আমার পূর্ব প্রজন্ম, বর্তমান প্রজন্ম এবং তরুণ প্রজন্মের মধ্যে অনেককেই বলতে শুনি যে বাংলাদেশে হিন্দুরা খুব ভালো আছে! তারা খুব সম্ভবত ভারত এবং অন্যান্য যে সকল দেশে মুসলমানরা সংখ্যালঘু হয়ে বাস করছে সেসব দেশের সাথে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দুদের অবস্থানের তুলনা করছেন। এই তুলনাটা কেন প্রাসঙ্গিক হবে? অন্য দেশের সাথে বাংলাদেশের তুলনাটা কেন করতে হবে? এটা কি সহজে অনুধাবন করা সম্ভব নয় যে বাংলাদেশের ব্যাপার বাংলাদেশেরই? এই দেশে ধর্মীয় সম্প্রীতির মাপকাটিটা নির্ধারণ করবে এক মাত্র বাংলাদেশিরাই? পার্শ্ববর্তী দেশ বা দূর দূরান্তের দেশে কী হচ্ছে সেটার দায় আমাদের দেশের হিন্দু সম্প্রদায় কেন বহন করবে?
এর চেয়ে বড় করা কথা হচ্ছে যে বাংলাদেশে আমাদের হিন্দু ভাই-বোনরা ভালো আছে কি নেই এবং কতটুকু ভালো আছে বা কতটুকু খারাপ আছে তা উপস্থাপন করার এখতিয়ার এক মাত্র আমাদের হিন্দু ভাই-বোনদেরই। আর কারোর না। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান সম্প্রদায়ের বিন্দু মাত্র অধিকার নেই এখানে কোনো কথা বলার, হিন্দুদের কথা অগ্রাহ্য করার বা সেটার বিরূদ্ধ হওয়ার। কারণ সংখ্যালঘু হওয়ার ব্যক্তিগত, দৈনিক, সামাজিক এবং রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা কোনো দিনও সংখ্যাগরিষ্ঠদের হয় না। হাজার চেষ্টা করেও না। খাতা-কলমে কিছু কল্পনা করা যায়, ধারণা পোষণ করা যায় ইত্যাদি। কিন্তু যেই মানুষটা কোনো দিন বাচ্চা প্রসব করেনি, তার পক্ষে প্রসব দেয়ার অভিজ্ঞতা উপলব্ধি করা একেবারেই অসম্ভব।
আমাদের দেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বা ধর্মীয় সম্প্রীতি নিয়ে আলোচনা শুরু করতে হলে এটাই হওয়া উচিৎ সকলের আদ্যস্থল। একজন হিন্দু মানুষ না হয়ে কখনোই কোথাও বক্তব্য রাখতে যাবেন না যে হিন্দুরা আমাদের দেশে খুব ভালো আছে বা ভালোই আছে। তারা সেটা আছে কি নেই, সেটা তাদের কাছ থেকেই মনোযোগ দিয়ে শুনবেন, বোঝার চেষ্টা করবেন, তাদের সাথে একাত্বতা প্রকাশ করবেন এবং তারা ভালো না থাকলে, আপনি কী কী কাজ করলে তারা ভালো থাকতে পারবে তা তাদের সাথে আলাপচারিতার মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠা করুন বাংলাদেশের একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে।
একজন হিন্দু ফেসবুক ব্যবহারকারী হেফাজতের নেতা মামুনুল হককে সমালোচনা করলো দেখে সুনামগঞ্জের একটি গ্রামে অজস্র হিন্দু বাড়িঘর ও মন্দির লন্ডভন্ড করে দেয়া হলো। এরপরেও কি আপনারা বলবেন যে বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়টি মুসলমান সম্প্রদায়ের সাথে একই দুনিয়ায় বাস করছে? হেফাজতিরাই তো প্রকাশ্যে ভিন্ন ধর্মালম্বীদের নিয়ে যা তা খুশি বলে আসছে। কই? হিন্দুদেরকে তো মুসলমানদের বাড়িঘর, মসজিদ ইত্যাদি ভাঙচুর করতে দেখিনি? আপনাদের কি লজ্জা করেন না হিন্দুদের অবস্থান সম্বন্ধে নিজেদের অভিমত বা মূল্যায়নকে অধিকতর গুরুত্ব দিতে?
স্বাধীনতার পূর্ব এবং তার পর থেকে আজও রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতাবানরা (তারা যেই দলেরই হোক না কেন) ধারাবাহিকভাবে হিন্দুদের জমি দখল করে আসছে। আজানের সময়ে উলু ধ্বনি চলবে না, অথচ উলু ধ্বনির সময়ে আজানের উপর নিষেধাজ্ঞা নেই, এগুলো কি হিন্দু ও মুসলমানদের সমান অবস্থানের পরিচয়? কবে বুঝতে পারবেন যে বাংলাদেশে হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে এই অসমান পরিস্থিতির একটা সাংবিধানিক ভিত্তি জেনারেল এরশাদ তৈরি করে দিয়ে গেছেন যেটা অতীত প্রতিশ্রুতি সত্যেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উপড়ে ফেলেননি। যত দিন বাংলাদেশের সংবিধানে একটা রাষ্ট্রধর্ম উল্লেখ করা আছে, তত দিন সেই রাষ্ট্রের চোখে সেই ধর্মের বাইরের সকল মানুষ দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক। আর জেনারেল জিয়ার কেরামতিতে সংবিধানে যদি বিসমিল্লাহ থাকে তো সেই সংবিধান ভিন্ন ধর্মালম্বী বা নাস্তিকদের কাছে সমানভাবে প্রিয় হতে পারে না।
তাই ধর্মীয় সম্প্রীতির সবচেয়ে প্রথম শর্ত রাষ্ট্রীয়ভাবে নিরঙ্কুশ ধর্মনিরপেক্ষতা। এখানে ধর্মীয় সব ব্যাপারেই রাষ্ট্র থাকবে অন্ধ। আসুন এটা প্রতিষ্ঠা করার জন্য মরিয়া হয়ে পড়ি। এতে হিন্দুদের বাড়িঘর ও মন্দিরের উপর আক্রমণ কিছুটা হলেও কমবে কারণ সেগুলোকে রাজনৈতিকভাবে উস্কানি দেয়ার মতো মানুষ তখন কমে যাবে। রাজনৈতিক স্বার্থে রাষ্ট্রীয়ভাবে ধর্ম গোষ্ঠীগুলোকে দুধ-কলা খাওয়ানোর পথটাও সংকুচিত হবে।
অনেক আবাল মুমিনরা বলে থাকে যে বাংলাদেশে গণতন্ত্র মানে ৯০% মানুষ অর্থাৎ মুসলমানরা যা বলবে তাই। হ্যাঁ! সেটা ভোটের বাক্সে। কিন্তু একটি দেশে প্রকৃত গণতন্ত্রের চর্চা মানে সংখ্যাগরিষ্ঠদের ইচ্ছা কায়েম করার সময়ে সংখ্যালঘুদের স্বার্থ যেন কখনোই ক্ষুন্ন না হয় সেই পরষ্পর বিরোধী সংগ্রামটির সুষ্ঠ পরিচালনা। অতএব গণতন্ত্র এবং ধর্মনিরপেক্ষতা অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। বাংলাদেশে বর্তমানে এই দুটোর একটারো বাস্তবায়ন নেই বললেই চলে।
আবালদেরকে এটাও বলতে শুনেছি যে বাংলাদেশে রাষ্ট্রভাষা থাকলে রাষ্ট্রধর্মও থাকতে হবে। তাদেরকে দুটোর মধ্যে পার্থক্যটা সহজ ভাষায় বুঝিয়ে দিতে হয় বলে পরিতাপ হচ্ছে। একজন মানুষ একটু চেষ্টাতেই একটার বেশি ভাষা রপ্ত করতে পারে। কিন্তু সেই মানুষটা দেশের সমান নাগরিক হওয়ার উদ্দেশ্যে অত সহজে একই সাথে বিভিন্ন ধর্মে বিশ্বাসী এবং সেগুলোর অবলম্বনকারী হতে পারে না। দেশের প্রচলিত ধর্মগুলো কখনোই সেটার অনুমতি দেয়নি। আর একই উদ্দেশ্যে বাংলাদেশে ধর্ম পরিবর্তন করাটা একজন মানুষের জন্য ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক আঙ্গিকে কঠিন এক পদক্ষেপ। কাজেই বাংলাদেশে রাষ্ট্রভাষার মাধ্যমে আমরা দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক তৈরি করিনি কিন্তু রাষ্ট্রধর্মের মাধ্যমে তা করেছি।
আমার সম্প্রতি লেখা “বাংলা ভাষার প্যাঁচাল” নামের নিবন্ধটির পর এই লেখাটির একটি বিশেষ অনুরোধ আসাতে এই লেখাটিতে আমাকে একটি ভিন্ন অঙ্গনের দিকে মনোযোগ দিতে হয়েছে। “চেয়ার” ও “টেবিল” নামের বস্তুগুলো ছিল ইংরেজদের মাধ্যমে আমাদের মাঝে প্রচলিত করে দেয়া কিছু আসবাবপত্র, যেগুলোর বাংলা প্রতিশব্দ (কেদারা, কুর্সি ইত্যাদি) তেমন প্রচলিত হতে পারেনি। যুক্তি উপস্থাপন করা যায় যে যেহেতু এই বস্তুগুলোই ছিল বিদেশি এবং যেই সংষ্কৃতি থেকে সেগুলো আমাদের কাছে এসেছিল, সেখানে “চেয়ার” বা “টেবিল” শব্দগুলো ছিল সর্বব্যাপী, সেহেতু সেগুলোর বাংলা প্রতিশব্দ প্রতিষ্ঠিত করতে কেউ তেমন মাথা ঘামায়নি। চেয়ার এবং টেবিল আমাদের ভাষাতে সেই নামেই পরিচিত হয়ে গিয়েছে।
পর্তুগীজরা ইংরেজদেরও অনেক আগে আমাদের মাঝে “সাবোন” নামে গোসল করার একটা উপাদান নিয়ে এসেছিল। আমাদের মুখ সেই শব্দটিকে সময়ের সাথে সাথে একটু পালটে দিয়ে সাবান বানিয়ে ফেলেছে। ফরাসীদের কাছ থেকে আমরা পেয়েছি “রেস্তোরাঁ”। বাংলা ভাষায় এরকম আরো অনেক বস্তু বিষয়ক শব্দের উৎপত্তি হচ্ছে ভিন্ন সংষ্কৃতি ও ভাষা। প্রাচীন বাংলায় বিশ্বের বিভিন্ন স্থান থেকে বণিকরা এসেছিলেন – কেউ কেউ বাংলাকেই তাদের ভূমি হিসেবে বেঁছে নিয়েছিলেন। এই প্রক্রিয়ার ফলে তাদের আনা অনেক জিনিষগুলোর নাম আমাদের ভাষায় ঢুকে গিয়ে বাংলা ভাষাকে করেছে সমৃদ্ধ। এর আগে বাংলা ভাষায় এগুলোর নামই ছিল না কারণ আমাদের এই অঞ্চলে হয়তো সেই বস্তুগুলোরই কোনো হদিস ছিল না।
