা, যারা চিরকাল বিবাহ, তালাক উত্তরাধিকার ইত্যাদি বিষয়ে ধর্মীয় অনুশাসনগুলো মেনে এসেছে, তারা কি বিচার ব্যবস্থা থেকে এই অনুশাসনগুলোর অপসারণে সায় দেবে? অনেক মুসলমান নারীরাই হয়তো দেবে, যাতে তাদেরকে তাদের ভাইদের তুলনায় অর্ধেক সম্পত্তি পেয়ে সন্তুষ্ট থাকতে না হয়।
অনেক হিন্দু নারীরাও হয়তো খুশি হবে, কারণ একটি অভিন্ন দেওয়ানি কার্যবিধির আওতায় তারা প্রথমবারের মতো তাদের স্বামীদেরকে তালাক দিতে পারবে। তো এই আইনি পরিবর্তনগুলোর সবচেয়ে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে কারা? এর উত্তর স্পষ্টতই হচ্ছে পুরুষরা, যারা ধর্মীয়ভাবে নির্দিষ্ট করে দেয়া বারতি সুবিধা ভোগ করে এসেছে যা তারা এখন হারাতে বসতে পারে।
এই হচ্ছে হেফাজতের হুংকারের কারণ। এই গোষ্ঠী, সাথে আরও কম চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলো মিলে নিশ্চিত করবে যে বাংলাদেশে কোনো দিন কোনো অভিন্ন দেওয়ানি কার্যবিধি প্রতিষ্ঠিত হবে না। এমনকি যেসকল পুরুষগণ নারীর সমতাকে সমর্থন করে, তারা শক্ত ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে ব্যক্তিগত আইনগুলোর বিলুপ্তি সহ্য করতে পারবে না – নারীদের বেলায়েও তা সত্য। অথচ সেটা সাধন করতে না পারলে নারীরা বাংলাদেশে কোনো দিনও পুরুষদের সাথে সম্পূর্ণ সমতা অর্জন করতে পারবে না।
বিশেষ হালনাগাদঃ বিগত ৫ তারিখে এই লেখাটির ইংরেজি সংস্করণটি প্রকাশ করার পরপরই বাংলাদেশি একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলে আমার একটি সাক্ষাৎকার দেখার সৌভাগ্য হয় যেখানে কমিশনের দুইজন সদস্য যথেষ্ট বেগের সাথে সকলকে বুঝিয়েছেন যে ধর্মীয় ব্যক্তিগত আইনগুলোকে স্পর্শ করা হয়নি।
তারা একটি ঐচ্ছিক এবং নিধার্মিক দেওয়ানি কার্যবিধি (সিভিল কোড)-এর প্রস্তাবনা রেখেছেন, যেখানে ব্যক্তিগত আইনগুলো হবে নিধার্মিক এবং শুধু তাদের জন্য প্রযোজ্য হবে যারা ইচ্ছাকৃতভাবে এই আইনের আওতায় পারিবারিক ব্যাপারগুলো সম্পন্ন করতে চায়। এই কার্যবিধিটি হবে সকল ক্ষেত্রে পরম সমতার ভিত্তিতে। এটি একটি অভিনব চিন্তা যা যথেষ্ট পর্যালোচনার দাবি রাখে।
Bangladesh’s Interim Government’s Chief Adviser Professor Yunus had recently appointed a Women’s Affairs Reform Commission, which has recently submitted its report to the Chief Adviser. After some of the report’s recommendations appeared in the media, the country’s fundamentalist Islamic group called Hefazat-e-Islam called for the disbandment of the Commission.
This is due to some demands of a personal nature to do with women that were considered un-Islamic. One such demand was the right to equal inheritance as men. Let’s dive into the politics of it all.
In Bangladesh, outside of the Penal Code (which deals with general criminality), we have a set of Civil Laws which contain Personal Laws, some codified and some not. It is these Personal Laws that govern issues of marriage, divorce, inheritance etc. This is where religious edicts come in for Muslims, Hindus, Christians etc. which are all different and discriminate against women in their own ways.
The only way to remove these varying degrees of religion based discrimination from Bangladesh’s legal system is by replacing the Civil Laws (which contain the religion based Personal Laws), with a new fully coded and uniform Civil Code.
In this new Civil Code, men and women would enjoy equal facilities when it came to the benefits of marrigage, divorce, inheritance etc. There would be no religion based discrimination left in Bangladesh’s legal system. Men and women of all religions in Bangladesh would have this Civil Code equally applicable to them, be they Muslim, Hindu, Christian, Buddhist and others. Men would not be subject to any new discrimination.
This is where all the difficulty would arise. In Bangladesh’s legal system which is based on the secular British Common Law, the area of Personal Law is the only area where religious edicts have been put in place, be they Muslim, Hindu, Christian etc. (it was the British rulers who did this out of presumed necessity).
