ধর্ষণ রোধের নিরাময় – আরো বেশি ধর্ম, না কি আরো কম?

রিয়াজ ওসমানী

৫ অক্টোবর ২০২০

বাংলাদেশে সম্প্রতি নারী ধর্ষণের ধারাবাহিকতা সবাইকে স্বাভাবিকভাবেই বিচলিত করেছে এবং মাঠেও পুনরায় নামতে বাধ্য করেছে। আমি এই আন্দোলনের সফলতা কামনা করছি। এই সব ঘটনার পেছনে রাজনৈতিক ক্ষমতার উৎস সহ অন্যান্য মদদের উৎস উদ্ঘাটন করা জরুরী। দোষীদেরকে যথাযথ আইনে শাস্তি প্রয়োগ করতে হবে এবং এই সব ঘটনার শিকার নারীদেরকে সকল প্রকার রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, পারিবারিক, ব্যক্তিগত ও মানসিক সহায়তা ও সমর্থন দিতে হবে। কিন্তু একটা ব্যাপারে আমাদেরকে স্পষ্ট হয়ে যাওয়া উচিৎ। ধর্ষণ রোধ করা কি শুধু আইন প্রয়োগের ব্যাপার? সকল ধর্ষকদের ধরে ধরে কয়েদী বানালে, বা তাদের পুরুষাঙ্গ কেঁটে ফেললে বা তাদেরকে বিচার বহির্ভূতভাবে হত্যা করে ফেললে আমরা কি আসলেই ধর্ষণ বন্ধ করতে পারবো? নতুন নতুন ধর্ষকদের আগমন রোধ করার উপায় কি আসলে এগুলোই?

প্রশ্নটা করছি কারণ একজন ধর্ষককে যথাযথ সাজা দিয়েও নতুন আরেকজন ধর্ষকের আগমনকে ঠেকানো যাবে বলে আমার মনে হয় না। ধর্ষণের জন্য দেশে কঠোর শাস্তি ও তার প্রয়োগের বিধান থাকলে এই অপরাধের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা থাকবে, একটা প্রতিবন্ধকতা থাকবে। কিন্তু ধর্ষক তৈরি বন্ধ হবে না। এর কারণ, শুধু সচেতনতা দিয়ে বা নারীকে সন্মান দেখাতে শিখিয়ে একটা যৌন বিস্ফোরণ (সাথে যৌন ক্ষমতার অপব্যবহার) কে আটকানো সহজ হলে এতো দিনে এই পৃথিবী থেকে নারী ধর্ষণ বন্ধ হয়ে যেত। সেটা না হয়ে আমরা বরং আমাদের ধর্মীয় সামাজিক রীতির আওতায় একেকজন (পুরুষ) ধর্ষক তৈরি করছি যাদেরকে যে কেউই উস্কানি দিয়ে একটা নিরীহ নারী বা শিশুর উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে সফল করতে পারে।

বয়ঃসন্ধিকালের পর ছেলেদের যৌন উত্তেজনা তুঙ্গে থাকে আঠারো (১৮) বছর বয়সে। মেয়েদের সেটা হয় আরো পরে (কথাটা ভুল হলে আমি দুঃখিত)। অথচ ধর্মীয় সামাজিক রীতি অনুযায়ী সকলের বিবাহপূর্ব যৌনসম্পর্ক নিষিদ্ধ। আবার ধর্মীয় রীতির প্রতি শ্রদ্ধা রেখে আঠারো বছর বয়সে সকল ছেলেকে একটা মেয়ের সাথে বিয়ে করিয়ে দেয়াটাও দায়িত্বহীনতার কাজ যেহেতু সেই বয়সে একটা ছেলের সংসার চালানোর মতো আর্থিক, পেশাভিত্তিক ও মানসিক ক্ষমতা নাও থাকতে পারে (মেয়েদের ক্ষেত্রেও তাই)। ফলে যেটা দাঁড়ায় যে অনেক ছেলেরাই আছে যারা ২৫-৩০ বছর বয়স অতিক্রম করার আগ পর্যন্ত কোনো প্রকার যৌন অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিত। তার উপর যারা কট্টর ইসলামে বিশ্বাসী, তারা শিখেছে যে হস্তমৈথুন করা হারাম। তাদেরকে শিখানো হয় বিয়ের আগ পর্যন্ত নামাজ-কোরআন পড়ে সকল দৈহিক যৌন চাহিদা উপেক্ষা করতে এবং সেগুলোকে দমন করে রাখতে।

এবার আপনারাই বলুন। একটা মানুষের স্বাভাবিক যৌনতাকে বয়ঃসন্ধিকাল থেকে বিবাহপূর্বক অবদমন করে রাখার ফলে আমরা কি কিছু অসুস্থ মানুষ তৈরি করছি না? যেই মানুষটাকে প্রাপ্তবয়স লাভ করার পর যৌনভাবে ক্ষুধার্ত করে রাখা হয়েছে, সে কি এক সময়ে কোনো বিশেষ চুলকানি বা উস্কানি দ্বারা প্রভাবিত হয়ে হিংস্র হয়ে যাওয়ার ক্ষমতা রাখে না? এখানে খাঁচায় বন্দী বাঘের তুলনা করলে ভুল হবে না। আমরা কি এরকম একটা সমাজে বাস করি, যেখানে যৌন চুলকানি বা উস্কানি থাকবে না? এটা তো অবান্তর! একজন পুরুষের অবশ্যই দায়িত্ব নিজের উত্তেজনাকে সংযম করে রাখা – সেই দায়িত্ব আর কারোর না, নারীদের এবং তাদের পোশাকের তো নয়ই। কিন্তু আমরা একটা বিশেষ ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী এদেরকে জীবন কাঁটাতে বাধ্য করে এদের দায়িত্বটাকে আরো কঠিন করে দিচ্ছি কেন? আমরাই তো এই ধর্ষকদের তৈরি করছি। যে কোনো পুরুষেরই সম্ভাবনা আছে একজন ধর্ষক হয়ে যাওয়ার। কয়জনকে আপনারা বন্দুকযুদ্ধে মারবেন?

সময় এসেছে বাংলাদেশের ধর্মীয় সমাজের একটা আগাগোড়া সংস্কারের, হোক সেটা সময় সাপেক্ষ। সমস্যার গোঁড়া উন্মোচন করলে দেখা যাবে যে বর্তমান ধর্মীয় রীতি এই মহামারী রোধে ব্যর্থ। এবং ধর্মীয় রীতির আরো কঠোর প্রয়োগ তৈরি করবে আরো যৌনক্ষুধার্ত পুরুষ এবং মহিলা। আমি বলবো এটা প্রকৃতি বিরুদ্ধ। আর এই কারণেই সৌদি আরবের মতো কট্টর ইসলাম ধর্ম প্রতিষ্ঠা করা দেশটিতেও নারীদের উপর ধর্ষণ সহ সকল প্রকার অন্যায় বিদ্যমান, যদিও তার সংবাদ আনুষ্ঠানিকভাবে বের হয়ে আসার কোনো সুযোগ নেই।

আমাদেরকে বুঝতে হবে যে ধর্ষণের নিরাময় আরো বেশি ধর্ম নয়, আরো কম ধর্ম। আঠারো বছর বয়স অতিক্রম করার পর যুবক ও যুবতিদের মাঝে বিয়েপূর্বক যৌনাচারকে আমাদের স্বাভাবিক মনে করতে হবে। এই যৌনাচার প্রেমের আলিঙ্গনে হতে পারে আবার নাও হতে পারে। পরিচিত একজন আরেকজনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে সম্পূর্ণ সন্মতিতে একজন আরেকজনকে আনন্দ দেয়ার কারণেও এই যৌনতায় লিপ্ত হওয়ার অবকাশ থাকতে হবে। এই যৌন সম্পর্কের উদ্দেশ্য ভবিষ্যতে একজন আরেকজনকে বিয়ে করা হতে পারে আবার নাও হতে পারে। নিরাপদ যৌনকর্ম অনাকাঙ্খিত গর্ভধারণ বা যৌনরোগ সংক্রমনকে বিরত রাখতে পারবে। বাংলাদেশের উচ্চ আধুনিক সমাজে এই রীতির কিছুটা হদিস এখনই বিদ্যমান। অন্যত্রও এই রীতি পরিবার ও লোকচক্ষুর অন্তরালে চলছে। বিয়ের পর যৌনসঙ্গী হিসেবে তারা একজন আরেকজনকে একক হিসেবে রাখবে কি না সেটা একান্ত তাদের সিদ্ধান্ত। তবে সেখানে থাকতে হবে সততা, সচ্ছতা এবং সন্মতি। প্রতারণামূলক পরকীয়ার কোনো স্থান নেই একটা সুস্থ বিবাহ জীবনে।

পরষ্পর সন্মান বজায়ে রেখে যারা প্রাপ্তবয়স থেকেই সন্মতিসূচক যৌনাচারে লিপ্ত হতে শিখে এবং যৌনক্ষুধা থেকে রেহাই পেয়ে জীবনের স্বাদ পেতে পারে, তারা কোনো এক সময়ে ধর্ষক হয়ে উঠবে, সেই সম্ভাবনা অপেক্ষাকৃত কম। তাদেরকে রাজনৈতিক ও অন্যান্য উস্কানি দিয়ে কারোর উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে বাধ্য করার সফলতার সম্ভাবনাও কম। নারীদের পোশাক, হাত, পেট, বুক, পাছা এগুলো তাদেরকে ক্ষুধার্ত বাঘের মতো বিপজ্জনক করে তুলবে না। নারীরাও সমাজের সর্বস্তরে স্বাচ্ছন্দ্যে চলাফেরা করতে পারবে বোরখা-হিজাবের কথা না ভেবে। সুস্থ যৌনতায় তৃপ্ত মানুষরা কখনো ধর্ষক হয় না। ধর্ষক তারাই হয় যারা যৌনভাবে অবদমিত এবং অসুস্থ। এবং সেই অসুস্থতা আমরাই তাদের মাঝে তৈরি করে দিয়েছি এবং দিচ্ছি একটি ব্যর্থ ধর্মীয় রীতির ছত্রছায়ায়।


To Mark Zuckerberg

Riaz Osmani

July 22, 2020

This article is aimed at Mark Zuckerberg as well as the Facebook authority in general. I wish to highlight the fact that Facebook has been knowingly or unknowingly deactivating accounts of numerous atheists, ex-Muslims and freethinkers in Bangladesh. It is conceivable that a similar situation exists in other Muslim majority countries. Facebook has become almost indispensable for the young and tech savvy population of Bangladesh, due to the availability of cheap smartphones and the ability to post and comment in the Bangla language. This has given rise to a vibrant online world in the country, where people can now connect and converse in a way that was never possible.

One phenomenon of this vibrant Facebook world is that Islamic preachers have found a new medium to spread their word. Equally, the previously silent group of atheists, ex-Muslims and freethinkers have also found a new way to challenge some of the deeply held ideas of Muslims. These Godless heathens have taken it upon themselves to discuss various verses from the Quran and Hadith with the following in mind. Muslims believe the Quran to be the absolute word of God whereas Hadith is a compilation of various sayings of the Prophet Muhammad. In countries like Bangladesh, both the Quran and Hadith are sacrosanct. One must not question but instead believe and obey.

To add a twist to all this, most Bangladeshis have not read the Quran or Hadith in a language they understand. Both the Quran and Hadith were written in Classical Arabic and there is no social endeavour to concentrate on Bangla translations. Children from a very early age are taught to recite Arabic letters and words, and thus learn to pronounce and recite the whole Quran over time. Many are even encouraged to memorize the whole thing. Missing from all this is any comprehension of what is being read. Most Muslims in Bangladesh and indeed many non-Arabic speaking countries do not have comprehensive knowledge of what they are reciting day in and out.

Knowledge of the contents of these books is limited to what various Islamic priests known as Imams regularly sermonize to a congregation either in a Mosque or in another type of religious event. These priests, teachers or scholars selectively translate and explain the message of Quran and Hadith in a way that maintains good PR. It is those selective verses that followers of Islam, both and young and old, take to heart and regurgitate at the earliest opportunity. It is this selective knowledge that forms the basis of the faith for most Muslims in Bangladesh and it is not strongly encouraged to look deeper into the scriptures. That is left to the capabilities of the preachers and scholars.

Atheists, ex-Muslims and freethinkers in Bangladesh have found Facebook an opportunity to highlight verses from both the Quran and Hadith that are skilfully pushed aside by the preachers. Verses that have been used over 1400 years by the male dominated Islamic societies to subjugate the status of women, the LGBT community and non-believers, have been brought to light and discussed. This has given rise to anger among many Muslim Facebook users who have reported such posts to be demeaning of Islam and the Muslim community. Since most of the posts and discussions regarding the above are in the Bangla language, Facebook does not have enough resources to investigate the complaints of the angry Facebook users. If posts by an atheist, ex-Muslim or freethinker regularly receive a certain number of reports from Muslim members, then Facebook eventually deactivates the account of the one who made those posts.

On the other hand, whenever we have reported posts by Muslim fundamentalists calling for death to all homosexuals and atheists in Bangladesh, we received a canned response back stating that the posts in question did not violate Facebook’s community standards. Really?

I think Mark Zuckerberg will agree with me that discussing various verses from the Quran and Hadith, as to how they have been used to subjugate women, gays and non-believers, as well as in recent times to conduct some of the worst terrorist atrocities in both Muslim and non-Muslim countries, does not tantamount to Islamophobia or denigrating a particular religious group. Instead, it is a legitimate discussion that is incidentally forbidden in Islam. And yet we, the Bangladeshi atheists, ex-Muslims and freethinkers now find our voices stifled and our freedom of speech curbed, because Facebook deactivated our accounts upon receiving numerous complaints from believers.

I hope Mark Zuckerberg will also agree with me that it is a legitimate discussion to have, regarding how religions like Islam have in general suppressed free thinking, flourishment of individuality, freedom of sexuality, and the attainment of knowledge through science. Islam is a highly textualized faith based on ground realities of Arabia over 1400 years ago. It itself declares that it forms a complete and immutable way of life and disallows its followers to pursue a non-prescribed way of being. Most Muslims however cherry-pick the aspects of this complete way of life that suit their current circumstances and then claim to be pious and righteous Muslims. It is a legitimate discussion to condemn this hypocrisy especially when it is used to judge people anywhere from Muslims who observe even less, to non-Muslims, apostates and LGBT people (Muslim or otherwise).

It is a legitimate discussion to highlight systematic boy rapes and other forms of physical torture that are inflicted upon poor and orphaned young male students in Islamic schools called Madrasas. These are inflicted by the teachers of the same-sex residential Madrasas as well by older male students. It is a legitimate discussion to highlight the fact that many Imams themselves are involved in rapes of young girls and women. Physical violence against children and women need no further mention.

It is a legitimate discussion where the life of Prophet Muhammad is brought to light, even aspects of his life that veer towards his personal matters of marriage and sexual relations as narrated in the scriptures. All aspects of Prophet Muhammad’s life, and not just a select few, should be up for discussion since most male Muslims in Bangladesh (and elsewhere) openly express their desire to follow his footsteps in their entirety (including personal grooming).

It is a legitimate discussion to question the very authenticity of Islam and its history as narrated in the Quran and Hadith. It is legitimate as a freely thinking human being to question the very authenticity of the Quran and Hadith and how those books came about. It is equally valid to question the very idea of a belief system, as prescribed by Islam or any other organised religion. It is valid to point out that such a belief system that maintains the notion of “I blindly believe and hence it must be true”, is against all forms of rational reasoning and proof.

Mr. Zuckerberg, many of our Facebook accounts have been deactivated including my own. We also think Facebook is succumbing to requests from the government of countries like Bangladesh to muzzle our voice. This is where Facebook is failing in its commitment to protecting free speech and connecting people across the globe. And Facebook is doing this to us against the backdrop of numerous atheists, ex-Muslims, free thinkers, writers, bloggers, leaders of non-Muslim faiths, cultural activists and gay rights activists that have been killed in Bangladesh by Islamic terrorists, all in the name of Islam, a few years ago. Muslims in the country, generally speaking, did not lament these incidents, since it was their faith that was supposedly criticized by those who lost their lives or was tainted by the incongruent lifestyles of the latter. This was also the overall political position of the government. And Mr. Zuckerberg, do you know where these murders were encouraged into fruition? On Facebook itself.

I hope you and your team will look into this matter seriously. Our Facebook accounts must be reactivated, and procedures be put in place so that legitimate discussions on, and criticism of Islam, are not suppressed. Moreover, Facebook needs to hire enough experts in the Bangla language so that it is possible for members of your team to analyse the posts and comments carefully and be able to make more appropriate decisions about them.

Thank you very much Mr. Zuckerberg. My best wishes go to all the atheists, ex-Muslims and freethinkers in Bangladesh and around the world.

Related Blog: Islamic Digital Terrorism


মার্ক জুগারবার্গের উদ্দেশ্যে

রিয়াজ ওসমানী

২২ জুলাই ২০২০

এই প্রচ্ছদটি মার্ক জুকারবার্গ তথা সাধারণ ফেসবুক কতৃপক্ষের উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট করা হলো। আমি এখানে তুলে ধরতে চাই যে ফেসবুক কতৃপক্ষ জেনে বা না জেনে বাংলাদেশের অসংখ্য নাস্তিক, প্রাক্তন মুসলমান এবং মুক্তমনাদের একাউন্ট নিষ্ক্রিয় করে যাচ্ছে। এটা ধারণা করা যায় যে অন্য মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোতেও একই অবস্থা বিরাজমান। বাংলাদেশের তরুণ এবং তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষ জনগষ্ঠির জন্য ফেসবুক প্রায় অপরিহার্য হয়ে উঠেছে, যার সহায়ক হিসেবে কাজ করেছে সস্তা স্মার্ট মুঠোফোন এবং বাংলা ভাষায় স্থিতি দেয়া এবং মন্তব্য করতে পারার ক্ষমতা। এর ফলে দেশের ভেতর একটা প্রাণবন্ত অনলাইন জগত তৈরি হতে পেরেছে, যেখানে মানুষ এখন যোগাযোগ এবং কথোপকথন করতে পারে যা আগে সম্ভব ছিল না।

এই প্রাণবন্ত ফেসবুক জগতের একটা ঘটমান বিষয় হচ্ছে যে ইসলাম ধর্মের প্রচারকরা তাদের বক্তব্য ছড়িয়ে দেয়ার জন্য একটা নতুন মাধ্যম খুঁজে পেয়েছে। সমানভাবে, পূর্বে নিরব নাস্তিক, প্রাক্তন মুসলমান এবং মুক্তমনাদের গোষ্ঠীটিও মুমিনদের মনে গভীরভাবে ধরে রাখা বিভিন্ন অভিমতগুলোকে সংপ্রশ্ন করার একটা পথ খুঁজে পেয়েছে। নিম্নে বর্ণিত উদ্দেশ্য নিয়ে এই অবিশ্বাসী বিধর্মীরা নিজেদের উপর নিয়ে নিয়েছে কোরআন ও হাদিসের বিভিন্ন উক্তি নিয়ে আলোচনা করা দায়িত্বটি। মুসলমানরা বিশ্বাস করে যে কোরআন হচ্ছে সৃষ্টিকর্তার সার্বভৌম বাণী এবং হাদিস হচ্ছে নবী মুহাম্মদের বিভিন্ন বক্তব্যের সংকলন। বাংলাদেশের মতো দেশে কোরআন এবং হাদিস উভয়ই অলঙঘনীয়। কেউ কোনো প্রশ্ন করতে পারবে না, বরং সব কিছু বিশ্বাস এবং মান্য করতে হবে।

এর মধ্যে মজার বিষয় হচ্ছে যে বেশির ভাগ বাংলাদেশিরা মর্মগ্রহণ করতে পারে এমন একটা ভাষায় কোরআন বা হাদিস পড়েনি। কোরআন এবং হাদিস দুটোই লেখা হয়েছে শাস্ত্রীয় আরবি ভাষায় এবং বাংলা অনুবাদের দিকে মনোযোগ দেয়ার জন্য কোনো সামাজিক উদ্যোগ নেয়া হয়নি। অনেক অল্প বয়স থেকে শিশুদেরকে আরবি অক্ষর আর শব্দ উচ্চারণ করতে শেখানো হয়, এবং এর ফলে সময়ের সাথে সাথে পুরা কোরআন শরীফ উচ্চারণ করতে পারার ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। অনেককেই পুরাটা গ্রন্থ মুখস্ত করে ফেলতে উৎসাহ দেয়া হয়। কিন্তু এই প্রক্রিয়ার মাঝে বাদ পড়ে যায় কী পড়া হচ্ছে তার কোনো উপলব্ধি। বাংলাদেশ তথা আরবি ভাষা বলা হয় না অধিকাংশ এমন সব দেশের বেশির ভাগ মানুষরাই প্রতিদিন কী পাঠ করছে তার বিস্তারিত জ্ঞান আয়ত্তে রাখে না।