বর্তমান যুগে প্রযুক্তি আমাদের কাছে নিয়ে এসেছে কম্পিউটার, ল্যাপটপ, সিমকার্ড আরো কত কী! তার আগে এসেছে ক্যালকুলেটর, ফোন ও টেলিভিশন। এগুলোর প্রতিশব্দ বাংলা একাডেমি স্থাপন করার চেষ্টা করেনি এবং সেটা নিয়ে কারো মাথা ব্যথাও নেই। আমি বলবো যে এটা মেনে নেয়ার জন্য কিছু যুক্তি আছে এবং সেটা কী তা উপরে উল্লেখ করেছি। কিন্তু সবার কাছে আমার প্রশ্ন হচ্ছে যে এটার সাথে বর্তমান যুগে সকলের “বাংলিশ” বলার সম্পর্কটা কোথায়? বাংলিশ শব্দটির একটি মানে হচ্ছে বাংলা কথার মাঝে অর্ধেক বা অনেক শব্দেরই ইংরেজিটা বলা বা লেখা। উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করতে পারিঃ “বাংলা একটা রিচ ল্যাঙ্গুয়েজ, আমি এই ভাষা ইউজ করতে ভালোবাসি”। আরো শুনতে পাওয়া যায়ঃ “আমি তোমাকে লাভ করি”। আমার এটাও শোনার দূর্ভাগ্য হয়েছেঃ “একটা কান্ট্রির এডমিনিস্ট্রেশন মাদার টাঙে হওয়া উচিৎ”।
ব্যঙ্গ করে আমি ফেসবুকে বেশ আগে এরকম একটা স্থিতি দিয়েছিলামঃ “একুশের মান্থ আসলে ল্যাংগুয়েজ মুভমেন্টের স্টোরিটা আমাকে অনেক ইন্সপায়ার করে”। এই ধরণের কথাবার্তার অবির্ভাব কীভাবে হলো, কারা মূলত এই সব শব্দদূষণের জন্য দায়ী, সেটা নিয়ে আমার “বাংলা ভাষার প্যাঁচাল” নামের প্রচ্ছদে বিশদ বিশ্লেষণ করেছি। এই লেখায় শুধু প্রশ্ন করবো যে বাংলা ভাষায় সাবান আর কম্পিউটারের আগমন কি নিজের জাত বাড়িয়ে, ঢং করে উপস্থিত বাংলা শব্দকে দুমড়ে মুচড়ে প্রতিস্থাপন করে ইংরেজি শব্দটা ঢোকানোর মতোই একটা বিষয়? পরের বিষয়টিকেও কি ভাষার চলমান প্রক্রিয়া ও বিবর্তন হিসেবে ধরে নেয়া যায়? যেই কারণে বাংলা ভাষার শব্দ গণনা সময়ের সাথে সাথে বৃদ্ধি পেয়েছে, সেই কারণেই কী “ভাই” হয়ে গিয়েছে “ব্রো”? বাজারে পণ্যের “দাম” হয়ে গিয়েছে “প্রাইস”? কাপড়ের রং হয়ে গিয়েছে “কালার”?
নগ্নভাবে বুঝিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছি যে পরের বিষয়টা বাংলা ভাষাটাকে সমৃদ্ধ করছে না। বরং একটি ক্ষতিকর (কেন সেটা আগের লেখায় বর্ণনা করেছি) প্রবণতার আদলে সুন্দর এবং যথাযথ কিছু বাংলা শব্দ প্রতিস্থাপন করে ইংরেজি শব্দের আগমন ঘটিয়ে কালের গর্ভে সেই বাংলা শব্দগুলো হারিয়ে ফেলার পথ সুগম করে দেয়া হচ্ছে। এই পার্থক্যটা সূক্ষ্ম হলেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হাওয়ায় গা ভাসানোর আগে সবাইকে একটা ব্যাপার অনুধাবন করতে অনুরোধ করছি। দিন শেষে যারা অনবরত বাংলিশ বলেন ও লিখেন, তারা বাংলা বা ইংরেজি, কোনোটারই পারদর্শিতা দাবী করতে পারেন না। মজার ব্যাপার হচ্ছে যে এই মানুষগুলো বাংলিশ বলে তারা যে ইংরেজি জানেন সেটাই সবাইকে বোঝাতে চেষ্টা করছেন। তবে আরো মজার ব্যাপার হচ্ছে যে তারা প্রকৃতপক্ষে তেমন ইংরেজিই জানেন না। যারা বাংলার সময়ে বাংলা, ইংরেজির সময়ে ইংরেজি – এই মনোভাব পোষণ করেন, তারাই প্রকৃতপক্ষে ইংরেজি জানেন, সাথে বাংলা তো বটেই।
সম্প্রতি ঘটে যাওয়া একটা ব্যাপার উল্লেখ না করলেই নয়। ঢাকার এক উদীয়মান আবাসিক এলাকায় সেটার চেয়েও উদীয়মান এক ভদ্র মহিলা অদূরে একটা গরু হেঁটে যাচ্ছে দেখে তার বাচ্চা মেয়েকে উদ্দেশ্য করে বললেনঃ “বেবি! দেখো, কাও যাচ্ছে”। আমি যদি বাংলাদেশের আইনমন্ত্রী হতাম, তাহলে এই প্রকার ঢঙের প্রতিদান হিসেবে এই সকল ভদ্র মহিলা (সাথে ভদ্র লোক, তরুণ, তরুণী, যুবক, যুবতি)দেরকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের আওতায় গ্রেফতার করে বিনা জামিনে দশ বছর হাজতে আটকে রাখার বিধানের সুপারিশ করতাম। এই মনোভাব পোষণ করার জন্য আমাকে যদি “ভাষা মৌলবাদী” বলা হয়, তো সেই সুনাম আমি আনন্দের সাথে মাথা পেতে নেব। জীবনটাকে স্বার্থক মনে করবো।
পশ্চিম বাংলা থেকে প্রকাশিত বাংলাভাষী যৌন ও লিঙ্গ সংখ্যালঘু বিষয়ক “কাঁচালঙ্কা” নামের সনামধন্য প্রত্রিকাটির ভাষা দিবস সংক্রান্ত বার্ষিক ক্রোর পত্র “কালিজা”য় আমাকে লেখা পাঠাতে অনুরোধ জানানোর জন্য পত্রিকাটির সম্পাদক ও পরিচালক অনিরুদ্ধ সেনকে বিশেষ কৃজ্ঞতা।
বাংলাদেশের বর্তমান তরুণ প্রজন্ম এবং সকল প্রজন্মের পাণ্ডিত্যের বিজ্ঞরা বাংলা গানের এই দুটি বাক্য উচ্চারণ করার অধিকার আজ হারিয়ে ফেলেছে। এই প্রচ্ছদে আমি ভারত এবং ভারতীয় বাঙালিদেরকে লক্ষ্য করে কোনো কথা বলার অধিকার রাখছি না। একজন বাংলাদেশি লেখক হিসেবে বাংলাদেশের বাংলাভাষীদের উদ্দেশ্য করেই কাঁচালঙ্কার নিয়মিত এবং বার্ষিক এই প্রকাশনায় কিছু বক্তব্য রাখছি।
দুই শত বছর বিলেতি উপনিবেশিক শাসনের আধুনিক ছিটেফোটার কারণেই হোক বা বিশ্বায়নের তরঙ্গে মাতোয়ারা হয়ে মাতলামির কারণেই হোক, বাংলাদেশের একজন শিক্ষিত মানুষ, যার মুখে প্রমিত বাংলার ধ্বনি আশা করা যেত, তার মুখে আজ প্রমিত বাংলা তো দুরের কথা, তার মুখে যে কোনো বাক্যের মধ্যে প্রয়োজনের বাইরেও অজস্র ইংরেজি শব্দে মাখা খিচুড়ি বচন ছাড়া আর কিছু শোনা যায় না। আগে অন্তত লিখিত ভাষায় আমরা নিটোল বাংলার রূপটা দেখতে পেতাম। এখন খুদে বার্তা ও বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমের ব্লগের যুগে সেখানেও দেখি সীমাহীন অরাজগতা।
সকলের মধ্যেই একটা প্রতিযোগিতা চলছে যে সুযোগ পেলেই বাংলা বাক্যের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত বাংলা শব্দ প্রতিস্থাপন করে ভুল হোক বা শুদ্ধ হোক, একটা বা দশটা ইংরেজি শব্দ বসিয়ে দিয়ে সকলের কাছে নিজের মর্যাদা, সামাজিক অবস্থান বা শিক্ষার মানের পরিচয় বড় করে ফুটিয়ে তুলি। সোজা কথায় বলা যায় যে সকলের মানসিকতা হচ্ছে যে ইংরেজি শব্দের ব্যবহারে নিজের জাত বাড়ে। এর কারণ বহুবিধ। ইংরেজ আমলের তৈরি বাবু শ্রেণি থেকেই এই অভ্যাসটা বিদ্যমান। তারপরে ভারত উপমহাদেশেই ইংরেজদের স্থাপন করে যাওয়া শিক্ষা ব্যবস্থায় উজ্জ্বল হয়ে ওঠা আঁতেলরা এখনও প্রজ্ঞা ভিত্তিক বিষয়গুলো বাংলা ভাষায় মৌখিক আকারে তো নয়ই, লিখিত আকারেও প্রকাশ করতে শিখেনি।
আর এখনকার তথ্যপ্রযুক্তি ও বিশ্বায়নের যুগে এই প্রবণতা লাগামহীন। ভিন্ন বাবা-মা থেকে পাওয়া বাংলাদেশে আমারই ভাই এবং বিভিন্ন ভাগনে ও ভাতিজাদের সাথে বাংলায় খুদে বার্তা আদান-প্রদানের সময়ে শুনতে হয়ঃ “বাংলায় টাইপ করতে আমার পেইন লাগে!”। অনেক দিন “ভাই” হিসেবে পরিচিত থাকার পর আমি হঠাৎ হয়ে গিয়েছি “ব্রো”! আমি অবশ্য শারীরিক আক্রমণের ভয় দেখিয়ে মুহুর্তের মধ্যেই তাদের এই অভ্যাসটাকে গলা টিপে শেষ করে দেই। আবার বাংলা কথাই ইংরেজি অক্ষর দিয়ে লেখার ফলে অনেক ইংরেজি শব্দই ব্যবহার করা হচ্ছে সুবিধার কারণে। এর ফলে মুঠোফোন টিপাটিপি করা এই প্রজন্মের ছেলে ও মেয়েরা (গ্রামের হোক বা শহরের হোক) দিনের শেষে অনেক ইংরেজি শব্দ শিখছে ঠিকই, কিন্তু সেগুলোর বাংলা আর জানছে না, জানলে ব্যবহার করছে না এবং কালের গর্ভে সেই বাংলা শব্দগুলো হারিয়ে ফেলার পথ সুগম করে দিচ্ছে।
তাদের সাথে এই নিয়ে কথা বলতে গেলেই পাল্টা শুনতে হয় “ল্যাংগুয়েজ একটা মুভিং থিং, এখন গ্লোবালাইজেশনের টাইম” – মানে ভাষা একটি চলমান বস্তু, এখন বিশ্বায়নের সময়। যারা আমাকে ভালো করে চিনেন তারা জানবেন যে আমি নিজেই বিশ্বায়নের একজন সৃষ্টবস্তু। এবং আমার ভাবনা অনুযায়ী বিশ্বায়ন মানে খিচুড়ি বচন, ব্লগ, লেখনী, সাক্ষাৎকার বা সংবাদ প্রতিবেদন নয়। বরং এটার মানে হচ্ছে বাংলা ছাড়াও ইংরেজি এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য ভাষার পারদর্শিতা। জি! “পারদর্শিতা”। এটা কি সকলের বোধগম্য নয় যে বাংলিশ বা বাংরেজি (অর্থাট খিচুড়ি) ভাষায় পারদর্শিতা আসলে কোনো পারদর্শিতা নয়? এটা কি পরিষ্কার নয় যে বাংলার সময়ে বাংলা এবং ইংরেজির সময়ে ইংরেজি – এই মনোভাব তৈরি করে দুটা ভাষারই ভিত্তি মজবুত করে সেগুলোর বিস্তৃত মহিমা নিজের জীবনে, অর্থাৎ বচন ও লেখায় তুলতে পারাটাই দক্ষতার পরিচয়?