Would Muslims or Hindus who have always obeyed these religious instructions in the areas of marriage, divorce, inheritance etc. be willing to see them eliminated from the legal system? Many Muslim women may wish to, since they would no longer have to contend with just half the amount of inheritance as that of their brothers.
Many Hindu women would be happy too, since under a uniform Civil Code, they would for the first time be able to divorce their husbands! So who would be the obstacles to these legal changes? The answer is obviously men who have enjoyed religiously sanctioned privileges that they would now be set to lose.
This explains Hefazat’s screaming! Groups such as these (and many moderate ones too) would see to it that Bangladesh never gets a uniform Civil Code. Even men who support equality for women may simply not be able to contend with the elimination of the Personal Laws out of strong religious beliefs (same with women). Yet, unless that can be achieved, women in Bangladesh will never achieve full equality with men.
Special Update: Soon after publishing of this blog, I had the pleasure of watching an interview on a private Bangladeshi TV channel where a couple of the members of the Commission were interviewed. That is where they went at great lengths to explain that existing Personal Laws would not be touched.
What they have proposed is an optional non-religious Civil Code containing non-religious Personal Laws for those who wish to opt-in to it. It would be based on absolute equality in all personal spheres. This is a novel idea that is definitely worth a lot of consideration.
বাংলাদেশের রাষ্ট্র সংস্কার বা মেরামত, সাথে নির্বাচন নিয়ে যারা বিএনপির প্যান প্যান এবং অসহযোগিতামূলক রাজনীতির কারণে আগামী কয়েকটা মাসের চিত্রটা বুঝতে হিমসিম খাচ্ছেন, বা সঠিক চিত্রটা বোঝার জন্য যেই মেহনতটার প্রয়োজন, তা করতে অপারগ, অক্ষম বা অলস, তাদের জন্য এই লেখাটা দিলাম।
প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ইউনুস ছাত্র-জনতার দাবী বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে রাষ্ট্রের বিভিন্ন খাতের সংস্কার বা মেরামতের সুপারিশমালা তৈরি করার জন্য অনেকগুলো কমিশন গঠন করে দিয়েছিলেন। কয়েকটা খাতের উদাহরণ হচ্ছে প্রশাসন, পুলিশ, সংবিধান, নির্বাচন ইত্যাদি। তাদের মধ্যে ছয়টা কমিশন তাদের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। বাকিরাও দিচ্ছে।
পরবর্তী কাজ হচ্ছে অধ্যাপক ইউনুস এবং অধ্যাপক আলী রীয়াজের নেতৃত্বে একটি জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের মাধ্যমে সকল রাজনৈতিক দলের সাথে বসে সকলের লিখিত মতামতের ভিত্তিতে একটি ন্যূনতম সংস্কারের রূপরেখা প্রণয়ন। বুঝাই যাচ্ছে যে বিএনপি খুবই কম সংস্কার চাবে আর বাকিরা (বিশেষ করে নব নির্মিত এনসিপি) কমিশনগুলোর সকল সুপারিশ বাস্তবায়ন চাবে। এই দর কষাকষি চলবে আগামী জুলাই পর্যন্ত যার নেতৃত্ব দেবে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন।
দর কষাকষির শেষে আগামী সম্ভাব্য সংস্কারের পরিধি নিয়ে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হলে প্রশ্ন উঠবে সেই পরিধিটা কি অনেক বড় (অনেক সংস্কারের)? নাকি অনেক ছোট (অল্প সংস্কারের)? ছোট পরিধির হলে সরকার এই বছরের ডিসেম্বর মাসে নির্বাচন দিয়ে দেবে এবং তার আগে ছোট সংস্কারগুলো সম্পন্ন করে ফেলবে। বড় পরিধির হলে সরকার আগামী বছরের জুন মাসে নির্বাচন দেবে এবং তার আগে বড় সংস্কারগুলো সম্পন্ন করে ফেলবে।
এখানে বিশেষভাবে বলে রাখা উচিৎ যে সংস্কার কমিশনগুলো তাদের প্রতিবেদন তৈরি করার সময়ে নানা উপায়ে দেশের জনগণের কাছ থেকে প্রচুর সুপারিশ ও মতামত গ্রহণ করেছিল। কাজেই দিনের শেষে সংস্কারের পরিধি নিয়ে একটি ন্যূনতম ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হতে পারলে নির্দিধায় বলা যাবে যে সেখানে জনগণেরই আকাঙ্খা ফুটে উঠেছে। সেই আকাঙ্খাকে আনুষ্ঠানিক একটা রূপ দেয়ার জন্য জুলাই মাসে লিখিত আকারে ঘোষণা করা হবে একটি “জুলাই সনদ”, ইংরেজিতে যেটা “জুলাই চারটার”। এই সনদে প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দল সই করবে এবং সনদটি তখন হয়ে উঠবে বাংলাদেশ ২.০ গড়ে তোলার পথ নির্দেশক।