এই বইগুলোতে কী আছে তা বিভিন্ন ইমাম বা হুজুররা মসজিদে বা অন্য কোনো ধর্মীয় সমাবেশে কী বয়ান দিচ্ছে তার উপর নির্ভরশীল। এই সব মওলানা, শিক্ষক এবং বিদ্বানরা বাছাইকৃতভাবে কোরআন এবং হাদিসের অনুবাদ এবং ব্যাখ্যা তুলে ধরেন যাতে এতে করে জনগণের মাঝে সর্বদা একটা ইতিবাচক ধারণা সৃষ্টি হয়। এই বাছাইকৃত উক্তিগুলোই ইসলামের নবীন ও প্রবীণ অনুসারীরা হৃদয়ঙ্গম করে সময় এবং সুযোগ বুঝে পুনরাবৃত্তি করে বেড়ায়। এই নির্বাচিত জ্ঞান ভান্ডারই হচ্ছে বাংলাদেশে অধিকাংশ মুসলমানদের বিশ্বাসের ভিত্তি এবং ধর্মগ্রন্থগুলোকে গভীরভাবে পর্যালোচনা করাটাকে জোরালোভাবে উৎসাহিত করা হয় না। সেটা প্রচারক এবং বিদ্বানদের উপরেই ছেড়ে দেয়া হয়।

বাংলাদেশে নাস্তিক, প্রাক্তন মুসলমান এবং মুক্তমনারা ফেসবুকের মাধ্যমে সুযোগ পেয়েছে কোরআন ও হাদিসের সেই উক্তিগুলো তুলে ধরার, যেগুলো প্রচারকরা এতো দিন কৌশলে এড়িয়ে গিয়েছেন। ১৪০০ বছরের বেশি সময় ধরে পুরুষ শাসিত ইসলামী সমাজগুলোতে যেই উক্তিগুলো ব্যবহার করে নারী, যৌন সংখ্যালঘু এবং কাফেরদের পদমর্যাদা ক্ষুণ্ণ করা হয়েছে তা তুলে ধরে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এর ফলশ্রুতিতে ফেসবুকের অনেক মুসলমান সদস্যদের মাঝে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে এবং আলোচ্য পোষ্টগুলো ইসলাম ধর্ম এবং মুসলমান সম্প্রদায়ের মর্যাদা বিনষ্ট করেছে বলে সেই সদস্যরা অভিযোগ করেছে। যেহেতু উপরের বিষয়বস্তু নিয়ে অধিকাংশ স্থিতি এবং মন্তব্যগুলো বাংলা ভাষায় করা হয়েছে, সেহেতু ফেসবুকের যথেষ্ট সম্বল নেই রাগান্বিত ফেসবুক ব্যবহারকারীদের সকল অভিযোগ তদন্ত করে দেখার। একজন নাস্তিক, প্রাক্তন মুসলমান বা মুক্তমনার স্থিতি বা মন্তব্যগুলো যদি মুসলমান ব্যবহারকারীদের দ্বারা নিয়মিত কিছু অভিযোগের শিকার হয়, তাহলে ফেসবুক দিন শেষে যে মানুষটা সেই স্থিতি বা মন্তব্যগুলো দিয়েছেন তার একাউন্ট নিষ্ক্রিয় করে ফেলে।

অন্যদিকে যখনই আমরা বাংলাদেশে সকল সমকামী এবং নাস্তিকদের খুন করে ফেলার উদ্দেশ্যে মুসলমান মৌলবাদীদের দ্বারা প্রকাশ করা বিভিন্ন স্থিতির অভিযোগ করি, তখনই আমরা একটি প্রস্তুত করা উত্তর পেয়েছি যে উক্ত স্থিতিগুলো ফেসবুক সম্প্রদায়ের নীতিমালা লঙ্ঘন করেনি। আসলেই তাই?

আমার মনে হয় মার্ক জুকারবার্গ আমার সাথে একমত হবেন যে নারী, সমকামী এবং বিধর্মীদেরকে দমিত করে রাখার জন্য, এবং সম্প্রতিকালে মুসলমান ও অমুসলমান দেশগুলোতে সবচেয়ে নিকৃষ্ট সন্ত্রাসী কার্যকলাপ ঘটানোর জন্য কোরআন ও হাদিসের বিভিন্ন আয়াত বা উক্তিগুলোকে কীভাবে ব্যবহার করা হয়েছে সেগুলো বিশ্লেষণ করাটা ইসলাম বিদ্বেষী মনোভাব পোষণ করা, বা একটি বিশেষ ধর্মীয় সম্প্রদায়কে কালিমালিপ্ত করার শামিল নয়। বরং এটা একটা উপযুক্ত আলোচনা, প্রসঙ্গক্রমে যেটা ইসলাম ধর্মে নিষিদ্ধ। অদৃষ্টের পরিহাস এই যে আমরা বাংলাদেশি নাস্তিক, প্রাক্তন মুসলমান এবং মুক্তমনারা এখন আমাদের কন্ঠগুলোকে রুদ্ধ পাচ্ছি এবং আমাদের বাকস্বাধীনতা খর্বিত দেখছি, কারণ ধর্ম বিশ্বাসীদের কাছ থেকে বিভিন্ন অভিযোগ পাওয়ার পর ফেসবুক আমাদের একাউন্টগুলো নিষ্ক্রিয় করে দিয়েছে।

আমি আশা করি যে মার্ক জুগারবার্গ আমার সাথে একমত হবেন যে ইসলামের মতো ধর্মগুলো কীভাবে মুক্তচিন্তা, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের বিকাশ, যৌনতার স্বাধীনতা, এবং বিজ্ঞান মারফত জ্ঞান অর্জনকে সাধারণভাবে দমন করে রেখেছে, সেগুলো নিয়ে আলাপচারিতা করাটা একটি ন্যায্য প্রচেষ্টা। ইসলাম হচ্ছে একটি গাঁথাই করে লিখে দেয়া ধর্ম যা ১৪০০ বছর আগেরকার আরব মুরুভূমির স্থানীয় বাস্তবতার উপর উদিত। ইসলাম নিজেই একটি পূর্ণাঙ্গ এবং অপরিবর্তনীয় জীবনধারা হিসেবে নিজেকে ঘোষিত করেছে এবং এই ধর্মের অনুসারীদেরকে এর ব্যতিক্রমী জীবন যাপন করতে নিষেধ করে দিয়েছে। তবে অধিকাংশ মুসলমানরা নিজেদের সুবিধা-অসুবিধার সাথে সামঞ্জস্য রেখে এই পূর্ণাঙ্গ জীবনধারার বিশেষ কিছু দিকগুলো বাছাই করে গ্রহণ করে নিয়ে নিজেদেরকে বড় ধার্মিক ও ন্যায়নিষ্ঠ মুসলমান বলে দাবি করে। এই কপটতাকে নিন্দা করাটা একটা উপযুক্ত প্রয়াস, বিশেষ করে যেহেতু এই ভন্ডামির ছত্রছায়ায়েই যেসকল মুসলমানরা উপরের এই মানুষদের চেয়েও কম ইসলামী জীবনধারা মেনে চলে, তাদের থেকে শুরু করে অন্য ধর্মালম্বী, ধর্মত্যাগী এবং মুসলমান ও অমুসলমান যৌন সংখ্যালঘুদেরকে হেয় প্রতিপন্ন করা হয়।

মাদরাসা নামক ইসলামী অধ্যয়ন কেন্দ্রগুলোতে গরীব এবং অল্প বয়সের এতিম বালক ছাত্রদেরকে যে বলাৎকার (ধর্ষণ) করা হয় এবং তাদের উপর যে অন্যান্য শারীরিক অত্যাচার বেসানো করা হয় সেটাকে সবার দৃষ্টিগোচরে আনা একটা ন্যায্য আলোচনা। এই সমলৈঙ্গিক আবাসিক মাদরাসাগুলোর শিক্ষক এবং অপেক্ষাকৃত বড় বয়সের পুরুষ ছাত্রদের দ্বারা ছোট বালকদের নিয়ে এই ঘটনাগুলো ঘটে থাকে। বহু ইমামরা যে নিজেরাই অল্প বয়সের কিশোরী এবং নারী ধর্ষণের সাথে জড়িত সেটা তুলে ধরা একটা উপযুক্ত বিষয়। শিশু এবং নারীদের উপর শারীরিক অত্যাচারের ঘটনাবলি নতুন করে কিছু বলার অপেক্ষা রাখে না।

এটা একটা উপযুক্ত আলোচনা যেখানে নবী মুহাম্মদের জীবনকে সবার দৃষ্টিগোচরে আনা হয়, এমন কি সেই দিকগুলোও, যেগুলো ধর্মগ্রন্থ মোতাবেক তার বিবাহিত জীবন এবং যৌন সম্পর্কের মতো ব্যক্তিপরিসরে প্রবেশ করে ফেলে। নবী মুহাম্মদের জীবনের সকল দিকগুলোই পর্যালোচনার জন্য উপযুক্ত, শুধু বাছাইকৃত কিছু দিক নয়, যেহেতু বাংলাদেশে (এবং অন্য দেশে) অধিকাংশ পুরুষ মুসলমানরা প্রকাশ্যে নবীর পদক্ষেপ অনুসরণ করার ইচ্ছা ব্যক্ত করে থাকে (নবীর ব্যক্তিগত পরিচর্যা সহ)।

কোরআন এবং হাদিসে বর্ণিত ইসলাম ধর্মের প্রামাণিকতা এবং ইতিহাসকে প্রশ্ন করাটা একটি ন্যায্য আলাপচারিতা। একজন মুক্ত চিন্তাশীল মানুষ হিসেবে কোরআন এবং হাদিসের সত্যতা এবং কীভাবে এই বইগুলোর আগমন ঘটলো, সেটাকে প্রশ্নবিদ্ধ করাটা ন্যায়সঙ্গত। এবং ইসলাম বা অন্য যে কোনো সংগঠিত ধর্মের আদলে একটি বিশ্বাস ভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গিকে সংপ্রশ্ন করা একটি বৈধ অধিকার। এই বিশ্বাস ভিত্তিক দর্শন, যেটা “আমি বিশ্বাস করি বলেই ইহা সত্য হইবেই” – এই জাতীয় একটি ধারণা পোষণ করে থাকে, সেটা সকল যুক্তিযুক্ত বিতর্ক এবং প্রতিপাদনের পরিপন্থী।

জনাব জুকারবার্গ, আমার নিজেরটা সহ আমাদের অনেকেরই ফেসবুক একাউন্ট নিষ্ক্রিয় করে ফেলা হয়েছে। আমরা এটাও মনে করি যে ফেসবুক বাংলাদেশের মত দেশেগুলোর সরকারের তরফ থেকে আমাদের কন্ঠরোধ করার অনুরোধের কাছে মাথানত করছে। এখানেই ফেসবুক বাকস্বাধীনতা রক্ষা এবং পৃথিবী জুড়ে মানুষদের মাঝে যোগাযোগ স্থাপন করার জন্য তার নিজের অঙ্গীকারে ব্যর্থ হচ্ছে। এবং ফেসবুক আমাদের সাথে এমনটা করছে এমন একটা পটভূমিতে, যখন কয়েক বছর আগেই ইসলামের নামে বাংলাদেশে ইসলামী জঙ্গিরা বেশ কিছু নাস্তিক, প্রাক্তন মুসলমান, মুক্তমনা, লেখক, ব্লগার, ভিন্ন ধর্মের নেতা, সংষ্কৃতিমনা এবং সমকামী অধিকার কর্মীদের হত্যা করে। সাধারণভাবে বলা যায় যে দেশের মুসলমানরা এই সব ঘটনাগুলোর জন্য কোনো আফসোস প্রকাশ করেনি। কারণ যাদের প্রাণ চলে গিয়েছে তারা সেই মুসলমানদের ধর্মেরই সমালোচনা করেছে বা সেই ধর্মের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ জীবন যাপন করেছে। দেশের সরকারের সামগ্রিক রাজনৈতিক অবস্থানও ঠিক এমনটাই ছিল। এবং জনাব জুকারবার্গ, আপনি কি জানেন যে এই সব হত্যাকান্ডগুলোর ইন্ধন কোথায় যোগানো হয়েছিল? সয়ং ফেসবুকেই।

আমি আশা করছি যে আপনি এবং আপনার কর্মীগন গুরুত্ব সহকারে এই বিষয়টা খতিয়ে দেখবেন। আমাদের একাউন্টগুলো পুনরায় সক্রিয় করতে হবে, এবং ইসলাম ধর্ম সংক্রান্ত ন্যায্য আলোচনা এবং সমালোচনাকে যাতে দমন করা না হয়, তার জন্য উপযুক্ত কার্যপ্রণালী বাস্তবায়ন করতে হবে। উপরন্তু, ফেসবুকে বাংলা ভাষায় পারদর্শী যথেষ্ট ব্যক্তিদের কর্মনিয়োগ দিতে হবে, যাতে করে আপনার কর্মীবর্গের সদস্যরা নিখুঁতভাবে সংশ্লিষ্ট স্থিতি এবং মন্তব্যগুলো পরখ করে দেখতে পারে এবং সেগুলো নিয়ে উপযুক্ত সিদ্ধান্তে পৌছতে পারে।

অনেক ধন্যবাদ জনাব জুকারবার্গ। বাংলাদেশ এবং বিশ্ব জুড়ে সকল নাস্তিক, প্রাক্তন মুসলমান এবং মুক্তমনাদের জানাই আমার শ্রেষ্ঠ কামনা।


কালোদের জীবন মূল্যবান – পর্ব ৪

রিয়াজ ওসমানী

১৪ জুন ২০২০

এই শিরোনাম দিয়ে লেখার তৃতীয় পর্ব এই বলে শেষ করেছিলাম যে যুক্তরাজ্যে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে এই দেশের কালো ও বাদামী (ভারত উপমহাদেশীয়) রঙের মানুষরাই বেশি প্রাণ হারিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রেও কালোরা তুলনামূলক হারে অনেক বেশি মৃত্যু বরণ করেছে এই মহামারীতে। এর সমস্ত কারণ ভবিষ্যতে ডাক্তার, বিজ্ঞানী ও সমাজ বিজ্ঞানীদের কাছ থেকে জানার অপেক্ষায় রইলাম। এই পর্বে কৃষ্ণাঙ্গ (কালো) মানুষের প্রতিকূল ও বর্ণবাদী এই দুনিয়ায় আমরা যারা ভারত উপমহাদেশীয়, তাদের অবস্থান, অবদান ও দায়িত্ব কি থাকতে পারে তা নিয়ে আলাপ করবো।

প্রথমে বলতে হবে তাদের কথা যাদেরকে বিলেতি সাম্রাজ্য চলাকালীন সময়ে ভারত উপমহাদেশ থেকে আফ্রিকা মহাদেশে কাজের লোভে নিয়ে যাওয়া হয় এবং “কুলি” বলে আখ্যায়িত করা হয়। উগান্ডা, কেনিয়া, তানজানিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকায় তারা পাড়ি জমায় রেল খাত, দাপ্তরিক খাতের বিভিন্ন নিম্ন স্তরের কাজ ইত্যাদিতে বিলেতি ঔপনিবেশিক শাসনকে সহায়তা করতে, কারণ সেই সকল কাজের জন্য বিলেতিরা স্থানীয় কালোদেরকে যথাযথভাবে বস করতে পারেনি। কালোদের জীবন থেকে কিছুটা উঁচু কিন্তু বিলেতি সাদাদের থেকে আর্থিক ও সামাজিক দিক থেকে নিচু স্তরে বদ্ধ থাকা এই ভারতীয়রা সময়ের সাথে সাথে স্থানীয় ব্যবসা-বানিজ্যে নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত করে ফেলে। তাদের ছেলে ও মেয়েরা বিলেতিদের বিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করে ডাক্তার, প্রকৌশলী ইত্যাদিতে পরিণত হয়।

বুঝতেই পারছেন যে ইচ্ছা বা অনিচ্ছা করে বিলেতিরা আফ্রিকা মহাদেশে তাদের অধীনের দেশগুলোতে কালো ও সাদাদের মাঝে গায়ের রং, সমাজ ও অর্থনীতির বর্ণালীতে একটা মধ্য অস্তিত্ব তৈরি করে ফেলে যা কালো আফ্রিকানদের দমন ও শোষণের মাত্রাকে আরও তীব্র করতে সহায়তা করে। এবং সেখানে খুঁটি গড়া ভারত উপমহাদেশীয়রা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সেই শোষণে অবদান রেখেছে নিজেদের স্বার্থে, নিজের জীবন গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে। এদের পরবর্তি প্রজন্মরা এখনো আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের নাগরিক এবং কালো আফ্রিকানদের তুলনায় এরা সামাজিক ও আর্থিক দিক থেকে সুবিধাজনক অবস্থায় বাস করছে। এখানেও চামড়ার বর্ণ একটা অন্যায় পরিস্থিতির আহবায়ক হয়েছে।

তবে এই দেশগুলো বিলেতি শাসকদের কাছ থেকে স্বাধীন হওয়ার পর অনেকগুলোতেই সামরিক নেতারা ক্ষমতায় আসে। তারা কালোদের সত্যিকারের মুক্তির কথা বলে ভারতীয় নাগরিকদের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালায়। এর উদাহরণস্বরূপ আমরা দেখতে পাই যে ১৯৭২ সালে উগান্ডা দেশটির নেতা ইদি আমিন সেই দেশের ভারতীয় বংশের প্রায় সকল নাগরিকদের বহিষ্কার করে দেয়। প্রাক্তন শাসক দেশ যুক্তরাজ্য উগান্ডা থেকে বের করে দেয়া সকল মানুষদেরকে গ্রহণ করে নেয়। বহিষ্কৃত অনেকে যুক্তরাষ্ট্রেও পারি জমায়। যুক্তরাজ্যে আফ্রিকা থেকে আসা এই ভারতীয় বংশের মানুষরাই আজ সমগ্র ভারত উপমহাদেশ থেকে আসা মানুষদের তুলনায় সবচেয়ে বেশি সফল। কারণ তাদের ছিল আফ্রিকা থাকাকালীন সময়ে প্রাপ্ত বিলেতি শিক্ষা ও পেশাগত যোগ্যতা। বর্তমান সরকারের মেয়াদে এই দেশের অর্থমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী উভয়ই সেই গোত্রেরই মানুষ।

এবার আসি যুক্তরাষ্ট্রের দিকে। সম্প্রতি ও-পি ওয়ান এবং ডি-ভি ওয়ান ভিসার আওতায় সেই দেশে পৃথিবী থেকে নিম্ন স্তরের (অর্থনৈতিক, শিক্ষাগত এবং পেশাগত) মানুষরা পারি জমাতে পারলেও তার আগে ভারত উপমহাদেশ থেকে যারা যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন নিয়েছিল, তারা ছিল স্থানীয় মেধাবীরা যারা সেখানে গিয়ে বড় ডাক্তার, বিজ্ঞানী, অধ্যাপক ও ব্যবসায়ী হতে পেরেছে। তাদের উপার্জন মার্কিন গড় আয়ের চেয়ে উপরে এবং অর্থনীতি ও সমাজে তাদের ইতিবাচক ভূমিকার কারণে তাদেরকে এবং এশিয়া মহাদেশ থেকে আগত অন্যান্যদেরকে মার্কিনি শ্বেতাঙ্গ (সাদা) সম্প্রদায় এক সময়ে “আদর্শ সংখ্যালঘু” (মডেল মাইনরিটি, model minority) বলে আখ্যা দেয়। আমরা ভারত উপমহাদেশীয়রা মনের হরষে সেই আখ্যা লুফে নিয়েছি নিজেদের অজান্তে যে এই ধরণের খেতাব যুক্তরাষ্ট্রে বিভিন্ন বর্ণের ও জাতের মানুষদের মাঝে সম্প্রীতির ক্ষেত্রে ক্ষতিকর। গায়ের রং ও জাতের বর্ণালীতে নিজেদেরকে একটি বিশেষ রঙের মানুষদের (কালোদের) চেয়ে উঁচু ভাবতে এই শ্রেণিবিন্যাস আমাদেরকে সহায়তা করেছে যা দুঃখজনক। আমেরিকার কালোরা অলস, মদ ও মাদকখোর, অপরাধ প্রবণ ইত্যাদি পর্যবেক্ষণ ও বিশ্বাসের কারণে বাংলাদেশিদের মুখে কালোদের বিরুদ্ধে কটু কথা শুনতে পাওয়া অস্বাভাবিক কিছু না। সাদাদের সঙ্গে আমাদের এভাবে সুর মেলানোর কোনো দরকার নেই।