এই মনোভাব পোষণ করেই সময়ের সাথে সাথে আমি বাংলা ও ইংরেজি, এই দুটো ভাষার পারদর্শিতা অর্জন করেছি। সেটা লেখার সময়ে তো বটেই, কথা বলার সময়েও। বাংলা ব্যাকরণ ও ভাষার ইতিহাস সম্বন্ধে বিজ্ঞরা অবশ্যই আমার মধ্যে অনেক ভুল পাবেন যা আমি আশা করবো তারা আমাকে ধরিয়ে দেবেন। আমি বাংলা ব্যাকরণ ও ইতিহাস নিয়ে তেমন কিছুই শিখতে পারিনি। বাংলা বই ও আন্তর্জালে বাংলা পত্রিকা পড়ে পড়ে ভাষার ছন্দটা ধরে ফেলেছি। তবে বাংলা বানান এখনো আমাকে মুর্খ বানিয়ে ছাড়ে। সেটাও আস্তে আস্তে অতিক্রম করার চেষ্টা করছি। প্রবাসে জীবনের বেশির ভাগটা কাটানোর পরও, এবং প্রথমে ইংরেজিতেই পারদর্শিতা অর্জন করার পরও আমাকেই বলা হয়েছে যে বাংলাদেশের অনেক মানুষের তুলনায় আমি ভালো বাংলা বলি ও লিখি।
এর কারণ আমার উপলব্ধিতে এসেছে যে বিশ্বায়নের যুগে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষারই দক্ষতার প্রয়োজন। বিশ্বায়ন মানে নিজের ভাষা ও সংষ্কৃতিকে হারিয়ে ফেলা নয়, বরং যেখানে ভাষার এবং জনপ্রিয় সংষ্কৃতির প্রতিযোগিতা অর্থাৎ ইংরেজি ভাষার দাপট বিদ্যমান, সেখানে নিজের সত্ত্বাকে আলিঙ্গন করে রাখাটা আরো বেশি আবশ্যক। তবে সেটা ইংরেজি ভাষা ও বিশ্বায়নের সংষ্কৃতির ব্যাপকতাকে মেনে নিয়েই করা যায়। একটাকে হারিয়ে আরেকটা নয়।
এই প্রয়োজনীয়তার উপলব্ধিটা বাংলাদেশে এখন আর নেই বললেই চলে। এর কিছু সম্ভাব্য কারণের দিকে তাকানো যাক এবার। বাংলাদেশের উচ্চ শ্রেণির বণিকরা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ইংরেজিটাই ব্যবহার করে বলে সাধারণ জীবনেও বাংলা ভাষার কথ্য ও লিখিত ব্যবহার ভুলেই গিয়েছে। তারাই তাদের ছেলে-মেয়েদেরকে ব্যয়বহুল ও শিক্ষার নামে প্রহসন, অর্থাৎ ইংরেজি মাধ্যমের অধ্যয়ন কেন্দ্রগুলোতে পাঠাচ্ছে যেখানে সন্তানরা ছোট বেলা থেকেই শিখছে টুইংকল টুইংকল এবং চার্স ডিকেন্সের “মার্চেন্ট অফ ভেনিস”। তারা শ্রেণিকক্ষে একজন আরেকজনের সাথে বাংলা বলারও অনুমতি পাচ্ছে না, পাচ্ছে শুধু ইংরেজিতে ফ্যাটর ফ্যাটর করার আদেশ। বাংলাদেশে এই শিক্ষাটার প্রয়োজনীয়তা এবং যথার্থতাটা কী সেটার বিচার বিশ্লেষণ আপনাদের উপরেই ছেড়ে দিলাম।
শৈশবে কিছুটা সময় এরকম একটা স্থানে পাঠ করার দূর্ভাগ্য হয়েছিল বলে আমি সাক্ষী যে এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে চাষ করা হয় স্বদেশ, স্বীয় সংষ্কৃতি ও মাতৃভাষার প্রতি ঘৃণা পোষণ করা কিছু ফিরিঙ্গির জাতকে, যারা নিজেদেরকে অধিকতর উচ্চ ভেবে বাংলা মাধ্যমের ছাত্র-ছাত্রীদেরকে নিচু মনে করে ক্ষ্যাত উপাধি দিয়ে থাকে (ঢাকার বাইরে গ্রামে গঞ্জের ছাত্র-ছাত্রীরা তো জন্তু-জানোয়ার!)। এই কৃত্রিম উপগ্রহদের দৈনিক স্বপ্ন ও আকাঙ্খা বিদেশ পাড়ি দেয়া বলে নিজের দেশ তো দূরের কথা, নিজের এলাকাটাকেও ভালোভাবে চেনার প্রয়োজন মনে করে না এরা। করলে বড় জোর কোনো আভিজাত্যপূর্ণ বিপনী কেন্দ্র, আইস্ক্রীম পার্লার, বিউটি পার্লার, শরীরচর্চা কেন্দ্র, দামী কফির দোকান, রেস্তোরাঁ বা পাঁচ তারা হোটেলের লবি। বাকিটা বাংলাদেশ (তার বিভিন্ন ভৌগলিক স্থান) ও দেশের মানুষ, সমাজ, দেশের ইতিহাস, দেশের সমস্যা, ভাষা, সঙ্গীত ও সাহিত্য সম্বন্ধে এরা একই সাথে অজ্ঞ এবং উদাসীন।
এদেরকে বাংলায় কিছু একটা লিখতে দেয়া আর মাথার চুল ছিড়ে ফেলা একই কথা। আর এদের বাংলা বচন? কোথা থেকে একদল ফিরিঙ্গির মাথায় এলো যে বাংলা কথাগুলো ইংরেজি বা বিদেশি কায়দায় মুখ বাঁকা করে উদ্ভটভাবে উচ্চরণ করাটাই সময়ের দাবী। আর যারা তা করছে না, তাদের খিচুড়ি ভাষা অনেকটা ভারতীয় “ইন্ডিয়াজ বেস্ট ড্যান্সার” অথবা “ইন্ডিয়ান আইডল” নামের টিভি অনুষ্ঠানের বিচারকদের হিন্দি বচনের মতো, যা শুনলে আমার গায়ে কেরোসিন ঢালতে ইচ্ছা করে। এখানে বলে রাখা উচিৎ যে আমি নরেন্দ্র মোদির রাজনীতি ভীষণ অপছন্দ করলেও তার হিন্দি বচনকে মধুময় মনে করি, কারণ তিনি হিন্দি বলেন!
অদৃষ্টের কী পরিহাস! বাংলাদেশের সুশীল সমাজ ও বাংলা সংষ্কৃতির বিশিষ্ট কিছু মানুষও এখন ঠিকই তাদের ছেলে-মেয়েদেরকে এই সব ইংরেজি মাধ্যমে পাঠিয়ে সাংষ্কৃতিক বিকলাঙ্গ হিসেবে গড়ে তুলছেন। আর বিলেতি আমল থেকেই আমাদের অবচেতন মনে গেঁথে দেয়া হয়েছে যে যারা ইংরেজি বলে তারা জাতের মানুষ। তারা “ইস্মার্ট”, তারা ভদ্র। তাই ঢাকা ও অন্যান্য শহরের ইংরেজি মাধ্যমগুলোতে চাষ করা এই বাংরেজগুলোর প্রভাব সময়ের সাথে সাথে বাংলাদেশের বাকি আনাচে কানাচেও পড়ছে। যেহেতু ইংরেজি শব্দ শিখলেই ও ব্যবহার করলেই মানুষ “কুল” হতে পারে, সেহেতু একজন ট্যাক্সি চালককে আমি কিছুতেই ঢাকা বিমানবন্দরের “অভ্যন্তরীণ” টার্মিনালে নিয়ে যাওয়ার জন্য রাজী করাতে পারলাম না। “ডোমেস্টিক” বলার সাথে সাথেই তিনি আমাকে ঘোড়ার বেগে সেখানে নিয়ে গেলেন। বাংলাদেশে অভ্যন্তরীণ শব্দটা কালের গর্ভে হারিয়ে যেতে বসেছে।
এক তথাকথিত ভাইকে আমি কিছুতেই তার জাতীয় পরিচয় পত্র নিয়ে আসতে বলতে পারলাম না। অনেক কষ্ট করে তাকে তার এনআইডটা আনতে বোঝাতে পেরেছি। আর ঢাকার রিকশা চালক ভাইদেরকে যে কখনোই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ে যেতে বলা যাবে না তা অনাদিকাল থেকেই স্বীকৃত। তারা ঢাকা ইউনিভার্সিটি ছাড়া আর কিছুই চিনেন না। তারা কোন শব্দটা বাংলা এবং কোন শব্দটা ইংরেজি সেটাও জানে না। একজন নামী-দামীর মুখে কী যেন একটা (ইংরেজি) শব্দ শুনেছে সেটাকে তারা বাংলা শব্দই মনে করছে এখন থেকে।
আমি অনেক লেখককে চিনি যারা বাংলা বই লিখতে পারেন, কাব্য রচনা করতে পারেন কিন্তু খিচুড়ি মার্কা ভাষা ছাড়া আর কিছু বলতে পারেন না। এই প্রহসন একেবারে সমাজের উচ্চ স্তর থেকে শুরু করে আস্তে আস্তে নিচের স্তরগুলোর গায়ে বেয়ে বেয়ে নেমে এসে সব কিছুকে শিক্ত করে ফেলেছে। এই পরিস্থিতিটাকে ভাষার স্বাভাবিক পরিবর্তন বা চলমান প্রক্রিয়া বলে মনে করে বসে বসে আঙ্গুল চুষলে চলবে না। একটু ভাবতে হবে এটা কী হচ্ছে এবং কেন হচ্ছে।
বাংলা ভাষা ও সংষ্কৃতিকে কেন্দ্র করে যেই বাংলাদেশটার জন্ম, বাংলাদেশি হিসেবে আমাদের যেই পরিচয়, এবং যেই স্বাধীনতার বীজ বপন করা ভাষা দিবস উদযাপন করাটা আমাদের বার্ষিক রীতি, সেখানে সেই ভাষাটার বিবর্তনটাকে অস্বাভাবিকভাবে এবং কৃত্রিমভাবে প্রভাবিত করার দায় আমাদের সকলের। এবং এই দোষ শুধু বাংলাদেশের ইংরেজি মাধ্যম ব্যবসাগুলোরই নয়, বরং একই সাথে দেশের সকল মাদ্রাসাগুলোরও, যেখানে আরবি, ফারসি, উর্দু ও কিছু ইংরেজির দাপটের কারণে কোনো মাদ্রাসার ছাত্র বা সেখান থেকে বের হয়ে আসা হুজুর বা ইমামের বাংলা বচন একেবারেই অশ্রাব্য।
এর সমাধান কী? এবার যা বলতে যাচ্ছি তা শুধু বাংলাদেশের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। আমার ভারতীয় পাঠক বন্ধুদেরকে এখনই বলে রাখছি যে ভারতের ভাষাগত বৈচিত্র্যের বিকাশ ও রক্ষণাবেক্ষণের রূপরেখা ভারতীয়রাই নির্ধারণ করবে। আমি শুধু বাংলাদেশের কথাই বলছি এখানে। আমার মতে বাংলাদেশে উপরে বর্ণিত সব কিছুর সমাধান হলো বাংলা মাধ্যমে একটি অতি উন্নত, আধুনিক, সার্বজনীন এবং সম্পূর্ণ একমুখি, ধর্মনিরপেক্ষ, বাংলা সাহিত্য ও সংষ্কৃতিমনা, কারিগর ও প্রযুক্তি ভিত্তিক এবং বিজ্ঞানমনষ্ক শিক্ষা ব্যবস্থা যা সবার জন্য সমানভাবে লভ্য হবে (অর্থাৎ সরকারি)৷ এখানে আধুনিক উপায়ে একটি দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে সবাইকে ইংরেজিও শেখানো হবে। এই নতুন শিক্ষা ব্যবস্থা পর্যায়ক্রমে গড়ে তুলতে হবে প্রতি বছর সরকারি বাজেটের ৫% এই খাতে ব্যয় করে। এবং এই বিকল্প শিক্ষা ব্যবস্থাটা গড়ে তুলতে হবে এই লক্ষ্য নিয়ে যে অভিভাবকরা সেচ্ছায়েও কোনো দিন তাদের ছেলে-মেয়েদেরকে ইংরেজি বা মাদ্রাসা মাধ্যমে আর পাঠাবে না, কারণ সেগুলোর আর প্রয়োজনই পড়বে না।
যে সকল বামপন্থীরা সামাজিক সাম্যতা বলে দিনরাত মুখে ফ্যানা তুলেন (সাথে নিজের সন্তানদের ইংরেজি মাধ্যম ও পরে যুক্তরাষ্ট্র পাঠিয়ে দেন), তারা নিশ্চয়ই বুঝবেন যে একটা দেশে শিক্ষার ভিন্নতা মানুষের মাঝে যেই বিভাজন তৈরি করে, তার পরিধি ব্যাপক এবং সার্বজনীন। বামপন্থী অর্থনীতি কায়েম না করেও একটি দেশে সম্পূর্ণ সরকারি ও একমুখি শিক্ষা ব্যবস্থা (ও স্বাস্থ্য খাত) তৈরি করতে পারলে মানুষের মাঝে শ্রেণি বিভাগ এমনিতেই কমে যায়। আর বাংলাদেশে এই শিক্ষার মাধ্যম বাংলায় হলে ফ্যাটর ফ্যাটর করা ফিরিঙ্গিরা আঞ্চলিক বাংলা বলা মানুষদের ছোট মনে করবে না, প্রমিত বাংলা বলার চেয়ে ভুলভাল ইংরেজি মিশিয়ে খিচুড়ি বলাটাকে আরেকটু “কুল” মনে করবে না, শিক্ষিত একজন কৃষক ভাই কখনোই তার চেয়ে কম শিক্ষিত কিন্তু বিত্তবান একজন ব্যাবসাইয়ের চোখে ছোট হবে না। কারণ সেই শিক্ষাটা ছিল বাংলায়, এক্মুখি এবং সার্বজনীনভাবে লভ্য – মানুষের বিত্তের উপর সেটা নির্ভরশীল ছিল না।
এবার নিশ্চয়ই ভাবছেন যে কাঁচালঙ্কায় এই বিশদ সামাজিক বিশ্লেষনের সাথে সমকামী (নারী ও পুরুষ), উভকামী, রূপান্তরকামী, রূপান্তরলিঙ্গ, রূপান্তররূপী, আন্তলিঙ্গ, লিঙ্গতরল, অদ্বৈত, অযৌন ইত্যাদি মানুষদের কী যোগাযোগ? বাংলাদেশের যৌন সংখ্যালঘু (এলজিবিটি) সম্প্রদায়ের মানুষগন এত কিছু চিবিয়ে চিবিয়ে কী করবে? উত্তর হচ্ছে যে উপরে উল্লেখিত সব কিছুই বাংলাদেশের যৌন ও লিঙ্গ সংখ্যালঘু সমাজটার ভেতর নোংরাভাবে প্রতিফলিত। ধর্ম বিশ্বাস (এর বিভিন্ন মাত্রা) এবং ধর্ম অবিশ্বাস – এগুলো যেমন যৌন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়টাকে বিভক্ত করে রেখেছে, ঠিক তেমনি ভাষা ও সংষ্কৃতিকে কেন্দ্র করে আরো বিভাজন আমাদেরকে কাবু করে রেখেছে।
বাংলাদেশে প্রথম সমকামী সংগঠন তৈরি হয় ঢাকার অভিজাত এলাকার বিত্তবান অভিভাবকদের ইংরেজভাষী ছেলেদের নিয়ে। তাদের অনেকেই এখন স্বীকার করে যে সেই সংগঠনে সমাজের একই স্তরের বাইরে সমকামীদের কোনো জায়গা ছিল না। আরো পরে সেই অভিজাত এলাকার বাইরে বাংলাদেশের আনাচে কানাচে থেকে সমকামী ছেলে ও কিছু মেয়েদের সাথে অনলাইনে পরিচয় হওয়ার পর বুঝতে পারলাম যে এদের প্রতিনিধিত্ব করার কেউ ছিল না। এরা বাংলাভাষী হওয়াতে উপরে উল্লেখিত সংগঠনের কাছে অগ্রসর হওয়ার সাহস পেত না। অগ্রসর হলে অনেককেই নাক উঁচু ব্যবহার পেয়ে ফিরে যেতে হত।
আমি বাংলা ভাষায় এলজিবিটি অধিকার বিষয়ক কর্মকান্ডের অপ্রতুলতা লাঘব করতে বাংলাদেশের এবং সমগ্র বাংলাভাষী যৌন সংখ্যালঘু এবং তাদের শুভানুধ্যায়ীদের উদ্দেশ্যে নির্মাণ করি বৈচিত্র্য নামের তথ্য ও সৃজনশীলতা ভিত্তিক একটি জালপাতা। অনেক মানুষের স্বপ্ন ও আকাঙ্খা সেখানে পরিস্ফুটিত হয়েছিল। অনাকাঙ্খিত কারণবশত আমার একার পক্ষে বৈচিত্র্যের রক্ষণাবেক্ষণ ও চালানো আর সম্ভব নয় বলে ভারাক্রান্ত হৃদয়ে আমি এই পাতাটি সম্প্রতি বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছি। তবে আমি সংশ্লিষ্ট অনেক ইংরেজি শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ স্থাপন ও ব্যবহার করার উপর জোর দিয়েছিলাম যা কিছুটা হলেও গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। Sexual Orientation আমার কাছে যৌন প্রবৃত্তি (সামান্য উদাহরণ স্বরূপ)।