আরো গভীরে গেলে আমাদের মাঝে বর্ণবাদিতার আরেক রকম বহিঃপ্রকাশ স্পষ্ট দেখা যায়। বর্তমান সময়ে বাংলাদেশি মূলোদ্ভূত মার্কিনি ছেলে ও মেয়েরা কেউ কেউ অন্য জাতের মানুষদের সাথে প্রেমের সম্পর্ক করে বিয়েও করে। অন্য জাতটা সাদা হলে আমাদের প্রতিক্রিয়া এক রকম হয়। অন্য জাতটা কালো হলে আমাদের প্রতিক্রিয়াটা কী সেটা কি এখানে বর্ণনা করে দিতে হবে? নিজে অনুমান করে নিতে পারেন কি? সাদা হলে মন্দের ভালো আর কালো হলে সর্বনাশ! আমার এই পর্যবেক্ষণ কি মিথ্যে? কালোর চেয়ে এখানে সাদাদের একটু বেশি সহ্য করা বা মেনে নেয়া হচ্ছে কেন? আমি এখানে যারা সম্পর্ক করছে তাদের ব্যক্তিগত পছন্দের কথা বলছি না। বলছি তাদের এই সম্পর্ক বা বিয়ের কারণে বাংলাদেশি বা ভারত উপমহাদেশীয় পরিবারগুলোর প্রতিক্রিয়ার কথা। এই ব্যাপারটা আরো ভালোভাবে অনুধাবণ করতে চাইলে ১৯৯১ সালের মিসিসিপি মাসালা (Mississippi Masala) নামক ছবিটা দেখে নিন।

এবার আসি যুক্তরাজ্যের দিকে। একটু আগে বলেছি যে আফ্রিকা থেকে আসা ভারতীয় বংশের মানুষরা এই দেশে সবচেয়ে বেশি সফল। ভারত উপমহাদেশ থেকে আসা বাকিদের কথা এখন বলা দরকার। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের পর পাকিস্তানের মিরপুর অঞ্চল থেকে অনেক কম শিক্ষিত ও অর্থ সহ মানুষরা এই দেশে এসে বস্ত্র শিল্পে কাজ শুরু করে। স্বাধীনতার আগের থেকেই বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চল থেকে অল্প শিক্ষা আর আয়ের অনেক মানুষ এই দেশে এসে ভারতীয় রেস্তোরাঁ ব্যবসায় নিয়োজিত হয়ে যায়। ভারত থেকে শিক্ষিত ও কম শিক্ষিত উভয় মানুষরাই এই দেশে আসে স্থানীয় শ্রমিক সংকট কাটাতে সহায়তা করতে। তাদের মধ্যে অনেকে বিলেতি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে উচ্চ শিক্ষায়ও নিয়োজিত হয়ে যায়। তাই তাদের মধ্যে আজ অনেক উচ্চ আয়ের মানুষ দেখা যায় যারা ডাক্তার, অধ্যাপক ইত্যাদি। তবে নিজের ছেলে ও মেয়েদেরকে বিলেতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সুষ্ঠভাবে শিক্ষিত করার প্রবণতা পাকিস্তানি ও বাংলাদেশিদের তুলনায় ভারতীয়দের মধ্যেই সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে। পাঞ্জাবি, গুজরাতি এই গোত্রের বিলেতিরা আজ টিভির পর্দায় দৃশ্যমান।

পাকিস্তানি আর বাংলাদেশি বিলেতিরা দেরিতে হলেও তাদের ছেলে ও মেয়েদেরকে এখন লেখাপড়া শেখাতে শুরু করেছে। বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রে বলা যায় যে সেই সব পরিবারের ছেলে ও মেয়েরা কিছুতেই রেস্তোরাঁ ব্যবসায় মন দিতে চায় না। তারা কষ্ট করে উপরেই উঠতে চায় যার ফল আমরা আস্তে আস্তে দেখতে পাচ্ছি সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে। তবে এদের এবং পাকিস্তানি অধ্যুষিত অনেকের মাঝেই ইসলাম ধর্মের অনেক গোঁড়ামি ঢুকে গেছে দেখে এদেরকে কালোদের মত পপ সঙ্গীত ও ফুটবল জাতীয় খেলাধূলায় বেশি দেখা যাবে বলে মনে হয় না! এদেরকে ভবিষ্যতে দাপ্তরিক পেশায় বেশি করে দেখা যাবে বলে মনে হচ্ছে। বিলেতি সরকারি স্বাস্থ্য সেবায় আজ বাংলাদেশি বিলেতিদের উপস্থিতি লক্ষণীয়।

বলে রাখা উচিৎ যে বাংলাদেশি বিলেতিদের ছেলেদের মধ্যে এক সময়ে কালোদের মত কিছুটা মাস্তানী আর মাদক আসক্তি লক্ষ্য করা গিয়েছিল। পরে অনেকেই ধর্মের আশ্রয় নিয়ে মৌলবাদী হয়ে গিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের ইসলামিক স্টেট (আই এস) এ যোগ দিয়ে নিজের (ও অন্য মানুষের) জীবন বিপন্ন করে ফেলে। এদের মাঝে বাংলাদেশি অধ্যুষিত বিলেতি ছেলে ও মেয়ে উভয়েরই সংবাদ পাওয়া গেছে। তবে পরিষ্কার করে দিতে চাই যে ইসলামিক স্টেটে যোগদানকারীরা যে সবাই আগে মাস্তান আর মাদকখোর ছিল তা নয়। আবার সব গোঁড়া মুসলমান ছেলে ও মেয়েরাই যে আই এস এ যোগদান করেছে তাও নয়।

আমার এই সব বর্ণনা দেয়ার একটাই কারণ। কোনো অবস্থাতেই এই দেশে আমরা যেন নিজেদের বিভিন্ন অর্জন সত্যেও নিজেদেরকে এই দেশের কালোদের চেয়ে উঁচু ভেবে বসে না থাকি। সাদারা সকল স্তরের উপরে, কালোরা সকল স্তরের নিচে এবং আমরা তার মাঝামাঝি, এই চিন্তাধারা আমাদের অবচেতন মনে গেঁথে গেছে অনেক আগেই। এই মানসিকতা ভাঙ্গতে হবে এবং এই দেশ ও দুনিয়াটাকে দেখতে হবে একটা নতুন আঙ্গিকে। আমরাও যুক্তরাজ্যে আশির দশকে সাদাদের কাছ থেকে প্রচুর বর্ণবাদিতার শিকার হয়েছি। মুখের উপর ভারত উপমহাদেশীয় আমাদের সবাইকে ঘৃণাত্মক “প্যাকি” শব্দটা ব্যবহার করে গালি দেয়া হয়েছে। ইংরেজি বলার সময় আমাদের উপমহাদেশীয় টান ও উচ্চারণকে সবখানে ভ্যাঙ্গানো, ব্যঙ্গ এবং উপহাস করা হয়েছে।

১৯৭৮ সালে আলতাব আলী নামের এক বাংলাদেশি তরুণকে পূর্ব লন্ডনে তিন জন বর্ণবাদী যুবক খুনও করে। শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠতায় বিশ্বাসী “ন্যাশনাল ফ্রন্ট” নামক একটি বিলেতি বর্ণবাদী রাজনৈতিক দলের প্ররোচনায় উদ্ভুদ্ধ হয়ে সাদা যুবকরা তাকে হত্যা করে। এখানে বলতে হবে যে আজ আমি যখন এই লেখাটি লিখছি তখন লন্ডনের ট্র্যাফালগার স্কয়ারে শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠতায় বিশ্বাসী কিছু চরমপন্থী দলের মানুষরা চার্চিলের মূর্তি বাঁচাতে বিশাল বিক্ষোভ মিছিল করেছে। বিলেতি সাম্রাজ্যবাদ চলাকালীন সময়ে ভারত উপমহাদেশের প্রতি চরম বর্ণবাদী মনোভাব যেই বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী প্রকাশ করেছিলেন, যিনি আমাদেরকে জন্তু-জানোয়ারের সাথে তুলনা করেছিলেন, যার নীতির কারণে ১৯৪৩ সালে সমগ্র বাংলায় দূর্ভিক্ষের কারণে ২০ থেকে ৩০ লক্ষ মানুষ মারা যায়, তার মূর্তি ভাঙ্গা বা সরিয়ে ফেলাকে আমরা যদি সমর্থন নাও করি, অন্তত এই দেশের কালোদের বর্তমান আর্তনাদের সাথে আমারা একাত্মতা প্রকাশ করতে পারি।

এবং সেটা শুরু করতে হবে আমাদের বাংলাদেশেই। সব চেয়ে আগে বর্তমান সময়কার একটি ব্যাপার নিয়ে বাংলাদেশের সবাইকে অবহিত হতে হবে। ইংরেজি কথ্য ভাষা এবং এখনকার লিখিত ভাষা থেকে “নিগ্রো” শব্দটার ব্যবহার অনেকটা আল্লাহ-রসুলের বদনাম করার মত হয়ে গেছে। আধুনিক সমাজে এই শব্দটার ব্যবহার এখন একেবারেই নিষিদ্ধ। এই ব্যাপারে অধিকাংশ পশ্চিমা সমাজ এক মত হতে পেরেছে। কালোরা অনেক সময়ে নিজেদের মাঝে নিজেদের কথা বলার জন্য অথবা নিজেকে সম্বোধন করার জন্য এই শব্দটা ব্যবহার করে থাকে। কিন্তু সেটা তাদের ব্যাপার। আমাদের ব্যাপার না। এর কারণ নিগ্রো শব্দটা ছিল আমেরিকায় সেই কৃতদাসদের কপালে কালী মেখে দেয়া একটা জঘন্য গালি, ঠিক যেমনটি “প্যাকি” শব্দটি ছিল বিলেতে আমাদের কপালে মেখে দেয়া একটা গালী। আমাদের বাংলা আলাপচারিতা এবং কোনো কোনো বাংলা লেখায় এখনো নিগ্রো শব্দটা অজ্ঞতার সাথে ব্যবহার করা হয়। এটা বন্ধ করতে হবে। সাথে এটারই ব্যতিক্রমী একটি আরও বাজে শব্দ “নিগার”কেও পরিত্যাগ করতে হবে।

নব্বইয়ের দশক থেকে শুরু করে অনেক দিন পর্যন্ত সম্ভ্রান্ত আলাপে আমেরিকার কালোদেরকে “আফ্রিকান-আমেরিকান” (African-American) বলা হয়েছে তাদের ইচ্ছা অনুযায়ী। তবে এখন আস্তে আস্তে শুধু “ব্ল্যাক” (Black) বা ব্ল্যাক-আমেরিকান বলার চলও তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য। আর এই কারণেই বর্তমান আন্দোলনের নামঃ “ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার” বা কালোদের জীবন মূল্যবান। আমরা আমাদের মাঝে কালোদের নিয়ে কথা বলার সময়ে “কালো” বা “কৃষ্ণাঙ্গ” বা “কৃষ্ণবর্ণ” বলতে পারি। এতে মুমিনরা অবশ্য চিল্লাতে পারে যে কালোদেরকে হিন্দু বানিয়ে দেয়া হচ্ছে কেন? আমেরিকাতে মুষ্টিযুদ্ধের কালো রাজা “মোহাম্মদ আলী” তো মুসলমান ছিলেন! মুমিনদের সব প্যাঁচালের মতো এতেও কর্ণপাত না করে আমরা ‘ন’ দিয়ে শব্দটা সম্পূর্ণ পরিহার করবো। তবে কালো বলতে গিয়ে কাল্লু বা কালা ভূত বললে আবার চলবে না। সেটা হানিকর।

বাংলাদেশে আফ্রিকা মহাদেশ থেকে মানুষরা আসলে বা যুক্তরাষ্ট্র থেকে কোনো কালো মানুষ আসলে আমাদেরকে অবশ্যই সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। কাল্লু, কালা, ইত্যাদি শব্দের সাথে এরা অনেকেই এখন পরিচিত। আর কালোদেরকে সন্মান করাটা নামের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তাদেরকে দেখে তাদের প্রতি আমাদের মনে কী অনুভূতি জাগ্রত হয় এবং কোনো কোনো সময়ে সেটার বহিঃপ্রকাশ কী রূপ নেয় তা ভালোভাবে লক্ষ্য করতে হবে। ইউরোপ বা আমেরিকা থেকে সাদারা আমাদের দেশে আসলে আমরা অনেকেই হা করে এবং ফ্যানা তুলে মুখ ছ্যাড়াব্যাড়া করে ফেলি। এটাই হচ্ছে সারা দুনিয়াতে সাদাদের জন্য স্থাপিত “শ্বেতাঙ্গ সহৃদয়তা” (হোয়াইট প্রিভিলেজ,  white privilege)। অন্য দিকে আমাদের দেশে কালো কেউ আসলে তাদেরকে কোন ধরণের সহৃদয়তা বা আতিথেয়তার সন্মুখিন হতে হয় তা আমাদেরকে ভালোভাবে বুঝতে হবে। মোদ্দাকথা আমাদের তুলনায় অপেক্ষাকৃত গাঢ় রঙের চামড়ার মানুষদেরকে আমরা কী চোখে দেখি সেটাকে বিশ্লেষণ করে ভালোভাবে অনুধাবণ করতে হবে। কারণ সেটাই বর্ণবাদিতার উৎস।

দুইশো বছর বিলেতিদের দাসত্ব করার ফলে, না কি ভারত উপমহাদেশে অনেক আগে থেকেই জাত প্রথা থাকার ফলে, না কি পশ্চিম এশিয়া থেকে আগত মানুষের স্থাপন করা মোগল সাম্রাজ্যের আধিপত্যের কারণে আমাদের মাঝে ফরসাকেই শ্রেয় মনে করার প্রবণতা এসেছে, তা গবেষণা করার বিষয়। তার উপর ভারতীয় জন্মপ্রিয় সংষ্কৃতিতে আমরা দেখি বিখ্যাত শিল্পীরা “ফেয়ার এন্ড লাভলি” জাতীয় ক্রিমের বিজ্ঞাপন করে সবাইকে ফরসা হওয়ার আমন্ত্রণ জানাচ্ছে। সুক্ষভাবে চারিদিক থেকে আমাদের মনে গেঁথে দেয়া হয়েছে এবং হচ্ছে যে ফরসাই সৌন্দর্যের মাপকাঠি। তা না হলে আমাদের পরিবারের লোকজন ফরসা বৌ খুঁজে বেড়ায় কেন? টিভি ও চলচিত্রের পর্দায় তুলনামূলকভাবে ফরসাদেরই দাপট কেন? বাংলাদেশের সমকামীরা অনেকেই ফরসা জীবন সঙ্গী বা যৌন সঙ্গী খুঁজে বেড়ায়। ছেলে বা মেয়ে, বিষমকামী বা সমকামী যেই হোক না কেন, শ্যামলাদেরকে খুব ভালোভাবেই জানিয়ে দেয়া হয়েছে যে বাংলাদেশের সমাজে তাদের কোনো মূল্য নেই। এই পরিস্থিতিটিকে কি একটি সুস্থ ও মানবিক সমাজ ব্যবস্থা হিসেবে চিহ্নিত করা যায়?

একটা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা দিয়ে আমি শেষ করছি। কয়েক বছর আগে দেশে বেড়াতে এসে আমি একজন তুরুণ সমকামী ছেলের সাথে দেখা করি যার সাথে অনলাইনে আগে থেকেই পরিচয় ছিল। ছেলেটি প্রথম থেকেই আমাকে বলেছে যে সে শ্যামলা এবং তাকে কেউ পছন্দ করে না। এই নিয়ে তার হীনমন্যতা আর বিষন্নতার সীমা ছিল না। আত্মবিশ্বাসটা কী সেটার সে কিছুই জানতো না। বাংলাদেশের মত দেশে একজন শ্যামলা সমকামী ছেলে হওয়াতে সে মেনে নিয়েছিল যে তার জীবন ছিল একটা অভিশাপ। আমি তার সাথে দেখা করে তার সৌন্দর্য দেখে এতোটাই মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম যে আমার কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছিল না তার মনের অবস্থার কথা। শ্যামলা, ধলা, যে যেটাই হোক! সুষ্ঠ জীবন যাপন, যেমন সঠিক খাবারটি খাওয়া (ফলমূল, শাকসবজি ইত্যাদি), কিছু বেয়াম করা (যদি কায়িক পরিশ্রম না করে থাকতে হয়) এবং মাথার উপর একটা নিশ্চিত ছায়া থাকলে (আর সাথে একটু সতেজকারক ক্রিম থাকলে!) যে কারোরই ভেতর থেকে সৌন্দর্যটা ফুঁটে ওঠে বাঁধহীণ নদীর মত। সেই ছেলেটির বেলায় হয়েছিল ঠিক তাই। কিন্তু সেটা সে তার জীবনে বিন্দুমাত্র অনুধাবণ করতে পারেনি।

এর কারণ শ্যামলা যে অসুন্দর এই ধারণা আমরাই তার মস্তিষ্কে অনেক আগে ঢুকিয়ে দিয়েছি। এবং এই কারণে হীণমন্যতা তাকে তীলে তীলে গ্রাস করে খেয়েছে। নিজের আয়নায় সে দেখেছে অবাঞ্ছিত একটি প্রাণি, যেখানে আমি দেখেছি একটা পদ্ম, শাপলা আর রক্তজবার সম্ভার। আদৌ সে নিজের অপরূপকে চিনতে ও বিশ্বাস করতে পেরেছে কি না তা সন্দেহ।


কালোদের জীবন মূল্যবান – পর্ব ৩

রিয়াজ ওসমানী

১২ জুন ২০২০

এই শিরোনাম দিয়ে লেখার দ্বিতীয় পর্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কৃষ্ণাঙ্গ (কালো)দের বিভিন্ন অর্জন এবং উত্তরের অঙ্গরাজ্যগুলোতে বিভিন্ন শহর ও শহরতলিতে ছিটমহল জাতীয় এলাকায় তাদের অনেকের আবাসের ফলে বর্তমানে তাদের বিভিন্ন সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পারিবারিক সমস্যার কথা তুলে ধরেছিলাম। আর এই লেখাগুলোর অনুপ্রেরণা পেয়েছি সম্প্রতি একটা ঘটনা থেকে যেটার সম্বন্ধে আপনারা আশা করি ভালোভাবে অবগত হয়ে গেছেন। মুঠোফোনের পর্দায় জর্জ ফ্লয়েডের “আমি নিশ্বাস নিতে পারছি না” আর্তনাদটি বিশ্বকে কাঁপিয়ে দিয়ে জানিয়ে দিয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্রে পুলিশ প্রশাসন ও বিচার ব্যবস্থার আমূল সংস্কার প্রয়োজন। আর পুলিশি সহিংসতা এবং বৈষম্যের ভিত্তিতে কালোদের উপর আইনের অপেক্ষাকৃত শক্ত প্রয়োগের মূল কারণ নিয়ম মাফিক এবং প্রতিষ্ঠানিক বর্ণবাদিতা।

প্রথম পর্বে উল্লেখ করেছি যে কৃষ্ণাঙ্গরা উপরে বর্ণিত পরিস্থিতিটি নিয়ে আগে প্রচুর কথা বললেও সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্বেতাঙ্গ (সাদা)রা এই সব কথায় বিন্দু মাত্র কর্ণপাত করেনি এতো দিন। কিন্তু আজকে বিভিন্ন মার্কিন শহর ও উপশহরে মানুষের মিছিলে রয়েছে সাদারা। বিশেষ করে তরুণ সাদারা এই সব মিছিলে এবং সামাজিক মাধ্যমে বড় রকমের ঝড় তুলে ফেলেছে, যা আমেরিকার ইতিহাসে এই প্রথম। মুঠোফোনের পর্দা কোনো সময় মিথ্যা কথা বলে না। তাই এবার মার্কিনি শ্বেতাঙ্গদের টনক নড়েছে। তারা বলছে “যথেষ্ট হয়েছে, আর নয়”। দীর্ঘ দিনের প্রচেষ্টার পর এরা বোধহয় আসলেই এবার কালোদের পরিণতিটা সঠিকভাবে অনুধাবণ করতে পেরেছে। আগের পুলিশি বর্বরতায় কালো মানুষ নিহত হওয়ার পরও অনেকেই আশা রেখেছিল এবার বুঝি পরিবর্তন আসবে। কিন্তু সেই পরিবর্তন আসেনি। কেন যেন এই বার মনে হচ্ছে পরিবর্তন আসার হলে এইবারই আসবে।