বাংলা ভাষায় (এবং উপযুক্ত বাংলা প্রতিশব্দ ব্যবহার করে) আমরা আমাদের মনের ভাব লিখিত এবং মৌখিকভাবে প্রকাশ করতে শিখে যৌন ও লিঙ্গ বৈচিত্র্যকে আমাদের করে নিয়েছি। এগুলো পাশ্চাত্য থেকে আমদানী করা ভীমরতি নয়। হাজার হলেও ভারত উপমহাদেশে আমরা হাজার বছর ধরেই আছি, শুধু মনের ভাব প্রকাশ করার ভাষা খুঁজে পাইনি। এখন যেহেতু পেয়েছি, তাই এখন যেন ফ্যাটর ফ্যাটর করা একটি দল বাকিদেরকে আলাদা করার সুযোগ না পায়। বাংলা ভাষায় আমাদের মনের ভাব প্রকাশ করার আদলে বাংলাদেশের সকল শহর ও গ্রাম ভিত্তিক সমকামী, রূপান্তরকামী, অদ্বৈত ইত্যাদি মানুষদের মাঝে কৃত্রিমভাবে তৈরি করা একটা বিভাজনকে আমরা যেন অতিক্রম করতে পারি।
আর এর জন্যই মন্দ্র ও নবপ্রভাত-এর প্রচেষ্টায় আমি মুগ্ধ। বাংলা ভাষায় এদের নেট ভিত্তিক প্রকাশনা বাংলাদেশের সকল স্তরের এবং সকল স্থানের যৌন সংখ্যালঘুদেরকে সহজেই আমন্ত্রণ জানাতে পারবে। এখানে কোনো অভিজাত শ্রেণির দাপট থাকবে না। আর সব শেষে কাঁচালঙ্কার প্রতি অশেষ ভালোবাসা তো রইলোই।
বাংলাদেশি ও সকল বাংলাভাষী যৌন সংখ্যালঘু ও তাদের শুভানুধ্যায়ীদের উদ্দেশ্যে নিবেদিত আমার জীবনীটা ২০১৮ সালের জুলাই মাসে প্রকাশ করা হয়েছিল সদ্য বন্ধ করে দেয়া বৈচিত্র্য জালপাতায়। সেটাকে এখানে পুনরায় প্রকাশ করা হলো। কেউ এই লেখা পড়ে উপকৃত হলে আমার এই লেখা স্বার্থক হবে।
রিয়াজ ওসমানী
২০ ফেব্রুয়ারী ২০২১
আমি যৌবনে পা দেবার পর আমার আশেপাশে, বর্ধিত পরিবারে, সমাজে, টিভিতে ও চলচিত্রে আমার মনের মতো করে কীভাবে ভালোবাসতে হয়, কীভাবে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তুলতে হয়, কীভাবে যৌন সম্পর্ক করতে হয় তার কোনোটারই কোনো দৃষ্টান্ত বা উদাহরণ ছিল না। ছিল না কোনো দেখিয়ে দেয়া অনুমোদিত বিধি। আর তাই বোধহয় ২১ বছরে পা দেয়ার আগ পর্যন্ত আমি ছিলাম নিষ্কাম। এই নিষ্কামিতাকে আমি খুব একটা আশ্চর্যবোধক মনে করিনি কারণ আমি বড় হয়েছি একজন বাংলাদেশি মুসলমান পরিবারে। এবং আমাদের সমাজে এটাই সকলের বিশ্বাস এবং প্রত্যাশা ছিল যে একটা মেয়েকে বিয়ে করার আগ পর্যন্ত একটা ছেলের যৌন অভিজ্ঞতা বলতে কিছুই থাকবে না। সব হবে বিয়ের পর। তখন আমার বিয়ের বয়সও হয়নি, তাই কারো সাথে কোনো যৌন সম্পর্কও হয় নি। এই বলে নিজেকে বেশ মানিয়ে নিতাম একটা পরিবেশে যেখানে আমার সমবয়সী প্রায় সব ছেলেরাই ইতিমধ্যে কোনো না কোনো বান্ধবির সাথে প্রেমের এবং যৌন সম্পর্ক করে ফেলেছে। সেই পরিবেশটা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের একটা বিশ্ববিদ্যালয় ভিত্তিক শহরে, যেখানে ১৮ বছর বয়স থেকে আমি একটা নতুন জীবন শুরু করি।
তার আগে দেশ ছেড়েছি ১৩ বছর বয়সে। বাবা-মা ও বোনদের সাথে স্ক্যান্ডিনেভিয়ার ফিনল্যান্ড দেশটিতে পাড়ি জমাই বাবার চাকরির কারণে। কিন্তু সেখানে ইংরেজিতে তখন ভালো লেখাপড়ার সুযোগ না থাকায় আমাকে যুক্তরাজ্যের একটা আবাসিক বিদ্যালয়ে পাঠিয়ে দেয়া হয় ১৪ বছর বয়সে। বাড়ি থেকে সেই বের হয়ে যাওয়ার পথটা শুধু এক দিকেই যায়। ঘর ছাড়া ছেলেরা কোনো দিন আর সত্যিকার অর্থে বাড়ি ফেরে না। আর সেই যাত্রাটা ছেলে বা মেয়েদেরকে চিরতরে বদলে দেয়।
তারও একটু আগের কথায় যাই এবার। বাংলাদেশকে চিনতে শিখেছি ছয় বছর বয়স থেকে। ভাবছেন তার আগে কই ছিলাম? আমার জন্ম বাংলাদেশেই ১৯৭২ সনের আগষ্ট মাসে অর্থাৎ স্বাধীনতার প্রায় এক বছর পর। আমাকে গর্বিত বাংলাদেশি বলতে পারেন। কিন্তু এক বছর বয়স থেকে ছয় পর্যন্ত আমার শৈশব কাটে যুক্তরাজ্যের লন্ডনে। আমার বাবা লন্ডনের একটি বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি পড়ছিলেন। মা তখনকার যুগের সাথে তাল মিলিয়ে লন্ডনে চাকরিও করতেন। পাঁচ বছর বয়সের আগে আমার প্রথম ছোট বোন না আসার আগ পর্যন্ত আমি বড় হচ্ছিলাম তাদের এক মাত্র ছেলে হিসেবে এবং ঘরের ভেতর মায়ের মুখ থেকে শোনা কিছু বাংলা শব্দ শুনে। তার সাথে পারিপার্শিকতার ইংরেজি ভাষা ও সংষ্কৃতিই আমাকে বেশি প্রভাবিত করেছিল এবং কথা বলতে শুরু করার পর ঘরে মায়ের মুখ থেকে শোনা কিছু শব্দ ছাড়া ফটফট করে ইংরেজ ছেলেদের মতোই ইংরেজি বলতাম।
আমার বাবা-মা ছিলেন গানের ভক্ত। তারা ঐ পাঁচ বছর লন্ডনের বিভিন্ন ভারতীয় দোকান থেকে খালি বিভিন্ন বাংলা ও হিন্দি রেকর্ড (এল পি) কিনতেন। আমাদের বাসায় সারাক্ষণ সেই গানগুলো বাজতো। কিছু না বুঝলেও সেই গানগুলো শুনতে শুনতে বেশ রপ্ত করে ফেলেছিলাম এবং গুনগুন করে আমার বাবা-মা ও তাদের অন্যান্য বাংলাদেশি বন্ধু-বান্ধবদের শোনাতেও পারতাম। সেই তখন থেকে দূরের বাংলাদেশ ও ভারতের সংষ্কৃতির সাথে আমার পরিচয়। লক্ষণীয় ব্যাপার হচ্ছে গানের সেই পরিবেশটা বাংলা আর হিন্দির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। বাইরের বিলেতি পরিবেশের সাথে তাল মিলিয়ে তখনকার জনপ্রিয় বিভিন্ন ইংরেজি আধুনিক গানের সাথেও ছিল আমার ভালো সম্পর্ক। “এব্বা”, “কার্পেন্টার্স”, “ক্লিফ রিচার্ড”, এদের গানও বাজতো আমাদের বাসায়। মা এখনো স্মৃতিচারণ করে আমি কীভাবে জোর করে তাদেরকে এব্বা”র গান রেকর্ডে বাজাতে বলতাম। “ইউ আর মাই ড্যান্সিং কুইন”, “নওইং মি, নওইং ইউ” ইত্যাদি ঘুমের মধ্যেও গেতে পারতাম। এখন মনে মনে হাসি যে খেলাধূলার প্রতি আমার একেবারেই মনোযোগ ছিল না অথচ এব্বা’-র গান মুখস্ত করে ফেলেছিলাম এবং ‘কার্পেন্টার্স’-এর “ইয়েস্টারডে ওয়ান্স মোর” গানটা আমাকে আমার স্কুলের শিক্ষিকা সবার সামনে দাঁড় করিয়ে গাওয়াতেন।
ছয় বছর বয়সে ছোট বোনকে নিয়ে আমি আর আমার বাবা-মা দেশে ফিরলাম। সেই পরিবর্তনটা আমার মাঝে সারা জীবনের জন্য দাগ কেটে দেয়। আপনি পৃথিবী থেকে মঙ্গল গ্রহে চলে গেলে আপনার যা অনুভূতি হতে পারে, আমার বোধহয় তাই হয়েছিল। সম্পূর্ণ অচেনা এক জগত যার ভাষা বুঝিনা আর যেখানে সবখানে মানুষ আর মানুষ (বেশির ভাগই আমার আত্মীয় স্বজন)। কিন্তু বাচ্চারা অল্প সময়ের মধ্যেই অনেক কিছু মানিয়ে নিতে শিখে। বুড়াদেরই যত সমস্যা হয়। শুরু হলো এক নতুন অধ্যায়। বাবার কড়া হুকুম ছিল কারো সাথে ফটফট করে ইংরেজি বলা যাবে না। কী মুশকিল! আমি তো বাংলাই বলতে পারি না দুই একটা শব্দ ছাড়া। কিন্তু বাবার হুকুম তো মানতেই হবে। কত মানুষ আমার ইংরেজি শোনার জন্য অস্থির। কিন্তু আমার উপর জারি করা আছে এক বিশেষ আইন। মানুষের কথা শুনে শুনে নতুন শব্দ এবং বাক্যগুলো রপ্ত করা ছাড়া আমার আর কোনো গতি ছিল না। একটু আকটু বলতে শুরু করলে অবশ্য অনেকেই খুশি হত আবার ছোটরা টিটকারিও মারতো।