ফিরে আসতে হয় ৪০০ বছর আগ থেকে শুরু করে অনেক দিন পর্যন্ত আফ্রিকা মহাদেশ থেকে কৃষ্ণাঙ্গরা আজকের যুক্তরাষ্ট্রে কীভাবে আগত হলো, সেই প্রসঙ্গে। প্রথমে পর্টুগাল, হল্যান্ড ও বেলজিয়াম এবং পরে যুক্তরাজ্য ভিত্তিক কৃতদাস বনিকদের কর্মকান্ডের ফলে আফ্রিকা মহাদেশ থেকে অমানবিক পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে ৩.১ মিলিয়ন আফ্রিকান মানুষদেরকে বিলেতি অধ্যুষিত বিভিন্ন ক্যারিবিয়ান দ্বীপ এবং উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকায় পাচার করা হয়। এর মধ্যে ২.৭ মিলিয়ন মানুষ তাদের গন্তব্যস্থলে পৌছতে পারে। বাকিরা পথে জাহাজেই মৃত্যু বরণ করে অমানবিক অত্যাচারের কারণে। বিলেতি বনিকরা আফ্রিকা মহাদেশ থেকে বিলেতি বন্দর দিয়েই জন্তু জানোয়ারের মত করে এই কৃষ্ণাঙ্গদেরকে আটলান্টিক সাগর পার করিয়ে দেয়। এই বন্দরগুলোর নাম আমরা অনেকেই জানি। সেগুলো হচ্ছে ব্রিস্টল (Bristol) আর লিভারপুল (Liverpool). কৃতদাস বানিজ্য থেকে জনৈক বিলেতি বণিকরা এতোটাই লাভবান হয়েছিল, এবং তারা তাদের সেই উপার্জন স্থানীয় এলাকা এবং মানুষদের উন্নয়নের জন্য এমনভাবে নিবেদিত করেছিল যে তাদের স্মরণে ব্রিস্টল সহ অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছু মূর্তিও স্থাপন করা হয়।

এমন একজন বনিকের নাম এডওয়ার্ড কলস্টন যার মূর্তি বহু দিন যাবৎ ব্রিস্টল শহরে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে ছিল। যুক্তরাষ্ট্রে জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যুর প্রতিবাদ যুক্তরাজ্যেও ছড়িয়ে পড়ে। এই দেশের কালো ও কিছু সাদা মানুষদের মিছিলের সময়ে গত ৭ তারিখে (৭ জুন ২০২০) সেই মূর্তিটিকে দড়ি দিয়ে টেনে নামিয়ে পাশের নদীতে ফেলে দেয়া হয়। বিলেতের ইতিহাসে এমন ঘটনা এই প্রথম। বলা বাহুল্য এই ঘটনা নিয়ে এই দেশে পক্ষে আর বিপক্ষে বিতর্কের অবকাশ নেই। পক্ষে আর বিপক্ষে কারা আছে তার একটু ব্যাখ্যার প্রয়োজন।

এই দেশে এক বিশাল জনগোষ্ঠী আছে (অধিকাংশই শ্বেতাঙ্গ) যারা তাদের অতীত ইতিহাস সম্বন্ধে একেবারেই অজ্ঞ। এটা ঢালাওভাবে বলা যায় যে বিলেতি ইতিহাস সম্বন্ধে এই দেশের মানুষদেরকে যা শেখানো হয় তা সাবান দিয়ে ঘষামাজা করা একটা চকচকে সংস্করণ। এখানে ঠাই পায়নি কৃতদাস বানিজ্যে তাদের ভূমিকা, আফ্রিকা মহাদেশে বাস করা মানুষদের উপর তাদের হত্যাকান্ড, অন্যান্য অত্যাচার এবং নির্ভেজাল বর্ণবাদিতা। এখানে ঠাই পায়নি ২০০ বছর ধরে ভারত উপমহাদেশ থেকে সম্পদ আহরণ করে প্রাক্তন একটি সমৃদ্ধশালী অঞ্চলকে তুমুল দারিদ্রে ঠেলে দেয়ার কাহিনী। ঠাই পেয়েছে একটি হাস্যকর আখ্যায়িকা। আর তা হচ্ছে বিলেতিরা সারা দুনিয়াতে ছড়িয়ে পড়ে অন্য বর্ণের মানুষদের সভ্য করার জন্য। আর এই প্রয়াসের পেছনে ছিল নিজেদের নিয়ে “শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠতা” (হোয়াইট সুপ্রেমেসি, white supremacy) নামক একটি বিশ্বাস। লক্ষ্যনীয় বিষয় হচ্ছে যে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চলের অঙ্গরাজ্যগুলোতে কালোদেরকে কৃতদাস করে রাখাকে সেখানকার সাদারা এই বিশ্বাসের ভিত্তিতেই মূল্যায়ন করতো। দক্ষিণ আফ্রিকা দেশটিতে হল্যান্ড থেকে আগত শ্বেতাঙ্গ ঔপনিবেশিকরা এই আখ্যায়িকা ও বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করেই বহু বছর সংখ্যাগরিষ্ঠ কৃষ্ণাঙ্গ জনগনের উপর লাঙ্গল চালিয়েছে।

ইতিহাস সম্বন্ধে অজ্ঞ, সংশয়বাদী বা ঘষামাজা করা সংস্করণে বিশ্বাসী বিলেতি নাগরিকরা, যারা অধিকাংশই সাদা ইংরেজ, তারা ঐতিহাসিক মূর্তি ভাঙ্গা বা সরিয়ে ফেলার চরম বিরোধিতা করছে। তাদের তর্ক অনুযায়ী মূর্তি সরিয়ে ফেললে ইতিহাস মুছে যাবে। ইতিহাস কীভাবে মুছে যাবে সেটা এখানে যথেষ্ট তর্কের বিষয়। আর ইতিহাসের কোন সংস্করণটি মুছে যাবে বলে তারা ভয় পাচ্ছে সেটা নিয়ে বিতর্ক এখন বাড়বে। সাথে বাড়তে পারে এই দেশের কালোদের প্রতি এই দেশের কিছু প্রকাশ্যে বর্ণবাদী রাজনৈতিক সদস্যদের বিদ্বেষ।

অপর দিকে মূর্তি সরিয়ে ফেলার পক্ষে আছে এই দেশের অধিকাংশ কালোরা এবং কিছু সাদারা। তো এই দেশে কালোরা এলো কোথা থেকে বলতে পারেন? আফ্রিকা মহাদেশ থেকে কৃতদাস ধরে ধরে যেসকল বিভিন্ন ক্যারিবিয়ান দ্বীপে তাদেরকে স্থাপন করা হয় সেই সব বিলেতি সাম্রাজ্যের অঞ্চল, পরে যেগুলো স্বাধীন দেশে অবতীর্ণ হয়, সেগুলো থেকেই দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের পর বিলেতে মানুষ আসে বিভিন্ন নিম্ন পেশার কাজ করার জন্য এবং এই দেশটির পুনর্গঠনে অবদান রাখার জন্য। এই দেশগুলোকে একত্রে বাংলাদেশের ক্রিকেট প্রেমিরা ওয়েষ্ট ইন্ডিজ নামে চিনে থাকবে। আরো আসে আফ্রিকা মহাদেশের নাইজেরিয়া এবং অন্যান্য অনেক পার্শ্ববর্তি দেশ থেকে যেগুলো কয়েক দশক আগে বিলেতিদের অধীনে ছিল। বলে রাখা উচিৎ যে বিলেতি সাম্রাজ্যের অধীনে সকল অঞ্চল ও বর্তমানে স্বাধীন দেশ থেকে সকল মানুষদের জন্য যুক্তরাজ্য আশির দশকের প্রায় শেষাংশ পর্যন্ত দরজা উন্মুক্ত রেখেছিল। কোনো প্রকার ভিসা ছাড়াই উল্লেখিত মানুষগুলো এই দেশে এসে বসতি স্থাপন করতে পারতো এবং করেছে।

ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও আফ্রিকা থেকে আগত এদের ছেলে ও মেয়েরা আজ এই দেশের সমান নাগরিক হওয়ার দাবী রাখে। পপ সঙ্গীত এবং ক্রীড়াঙ্গনে এদের ভূমিকা অতুলনীয়। কেউ কেউ হয়েছেন সাংসদ, টিভি সাংবাদিক এবং কৌতুকাভিনেতা। কিন্তু ঠিক যুক্তরাষ্ট্রের একটা প্রতিচ্ছবি এই দেশেও দেখা যায়। এই দেশের দরিদ্রদের মধ্যে এদের সংখ্যাই বেশি। সাদা পুলিশের হাতে এই দেশেও কালো যুবক নিহত হয়েছে। ঠিক যুক্তরাষ্ট্রের মত এই দেশের কালোরা একটি অবহেলিত এবং দলিত শ্রেণিতে বদ্ধ। অনেক কালো পরিবারে পুরুষদের মাঝে মদ ও মাদক আসক্তি সাদাদের তুলনায় আনুপাতিক হারে একটু বেশি দেখা যায়। এর সাথে রয়েছে ঘরোয়া সহিংসতা যেখানে স্বামীর হাতে স্ত্রীকে প্রহার, বাবা-মার হাতে শিশুদেরকে প্রহার, যার অস্তিত্ব অপেক্ষাকৃত বেশি। এর প্রভাব কালো তরুণ ও তরুনীদের জীবনে চিরকালের জন্য এক অশুভ প্রভাব ফেলে। কিছুটা বিদ্রোহী মনোভাব নিয়েই তাদের মধ্যে অনেকে মাস্তানগিরি, যৌন অপরাধ, মদ ও মাদক পাচার ও আসক্তিতে জড়িয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রেই বিয়ে বহির্ভুত গর্ভাবস্থা চোখে পড়ে এবং অনেক শিশু শুধু মায়ের যত্নেই বড় হয়। এটা হয়ে যায় একটা চক্রাকার পরিণতি যেখান থেকে অনেকেই এখনো বের হয়ে আসতে পারেনি।

যুক্তরাষ্ট্রে পুলিশ প্রশাসন এবং বিচার বিভাগে কালোদের বিরুদ্ধে যে প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য ও বর্ণবাদিতা রয়েছে সেটা সেই দেশের শ্বেতাঙ্গরা এতো দিন স্বীকারই করতে চায় নি। কিন্তু যুক্তরাজ্যের চিত্রটা একটু ভিন্ন। এই দেশে ২২ এপ্রিল ১৯৯৩ তারিখে সাধারণ জনগনদের মাঝ থেকে কিছু সাদা বর্ণবাদী যুবকদের হাতে স্টিফেন লওরেন্স নামের এক কৃষ্ণাঙ্গ তরুণ খুন হওয়ার পর এবং এরপর পুলিশ প্রশাসনের সম্পূর্ণ গাফলতি ও উদ্যোগ নেয়ার অনিহা জনগনের সামনে পরিষ্কার হয়ে যাওয়ার পর এই দেশ স্বীকার করে যে এই দেশের পুলিশ প্রশাসন প্রাতিষ্ঠানিকভাবেই বর্ণবাদী। পুরো অঙ্গনটিকে ঢেলে সাজিয়ে বর্তমান সময়ের জন্য উপযুক্ত করে তোলার প্রয়াস এখনো বিদ্যমান যা প্রশংসনীয়।

তবে এই দেশের শ্বেতাঙ্গ শ্রমিক শ্রেণির মানুষ, যারা তুলনামূলকভাবে অল্প শিক্ষার এবং আয়ের মানুষ, তাদের মাঝে এখনো প্রকাশ্যে কালো এবং বাদামী (ভারত উপমহাদেশীয়) মানুষেদের প্রতি বর্ণবাদী আচরণ লক্ষ্য করা যায়। আশির দশকে এটা ছিল তুঙ্গে, যদিও তখন সেটার লক্ষ্যবস্তু ছিলো এই দেশে আসা ভারত উপমহাদেশীয়রা। নব্বই দশকের পর এই দেশের অধিকাংশ মানুষরাই নানা বিষয়ে উদারপন্থী মনোভাব দেখাতে শুরু করে। কিন্তু আমাদের সামনে ব্রেক্সিটের অভিশাপ আগত হওয়ার পর এই শ্রেণির মানুষদের মনের বিষ আবারো সমাজে ছোবল মারতে শুরু করে। এদের চোখে ব্রেক্সিট ছিল শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠতা মন্ডিত এবং অভিবাসী (ইমিগ্রান্ট) ব্যতীত বিশ্ব সেরা এক কল্পনার ভূবনে ফিরে যাওয়া। তবে করোনা ভাইরাস এসে সেটা কিছুটা নিস্তেজ করে দিয়েছে। আর এর কারণ এই দেশের সরকারি স্বাস্থ্য সেবায় কর্মরতরা অনেকেই কালো আর বাদামী যারা বিলেতে এই ভাইরাসের কাছে তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি প্রাণ হারিয়েছে। হয়তো এবার সবাই বুঝেছে যে এদের জীবন মূল্যবান।


কালোদের জীবন মূল্যবান – পর্ব ২

রিয়াজ ওসমানী

১০ জুন ২০২০

যুক্তরাষ্ট্রে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া এক শ্বেতাঙ্গ (সাদা) পুলিশ কর্মচারীর হাতে এক কৃষ্ণাঙ্গ (কালো) পুরুষের মৃত্যুর ঘটনা আজ নতুন কিছু নয়। অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হচ্ছে যে এই ঘটনাগুলো সেই দেশে একটা নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। মুঠোফোনের সুপ্রসারিত ব্যবহার আগেরকার দিনে বলবৎ না থাকায় আগের অনেক হত্যাকান্ডগুলোর যথাযথ বিচার হয়নি। অনেক সাদা পুলিশ কর্মকর্তারা বিনা বিচারে পার পেয়ে গিয়েছে। কিন্তু এবার আর নয়। এবার আমেরিকা জেগে উঠেছে, বিশ্ব জেগে উঠেছে।

এই করুন অবস্থার ইতিহাস জানতে হলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সৃষ্টির দুটি আদি কলঙ্ক (অরিজিনাল সিন) সম্বন্ধে অবগত হতে হবে। প্রথমটা হচ্ছে যুক্তরাজ্য থেকে যখন শ্বেতাঙ্গ মানুষগুলো ১৬০০ সালের পর থেকে বর্তমান যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিষ্ঠে জাহাজে করে উপস্থিত হতে শুরু করলো, তারপর থেকে সেখানে অনেক দিন ধরে বাস করা আদিবাসী, যাদেরকে এখন “নেটিভ আমেরিকান” বলে আখ্যায়িত করা হয়, তাদের জায়গা ও জমি দখল করে নেয়া হয়, তাদের বিরুদ্ধে হত্যাকান্ড ঘটানো হয় এবং তাদেরকে দীর্ঘ দিনের জন্য সীমিত সংরক্ষিত এলাকা (রেসার্ভেশন)এ বাস করতে বাধ্য করা হয়। তাদের কাছ থেকে প্রচুর এলাকা পেয়েই আস্তে আস্তে সেই বিলেতি আগন্তুকরা এবং পরে আরও ইউরোপীয়রা আমেরিকার সেই বিরাট অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে। প্রথম সেই দিনগুলোতে সেই অঞ্চলটা ছিল বিশ্ব জুড়ে বিলেতি সাম্রাজ্যেরই একটা অংশ। বিলেতিদের বিরুদ্ধে অনেক বিদ্রোহের পর ১৭৭৬ সালে ৪ জুলাই, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একটা স্বাধীন দেশের স্বাদ লাভ করে।

ধর্মীয় গ্রন্থের সমতূল্য তাদের লিখিত সংবিধানে সকল মানব সমান – এই বলে অনেক কথা বলা থাকলেও সেটার যথাযথ বাস্তবায়ন মার্কিনিরা আজও দেখতে পায়নি। সেই ১৬০০ সালের পর থেকেই বিলেতি কৃতদাস বনিকদের সহায়তায় বিলেতি সাম্রাজ্যবাদের অধিনস্ত আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষ, নারী ও শিশুদের জোর করে ধরে ধরে জাহাজে করে আমেরিকার দক্ষিণাঞ্চলে নিয়ে আসা হয় তুলার খামারে দাস হিসেবে কাজ করার জন্য। নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোর করে নিয়ে আসা এই মানুষদেরকে স্থানীয় শ্বেতাঙ্গদের কাছে বিক্রি করে দেয়া হয়। তাদেরকে নিয়ে আসার জন্য যেই সব জবরদস্তি খাটানো হয় তা ছিল শক্ত লোহার শিকল দিয়ে অবরুদ্ধ করে রাখা এবং অমানবিক প্রহার করা। জাহাজগুলোর বৈঠাগুলোও তাদেরকে পিটিয়ে পিটিয়ে তাদেরকে দিয়েই চালানো হয়। পর্যায়ক্রমে দলে দলে আরও অনেক কালো মানবরা আজকের যুক্তরাষ্ট্রে এসে পৌছে এক অজানা দেশে দাস হয়ে জীবন যাপন শুরু করতে, যেখানে তারা তাদের সাদা মনিবদের কাছ থেকে আরও প্রহার সহ্য করা সহ জন্তু-জানোয়ারের মত বাস করতে থাকে।

এটাই হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের সৃষ্টির দ্বিতীয় কলঙ্কটি। অনেক দিন পর্যন্ত এই জন্তু-জানোয়ারের মত মানুষরা বংশ বিস্তার করলেও তারা ছিল তাদের সাদা মনিবদের কৃপার পাত্র। স্বাধীনতা লাভের পর আমেরিকাকে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে গঠিত করা হয় (যার কারণেই দেশটির নামে আছে যুক্তরাষ্ট্র)। এবং উওর-পূর্ব অঙ্গরাজ্যগুলো দক্ষিণের অঙ্গরাজ্যগুলোতে বলবৎ থাকা দাসপ্রথার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। এই অবস্থা এক সময়ে এতোটাই প্রকট হয়ে ওঠে যে পুরো দেশ জুড়ে ১৮৬১ সালে চার বছরের জন্য একটা গৃহযুদ্ধ সংঘটিত হয়। দক্ষিণ অঙ্গরাজ্যগুলো কিছুতেই দাসপ্রথা বিলুপ্ত করতে চাচ্ছিল না। করলে তাদের খামারগুলোতে কাজ করবে কে? তারা এই লক্ষ্যকে ঘিরে উত্তর অঙ্গরাজ্যগুলো থেকে আলাদা হয়ে আরেকে স্বাধীন দেশ হয়ে যাওয়ার ব্রত নিয়েছিল। কিন্তু উত্তরাঞ্চলের সেনারা সেটা হতে দেয়নি এবং ১৮৬৫ সালের ৯ এপ্রিল, দক্ষিণের সেনারা হেরে যায়। গৃহযুদ্ধে অনেক প্রাণহানী ও ধ্বংসযজ্ঞের পর যুক্তরাষ্ট্র অটুট থাকে এবং ১৮৬৫ সালের ৩১ জানুয়ারীতে পুরা দেশ জুড়ে দাসপ্রথা আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত করা হয়।

কৃষ্ণাঙ্গরা এরপর থেকে মুক্ত হয়ে অনেকেই দক্ষিণ থেকে উত্তরের অঙ্গরাজ্যের বিভিন্ন শহরে এসে ভিড় জমায় বিভিন্ন কলকারখানায় কাজ করতে। দক্ষিণে রয়ে যাওয়া কালোরা বাসস্থান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র, বিনোদন কেন্দ্র এমন কি পানি পান করার ফোয়ারাতেও তুমুল পৃথকীকরণ এবং পৃথকীভবনের শিকার ছিল। তারা সেখানে নিঃসন্দেহে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকের মর্যাদাও পায়নি। তবে কৃষ্ণাঙ্গ নেতা সন্মানিত মার্টিন লুথার কিং এর নেতৃত্বে বিগত শতাব্দির মাঝামাঝি সময়ে কালোরা জেগে ওঠে। মহাত্মা গান্ধীর আদর্শে অসহযোগ আন্দোলনে মেতে ওঠে তারা। এবং এর ফলে ১৯৬৪ সালে দক্ষিণের সকল পৃথকীকরণ এবং পৃথকীভবন বিলুপ্ত করা হয় এবং অন্তত কাগজে কলমে যুক্তরাষ্ট্রের কালোরা সেই দেশের সমান নাগরিকের অধিকার পায়। তারা আজ সেই দেশের জনসংখ্যার ১৩-১৫%।