মানুষে মানুষে ভেদাভেদটা বোধহয় ছয় বছর বয়সে এই প্রথম দেখি। আমার দাদার বাড়িতে ছিল রান্না ঘরে কাজ করে এমন দুইটা ছোট মেয়ে। স্বভাব বশত তাদের সাথে আমার বন্ধুত্ব হয়ে যায় যদিও কেউ কারো কথা তেমন বুঝতে পারতাম বলে মনে হয় না। আমি রাতে খাবার টেবিলে বসে মাকে জিজ্ঞেষ করতাম যে মেয়ে দুইটা কেন আমাদের সাথে এক টেবিলে বসে খাবার খায় না? এরা তো আমার বন্ধু। টেবিলে বসা সকল গুরুজনদের মুখে তখন খালি অট্ট হাসি ছাড়া আর কোনো আওয়াজ বের হত না। কেউ আমাকে বুঝানোর চেষ্টাও করেনি তারা কেন আমাদের সাথে খাবার খায় না, এক সাথে সোফায় বসে না। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে সব বুঝেছি। অভাবের তাড়নায় এরা নিজেদের পরিবার ছেড়ে আরেক পরিবারে এসেছে দাসী হয়ে, নতুন পরিবারটার সমস্ত কাজ কর্ম করতে, নতুন পরিবারটাকে নিজেদের করে নিতে। সেখানে তিন বেলা খাওয়া ও মাথার উপর একটা ছায়া পাওয়া গেলেও সাথে জুটতো আরো অনেক কিছু যা আমাকে এখনো পীড়া দেয়। এদের ছিল না সামান্য মানুষ হিসেবে মর্যাদা। এদের করুণ দশার সুযোগ নিয়ে এদের উপর বিভিন্ন পরিবারেই দেখেছি অমানবিক, মানসিক ও শারীরিক অত্যাচার, যেই অপরাধে বাড়ির গৃহিণী থেকে শুরু করে গৃহকর্তা ও বাড়ির ছেলে মেয়েরাও সংযুক্ত ছিল। শারীরিক প্রহার কাকে বলে জীবনে এই প্রথম তা অবলোকন করি নিজের বাড়িতে। নিজের চোখে দেখা সেই ভয়াবহ দৃশ্য আজও চোখে ভেসে ওঠে। আমার কামনা যে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নতির ফলে ভবিষ্যতে দেশের কোথাও আর কোনো কাজের মেয়ে বা ছেলে খুঁজে পাওয়া যাবে না। সবাই আত্মমর্যাদা নিয়ে স্বাধীনভাবে কাজ করবে বিভিন্ন অফিস-আদালত, বিদ্যালয়, দোকানপাট আর শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোতে।
আমার বাবা তার নিজের পরিবারের কথা অগ্রাহ্য করে আমাকে বাংলা মাধ্যমের প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি করালেন। সবাই ভেবেছিল যে আমাকে বুঝি ইংরেজি মাধ্যমে ভর্তি করানো হবে। কিন্তু না। বাবার শখ ছিল আমাকে বাংলা শিখাবেন আর তাই বাংলা স্কুল। শুরু হলো আমার বাঙ্গালীয়ানা। বাবার এই সিদ্ধান্তকে আমি আজও সবচেয়ে বেশি সন্মান করি। এটা না হলে আর পরের জীবনে বিদেশে বসে এক গাদা হুমায়ুন আহমেদের বই পড়তে না পারলে আজ ৪৫ বছর বয়সে লন্ডনে বসে এই লেখা আর হয়তো লিখতেই পারতাম না। বাসায় আসলো সাদা-কালো টিভি। শুধু একটি মাত্র চ্যানেল যা এখনো বিটিভি নামে পরিচিত। চ্যানেল একটা হলে কী হবে, তার মধ্যে যে মহিমা ছিল তার সিকিটুকুও এখন খুঁজে পাওয়া যাবে না দেশের সব কটা বেসরকারী ছোট পর্দাগুলোতে। “সকাল সন্ধ্যা”, “এইসব দিন রাত্রি”, “ঢাকায় থাকি”, “আমি তুমি সে” এই সব নামের ধারাবাহিক নাটক সপ্তাহে একবার দেখা ছাড়াও ছিল “মনের মুকুরে”, কিছু উন্নত মানের বাংলা ছায়াছবি ও বিভিন্ন গানের অনুষ্ঠান। আমি সেই ছোট পর্দার মাধ্যমে বাংলাদেশকে চিনতে শিখি। পরিচিত হই সাবিনা ইয়াসমিন, রুনা লায়লা, প্রয়াত ফজলে লোহানী, হানিফ সংকেত আর টেলি সামাদের সাথে।
কেউ কেউ বললো যে আমি গুনগুন করে এত ভালো গান গাই যে আমার গান শেখা উচিৎ। আমার মায়েরও শখ হলো আমাকে একজন প্রশিক্ষিত প্রাণী বানিয়ে ফেলবে যাতে যখন খুশি তখন আমাকে বলবে গান গাও আর আমি গাইতে শুরু করবো। ওমা! গান তো না, একেবারে উপমহাদেশের উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত দিয়ে শুরু। এতে গানের সুর, লয় আর তাল – এগুলো ঠিক মতো বসে যায়। কিন্তু একজন ৭ বছরের বাচ্চা কি এই সব কাঁপানো আওয়াজ গলা থেকে বের করতে চায়? কিন্তু বাবা-মার এই অপ্রিয় চেষ্টার কারণে আমি পরে খুব সহজেই নজরুল গীতি, রবীন্দ্র সঙ্গীত, আধুনিক বাংলা গান, পল্লীগীতি, দেশাত্ববোধক গান ইত্যাদি পরিবেশন করতে শিখি। তবে সেগুলো শিখার আগে প্রথমে বিভিন্ন জায়গায় আমাকে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতও পরিবেশন করতে হত। আর আমি সেই বয়সেই বুঝে গিয়েছি যে সেগুলোর ভক্ত শ্রোতা খুবই কম। সবাই হালকা আর তালের গান শুনতে বেশি পছন্দ করে। কিন্তু আমার বাবা-মা আজ পর্যন্ত জানে না যে সব জায়গায় সব গান গাওয়া যায় না। পরিবেশ আর শ্রোতা বুঝে গেতে হয়। তাদের এই অজ্ঞতার জন্য তাদের উপর আমার অভিমান এখনো কমেনি। তবে গান গাওয়ার পরিবেশ ও শ্রোতা আজ আমার কাছে না থাকা সত্যেও বাংলা, হিন্দি ও উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের মর্ম আজ নিশ্বাসে ও মনের গভীরে অনুধাবণ করতে পারি। আর কোনো এক কালে বিড়ি-সিগারেট দিয়ে গলা প্রায় নষ্ট করে ফেলা সত্যেও আজও দুই একটা গান গেয়ে দিতে পারি দেশে বেড়াতে আসার পর কেউ হাতে পায়ে ধরলে। এই অবদান আমার বাবা-মার।
শুধু গান আর লেখাপড়া দিয়েই কি হয়? ধর্ম লাগবে না? প্রথমে হলো ৭ বছর বয়সে আমার খতনা। সে কী অত্যাচার! ডাক্তার আমাকে কিছুতেই ভালোভাবে স্থানীয় এনেস্থেসিয়া দিতে পারে নি। সেই ব্যথা আর চিৎকার এখনো মনে পড়ে। সেই আক্রমণাত্মক দিনটা উদযাপন করার জন্য এসেছিলেন আমার কিছু আত্মীয় স্বজন। সবাই আমাকে বুঝালো আমি সেই দিন থেকে মুসলমান হয়ে গেলাম। এর আগে কী ছিলাম সেটা প্রশ্ন করার মতো বোধ শক্তি আমার তখনো হয়নি। তারপর বাসায় এলো হুজুর। কেতাব থেকে শুরু করে কোরআন শরীফ। ওমা! হুজুর বললো আমাকে তো নামাজ পড়া শিখতে হবে নইলে বিভিন্ন মুখস্ত করা দোয়া দুরুদগুলো বিফলে যাবে। সেই যে শুরু হলো, একটা সময় গিয়েছে যখন পাড়ার মসজিদে ৫ ওয়াক্ত নামাজ পড়তাম। মসজিদের ইমাম থেকে শুরু করে মোয়াজ্জেন ও অন্যান্য হুজুরদের কী আদর আর ভালোবাসা! এমন কি মসজিদের মাইকে আজানও দিতে পেরেছি দুই একবার।
আমি বোধ হয় দেখতে সুন্দর ছিলাম, নইলে নামাজ পড়তে আসা বিভিন্ন বয়সের যুবকরা আমার দিকে এমন ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে থাকতো কেন? মুচকি মুচকি হাসতো বেহায়ারা। এক হুজুর আমাকে এক জোহরের নামাজের পর তার কক্ষে তার সাথে বিশ্রাম নেয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানালো। আমি কিছুটা কৌতুহল নিয়েই রাজি হলাম। আট-নয় বছর বয়সের ছেলেদের কতই না কৌতূহল থাকে। তার বিছানায় শুয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করছি, হঠাৎ খেয়াল করি আমার পশ্চাদপদে ব্যথা। আঁতকে উঠে দৌড় দিয়ে ঘর থেকে পালালাম। আর তারপর এই ঘটনাটা কেন জানি একদম ভুলে গেলাম অনেক দিনের জন্য। আজকালকার খবরে মাদ্রাসায় মোল্লা দ্বারা বালক ধর্ষণের কথা বেশ ছড়িয়ে পড়াতে আমার এই ছোট ঘটনাটা কিছু দিন আগে মনে পড়ে গেল। আরো মনে পড়ে গেল কীভাবে একটা না বোঝা ভাষায় তোতাপাখির মতো উচ্চারণ করে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত হুজুরের সামনে কয়েক মাস ধরে কোরআন শরীফ খতম দেয়ার পর বাসায় বসলো এক বিরাট মিলাদ মাহফিল। প্রতিটা আলিফ-বা-তা-সা’র জন্য কিছু কল্পনা করা সোয়াব লাভ করা ছাড়া আর কিসের সান্নিধ্য পেয়েছি বলতে পারেন?
আমি তো কিছু বাছাই করা অনুবাদ ছাড়া তখন কিছুই জানতে পারিনি এই বইটিতে কী লেখা আছে এবং এখানে আল্লাহ’র বাণী আসলে কি? ওয়াজ মাহফিল, পরিবার, ও সমাজ থেকে ভাঙ্গা রেকর্ডের মতো কিছু কথা শুনে শুনে মুখস্ত হয়ে গিয়েছিল, এই যা। কিন্তু এতেই কি আমি মুসলমান হয়ে গিয়েছেলাম? একটা না জানা ভাষায় একটা বই পড়ার অর্থ কি? বাংলাদেশের মতো বাংলা ভাষার দেশ কেন আরবিতে কোরআন শরীফ পড়ার উপর এতটা জোর দেয়? কেন প্রকৃত অনুবাদ পড়াটাকে যথেষ্ট মনে করা হয় না, কেউ কি ভেবে দেখেছেন? সেই অর্থ বা অনুবাদের সব কিছু আমাদের ভালো নাও লাগতে পারে, সেই সম্ভাবনা কি থেকে যায়? এবং এতে বাংলাদেশে মানুষদের ঈমানের উপর কোনো প্রকার হুমকি আসতে পারে, সেই ভয়েই কি থাকেন মুমিন আলেমগন?