তবে ১৮৬৫ সালের পর থেকে উত্তরাঞ্চলে চলে আসা কালোরা যে সেখানে তাৎক্ষণিক সমান নাগরিকের সন্মান পেয়েছিল তা নয়। দক্ষিণ অঙ্গরাজ্যগুলোর মত আনুষ্ঠানিক বৈষম্য বলবৎ না থাকলেও উত্তরে কালোরা সাদাদের কাছ থেকে অনেক প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ বৈষম্য ও বর্ণবাদিতার শিকার ছিল। যার কারণে উত্তরাঞ্চলের অনেক শহরেই আজও কালোরা অধিকাংশই কিছুটা আলাদা ছিটমহল জাতীয় এলাকায় বাস করে। সেখানে তারা নিম্নমানের বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ও নাগরিক সুবিধা পেয়ে থাকে। এর ফলে তাদের মধ্যে কেউ কেউ তুলনামূলকভাবে বেশি অপরাধেও জড়িয়ে পড়ে। নিম্ন শিক্ষার কারণে ভালো চাকরি-বাকরি করে অনেকেই এখনো উপরে উঠে আসতে পারেনি। এছাড়া সেই দেশের বাজার অর্থনীতিতেও কালোদের বিরুদ্ধে এখনো অনেক বাঁধা বিপত্তি রয়েছে। কালোদেরকে সহজে ব্যাংকের ঋণ দেয়া হয় না, বাড়ি ভাড়া দেয়া হয় না ইত্যাদি। মোট কথা একটা সাদা পরিবারে জন্ম নেয়া শিশু আমেরিকাতে যেই ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখতে পারে, একটা কালো পরিবারে জন্ম নেয়া শিশু সেই দেশে সমান ভবিষ্যত এখনো দেখতে পায় না।

কিন্তু সবচেয়ে মর্মান্তিক বিষয় হচ্ছে যে এখনো একজন কালো মানুষকে কেবল অপরাধের সন্দেহে সেই দেশের পুলিশ, যারা অধিকাংশই সাদা, তারা অধিকতরভাবে তল্লাশি করে, গ্রেফতার করে এবং সম্প্রতি ঘটনা অনুযায়ী খুনও করে ফেলে। অপরাধের সন্দেহে খুন হয়ে যায় এই পরিণতি আমেরিকাতে আমরা সাদা পুলিশের হাতে কালোদের কপালেই দেখি। এবং বিগত কয়েক দশক ধরে সাদা পুলিশদেরকে এই জঘন্য ঘটনাগুলোর জন্য জবাবদিহি করাতে শুরু করা হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে যথাযথ প্রমাণাদি এবং প্রশাসন ও বিচার বিভাগের সদিচ্ছার অভাবে অধিকাংশ খুনি পুলিশরা বিনা বিচারে পার পেয়ে গেছে।

দাসপ্রথা এবং পৃথকীভবনের ইতির পর অধিকাংশ মার্কিনি সাদাদের মধ্যে একটা ধারণা এসে গিয়েছিল যে সকল ঝামেলা মিটে গেছে – কালোরা এখন মুক্ত এবং সাদাদের বাপ-দাদাদের পাপের বোঝা তারা আর বহন করবে না। এই মানসিকতার ফলে কালোরা যখনই বর্তমানকালে রয়ে যাওয়া সকল প্রাতিষ্ঠানিক বর্ণবাদিতার অভিযোগ তুলেছে, সাদাদের প্রবণতা ছিল অন্য দিকে তাকিয়ে সেই সকল অভিযোগ অস্বীকার করা এবং কালোদের কথাগুলো বিন্দুমাত্র কর্ণপাত না করা। এবং এর ফলেই পুলিশি বর্বরতা সহ অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক বর্ণবাদিতা আজও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিদ্যমান।

মার্কিন রাষ্টপ্রতি ডোনান্ড ট্রাম্পের জঘন্য রাজনীতি সত্যেও এই বার আমেরিকায় আমরা পরিবর্তন আশা করতে পারি। শ্বেতাঙ্গ তরুণদের মাঝে সচেতনতা এসেছে যে তাদের কৃষ্ণাঙ্গ বন্ধু-বান্ধবদের জীবন তাদের চেয়ে এতোটা ভিন্ন হওয়াটা মার্কিন চেতনার সম্পূর্ণ পরিপন্থি। তবে সকল বয়সের সাদারা যদি আত্মবিশ্লেষণে মগ্ন হয়ে কালোদের মনের কথা এবং অনুভূতির কথা গভীরভাবে মনোযোগ দিয়ে শুনে অনুধাবণ করতে শিখে তবেই কাঙ্খিত পরিবর্তগুলো আনা সম্ভব। এখনো অনেক সাদা পরিবারের সান্ধ্যকালীন ভোজনের একটি প্রিয় আলাপের বিষয়বস্তু কালোদের নিয়ে নানা উপহাস।


কালোদের জীবন মূল্যবান – পর্ব ১

রিয়াজ ওসমানী

৮ জুন, ২০২০

যুক্তরাষ্ট্রে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া এক শ্বেতাঙ্গ (সাদা) পুলিশ কর্মচারীর হাতে এক কৃষ্ণাঙ্গ (কালো) পুরুষের মৃত্যুর ঘটনা আজ নতুন কিছু নয়। অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হচ্ছে যে এই ঘটনাগুলো সেই দেশে একটা নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। মুঠোফোনের সুপ্রসারিত ব্যবহার আগেরকার দিনে বলবৎ না থাকায় আগের অনেক হত্যাকান্ডগুলোর যথাযথ বিচার হয়নি। অনেক সাদা পুলিশ কর্মকর্তারা বিনা বিচারে পার পেয়ে গিয়েছে। কিন্তু এবার আর নয়। এবার আমেরিকা জেগে উঠেছে, বিশ্ব জেগে উঠেছে।

এই করুন অবস্থার ইতিহাস জানতে হলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সৃষ্টির দুটি আদি কলঙ্ক (অরিজিনাল সিন) সম্বন্ধে অবগত হতে হবে। প্রথমটা হচ্ছে যুক্তরাজ্য থেকে যখন শ্বেতাঙ্গ মানুষগুলো ১৬০০ সালের পর থেকে বর্তমান যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিষ্ঠে জাহাজে করে উপস্থিত হতে শুরু করলো, তারপর থেকে সেখানে অনেক দিন ধরে বাস করা আদিবাসী, যাদেরকে এখন “নেটিভ আমেরিকান” বলে আখ্যায়িত করা হয়, তাদের জায়গা ও জমি দখল করে নেয়া হয়, তাদের বিরুদ্ধে হত্যাকান্ড ঘটানো হয় এবং তাদেরকে দীর্ঘ দিনের জন্য সীমিত সংরক্ষিত এলাকা (রেসার্ভেশন)এ বাস করতে বাধ্য করা হয়। তাদের কাছ থেকে প্রচুর এলাকা পেয়েই আস্তে আস্তে সেই বিলেতি আগন্তুকরা এবং পরে আরও ইউরোপীয়রা আমেরিকার সেই বিরাট অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে। প্রথম সেই দিনগুলোতে সেই অঞ্চলটা ছিল বিশ্ব জুড়ে বিলেতি সাম্রাজ্যেরই একটা অংশ। বিলেতিদের বিরুদ্ধে অনেক বিদ্রোহের পর ১৭৭৬ সালে ৪ জুলাই, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একটা স্বাধীন দেশের স্বাদ লাভ করে।

ধর্মীয় গ্রন্থের সমতূল্য তাদের লিখিত সংবিধানে সকল মানব সমান – এই বলে অনেক কথা বলা থাকলেও সেটার যথাযথ বাস্তবায়ন মার্কিনিরা আজও দেখতে পায়নি। সেই ১৬০০ সালের পর থেকেই বিলেতি কৃতদাস বনিকদের সহায়তায় বিলেতি সাম্রাজ্যবাদের অধিনস্ত আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষ, নারী ও শিশুদের জোর করে ধরে ধরে জাহাজে করে আমেরিকার দক্ষিণাঞ্চলে নিয়ে আসা হয় তুলার খামারে দাস হিসেবে কাজ করার জন্য। নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোর করে নিয়ে আসা এই মানুষদেরকে স্থানীয় শ্বেতাঙ্গদের কাছে বিক্রি করে দেয়া হয়। তাদেরকে নিয়ে আসার জন্য যেই সব জবরদস্তি খাটানো হয় তা ছিল শক্ত লোহার শিকল দিয়ে অবরুদ্ধ করে রাখা এবং অমানবিক প্রহার করা। জাহাজগুলোর বৈঠাগুলোও তাদেরকে পিটিয়ে পিটিয়ে তাদেরকে দিয়েই চালানো হয়। পর্যায়ক্রমে দলে দলে আরও অনেক কালো মানবরা আজকের যুক্তরাষ্ট্রে এসে পৌছে এক অজানা দেশে দাস হয়ে জীবন যাপন শুরু করতে, যেখানে তারা তাদের সাদা মনিবদের কাছ থেকে আরও প্রহার সহ্য করা সহ জন্তু-জানোয়ারের মত বাস করতে থাকে।

এটাই হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের সৃষ্টির দ্বিতীয় কলঙ্কটি। অনেক দিন পর্যন্ত এই জন্তু-জানোয়ারের মত মানুষরা বংশ বিস্তার করলেও তারা ছিল তাদের সাদা মনিবদের কৃপার পাত্র। স্বাধীনতা লাভের পর আমেরিকাকে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে গঠিত করা হয় (যার কারণেই দেশটির নামে আছে যুক্তরাষ্ট্র)। এবং উওর-পূর্ব অঙ্গরাজ্যগুলো দক্ষিণের অঙ্গরাজ্যগুলোতে বলবৎ থাকা দাসপ্রথার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। এই অবস্থা এক সময়ে এতোটাই প্রকট হয়ে ওঠে যে পুরো দেশ জুড়ে ১৮৬১ সালে চার বছরের জন্য একটা গৃহযুদ্ধ সংঘটিত হয়। দক্ষিণ অঙ্গরাজ্যগুলো কিছুতেই দাসপ্রথা বিলুপ্ত করতে চাচ্ছিল না। করলে তাদের খামারগুলোতে কাজ করবে কে? তারা এই লক্ষ্যকে ঘিরে উত্তর অঙ্গরাজ্যগুলো থেকে আলাদা হয়ে আরেকে স্বাধীন দেশ হয়ে যাওয়ার ব্রত নিয়েছিল। কিন্তু উত্তরাঞ্চলের সেনারা সেটা হতে দেয়নি এবং ১৮৬৫ সালের ৯ এপ্রিল, দক্ষিণের সেনারা হেরে যায়। গৃহযুদ্ধে অনেক প্রাণহানী ও ধ্বংসযজ্ঞের পর যুক্তরাষ্ট্র অটুট থাকে এবং ১৮৬৫ সালের ৩১ জানুয়ারীতে পুরা দেশ জুড়ে দাসপ্রথা আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত করা হয়।

কৃষ্ণাঙ্গরা এরপর থেকে মুক্ত হয়ে অনেকেই দক্ষিণ থেকে উত্তরের অঙ্গরাজ্যের বিভিন্ন শহরে এসে ভিড় জমায় বিভিন্ন কলকারখানায় কাজ করতে। দক্ষিণে রয়ে যাওয়া কালোরা বাসস্থান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র, বিনোদন কেন্দ্র এমন কি পানি পান করার ফোয়ারাতেও তুমুল পৃথকীকরণ এবং পৃথকীভবনের শিকার ছিল। তারা সেখানে নিঃসন্দেহে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকের মর্যাদাও পায়নি। তবে কৃষ্ণাঙ্গ নেতা সন্মানিত মার্টিন লুথার কিং এর নেতৃত্বে বিগত শতাব্দির মাঝামাঝি সময়ে কালোরা জেগে ওঠে। মহাত্মা গান্ধীর আদর্শে অসহযোগ আন্দোলনে মেতে ওঠে তারা। এবং এর ফলে ১৯৬৪ সালে দক্ষিণের সকল পৃথকীকরণ এবং পৃথকীভবন বিলুপ্ত করা হয় এবং অন্তত কাগজে কলমে যুক্তরাষ্ট্রের কালোরা সেই দেশের সমান নাগরিকের অধিকার পায়। তারা আজ সেই দেশের জনসংখ্যার ১৩-১৫%।

তবে ১৮৬৫ সালের পর থেকে উত্তরাঞ্চলে চলে আসা কালোরা যে সেখানে তাৎক্ষণিক সমান নাগরিকের সন্মান পেয়েছিল তা নয়। দক্ষিণ অঙ্গরাজ্যগুলোর মত আনুষ্ঠানিক বৈষম্য বলবৎ না থাকলেও উত্তরে কালোরা সাদাদের কাছ থেকে অনেক প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ বৈষম্য ও বর্ণবাদিতার শিকার ছিল। যার কারণে উত্তরাঞ্চলের অনেক শহরেই আজও কালোরা অধিকাংশই কিছুটা আলাদা ছিটমহল জাতীয় এলাকায় বাস করে। সেখানে তারা নিম্নমানের বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ও নাগরিক সুবিধা পেয়ে থাকে। এর ফলে তাদের মধ্যে কেউ কেউ তুলনামূলকভাবে বেশি অপরাধেও জড়িয়ে পড়ে। নিম্ন শিক্ষার কারণে ভালো চাকরি-বাকরি করে অনেকেই এখনো উপরে উঠে আসতে পারেনি। এছাড়া সেই দেশের বাজার অর্থনীতিতেও কালোদের বিরুদ্ধে এখনো অনেক বাঁধা বিপত্তি রয়েছে। কালোদেরকে সহজে ব্যাংকের ঋণ দেয়া হয় না, বাড়ি ভাড়া দেয়া হয় না ইত্যাদি। মোট কথা একটা সাদা পরিবারে জন্ম নেয়া শিশু আমেরিকাতে যেই ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখতে পারে, একটা কালো পরিবারে জন্ম নেয়া শিশু সেই দেশে সমান ভবিষ্যত এখনো দেখতে পায় না।

কিন্তু সবচেয়ে মর্মান্তিক বিষয় হচ্ছে যে এখনো একজন কালো মানুষকে কেবল অপরাধের সন্দেহে সেই দেশের পুলিশ, যারা অধিকাংশই সাদা, তারা অধিকতরভাবে তল্লাশি করে, গ্রেফতার করে এবং সম্প্রতি ঘটনা অনুযায়ী খুনও করে ফেলে। অপরাধের সন্দেহে খুন হয়ে যায় এই পরিণতি আমেরিকাতে আমরা সাদা পুলিশের হাতে কালোদের কপালেই দেখি। এবং বিগত কয়েক দশক ধরে সাদা পুলিশদেরকে এই জঘন্য ঘটনাগুলোর জন্য জবাবদিহি করাতে শুরু করা হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে যথাযথ প্রমাণাদি এবং প্রশাসন ও বিচার বিভাগের সদিচ্ছার অভাবে অধিকাংশ খুনি পুলিশরা বিনা বিচারে পার পেয়ে গেছে।

দাসপ্রথা এবং পৃথকীভবনের ইতির পর অধিকাংশ মার্কিনি সাদাদের মধ্যে একটা ধারণা এসে গিয়েছিল যে সকল ঝামেলা মিটে গেছে – কালোরা এখন মুক্ত এবং সাদাদের বাপ-দাদাদের পাপের বোঝা তারা আর বহন করবে না। এই মানসিকতার ফলে কালোরা যখনই বর্তমানকালে রয়ে যাওয়া সকল প্রাতিষ্ঠানিক বর্ণবাদিতার অভিযোগ তুলেছে, সাদাদের প্রবণতা ছিল অন্য দিকে তাকিয়ে সেই সকল অভিযোগ অস্বীকার করা এবং কালোদের কথাগুলো বিন্দুমাত্র কর্ণপাত না করা। এবং এর ফলেই পুলিশি বর্বরতা সহ অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক বর্ণবাদিতা আজও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিদ্যমান।

মার্কিন রাষ্টপ্রতি ডোনান্ড ট্রাম্পের জঘন্য রাজনীতি সত্যেও এই বার আমেরিকায় আমরা পরিবর্তন আশা করতে পারি। শ্বেতাঙ্গ তরুণদের মাঝে সচেতনতা এসেছে যে তাদের কৃষ্ণাঙ্গ বন্ধু-বান্ধবদের জীবন তাদের চেয়ে এতোটা ভিন্ন হওয়াটা মার্কিন চেতনার সম্পূর্ণ পরিপন্থি। তবে সকল বয়সের সাদারা যদি আত্মবিশ্লেষণে মগ্ন হয়ে কালোদের মনের কথা এবং অনুভূতির কথা গভীরভাবে মনোযোগ দিয়ে শুনে অনুধাবণ করতে শিখে তবেই কাঙ্খিত পরিবর্তগুলো আনা সম্ভব। এখনো অনেক সাদা পরিবারের সান্ধ্যকালীন ভোজনের একটি প্রিয় আলাপের বিষয়বস্তু কালোদের নিয়ে নানা উপহাস।


ঢাকা বিমানবন্দরে এক দিন

শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, ঢাকা

রিয়াজ ওসমানী

১৭ মে ২০২০

ঢাকা বিমানবন্দরে নামার পর টার্মিনাল ভবনের ভেতর যেই জিনিষটা আমাকে প্রথমে আমন্ত্রণ জানালো তা হলো স্পিকারে বাজানো আসর নামাজের আজান। অভিবাসন আর শুল্কের আনুষ্ঠানিকতা সেরে নিয়ে ভবন থেকে বের হবার সময় শুনলাম মাগরেবের আজান। কই, যাত্রী এবং তাদেরকে গ্রহণ করতে আসা আত্মীয়স্বজন কাওকেও তো দেখলাম না সব কাজ ছেড়ে দিয়ে কাতারে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ে ফেলতে। সেটা হলে কিছুটা আশ্চর্যই হতাম। মনে করতাম আমার বিমান আমাকে ঢাকায় না নামিয়ে সৌদি আরবের কোনো শহরে নামিয়ে দিয়েছে।

মজার ব্যাপার কি জানেন? এই একই ভবনের ভেতরে আছে বিদেশি বিমান সংস্থাগুলোর কয়েকটা অভিজাত লাউঞ্জ যেখানে উচ্চ দামে টিকিট কেনা যাত্রীদেরকে বিনামূল্যে মদ জাতীয় পানীয় পরিবেশন করা হয়। এগুলো কিনে খাওয়ার জন্য বাকিদের জন্য একটা পানশালাও আছে। এই পুরো ব্যাপারটাকে কি একমাত্র আমিই হাস্যকর মনে করছি? প্রথম কথা হচ্ছে যে এত বার এই ভবন দিয়ে এসেছি, গিয়েছি – স্পিকারে আজান তো মনে পড়ছে না। এটা কি হিজাবের মতো বাংলাদেশের নতুন এক চল? এর উদ্দেশ্যটা কি? বিমানবন্দর তো নামাজ পড়ার জায়গা না। তাছাড়া এখান দিয়ে মুসলমানরা ছাড়াও আসা-যাওয়া করছে বিভিন্ন দেশের নাগরিক, বিভিন্ন ধর্মের অবলম্বনকারী অথবা ধর্মহীণ মানুষ। দীর্ঘ যাত্রার পর সবার উপর এই আওয়াজ চাপিয়ে দেয়ার মানেটা কি?