এই প্রশ্নগুলো করার ধৃষ্টতা এমন কি চেতনাও তখন আমার ছিল না। সেটা মাথায় এসেছে বেশ পরে যখন আমি ১৯৮৭-১৯৯১ সাল পর্যন্ত বিলেতের সেই আবাসিক বিদ্যালয়ে পড়ি। সেখানকার এক খ্রিস্ট পাদ্রী আমার কাছ থেকে একবার ভালোভাবে বুঝতে চেয়েছিলেন বাংলাদেশে কেন আমরা আরবি ভাষায় কোরআন পড়ি যার কোনো মানেই আমরা বুঝি না। তারা তো ইংরেজি ছাড়া আর কোনো ভাষায় বাইবেল পড়ার কথা চিন্তাও করতে পারে না। তো আমাদের এই তামাশা কেন? আমি তার কথার কোনো যথাযথ জবাব দিতে পারিনি তখন। কিন্তু মনে প্রশ্নটা ঠিকই গেঁথে যায়, যার প্রকৃত অনুধাবণ যুক্তরাষ্ট্রে আমার পরের দিনগুলোতে ইসলাম ধর্ম নিয়ে আমার ভাবনা চিরতরে বদলে দেয়।
এত গান, নাটক, লেখাপড়া আর নামাজ-কামাজের মধ্যে আমি খেয়াল করলাম যে বাংলা শিখতে শিখতে আমি আমার সেই ছোট বেলার ইংরেজি ভুলে গিয়েছি। আত্মীয় স্বজনদের পক্ষ থেকেও একই কথা জানলাম। কালক্রমে বাংলাদেশের রাজনীতি বড় খারাপের দিকে চলে গেল। আমি টিভিতে জিয়াউর রহমানকে দেখে দেখে বাংলাদেশের আর সব মানুষদের মতো তাকে ভালোবাসতে শিখলাম। তাকে যখন খুন করে ফেলা হলো, তখন বাংলাদেশের শোক দেখে মনে হয়েছে প্রত্যেকের বাবা বা স্বামী মারা গেছে। জিয়ার মতো বিতর্কিত মানুষ যে কীভাবে পুরা বাংলাদেশকে যাদু করে রেখেছিল তার রেশ এখনো কাটেনি। কিন্তু তারপর বন্দুকের ক্ষমতায় এরশাদ সাহেব আসলে আমার বাবা ভাবলেন যে এই দেশে তার আর ভবিষ্যত নেই। আবার সেই বিদেশেই পাড়ি জমাতে হবে। কিন্তু তখন তার তিন ছেলে মেয়ের (আমার আরেকটা ছোট বোন তত দিনে এসে গেছে) ইংরেজির অবস্থা খুব খারাপ। তাই এবার বাংলা মাধ্যম থেকে সোজা ইংরেজি মাধ্যম। আমি সেখানে পঞ্চম শ্রেণিতে ঢুকলাম।
এ কী এলাহি কান্ড! এখানকার ছাত্র-ছাত্রীরা বাঙ্গালীর মতোই দেখতে অথচ দেশে বসে বিদেশি হাল। কেউ বাংলা ঠিক মতো বলতে পারে না। ঢং ঢাং একেবারে কেমন জানি। ভেঙ্গে ভেঙ্গে বাংলা বলে তাও আবার বিরক্তি নিয়ে যদি কখনো দরকার হয়। ইংরেজি বলছে যেটাকে আমি তখন মনে করতাম না জানি কী ভালো মানের। পরে আবার বিদেশে এসে ইংরেজি ভালোভাবে রপ্ত করে অনুধাবণ করলাম যে তারা আসলে তেমন কিছুই ইংরেজি বলতে পারতো না। কিন্তু ঢংটা ঠিকই করতে পারতো। এদের ভাব ছিল এদের জন্মই যেন হয়েছে একটা ভুল দেশে। কোনো রকমে পাস করে আমেরিকা যেতে পারলেই হলো। তখন আর বাংলাদেশ নামের একটা অনগ্রসর দেশের সাথে তাদের কোনো যোগাযোগ রাখার প্রয়োজন থাকবে না। কালক্রমে আমার ব্যাচের প্রায় অনেকেই এখন যুক্তরাষ্ট্রে। এদেরই মা’রা অনেকেই আবার সেই স্কুলের শিক্ষিকা ছিলেন। এদের মধ্যে আমার মা’ও ছিলেন অন্যতম!
এই ইংরেজি মাধ্যমের চ্যাঙরাদের মধ্যে ছিল না আমার মনে তত দিনে গজিয়ে ওঠা দেশপ্রেম ও বাঙ্গালীয়ানা। এরা রবীন্দ্রনাথের নাম শুনেছে মাত্র। এরা ক্যানাডার প্রেইরীর নাম জানে কিন্তু বাংলাদেশের পদ্মা-মেঘনা-যমুনার মোহনার কথা জানে না। এদের ছিল নিজের দেশ ও পরিবেশের প্রতি বিতৃষ্ণা, বাংলা মাধ্যম থেকে আসা আমার মতো খ্যাত ছেলেদের প্রতি অবজ্ঞা। এবার বুঝলাম বাবা কেন আমাকে প্রথমে বাংলা মাধ্যমে লেখাপড়া করিয়েছিলেন। বাংলা ভাষার প্রতি আমার জন্মে গিয়েছিল এক অকৃত্রিম ভালোবাসা। সেই ভিত্তিটি আজ অবধি রয়ে গেছে। যেই দেশের স্বাধীনতার স্থম্ভ হচ্ছে মাতৃভাষার অধিকার এবং যেই দেশে এখনো ঢালাও করে ভাষা দিবস পালন করা হয়, সেখানে সমাজ কী করে এই সব অবাঙ্গাল ও কৃত্রিম ফিরিঙ্গিদের চাষ করার সুযোগ করে দিয়েছে তা আমার বোধগম্য নয়।
মনে রাখতে হবে যে এই বিশ্বায়নের যুগে ইংরেজি হচ্ছে একটি আন্তর্জাতিক ভাষা। ইংরেজদের চাপিয়ে দেয়া উপনিবেশিক হাতিয়ার আর নয় সেটা। তাই বাংলা মাধ্যমেই ভালো ইংরেজি শেখানোর ব্যবস্থা করতে হবে আধুনিক উপায়ে। কিন্তু বাংলাদেশের সমগ্র শিক্ষা ব্যবস্থা রাখতে হবে বাংলার মাধ্যমে, এই সব বানিজ্যিক ও ভাওতাবাজীর টিউটোরিয়াল ও বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় দিয়ে নয়। অবশ্যই প্রচুর চেষ্টায় সকল সরকারি ও বেসরকারি বাংলা মাধ্যমের চেহারা বদলে দিতে হবে যাতে দেশের নব বিত্তবান বাবা-মা’রা মনে করে বসে না থাকে যে টাকা খরচ করে ছেলে মেয়েদেরকে এই সব জায়গায় পড়ালেই বুঝি ভালো শিক্ষা পাওয়া যাবে, ভালো ইংরেজি শেখা যাবে ইত্যাদি। আজকের শহরাঞ্চলের ছেলে মেয়েদের মধ্যে নিজেদের জাত বাড়ানোর আকাঙ্খায় আধা বাংলা ও আধা ইংরেজি মিশিয়ে বাংলিশ, বা ইংরেজি উচ্চারণে ছাগলের মতো বাংলা বলার অভ্যাস রোধ করার এটাই উত্তম উপায়। আজকের ‘বাট-সো’ প্রজন্মের জন্য অভিভাবক, এই সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং গনমাধ্যম দায়ী।
১৯৮৬ সালের জুলাই মাসে দেশের মায়া ত্যাগ করলাম ফিনল্যন্ডের উদ্দেশ্যে যেখানে বাবা জাতিসংঘের একটা গবেষণামূলক প্রতিষ্ঠানে যোগ দিলেন। সেখানকার কথায় বেশি না গিয়ে চলে আসতে চাই তারও এক বছর পর বাবা যখন আমাকে বিলেতে আবাসিক স্কুলে পাঠিয়ে দিলেন। এই বয়সে ঘর ছাড়া হওয়ার বেদনা যার হয়নি সে বুঝবে না বেদনাটা কতটুকু। তবে এছাড়া আর উপায়ও ছিল না দেশে ফিরে আসতে না চাইলে। তাই জীবন যুদ্ধের জন্য তৈরি হলাম। ভেবেছিলাম শৈশবের সেই দেশ – সব পরিচিতই তো মনে হবে। কিন্তু না! আবাসিক বিদ্যালয়ের পরিবেশের কোথাও আমার শৈশবের ছায়াটা পর্যন্ত পাইনি। পেয়েছি বিষাদময় একটা গন্ডি।
আমার বাবা-মা’র ধারণা ছিল যে এই সব প্রতিষ্ঠানে রাজা-রানীর সব ছেলেরা পড়তে আসে। এবং ভারত উপমহাদেশে আমাদের প্রাক্তন দাসদের মাঝে রেখে যাওয়া ধারণা অনুযায়ী এই সব প্রতিষ্ঠানগুলো যেন বিশ্বের সেরা অধ্যায়ন কেন্দ্র, যেখান থেকে বের হয় পৃথিবীর সমস্ত নেতা, দার্শনীক, কবি সাহিত্যিক, রাজনীতিবীদ, এরা। বাস্তবে কী দেখলাম জানেন? অধিকাংশ ছাত্ররাই ৮০’র দশকে মার্গারেট থ্যাচার আমলের চরম মুক্তবাজার অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে নব্য ধনী হওয়া স্থানীয় কৃষক ও শ্রমিক শ্রেণির বাবা-মাদের ছেলে পেলে। এদের যে নতুন পয়সা তা এদের কথা বার্তা শুনলেই বোঝা যেত। এদের মুখের ইংরেজি ছিল স্থানীয় গোত্রের (যেটার ইংরেজি শব্দ স্ল্যাং) এবং এদের আচার আচরণে ছিল না কোনো মার্জিত ভাব। এরা ছিল রুক্ষ এবং বিরক্তিকর। আমি একেবারেই খাপ খাওয়াতে পারিনি চারটি বছর। বিষন্নতায় ভুগেছি আর বিবিসি টিভি দেখে, ক্লাসের অধ্যায়ন করে আর বিলেতের তখনকার সনামধন্য পত্রিকা পড়ে দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে ভালো এবং সম্ভ্রান্ত ইংরেজি রপ্ত করে ফেলি যা আমার আশেপাশের অধিকাংশ বিশ্রীদের তূলনায় ছিল অনেকাংশে উন্নত মানের।