সবাইকে এটা দেখাতে, যে বাংলাদেশ একটা মুসলমান দেশ? এটা দেখিয়ে লাভটা কি হচ্ছে? এটা তো লুকানো যাচ্ছে না যে বাংলাদেশ নামক মুসলমান এই দেশটি দূর্নীতির আন্তর্জাতিক তালিকার উপরের দিকে, এই দেশে সুদের নিয়মেই ব্যাংকের লেনদেন হয়। তার উপর এই দেশে নারী, বালক ও বালিকাদের ধর্ষণ ও শারীরিক নির্যাতন ঊর্ধ্বের দিকে। আজান শুনিয়ে কি এই সব অপরাধ ঢেকে ফেলা হচ্ছে? আমি তো বলবো না! হিজাবের মতো এটাও একটা লোক দেখানো ধার্মিকতা। হিজাবটা যেমন ব্যক্তিগত পর্যায় লোক দেখানো ধার্মিকতা, ঠিক তেমনি বিমানবন্দর, বাস, ট্রেন, লঞ্চ ইত্যাদিতে আজান ও কোরআন তেলোয়াত হচ্ছে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে লোক দেখানো ধার্মিকতা।

এই লোক দেখানোর প্রবণতা তখনই আসে যখন সেটাকে বেশি করে দেখানোর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করা হয়। অতি ভক্তি যেমন চোরের লক্ষণ, ঠিক তেমনি অতি ধার্মিকতা ভন্ডামির লক্ষণ। শাঁক দিয়ে মাছ ঢাকা যায় না। আকাশ পথে উড়াল দিয়ে ঢাকায় নেমে একতারা, দোতারা, বাঁশী বা সেতারের আওয়াজ না শুনতে পেয়ে আজানের আওয়াজ আমাকে শুনতে হবে জানলে হয়তো নিজের জন্মভূমি এত উচ্ছ্বাস নিয়ে বেড়াতে আসতাম না।


বাংলা একাডেমির বানান

রিয়াজ ওসমানী

১৭ মে ২০২০

বাংলাদেশী লিখবো, না কি বাংলাদেশি লিখবো? রাণী, না কি রানি? ইদানীং কালে এই বিড়ম্বনা বেশ প্রকট হয়ে উঠেছে। এর কারণ সম্প্রতি বাংলাদেশ সরকারি উদ্যোগে বাংলা একাডেমি মারফত বাংলা বানানের কিঞ্চিৎ সরলীকরণ এবং কিছু নিয়মের আওতায় সীমাবদ্ধকরণ। আমি প্রথমে ভেবেছিলাম, যেই প্রতিষ্ঠানটি এখনো পর্যন্ত তাদের নামটাও বাংলায় সঠিকভাবে রাখতে পারেনি তাদের এই শিশুসুলভ বাতুলতাকে গুরুত্ব সহকারে দেখার কোনো প্রয়োজন আছে কি না। তাছাড়া আমরা এত দিন কি ভুল শিখেছি বা লিখেছি? ভুলই যদি করেছি তাহলে কোন নিয়ম অনুযায়ী ভুল লিখেছি? আর ভুলই যদি করেছি তাহলে এখনকার যে নতুন নিয়ম প্রণয়ন করা হলো সেগুলো কোন নিয়মে করা হয়েছে? আগেকার প্রতিষ্ঠিত রীতি অনুযায়ী, না কি নতুন করে বানানো কিছু রীতি অনুযায়ী? নতুন করে বানানো কিছু হলে সেটাতে আমার ছিল ঘোর আপত্তি।

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর কেউ আমাকে সঠিকভাবে দিতে পারেনি। আমিও নেটে অনেক অনুসন্ধান করেও কোনো উপসংহারে আসতে পারিনি। পরে বুঝলাম আমার প্রশ্নগুলোই ছিল ভুল। এখানে ব্যাপার হচ্ছে যে এত দিন ধরে বিভিন্ন শব্দের প্রচলিত বানানের মধ্যে ছিল কিছু অরাজগতা। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় – একই রকম দুইটা শব্দ ছিল অথচ একটাতে ছিল ইকার, আরেকটাতে ছিল ঈকার এবং সেই বিশৃঙ্খলা কোনো নির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই বলবৎ ছিল। তার উপর একেকজন ভিন্নভাবে শব্দ দুটো লিখে গেছেন। এই অরাজগতা দূর করতে বাংলা বানানের একটা সরলীকরণ এবং মানদণ্ডের প্রয়োজন ছিল। বাংলা একাডেমি এই মানদণ্ড ও ছক তৈরি করে প্রতিটি নিয়মের ব্যাখ্যাও দিয়েছে। আমার আবারও প্রশ্ন থেকে যায় যে কিসের ভিত্তিতে তারা এই সব নিয়ম তৈরি করলো। তারা যেগুলোর বর্ণনা করেছে সেগুলোর কি কোনো ভাষাভিত্তিক এবং ঐতিহাসিক দলিল রয়েছে? নাকি এই নিয়মগুলো তাদের ইচ্ছে মত তৈরি করা হলো?

আরো ভেবে দেখলাম যে এই প্রশ্নটা আর মুখ্য নয়। তারা তাদের নিয়মের ব্যাখ্যা দিয়েছে এবং সংষ্কৃত ভাষার গঠনের কিছু কথাও বলেছে যেগুলো আমার সহজে বোধগম্য হয়নি। কিন্তু আস্তে আস্তে বুঝলাম যে এগুলো আমার অত ভালো করে এখন না বুঝলেও চলবে। একটা নিয়ম বা শৃঙ্খলা তৈরি করে দেয়া হয়েছে, সেটাই যথেষ্ট। কারণ, আমার কাছে একটাই জিনিষ গুরুত্বপূর্ণ। সেটা হচ্ছে যে সবাইকেই একভাবে একটা শব্দ লিখতে হবে। দুই বা তিনভাবে নয়। আর এখানেই বাংলা একাডেমির প্রচেষ্টা স্বার্থক বলে আমি মনে করি। অন্তত বাংলাদেশের ভেতরে সবাইকে সরকারি অনুমদিত এই বানানের রূপরেখা মেনে নেয়া উচিৎ। কিছু ভাষা বিশেষজ্ঞ এই নতুন নিয়মগুলোর কোনোটাকে যৌক্তিক মনে করতে পারেন, কোনোটাকে অযৌক্তিকও মনে করতে পারেন। সেটা তাদের অধিকার। কিন্তু একটা নীতিমালা যেহেতু আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত হয়েছে, আসুন আমরা সবাই এই ছকের আওতায় আসি। তথ্যপ্রযুক্তির যুগে বাংলা বানানের একটা নির্দিষ্ট রূপরেখা যে অপরিহার্য, আশা করি সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। শুনেছি চীনেও নাকি তথ্যপ্রযুক্তির কারণে তাদের হাজারটা শব্দ সরলীকরণ করে ফেলা হয়েছে।

এখন বাংলা বানান নিয়ে পশ্চিম বাংলার সাথে বাংলাদেশের একটা বিভাজন তৈরি হয়ে যেতে পারে। তবে বানান নিয়ে এই বিভাজন নতুন কিছু নয়। ইংরেজি ভাষার ক্ষেত্রেও আমরা দেখেছি যে মার্কিনরা অনেক ইংরেজি শব্দ সরলীকরণ করে বদলে ফেলেছে যেগুলো ইংরেজদের ভ্রু কুচকিয়ে ফেলে। বাংলাদেশে যেহেতু বাংলা বানানের জন্য একটা প্রণালী আনুষ্ঠানিকভাবে তৈরি করে ফেলা হয়েছে, আমাদের উচিৎ সেটাকে গ্রহণ করে নেয়া, এখন থেকে এইভাবে লেখার অভ্যাস করা এবং ছোটদেরকে এইভাবে শিক্ষা দেয়া। এতে বাংলা ভাষার প্রতিষ্ঠানিক রূপকে আরও পোক্ত করা হবে। নিম্নে দেয়া সংযুক্তিটি বাংলাদেশ সরকারের প্রজ্ঞাপনের। আমার সাথে আপনারাও এখানে দেয়া বানান প্রক্রিয়াগুলো রপ্ত করে নিতে পারেন। আমি এই কাজ কেবল শুরু করতে যাচ্ছি বলে আমার এই লেখায় বাংলা একাডেমির বানান স্পষ্টভাবে ফুঁটে উঠেছে বলে আমি বিন্দু মাত্র দাবি করতে পারছি না।


বাংলাদেশে যৌন সংখ্যালঘু এবং ধর্মনিরপেক্ষ মানবদের অধিকারঃ একটি সামাজিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণ

রিয়াজ ওসমানী

৯ ফেব্রুয়ারী ২০১৯

জানুয়ারীর ২০, ২০১৯ তারিখে যুক্তরাজ্যের লন্ডনে “যৌন সংখ্যালঘু এবং ধর্মনিরপেক্ষ মানবদের অধিকার এখন ঝুঁকিতেঃ একটি বাংলাদেশি দৃষ্টিকোণ” নামক একটি সন্মেলনে আমি এই বক্তব্যটা রাখি। বিখ্যাত মানবাধিকার, ধর্মনিরপেক্ষ এবং সমকামী অধিকার কর্মীবৃন্দ রাফিদা আহমেদ বন্যা, গীতা সেঘাল, মারইয়াম নামাজী, অজন্তা দেব রায়, সাদিকুর রহমান রানা, সাদিয়া হামিদ, জেমস বাঙ্গাস ইত্যাদিদের সাথে আমি সহাবস্থান করার গৌরব অর্জন করি। ইংরেজিতে রাখা বক্তব্যটার বাংলা অনুবাদ নিচে দেয়া হল।


ধন্যবাদ সুধী। আজকে একটি বক্তব্য রাখার জন্য সৈয়দ ইশতিয়াক হোসেনকে আমি অনেক ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আমি প্রয়াত অভিজিৎ রায় এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন মুক্তমনা এবং নাস্তিকদের প্রতি গভীর সন্মান জানাচ্ছি যারা কিছু বছর আগে ইসলামি মৌলবাদীদের হাতে খুনের শিকার হন। আমি আজকে অভিজিৎ রায়ের বিধবা স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যার সামনে দাঁড়াতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে করছি, যিনি ২৬শে ফেব্রুয়ারীর সন্ধ্যা বেলায় এক ভয়ানক হত্যাকান্ডের পর তার প্রয়াত স্বামীর এবং তার ব্যক্তিগত মশাল হাতে নিয়ে চলছেন।

আমি এই মুহুর্তে  প্রয়াত জুলহাজ মান্নান এবং মাহবুব তনয়ের প্রতিও আমার গভীর সন্মান এবং ভালবাসা প্রদর্শণ করছি যারাও ২০১৬ সালের এপ্রিল মাসের শেষের দিকে ইসলামি মৌলবাদীদের দ্বারা খুন হন। জুলহাজ ছিলেন বাংলাদেশের একজন বিশিষ্ট সমকামী অধিকার কর্মী, তার বন্ধু মাহবুব ছিলেন একজন সমকামী সাংষ্কৃতিক কর্মী। আমি আরও স্মরণ করতে চাই অন্যান্য ধর্মনিরপেক্ষ এবং নাস্তিক ব্লগার, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিভিন্ন ধর্মগুরু, সংষ্কৃতিমনা শিক্ষাবিদ এবং কিছু আন্তর্জাতিক মন্ডলের উন্নয়ন বন্ধু যারা গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশে মুসলমান চরমপন্থীদের হাতে নিজেদের জীবন হারান।

অভিজিৎ রায় আমাদের জানা মতে বাংলা ভাষায় সর্ব প্রথম সমকামিতা নিয়ে একটি বই লিখেন। তাঁর এই কর্ম নাস্তিক এবং সমকামীদের মধ্যে পরষ্পর সমন্বয়ের একটি সুন্দর সম্পর্ক তুলে ধরে। একজন মুক্তমনা, বৈজ্ঞানিক লেখকের কাছ থেকে এই উপহার আমাদেরকে শিখিয়ে দেয় যে অন্তর্নিহিত একটি যৌনতা, যা সংখ্যাগরিষ্ঠ বিষমকামী সামাজিক রীতির বাইরে পড়ে, তার গ্রহণযোগ্যতার জন্য মানুষকে ধর্মীয় অনুশাসন থেকে পাওয়া বিভিন্ন উপলব্ধি এবং সংজ্ঞাগুলোর সংকীর্ণতা থেকে বের হয়ে আসতে হয়।

এই বাস্তবতাটি বাংলাদেশ এবং বাকি বিশ্বের জন্য বর্তমানে একেবারেই প্রযোজ্য। লন্ডন ভিত্তিক কিন্তু বাংলাদেশের ভেতরকার যৌন সংখ্যালঘুদের সাথে যুক্ত একজন নেট ভিত্তিক সমকামী অধিকার কর্মী হয়ে আমি জানতে পেরেছি কিভাবে ধর্মীয় শৈশব এবং চিন্তাধারা সমকামীদের কোনো মানবাধিকার তো বটেই, কোনো স্বীকৃতির ক্ষেত্রেও এককভাবে প্রধান প্রতিবন্ধকতার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আমাদের উপলব্ধি অনুযায়ী মুসলমান জীবন ধারার সাথে কোনো মিল নেই, আমি এমন অনেক বাংলাদেশি মানুষের আসা যাওয়া দেখেছি। উপরন্তু বাংলাদেশের সমাজ এবং অর্থনীতিতে এমন কিছু ঘটনা বিদ্যমান যা আমাদের ধারণা অনুযায়ী কোনো দিনও ইসলামি সমাজের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে না। আমি পুরুষ দ্বারা নারীদের উপর যৌন এবং শারীরিক হিংস্রতার কথা বলছি। আরও বলছি ঘুষ, নিজের সুবিধার জন্য অন্যদের ক্ষতি, চরম দূর্নীতি, বিষমকামীদের মাঝে পরকীয়া, মাদ্রাসার শিক্ষক দ্বারা বালক ধর্ষণ, যে কোনো পুরুষ বা ছেলে দ্বারা বালিকা ধর্ষণ, চুরি, ছিন্তাই, ডাকাতি এবং আরও অনেক লম্বা তালিকাভুক্ত ঘটনাগুলোর কথা। কিন্তু ঠিক এই কুকর্মগুলোর সাথে জড়িত অনেকেই প্রথমে বলে উঠবেন যে সমকামিতা ইসলাম ধর্মের বিরুদ্ধে এবং মুসলমান দেশে আমরা এই সব সহ্য করতে পারবো না।

এই ধারণাটা তাদের মনে একটি নিম্নমানের রেস্তোরাঁয়ে বাজে মসলার গন্ধের মতো গেঁথে আছে। বিশ্বাসভিত্তিক একটি নিয়মের সাথে কেউ যেন তর্ক করতে পারে না। এই ভ্রম্যান্ডে যুক্তির কোনো স্থান নেই। কেউ কিছু একটা বিশ্বাস করে ফেললে সেই বিষয়ে সেটাই হচ্ছে চূড়ান্ত অভিমত। উপরন্তু, কে এই বিষয়ে (বা অন্য কোনো বিষয়ে) কী বিশ্বাস করলো বা ধারণা পোষণ করলো তা বিভিন্ন ইমাম দ্বারা প্রচার করা ধর্মীয় অনুশাসনগুলোর সংকীর্ণতা দিয়ে পরিষ্কারভাবে সংজ্ঞায়িত করা। প্রায় কেউই কোরআন শরীফ (আল্লাহর বাণী) এবং হাদিস (নবী মুহাম্মদ (সঃ) এর বাণী) কোনো একটি ভাষায়ে পড়েনি যেই ভাষা তারা বুঝে। বাংলা বা ইংরেজিতে কোরআন এবং হাদিস পড়ার উপর কখনোই কোনো জোর দেয়া হয়নি। সবাই তোতা পাখির মত আরবি লেখাগুলো উচ্চারণ করতে শিখে এবং এর ফলে পুস্তকগুলোতে আসলে কী বলা আছে তার বিন্দুমাত্র সরাসরি উপলব্ধি কারোর মাঝে আসে না। এই গন্ডির বাইরে চিন্তা করাটা সবার জন্য প্রায় অসম্ভব, এবং সেটার চেষ্টা করাটাকেও বৈধর্ম্য হিসেবে গণ্য করা হয়। এবং এর বিরুদ্ধে কেউ যতই সংগ্রাম করুক না কেন, আল্লাহর কাছ থেকে প্রদত্ত হৃদয়ঙ্গম করা বিজ্ঞতা, যা নবী মুহাম্মদ (সঃ) দ্বারা প্রচারিত হয়েছে, তাকে কখনো প্রশ্ন করা যাবে না। এই বাস্তবতার নিরিখে আমি আমার আগেকার ইসলামের আদলে গড়ে তোলা জীবন এবং পরে আবিষ্কার করা যৌনতাকে সমন্বয়ে রেখে এগিয়ে যেতে পারিনি।

আজ আমি একজন প্রাক্তন মুসলমান (এক্স-মুসলিম); একজন সমকামী বাংলাদেশি এবং বিলেতি নাগরিক, যে জোরালোভাবে অনুভব করে যে ইসলামের ফলে চিন্তাধারার উপর সীমাবদ্ধতা মেনে নেয়া এবং একই সাথে নিজের তথাকতিত বিপথগামী যৌনতাকে সত্যিকার অর্থে গ্রহণ করে নেয়ার প্রচেষ্টা বড়জোর এক প্রকার ভণ্ডামি। অনেক কিছু ডাষ্টবিনে ফেলে দিয়ে, আন্তর্জাল আবিষ্কার হওয়ার পর বাংলাদেশ থেকে উদিত হওয়া চমৎকার, মুক্তমনা সকল আল্লাহবিহীন বর্বরদের সাথে হাত মেলানো বরং একটি অপেক্ষাকৃত সৎ উদ্যোগ 😊।

আচ্ছা, এখন বলতে হবে যে সমকামী মুসলমান বলতে একটা জিনিষ অবশ্যই আছে। এই বর্ণনার মানুষরা ইসলাম ধর্ম যথারীতি পালনও করে। এরা অধিকাংশই পশ্চিমা দুনিয়াতে বাস করে এবং সডম শহরের নবী লুত (আঃ) এর ঘটনার একটি নতুন ব্যাখ্যা থেকে তারা তাদের শক্তি অর্জন করে। প্রচলিত জ্ঞান অনুযায়ী সমকামিতার কারণে সডম শহরকে ধ্বংস করে ফেলা হয় (যার ফলে তারপর দুনিয়াতে সমকামীদের উপর নিপীড়ন শুরু হয়); কিন্তু কিছু পশ্চিমা আলেমরা ইদানীং ব্যাখ্যা দিয়েছেন যে পুরুষ ধর্ষণের কারণে সডমে আল্লাহর গজব পড়ে, প্রাপ্তবয়ষ্কদের মধ্যে সন্মতিসূচক সমলৈঙ্গিক যৌনাচারের জন্যে না। এই ব্যাখ্যাটা শুনতে ভালোই লাগে। কিন্তু বাংলাদেশে (কিংবা ইরানে অথবা সৌদি আরবে) সমকামীদের এবং সমকামিতা নিয়ে জনসাধারণের চিন্তাভাবনা নির্ভর করবে কোন রূপকথা সর্বজনীনভাবে বিশ্বাস করা হয়, তার উপর। সুন্দর এবং সংশোধনবাদী সংস্করণটা আগামী দিনগুলোতে তেমন কোনো গ্রহণযোগ্যতা পাবে না।

তবে সমকামী মুসলমানরা শুধু কোরান ভিত্তিক ইসলামের দিকে নজর দিয়ে সান্ত্বনা পেতে পারেন। সডম নগরের ধ্বংসের কথা (সেটা যেই কারণেই হোক না কেন) কোরআন শরীফে উল্লেখ করা আছে ঠিকই কিন্ত সমকামীদের শাস্তির বিধান কোথাও পাওয়া যায় না। বস্তুত, সমকামীদের কথা কোরআন শরীফে কোথাও এসেছে কি না সেটাও প্রশ্নসাপেক্ষ।

কিন্তু হাদিসে তাদের কথা বলা হয়েছে বইকি। সেখানে সমকামিতার জন্য অজস্র শাস্তির বিধান রয়েছে। কেউ কোরআন ভিত্তিক ইসলাম মেনে চলতে চাইলে হাদিসের সকল বই ফেলে দিয়ে সমকামীদের শাস্তির কথা উপেক্ষা করতে পারে। কিন্তু আপনি যদি মনে করেন যে শুধু কোরআন ভিত্তিক ইসলাম ইসলামিপন্থার একটি বিকল্প হতে পারে তবে আপনি বোকার স্বর্গে বাস করছেন। আমি হলফ করে বলতে পারি যে বাংলাদেশের মতো দেশে নবীকে প্রায় আল্লাহর মতো সমান গুরুত্ব দেয়া হয় এবং প্রাচীন আলেম দ্বারা নিশ্চিত করা নবীর আসল বক্তব্যগুলো একেবারেই অলঙ্ঘনীয়।

এবং এটাই বাস্তব, যদিও নবীর মৃত্যুর ২০০ বছর পর হাদিসগুলোকে বই আকারে সঙ্কলন করা হয়। বংশ ধরে মানুষ মুখে মুখে নবী মুহাম্মদ (সঃ) তাঁর সাহাবীদের কী বলেছিলেন তা একজন আরেকজনকে বলে আসতে থাকে। আপনি চাইনিজ হুইসপার্স খেলাটার নাম শুনেছেন? আপনি কি বিশ্বাস করেন যে সঙ্কলিত সংস্করণটিতে কোনো কিছু থাকতে পারে, যা নবী আসলেই বলেছিলেন কিন্তু যেটা তাঁর মৃত্যুর ২০০ পর লিখিত আকার ধারণ করে? মজার ব্যাপার হচ্ছে হাদিস সঙ্কলন করতে গিয়ে প্রাচীন আলেমরা প্রথমে মানুষের মুখে মুখে শোনা বিভিন্ন উক্তিগুলোর ৯০ শতাংশকেই ভ্রান্তিকর বলে বিবেচিত করেন। রত্নগুলোর শুধু ১০ শতাংশকেই তারা সহি হাদিস বলে গণ্য করেন! কোনগুলো সঠিক এবং কোনগুলো সঠিক না, তা নির্ণয় করার জন্য নিশ্চয়ই আলেমদের একটা মানদন্ড ছিল।

এই মানদন্ডগুলোর মধ্যে একটি ছিল পুরুষদের মাঝে স্ত্রী-বিদ্বেষ বা নারীদেরকে ছোট করে দেখার প্রবণতা। এই আলেমরা ছিলেন অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পুরুষ এবং যেহেতু একজন পুরুষ শারীরিকভাবে একজন নারীকে প্রবেশ করতে পারে, সেহেতু পুরুষরা নারীদেরকে দূর্বল এবং অসুরক্ষিত মনে করতো। একজন পুরুষ আরেকজন পুরুষকে যদি প্রবেশ করে তাহলে সেটা হতো পুরুষত্বের তথা মানব জাতির সবচেয়ে বড় অপমান। একজন পুরুষ কি করে আরেকজন নারীর মতো হতে পারে? একই সুত্রে একজন পুরুষ কি করে নারীর মতো আরেকজন পুরুষের সাথে শয্যায়িত হতে পারে? আরও গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে মুসলমানদের ধর্ম কি করে আরব ও বাকি দুনিয়ায় প্রচার পাবে যদি সমস্ত পুরুষরা শুধু অন্য পুরুষদের সাথে শয্যায়িত হয়ে বাচ্চা প্রজনন বন্ধ করে দেয়?

পরিষ্কারভাবে বোঝা যাচ্ছে যে তখন যৌন প্রবৃত্তি নিয়ে ডাক্তারি আবিষ্কার আজকের দিনের মতো অত বিকশিত হয়নি। কিন্তু বংশ ধরে পাওয়া এই মনোভাব আজকে বাংলাদেশে তরুণ সমকামীদের মাঝে চিরস্থায়ীভাবে নিজেদেরকে পাপী মনে করার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেই তরুণরা বাল্যকাল থেকেই ইসলাম (ও অন্যান্য) ধর্মের সকল অলংকরণ দ্বারা মগজ ধোলাইকৃত হয়েছে। আগেকার দিনে পশ্চিমা দুনিয়ার মতো সেখানেও দেখা যাচ্ছে যৌন সংখ্যালঘুদের মাঝে বিষন্নতার প্রভাব এবং আত্মহত্যার প্রবণতা। এবং সাম্প্রতিক মোবাইল নেটের বিকাশের (সাথে সস্তা চাইনিজ স্মার্ট মুঠোফোনের আবির্ভাবের) আগে অধিকাংশকেই বিপরীত লিঙ্গের কাওকে বিয়ে করে ফেলার পরিণতিকে মেনে নিতে হতো, সব সময়েই যে আত্মীয়স্বজনের চাপের মুখে তা নয়, অনেক সময়ে একটি বিকল্প পথের কোনো সুযোগ নেই, এই ভেবে।

বিকল্প পথের একটি সচেতনতা আজ এসেছে বইকি। কিন্তু ধর্ম এসে দাঁড়িয়েছে পথের একটি চিরকালীন বড় বাঁধা হয়ে। দেখা যাচ্ছে যে যারা ধর্মভীরু এমনকি যাদেরকে মোল্লা হিসেবেই গণ্য করা যায়, তাদের মাঝে যারা সুপ্ত সমকামী, তারা হচ্ছে সাধারণভাবে সমকামীদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় হুমকি। এরা অনেক সময়েই রাতে সমলৈঙ্গিক যৌনাচারে লিপ্ত হয়, কিন্তু পরের দিনের বেলায়ে জনসন্মুখে সমকামিতার বিরুদ্ধে জঘন্য কথা বলে যৌনতাকে প্রশ্ন করা অল্প বয়সের ছেলে ও মেয়েদের মধ্যে ভীতির সঞ্চার সৃষ্টি করে এবং জনসাধারণের মধ্যে সমকামীদের বিরুদ্ধে ঘৃণা তৈরি করে। বাংলাদেশে সমকামীদের অধিকার তৈরি করার দীর্ঘ যাত্রার এক অংশ হবে এই মানুষদের মুখোশ খুলে দেয়া – শুধু এই সুপ্ত সমকামীদেরই না, বরং শিশুকামীদেরও একই, কারণ মুসলমান দেশে সমকামীদের বিরুদ্ধে এরাও কথা বলে এবং মূলধারার সমাজ শিশুকামিতা এবং সমকামিতাকে এক করে ফেলে।

আমি এবার বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির দিকে মনোযোগ দিব যেহেতু সেখানে মুক্তমনা, নাস্তিক এবং যৌন সংখ্যালঘুদের অধিকারের সম্ভাবনার কথা বলতে গেলে সেখানকার রাজনীতিবিদদের বিভিন্ন ছল আর খেলের কথা বলতেই হবে। ১৯৭১ সালে একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর পাকিস্তান থেকে স্বাধীনতা লাভের পর ডঃ কামাল হোসেনের মত একজন বিশিষ্ট আন্তর্জাতিক আইনজীবীর নেতৃত্বে ১৯৭২ সনে রচিত বাংলাদেশের প্রথম সংবিধানটি ছিল সম্পূর্ণ ধর্মনিরপেক্ষ। ১৯৭৫ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তার পরিবারের হত্যাকান্ডের পর আমরা ক্রমান্বয়ে কিছু সামরিক শাসনের শিকার হই, যখন সেনা শাসকরা নিজেদের অসাংবিধানিক ক্ষমতাকে প্রীতিকর করে তোলার জন্য দেশের মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠদের মনোরঞ্জন করার উদ্দেশ্যে ধর্মনিরপক্ষ সংবিধানটিকে কলুষিত করে।

৭০ দশকের শেষের দিকে জেনারেল জিয়াউর রহমান সংবিধান বদলে দেয়ার একটি ঘোষণা দিয়ে দেশের ইসলামীকরণের প্রক্রিয়া শুরু করে দেন। সংবিধানের প্রস্তাবনায়ে তিনি “বিসমিল্লাহের রাহমানের রাহিম” অভিবাদনটি প্রবেশ করিয়ে দেন। সমাজতান্ত্রিক চেতনা অনুযায়ী ধর্ম থেকে মুক্ত হাওয়া থেকে সরে গিয়ে অনুচ্ছেদ ৮(১) এবং ৮(১ক) তে যোগ করা হয় “সর্বশক্তিমান আল্লাহর উপর সম্পূর্ণ বিশ্বাস এবং আস্থা”। ৮০র দশকে রাষ্ট্রীয় ধর্মনিরপেক্ষতা পুরাপুরি জলাঞ্জলি দিয়ে জেনারেল এরশাদ সংবিধানে বাড়তি পরিবর্তন এনে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ঘোষণা দিয়ে এই লালিকা চলমান রাখেন।

শেখ মুজিবর রহমানের একজন কন্যা, শেখ হাসিনা, যিনি হত্যাকান্ড থেকে বেঁচে যান, তিনি তার পিতা দ্বারা চালিত এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখা একটি রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব হাতে তুলে নেন। জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ ন্যাশনালিষ্ট পার্টি অথবা বিএনপি নামক একটি রাজনৈতিক দল গঠন করেন যার নেতৃত্ব ১৯৮১ সালে তার হত্যাকান্ডের পর তার বিধবা স্ত্রী খালেদা জিয়া হাতে তুলে নেন। এতে করেই শুরু হয় দুই রাজনৈতিক পরিবারের দ্বন্দ্ব যা আজ অবদি বাংলাদেশের জন্য আশির্বাদ ও অভিশাপ উভয়ই বয়ে নিয়ে এসেছে।

১৯৯১ সালের পর থেকে বাংলাদেশে গনতন্ত্রের কিছুটা বিকাশের সাথে সাথে আমরা লক্ষ্য করেছি সুষ্ঠ এবং জালিয়াতিমণ্ডিত উভয় ধরণের নির্বাচনের মাধ্যমে দুই দলের পালাক্রমে রাষ্ট্রক্ষমতার অধীনে আরও বেড়ে যাওয়া ইসলামিকরণ। তবে আমরা ২০০১-২০০৬ সাল পর্যন্ত সময়টুকুর মধ্যে বাংলাদেশের সমাজের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন লক্ষ্য করি। বিএনপি এবং সাথেকার জামাতে ইসলামী নামক একটি রাজনৈতিক দলের যৌথ রাজনীতি এবং প্রশাসনের সময়ে আমরা দেখতে পাই যে জাঁকাল শাড়ি এবং উন্মুক্ত কেশ পরিধান করা যুগের সাথে তাল মেলানো মহিলাগন তাদের আধুনিক এবং বাঙ্গালী পোষাক পরিত্যাগ করে আরব দুনিয়ার মরুভূমি থেকে আমদানীকৃত হিজাব এবং বোরখা গ্রহণ করে নেয়। গনমাধ্যমের পরিচিত নারী ও পুরুষ ব্যক্তিদের দেখতে পাই তাদের পোষাক-আষাক বা বার্ষিক হজ্ব পালনের মাধ্যমে তাদের ধর্মীয় পরিচয় জনসন্মুখে প্রকাশ করতে।

১৯৭১ সালে একটি যুক্ত পাকিস্তান হারিয়ে সান্ত্বনা পুরষ্কার হিসেবে জামাতে ইসলামী বাংলাদেশকে সকৌশলে এবং সময়ের সাথে সাথে একটি ইসলামী রাষ্ট্র বানিয়ে দিতে চেয়েছিল। বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে জামাতের অবস্থানের যুক্তি তখন তারা তুলে ধরেছিল তখনকার পূর্ব পাকিস্তানে ইসলাম ধর্মের সংরক্ষণ করার কথা বলে। ভারতের অপর প্রান্তে তখনকার পশ্চিম পাকিস্তান থেকে রাজনৈতিকভাবে আলাদা হয়ে গেলে পুর্ব প্রান্তে হিন্দু ধর্ম থেকে গজিয়ে ওঠা বাঙ্গালী সংষ্কৃতির আদলে ইসলামী মূল্যবোধের অবক্ষয়ের আশংকা ছিল। এই বিশ্বাসকে কাঁধে করে নিয়ে তারা নির্দ্বিধায় বাঙ্গালী জাতির উপর গনহত্যা ও ধর্ষণ চালাতে এবং বাঙ্গালী বুদ্ধিজীবিদের বাছাই করে হত্যা করতে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীকে সহায়তা করতে এগিয়ে আসে – ভারতের হস্তক্ষেপের ফলে যার অবসান ঘটে এবং সেই বছরের ডিসেম্বর মাসে হয় বাংলাদেশের জন্ম।

বিএনপি এবং জামাত ২০০১-২০০৬ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায়ে থাকার সময়ে একটি চরম সাম্প্রদায়িক চেহারার পরিচয় দেয় যার ফলে বাংলাদেশের চেহারা হয়তো চিরকালের জন্য কিছুটা পাল্টে গেছে। আমরা ভারতের উদ্দেশ্যে দেশের হিন্দু জনগোষ্ঠীর ব্যাপক দেশান্তর হতে দেখি। ইসলামের নামে আমরা দেশের আনাচে কানাচে এক সাথে ৫০০টা বোমা বিস্ফোরণ হতে দেখি। তখন জঙ্গিদের পৃষ্ঠপোষকতা কোথা থেকে এসেছিল তা আমরা সহজেই অনুমান করে নিতে পারি।

কিন্তু ২০০৮ সাল থেকে এখন পর্যন্ত আওয়ামী লীগের ক্ষমতার সময়ে আমরা বেশ কিছু চমক এবং নিরাশার সাক্ষী হই। যদিও শেখ হাসিনা ১৯৭১ সালের পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর দোসর জামাত নেতাদের বিচার করে সময়ের একটা বড় দাবী কার্যকর করেছেন, এর পরবর্তীকালীন সময়ে একটি ধর্মনিরপক্ষ এবং অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের সকল আশা গুরুতরভাবে ভঙ্গ হয়েছে। জামাত নেতা ও অন্যান্য যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সমর্থনকারী বিভিন্ন ব্লগার এবং ছাত্রদের নিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে ধর্মনিরপেক্ষ এবং সর্বজনীন শাহবাগ আন্দোলনের প্রত্যুত্তর হিসেবে আমরা হেফাজতে ইসলাম নামের চট্টগ্রাম ভিত্তিক একটি মধ্যযুগীয় ধর্মগোষ্ঠীর আবির্ভাব দেখতে পাই। বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষতা ধ্বংস করে দেয়া, দেশের সকল নাস্তিকদের ফাঁসি দেয়া, জনসন্মুখে নারী ও পুরুষদের পৃথকীকরণ নিশ্চিত করা, নারীদের রান্নাঘরে পুনরায় সীমাবদ্ধ করে দেয়া, এবং সরকার এসকল দাবী অমান্য করলে দেশে আগুন জ্বালিয়ে দেয়ার হুমকি শেখ হাসিনার জন্য একটু বেশিই হয়ে যায়।

আমরা চমকিত এবং নিরাশ হয়ে দেখি যে তাদেরকে জামাতের ন্যয় শেষ করে না দিয়ে তিনি তাদেরকে শান্ত রাখার আশায়ে তাদেরকে তোষামোদ করতে থাকেন। এতে করে শুরু হয় এমন এক প্রক্রিয়া যেটার ব্যাখ্যা আওয়ামী লীগের চাটুকাররা এখনও দিয়ে থাকে একটা নিছক রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে। এখানে একটু চুষনি জাতীয় কিছু দিলে দেশে শুধু শান্তিই বিরাজ করবে না, বরং ধর্মভীরু মুসলমানে ভরা একটি দেশে এটা হবে ভোট পাওয়ার একটা দুর্দান্ত পন্থা। এই চাটুকারদের মনে আওয়ামী লীগ এখনও ধর্মনিরপেক্ষতায়ে বিশ্বাসী একটি দল, এবং শেখ মুজিবের বেটি, আমাদের মাননীয় নেত্রীর হাতেই বাংলাদেশের এরকম একটা ভবিষ্যত নিশ্চিত করার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশী।

এই চাটুকাররা কম করে হলেও নিজেদের এবং অন্যদেরকে বিভ্রান্ত করছেন। আর তার বেশী হলে এরা হলেন মিথ্যাবাদী। না হলে আমরা কেনই বা দেখবো বাচ্চাদের পাঠ্যপুস্তকগুলোকে একটি ধর্মনিরপেক্ষ পাঠ্যক্রম থেকে সরে নিয়ে এসে সেগুলোকে একটি সাম্প্রদায়িক চেহারা দেয়াটি? আমি ছোট বেলায়ে পড়েছি এমন কিছু বাংলা কবিতা ও গল্প যা আমরা কিছু হিন্দু লেখকদের কাছ থেকে পেয়েছি, তা কেনই বা এখন বাদ দেয়া হয়েছে? সরকার থেকে দেয়া সংস্কারের দাবীগুলো আদায় না হয়েই কওমি মাদ্রাসা থেকে প্রাপ্ত স্নাতককে একটি ধর্মনিরপেক্ষ স্নাতকের সমান মর্যাদা কেন দেয়া হল? এই বিষয়ে হাসিনা কেন হেফাজতের শেষ কথার প্রতি মাথা নত করলেন? তিনি কেন বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালতের প্রাঙ্গণে প্রথমবারের মত খাড়া করা শাড়িতে আবর্তিত লেডি জাস্টিসের একটি সুন্দর মূর্তি সরিয়ে ফেলার জন্য হেফাজতের দাবী মেনে নিলেন? তিনি কেন সৌদি আরবের সহায়তায়ে পুষ্ট দেশী তহবিলের অর্থায়নে দেশে ১০০০টা “আদর্শ” মসজিদ গড়ে তুলতে যাচ্ছেন? তিনি কি জানতেন না যে আলাদিনের চেরাগ থেকে এই দৈত্যকে একবার বের করলে সেটাকে আর ঢোকানোর কোনও উপায় নেই? পাকিস্তান এবং অন্যান্য কিছু দেশের অভিজ্ঞতাগুলো থেকে তিনি কি কিছুই শিখেন নি? আর সবচেয়ে বড় কথা হল, শেখ হাসিনা কয়েকবার গনমাধ্যমের সামনে বলেছেন যে তার সরকার কখনোই কোরান ও হাদিসের বিরুদ্ধে যাবে এমন কোন আইন পাস করবে না। তাহলে পুরাপুরি শরীয়া আইন আনতে বাঁধা কোথায়? রাজনৈতিক সুবিধার জন্য এই অর্ধেক ভেতর ও অর্ধেক বাহির কেন?

২০০৮ সালে তার দল সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার আদলে তিনি আবার ক্ষমতায় আসার পর তিনি বাংলাদেশের সংবিধানকে ১৯৭২ সনের চেহারায়ে ফিরিয়ে আনার জন্য সংস্কারের উদ্যোগ নেন। আগেই বলেছি যে সংবিধানকে অতীতকালে দুইজন সেনা জেনারেল (জিয়াউর রহমান আর এরশাদ) কলুষিত করে। সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা ফিরিয়ে আনার জন্য শেখ হাসিনার চেষ্টাটা ছিল হাস্যকর। সংবিধান থেকে আশির দশকে এরশাদ কর্তৃক পাওয়া মুখপোড়া সেই রাষ্ট্রধর্মটি বাতিল না করে তিনি একটি অনুভিতি সহ সেটা বলবৎ রেখে দেন – অনুভিতি বা শর্তটি ছিল যে আর বাকি সকল ধর্ম দেশে সমানভাবে পালন করা হবে। একটা রাষ্ট্রের চোখে কি করে সকল ধর্ম সমান মর্যাদা পায় যদি তাদের একটিকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে মনোনীত করা হয়? অধিকাংশ বাংলাদেশীরা কি এটা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে যে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা দেয়ার অর্থই হচ্ছে বাকি ধর্মের অবলম্বনকারী ও ধর্মহীণদের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক বানিয়ে দেয়া? মূলত, রাষ্ট্রধর্ম সহ একটা দেশকে কোন্ প্রকৃত অর্থে ধর্মনিরপক্ষ বলা যায়? বাংলাদেশ প্রকৃতপক্ষে কবে একটা ধর্মনিরপেক্ষ দেশ ছিল? আমি নিশ্চয়ই তখন বাচ্চাদের বুটি পরে দিন কাটাতাম। পশ্চিমা দুনিয়ায়ে সকলের অনুধাবিত সত্যিকারের ধর্মনিরপেক্ষতা অর্জন করতে হলে রাষ্ট্রকে সকল ধর্ম সম্বন্ধে অজ্ঞ থাকতে হবে, অনেকটা ফ্রান্স দেশটার মত। বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষতা বলতে বোঝায়ে একটা সম্পূর্ণ ভিন্ন বস্তু। সেখানে ধর্মনিরপক্ষতা মানে কিছুটা ভারসাম্যের ভিত্তিতে সকল ধর্মের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা।

বর্তমান সরকারের বিগত দশ বছরের দিকে তাঁকালে আমরা দেখতে পাই যে ধর্মনিরপেক্ষ, নাস্তিক, মুক্তমনা, ধর্মীয় সংখ্যালঘু এবং যৌন সংখ্যালঘুদের রাষ্ট্রীয় এবং সামাজিক স্তর দ্বিতীয় শ্রেণীর হয়ে পোক্ত হয়ে গেছে। নিম্নে উল্লেখিত কিছু ঘটনার সময়ে সরকারের ভূমিকা ছিল জঘন্য। সেই ঘটনাগুলোর মধ্যে ছিল ইসলামী জঙ্গিদের দ্বারা মুক্তমনা, নাস্তিক ব্লগার, অভিজিৎ রায়ের মত বিখ্যাত লেখক, সমকামী অধিকার কর্মী জুলহাজ ও তনয়, লালন ও বাউল কৃষ্টির কিছু সাংষ্কৃতিক ব্যক্তিবর্গ এবং হিন্দু, খৃষ্ট ও বৌদ্ধ ধর্মের কিছু ধর্মগুরুদের ক্রমাগত খুন। হতাশার সাথে আমরা দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মুখে বার বার শুনতে পাই যে এগুলো ছিল সব বিচ্ছিন্ন ঘটনা। প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলগুলোর উপর দোষ চাঁপিয়ে দিয়ে, এবং হত্যার শিকার হওয়া মানুষদেরকে ইসলামের বিরুদ্ধে লেখার জন্য তাদেরকেই দায়ী করে নিজেকে সকল দায়িত্ব থেকে মুক্ত রাখার চেষ্টা করেন। তার ধারণকৃত কথা অনুযায়ী আমরা জেনেছি যে তার সরকার এই সব নাস্তিকদের দায়িত্ব গ্রহণ করবে না। সন্ত্রাসী খুনীরা সরকারের এই মনোভাবের ফলে অধিকতর উৎসাহিত বোধ করেছিল বৈকি।

ব্যাপার যেই দিকে এগুচ্ছিল, ঢাকার গুলশানে একটি অভিজাত কফির দোকানে বর্বর আক্রমণটি ছিল সময়ের ব্যাপার মাত্র। এবং তারপরে প্রয়োগ হওয়া বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চাপের ফলে প্রশাসন বিশেষ কিছু অভিজান চালিয়ে জঙ্গিদের অনেককেই আটক এবং নির্মূল করে, যে সকল জঙ্গিদের অস্থিত্বই শেখ হাসিনা এর আগ পর্যন্ত অস্বীকার করে এসেছিলেন। মুক্তমনা এবং নাস্তিকদের ভাগ্য নিয়ে রাজনীতি করার মানসিকতা সহ সরকারের কিছু আগের নিরূদ্যম মনোভাব না থাকলে গুলশানের সেই দোকানে হত্যাকান্ডটি নাও ঘটতে পারতো। সাথে আজ বেঁচে থাকতো সেই জাপানী প্রকৌশলীরা এবং বাংলাদেশের কিছু রত্নরা, যারা অন্ধবিশ্বাস এবং তার পরিণতিস্বরুপ সামাজিক বিভিন্ন অন্যায়ের বিরুদ্ধে আগে থেকেই সোচ্চার হয়েছিল।

আজকের দিকে তাঁকালে দেখবো যে শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগ গত ডিসেম্বরে একটি হাস্যকরভাবে পাতানো নির্বাচনের পর ৫ বছরের জন্য আবারও ক্ষমতায়ে এসেছে। বাংলাদেশের মত রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত একটি দেশে এরকম হেসে উড়িয়ে দেবার মত ফলাফল পাওয়া যাওয়ার কথা না, যেখানে সংসদের ৩০০ আসনের শতকরা ৯৫ ভাগ একটি রাজনৈতিক দল বা তার নেতৃত্বে একটি জোটের পক্ষে যায়। কিন্তু আসলে তাই হয়েছে। সরকারের বিপক্ষে দাঁড়িয়েছিল কয়েকটি রাজনৈতিক দল মিলিয়ে নতুন একটি জোট যার নাম জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। বিশিষ্ট ব্যক্তি ডঃ কামাল হোসেন, যার কথা আমি শুরুতে বলেছি, তিনি তার নিজের দল সহ আরও কিছু দলকে এই জোটে একত্র করে নির্বাচনে আনতে পেরেছিলেন। এই ঐক্যের সবচেয়ে বড় দলটা ছিল বিএনপি যেটা একটি নৈতিক এবং রাজনৈতিক অপরাধ করে জামাতের সাথে সকল সম্পর্ক ছিন্ন করতে অস্বীকৃতি জানায়। ২৫ জন প্রাক্তন জামাতীরা বিএনপির একই প্রতিকের নিচে সাংসদ হিসেবে দাঁড়ায় যেহেতু জামাত এখন বাংলাদেশে আর কোনও নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল নয় এবং নিজের প্রতিকের নিচে নির্বাচন করতে পারে না।

এক দিকে ঐক্যফ্রন্টের ছাতার নিচে বিএনপি-জামাতের পুনরায় ক্ষমতায়ে আসার সম্ভাবনা, অন্য দিকে আরও ৫ বছর আওয়ামী লীগের শাসন – এই কঠিন বাছাইটি সম্প্রতি সম্পন্ন হওয়া নির্বাচনে ধর্মনিরপেক্ষ, নাস্তিক, মুক্তমনা, ধর্মীয় সংখ্যালঘু এবং যৌন সংখ্যালঘুদের এক বিরাট বিড়ম্বনায়ে ফেলে দেয়। ভোট দেয়া যদি বাধ্যতামূলক থাকতো তাহলে আমরা অনেকেই সিদ্ধান্ত নিতে পারতাম না কাকে নির্বাচিত করবো। দু’টি দলই ছিল অপাংক্তেও। আমরা বিএনপি-জামাতের প্রশাসন থেকে কখনোই একটা ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ উদিত হবার আশা রাখতে পারতাম না, যদিও সেই প্রশাসনটা ডঃ কামাল হোসেনের নৈতিক এবং ধর্মনিরপেক্ষ নেতৃত্বে আলিঙ্গনকৃত থাকতে পারতো। অন্য দিকে কিছু আগে দেয়া আমার বর্ণনা অনুযায়ী আওয়ামী লীগের শেখ হাসিনা তার ধর্মনিরপেক্ষতার আসল পরিচয় দেখিয়ে আমাদেরকে চূড়ান্ত বিশ্বাসঘাতকতা উপহার দেন। কেউ যদি এরপর বাংলাদেশের বামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর দিকে মনোযোগ দিত, তবে তা হত সহজেই অনুমেয়। দেশ থেকে রাষ্ট্রধর্ম উঠিয়ে দেয়া সহ ধর্মভিত্তিক সকল রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার তাদের ব্রত আমাদের কানে সঙ্গীতের মত বেজে ওঠে। দুর্ভাগ্যবসত, এই একই বামপন্থীরা এখনও কার্ল মার্ক্স আর চীনের জেনারেল মাওয়ের লেখা বইগুলো পড়া নিয়ে ব্যস্ত। তারা এখনও বিশ্বায়ন এবং মুক্ত বাজারকে গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানায়। বাংলাদেশের অর্থনীতিকে বিশ্বাসের সাথে এদের হাতে তুলে দেয়া হবে সেই অর্থনীতির স্থবিরতা এনে দেয়ার শামিল।

অর্থনীতির কথা এলে বলতে হবে যে হাসিনাকে যারা চরমভাবে ঘৃণা করে এক মাত্র তারাই গত দশ বছর ধরে বাংলাদেশ যেই অসাধারণ অর্থনৈতিক অগ্রগতির ভেতর দিয়ে গিয়েছে সেটাকে অস্বীকার করবে। বস্ত্র শিল্প, ঔষধ, উঠতি তথ্য-প্রযুক্তি ইত্যাদি দ্বারা বেসরকারি খাতের চাকার সাথে যোগ হয়েছে শুধু বিদেশ থেকে পাঠানো বাংলাদেশী শ্রমিক এবং পেশাজীবীদের কষ্টার্জিত অর্থই নয়, বরং সাথে দেশের অবকাঠামোতে বিস্ময়কর বিনিয়োগ এবং জরুরী সমাজ কল্যান ভিত্তিক কর্মকান্ডের সূচনা বা ধারাবাহিকতা। আজ বাংলাদেশ তার সকল অর্থনৈতিক ও সামাজিক সূচকগুলোর জন্য গর্ব বোধ করতে পারে এবং এর কৃতিত্বের বিরাট এক অংশ বর্তমান সরকারের উপরেই বর্তায় এবং বর্তানো উচিৎ।

শেখ হাসিনা এই সাফল্যের মর্মটা একটু বাড়াবাড়ির সাথে আমলে নিয়েছেন এবং এর ফলে দেশে  আজ বাকস্বাধীনতা, অন্যদের জন্য রাজনৈতিক পরিবেশ, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার সুযোগ সহ সংবিধানে নিশ্চিত করা বিভিন্ন বিষয় যেমন আইনি নিরাপত্তা, আইন থেকে নিরাপত্তা, কোন প্রতিপক্ষ থেকে ভয় ভীতি ছাড়াই নিরাপদে জীবন যাপন (অনেক সময়ে যেটা সয়ং সরকার নিজেই), প্রভৃতি ব্যাপারগুলো একেবারেই হ্রাস পেয়েছে। বিভিন্ন মহল থেকে প্রচন্ড আপত্তি আসা সত্যেও একমাত্র সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার আদলে সরকার ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নামক একটি কালো আইন পাশ করেছে।

এই আইনের ফলে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার বিভিন্ন রকম প্রয়োগকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং মতবিরোধের অনেক ন্যায্য উদাহরণের ফলাফল হিসেবে ধার্য করা হয়েছে বড় অংকের জরিমানা এবং কারাদন্ড। এই দন্ডবিধির ২৫ নং ধারা রাষ্ট্রের জন্য একটি বিশেষ ধরণের সংরক্ষণ নির্ধারণ করেছে যার উদ্দেশ্য হচ্ছে বিভিন্ন বৈধ রাজনৈতিক মতবাদ প্রকাশকে নিষিদ্ধ করা বা সেটাকে দন্ডনীয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা। ২৮ নং ধারাতে বলা হয়েছে যে “ধর্মীয় মূল্যবোধ বা অনুভূতিতে আঘাত হানে এমন যে কোনও সংবাদ” – এর প্রকাশনা বা সম্প্রচার হচ্ছে একটি দন্ডনীয় অপরাধ। আইনটির ফলে পুলিশকে দেয়া হয়েছে ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে একটি অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে – নিছক এই সন্দেহে বিনা পরোয়ানায় যে কাওকে গ্রেফতার করার সর্বোচ্চ ক্ষমতা। আইটির ফলে সরকারের কোন কর্মচারীকে গোপনে চিত্র বা কন্ঠ ধারণ করা, বা কম্পিউটার বা অন্য কোন ডিজিটাল যন্ত্র দিয়ে কোনও সরকারি কার্যালয় থেকে গোপনে তথ্য সংগ্রহ করাকে ১৪ বছরের কারাদন্ডের সাজা দেয়ারও ব্যবস্থা করা হয়েছে।

আমরা সরকারের কাছ থেকে “আশ্বাস” পেয়েছি যে সাংবাদিকদের ভয়ের কিছু নেই, বাকস্বাধীনতা খর্ব করা হয়নি ইত্যাদি, ইত্যাদি। আমরা যেমনটি ভেবেছিলাম এবং যেমনটি পরে দেখেছি, এই সব কথাগুলো ছিল ধাপ্পাবাজী ছাড়া আর কিছু না। আইনটি ইতিমধ্যেই অপব্যবহার করা হচ্ছে – গত নির্বাচনের অনিয়মের প্রতিবেদন পেশ করার জন্য সাংবাদিককে গ্রেফতার করা হয়েছে, সামাজিক মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীকে কটূক্তি করায় ব্যক্তিদেরকে আটক করা হয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল যে শহিদুল আলম নামক একজন ফটো সাংবাদিক এবং অধ্যাপককে সম্প্রতি গ্রেফতার করা হয় এবং বহু কষ্টে পাওয়া জামিনের আগে তাকে ১০০ দিন কারারূদ্ধ করে রাখা হয়। আল-জাজিরার সাথে একটি সাক্ষাৎকারের এবং ফেসবুকের বিভিন্ন পোষ্টের মাধ্যমে তিনি ছাত্র লীগ এবং পুলিশকে ব্যবহার করে একটি সম্প্রতি জেগে ওঠা ছাত্র আন্দোলনকে দমিয়ে দেয়ার চেষ্টা করার জন্য সরকারের তীব্র নিন্দা করেন। দেশদ্রোহিতার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্র মামলা আনে। নিজ দেশের সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলা কবে থেকে দেশদ্রোহিতার শামিল হলো বলতে পারেন? আমি বলতে পারি। এটা হলো সেই দিন থেকে যেই দিন সেই সরকারটা একটা মাথামোটা, চামড়াপাতলা এবং নির্লজ্জ স্বৈরাচারে পরিণত হয়।

ধর্মনিরপেক্ষ, মুক্তমনা, নাস্তিক এবং যৌন সংখ্যালঘুদের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে বাংলাদেশ এবং তার বাইরে একটি আন্দোলন কিভাবে শুরু করবো সেটা জিজ্ঞেস করার আগে আমাদের মনে উপরে বর্ণিত বাস্তবতাটি ভালভাবে অনুধাবণ করে নিতে হবে। এরকম কিছু একটা করার পরিসর কোথায়? কোনও বর্ণের রাজনীতিবিদদের মাঝে তা পাওয়া যাবে না (কিছু বামপন্থীগন ছাড়া)। বিএনপি-জামাতের বদনাম সত্যেও আমি গত নির্বাচনে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ইশতেহারের কিছু বস্তুকে বেশ আকর্ষণীয় মনে করি। এগুলোর মধ্যে দেশের বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথকীকরণ করবে এমন কিছু পদক্ষেপ ছিল অন্যতম। বর্তমানে দেশে বিচার বিভাগ লজ্জাস্করভাবে সরকারের হাতের মুঠোয়ে। ইশতেহারের আরেকটা বৈশিষ্ট ছিল ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের সম্পুর্ণ অপসারণের প্রতিশ্রুতি যা অন্তত আমাদের কন্ঠ ফিরিয়ে দিত। মানছি যে বাংলাদেশে অধিকাংশ ইশতেহারই কখনোই পুরাপুরি বাস্তবায়ন করা হয় না এবং নির্বাচনে ভোট পাওয়ার জন্য এগুলো ফাঁকা বুলি হিসেবেই থেকে যায়। কিন্তু আওয়ামী লীগের ইশতেহারে এই সব বস্তু একেবারেই ছিল না এবং কাকে ভোট দেয়া যায় সেটা নির্ধারণ করার জন্য সকল রাজনৈতিক দলের এই সকল আধপোড়া নিয়তগুলোই ছিল আমাদের নির্দেশক।

অতএব আমি গত নির্বাচনে জয়ী হবার জন্য ঐক্যফ্রন্টকে সমর্থন করি, যেই নির্বাচনটি প্রহসনের মাধ্যমে তাদের কাছ থেকে চুরি করে নিয়ে যাওয়া হয় এবং যার ফলশ্রুতিতে আগামী ৫ বছর আমাদের কন্ঠস্বর রোধ করা হয়ে থাকবে। অধিকাংশ ধর্মনিরপক্ষ ব্যক্তিরা এখানকার দ্বিমূল বাছাইয়ের ব্যাপারটা সুষ্ঠভাবে অতিক্রম করতে পারে নি। আগামী ৫ বছরের জন্য অনেকেই বর্তমান সরকারকেই নির্বাচিত করেছে। আমার দৃশ্যানুযায়ী আমি এই সময়টাতে “প্রকৃতি বিরুদ্ধ যৌনাচার” – কে নিষিদ্ধ করে রাষ্ট্রের চোখে সকল সমকামীদেরকে অপরাধী বানিয়ে দেয়া বাংলাদেশের দন্ডবিধির ৩৭৭ ধারার বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া আনার কল্পনাও করতে পারছি না। এরকম একটা প্রক্রিয়ার সফলতার জন্য দেশের বিচার বিভাগের যথেষ্ট স্বাধীনতার প্রয়োজন। এবং সম্প্রতিকাল থেকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বিলুপ্তিও প্রয়োজন যাতে করে একজন মুসলমানের কল্পনা অনুযায়ী আমি তার ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হেনেছি এই অজুহাতে সে যেন আমার বিরুদ্ধে মামলা করতে না পারে। মনে আছে, সমকামিতা ইসলামের বিরুদ্ধে এবং বাংলাদেশের রাষ্ট্রধর্ম এখনও ইসলাম?

আমি আর বাংলাদেশে বাসরত একজন যৌন সংখ্যালঘু অধিকার কর্মী ও আইনজীবী সম্প্রতি লন্ডনে অবস্থিত হিউমান ডিগনিটি ট্রাস্ট (এইচডিটি) নামক একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠানের সহায়তার দ্বারস্থ হই, যেই সংস্থাটি যেসকল দেশ সমলৈঙ্গিক সম্পর্ককে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে, সেসকল দেশে সেই আইনগুলোর বিরুদ্ধে স্থানীয় আইনি প্রক্রিয়া আনার জন্য নিবেদিত। ঘটনাক্রমে সেই আইনগুলো অনেক ক্ষেত্রেই বিলেতি সাম্রাজ্যের অনশিষ্টাংশ এবং সেগুলো সেই সময়ে বিলেতিদের দ্বারা সেখানে বসানো হয়। যাই হোক, এইচডিটি বাংলাদেশে এরকম একটি আইনি প্রক্রিয়া আনার সম্ভাবনা যাচাই করার জন্য কিছু গবেষণা করে। তারা এই দিকে অগ্রহসর হতে জোরালোভাবে নিরুৎসাহিত হওয়ার পেছনে অপ্রতিরোধ্য কারণগুলোর মধ্যে একটি ছিল বিচার বিভাগের স্বাধীনতার অভাব। বর্তমান পরিস্থিতিতে সাফল্যের সম্ভাবনা ছিল দূরবর্তী। হেফাজতে ইসলাম নিশ্চয়ই এটা শুনে পুলকিত হয়েছিল। ভারতের ৩৭৭ ধারার সাম্প্রতিক এবং ঐতিহাসিক বিলুপ্তিকরণ, যার কারণে আমরা সবাই গর্বিত হতে পারি, তার কিছু পরেই হেফাজতের মোল্লাদের ধারণ করা ওয়াজ মাহফিলে শোনা যায় যে তাদের দেশে একই প্রচেষ্টাকে প্রতিহত করার জন্য প্রয়োজন হলে সকল সমকামীদের হত্যা করা হবে এবং দেশে আগুন জ্বালিয়ে দেয়া হবে। শেখ হাসিনার চোখে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এই সকল দুর্বৃত্তদের বেলায়ে প্রযোজ্য না।

বাংলাদেশে অদূর ভবিষ্যৎ পর্যন্ত পর্যাপ্ত পরিমাণে রাজনৈতিক পরিসরের অভাবের কারণে আমাদেরকে আমাদের সকল কাজ সামাজিক মাধ্যমে সীমাবদ্ধ রেখে যত বিস্তীর্ণ সম্ভব মানুষদের কাছে পৌঁছতে হবে। সমকামিতা, মুক্তচিন্তা এবং নাস্তিকতা নিয়ে বাংলা ভাষায়ে বিভিন্ন ইউটিউব ভিডিও ইতিমধ্যে বাংলাদেশের নেটওয়ালা তরুণদের মাথা নাড়া দেয়ার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখছে। এই প্রচেষ্টাকে বলবৎ রাখতে হবে এবং এর ব্যাপক বিস্তার নিশ্চিত করতে হবে। বৈচিত্র্য.বাংলা নামক একটি জালপাতার প্রধান সম্পাদক হয়ে আমি বিশ্বের সমকামীদের বিভিন্ন তথ্য বাংলাদেশের অন্য সমকামীদের কাছে এমন একটি ভাষায়ে পৌছে দিচ্ছি যেই ভাষায়ে সবচেয়ে বেশী প্রভাব রাখা সম্ভব। বিশ্ব জুড়ে বাংলা ভাষীদের মধ্যে সরাসরি ফেসবুকে স্বীয় ভিডিওর ব্যাপক ভক্ত তৈরি করতে পারার জন্য আমি এখন আসিফ মহিউদ্দিন এবং আরিফুর রহমান নামক দুই ব্লগার ও ভ্লগারদের চেষ্টার প্রশংসা করছি।

আমি নিম্নের কিছু কথা দিয়ে শেষ করছি। বাংলাদেশে যৌন সংখ্যালঘু এবং নাস্তিকদের সম্পুর্ণ সমতা আনতে হলে আমাদেরকে এই লক্ষ্যগুলো অর্জন করতে হবেঃ

  • সংবিধান থেকে রাষ্ট্রধর্ম অপসারণ
  • বিচার বিভাগের সম্পূর্ণ স্বাধীনতা
  • দেশের দন্ডবিধি থেকে ৩৭৭ ধারার অপসারণ

আমরা কিভাবে এই লক্ষ্যগুলোর একটিও অর্জন করতে পারবো তা আমার কাছে পরিষ্কার নয়। তবে এতটুকু বলতে পারি যে মুক্তমনা, নাস্তিক ও যৌন সংখ্যালঘুদের যাত্রা একই উদ্দেশ্য ও গন্তব্যের মর্ম দিয়ে গাঁথা। একজনকে বাদ দিয়ে আরেকজনের বিকাশ সম্ভব নয়। একজন আরেকজনকে হাত বাড়িয়ে দিব এবং আমরা একত্রে একটি দুনিয়া গড়ে তুলবো যেটা হবে মানব সভ্যতাকে উপহাস করা সংকীর্ণ মনোভাব থেকে মুক্ত। আমি সকল আল্লাহবিহীন বর্বরদের অনুরোধ করছি ধর্মীয় পুস্তকের অবরোধ থেকে মুক্ত, চিন্তাশক্তির সামাজিক পরিসর তৈরি করে দিতে – যাতে আমরা সমকামীরা জলের উপর আমাদের মাথা ভাসমান রাখতে পারি। বিনিময়ে আপনারা দেখবেন যে যেই সমাজ সমকামীদের গ্রহণ করে, সেই সমাজ নাস্তিকদেরও সমানে গ্রহণ করতে পারে। অনেক ধন্যবাদ এবং জয় বাংলা।