এই পরিবেশে বই পোকাদের করা হত উপহাস। এখানে ভালো ফুটবল বা ক্রিকেট খেলোয়ারদের মূল্য ছিল বেশি। এখানে গুন্ডাদের মতো আচরণকারী ও অন্যদের ছোট করতে পারে এমন ছেলেদেরই সুনাম বেশি ছিল। এখানে যে এই ছকে পড়তো না, তার দিনগুলো হত অন্ধকারাচ্ছন্ন। তাহলে আমার কথায় আসি এবার। আমার ইংরেজি প্রথমে ছিল কাঁচা। আমি এদের কথ্যভাষা বুঝতামই না। খেলাধূলা? মনে আছে যে একেবারে ছোট বেলায় এব্বা”র গান গেতাম কিন্তু খেলা বুঝতাম না? বাংলাদেশে বিগত সাত বছরে লুকোচুরি আর হাড়ি-পাতিল ছাড়া আর কিছু খেলতে পেরেছি বলে মনে নেই। পাড়ার আর কোনো খেলা হলে আমি কিছুতেই পেরে উঠতে পারতাম না। না ফুটবল, না ক্রিকেট, না ব্যাডমিন্টন। আর বাংলাদেশে বিগত সাত বছরে বড় হয়েছি বাবা-মার কড়া শাসনে। তারা তাদের ব্যক্তিগত জীবনে ছিলেন অসুখী। আমার বাবার পরিবারের অনেক মানুষ ছিলেন নিম্ন শ্রেণির মানসিকতার, যাদের মানসিক জিম্মি আর নানান বিষয়ে ব্যক্তিগত হস্তক্ষেপের ফলে তাদের দাম্পত্য জীবন হয়ে ওঠে দুর্বিষহ। এর ফলে আমার উপর প্রায়ই আসতো মায়ের দিক থেকে অনাকাঙ্খিত প্রহার এবং বাবার দিক থেকে নিরন্তর গলাবাজী। হ্যাঁ! গান-বাজনা, ফুপাতো, চাচাতো ও মামাতো ভাইবোনদের সাথে ভালোবাসার অফুরন্ত মুহুর্ত, সবই ছিল। কিন্তু তার সাথে ছিল ধারাবাহিকভাবে আমার সাথে আমার বাবা-মা’র জানোয়ার সুলভ আচরণ যার প্রায়শ্চিত্ত তারা এখনো করে চোখের পানি দিয়ে।
আমাদের সমাজে প্রচলিত হয়ে এসেছে যে বাবা-মার অবাধ্য না হওয়ার অর্থ তাদের মুখের উপর কথা বললেও শাস্তি। এতে বাচ্চারা অনেক অন্যায় কথা শোনার পরও বোবা হতে শিখে ফেলে। এক পর্যায় কথার জবাব দিতেও ভুলে যায়। ধর্ম আবার এটাকেই সায় দেয় বলে এই নিয়মনীতি প্রতিটা পরিবারে গাঁথা। তার উপর আছে ছেলে মেয়েদের মনের উপরেও অভিভাবকদের কতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ। বড় হয়েও পেতে হয় তাদের দ্বারা চাপিয়ে দেয়া বিভিন্ন দায়িত্ববোধ ও অনুশোচনা। তাদের সংকীর্ণ কথাবার্তা ও গালাগালি শুনে অনেক বাচ্চারাই বড় হয়ে ওঠে আত্মবিশ্বাস আর নিজের উপর ভরসার অভাবে। অধিকাংশ অভিভাবকরা তাদের নিজেদের বাবা-মা’দের কাছ থেকেও পায়নি ইতিবাচক মনশক্তির দান। এর ফলে অনেকেই দুনিয়াতে হাত-পা ছড়ানোর পর জোর গলায় অন্যের কথা থেকে নিজেকে রক্ষা করতে শিখেনি। হ্যাঁ, আমাদের সমাজে পারিবারিক বন্ধন আর তার প্রসার প্রশ্চিমা সমাজের চেয়ে অনেক বেশি শক্ত আর ব্যাপক। কিন্তু তা আসে ব্যক্তিগত বিকাশ আর ব্যক্তি স্বাধীনতার প্রতিকূলতা নিয়ে।
বিলেতে এসে দেখলাম আমি তত দিনে ভেঙ্গে পড়েছি। আমি হয়ে গিয়েছিলাম একজন অদ্ভুতস্বভাব ব্যক্তি (ইংরেজিতে যেটাকে বলে একসেন্ট্রিক)। আমি এই জীবন যুদ্ধের জন্য না ছিলাম তৈরি, না ছিলাম শক্ত। সামান্য টিটকারিও সহ্য করার ক্ষমতা আমার ছিল না। ভাষার অদক্ষতা এবং বেড়ের ওঠার সময়কার কড়া শাসনের ফলে কোনো কথার জবাব দেয়ার অনভ্যাসের কারণে আমি সেই পরিবেশে হয়ে গিয়েছিলাম পঙ্গু। তাদের টিটকারিতে আমার প্রতিক্রিয়া দেখে একজন আমাকে জিজ্ঞেষই করে ফেলেছিল আমি ছোট বেলায় অপব্যবহারের শিকার হয়েছিলাম কি না।
তার উপর আশির দশকে বিলাত ছিল বর্ণ ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের জন্য এক বিভীষিকাময় দেশ। তার কিছু আগেকার দশক ধরে ভারত উপমহাদেশ থেকে আগত সকল অভিবাসীদের উপর ক্ষোভ অনেক ইংরেজরা প্রকাশ্যেই প্রকাশ করতো। পাকিস্থানীদের নাম থেকে নেয়া একটা ইংরেজি শব্দ আবিষ্কার করা হয় – “প্যাকি”, যার উচ্চারণ করা হত ঘৃণাত্তক সুরে এবং আমার উপর তা চালিয়ে যাওয়া হত অবিরাম। আমি বাংলাদেশি বা ভারতীয় হলেও এদের চোখে সকল বাদামী রঙের মানুষরাই প্যাকি। আমি এর প্রতিবাদ জানতাম না। মুখ বুঝে সহ্য করতাম এবং মনের ভেতরের অশ্রু মুছতাম। প্রথমে আমার ইংরেজি শুনে এরা হাসতো এবং আমার উপমহাদেশীয় উচ্চারণের তুমুল ব্যঙ্গ করতো। এটা প্রায় অসহনীয় হয়ে গিয়েছিল বলেই জেদ করে দুই তিন বছরের মধ্যে এই সব চাষা-ভুষাদের তুলনায় অনেক বেশি খাস বিবিসি ইংরেজির উচ্চারণ রপ্ত করে ফেলি এবং সেই ভাষার দক্ষতা দেখাতে শিখি। ভাগ্য ভালো যে সেই বয়সে সেটা সম্ভব ছিল। জীবনের শেষ অর্ধেকের দিনগুলোতে তা আর সম্ভব হয়ে ওঠে না।
আমার সাথে ভালো বন্ধুত্ব করে ফেলে একটি ইংরেজ ছেলে যে বাবার কুটনৈতিক চাকরির কারণে বিভিন্ন দেশে বাস করেছে। স্কুল ছুটির সময়ে সে সেই সব দেশেই চলে যেত। তখন তাদের স্থানান্তর ছিল ব্যাংককে এবং আমি বাংলাদেশি বলে সে আমার প্রতি আগ্রহ দেখায়। আর পাঁচ দশটা ছেলের চাইতে আমি তার সাথেই প্রথম থেকে কথা বলতে পারতাম আমার মতো করে। তার মুখের হাসি আমাকে আনন্দিত করতো আর কখন তার দেখা পাবো সেই আশায় বসে থাকতাম। শ্রেণিকক্ষে তার সাথে বসতে পারলে আমার দিনটাই ভালো যেত – বাকি সময়টার বাজে অভিজ্ঞতাগুলো আর গায় লাগতো না। আস্তে আস্তে আমি মানসিকভাবে তার প্রতি ঝুঁকে পড়ি। তাকে নিয়েই থাকতো আমার চিন্তা এবং আসা যাওয়া। বাকিরা আমাকে উপহাস করতো কিন্তু তার মাঝে পেতাম এক স্বর্গীয় শান্তি। তার স্নিগ্ধ কথা আর অমায়িক ব্যবহার আমার মাঝে আনতো উদ্যম এবং উদ্দীপনা। তার উপস্থিতিতে আমার মনের অনেক কষ্ট আর দুঃখ লাঘব হয়ে যেত। আমি তাকে অনুকরণ করতে শুরু করলাম নিজের অজান্তেই। তার মতো করে কথা বলার চেষ্টা করতাম, তার মতো করে হাসি দিতেও দ্বিধা বোধ করতাম না।
তাকে অন্য কারো সাথে হাটতে দেখলে আমার হিংসা লাগতো। ক্লাসে আর কারো সাথে বসলে তো কথাই নেই। বুঝলাম আমি তার প্রতি দূর্বল হয়ে পড়েছি। আমি চেষ্টা করতাম তার কাছ থেকে আরেকটু মনোযোগ পেতে। মজার বিষয় ছিল যে স্কুলটিতে আমার যেমন ছিল এক বর্ণনাতীত পরিস্থিতি, তারও অবস্থা ছিল কিছুটা শোচনীয়। বই পোকা আর কিঞ্চিত আন্তর্জাতিক মানসিকতার বাহক হিসেবে তাকেও বাকিরা ভিন্ন চোখে দেখতো। সে আস্তে আস্তে টের পেল যে আমার সাথে বন্ধুত্ব রাখলে আমাদের আবাসিক স্কুলের তথাকতিত সমাজে তার মান মর্যাদা উন্নয়ন করা সম্ভব নয়। তাই সে আমার বিরুদ্ধে চলে গেল এমনভাবে যা আজও আমাকে কাঁদায়। সে বুঝতে পেরেছিল যে আমাকে কষ্ট দেয়ার সবচেয়ে সহজ উপায় ছিল আমার তখনকার উপমহাদেশীয় ইংরেজি উচ্চারণের ব্যঙ্গ করা এবং আমাকে প্যাকি বলে গালি দেয়া। এইভাবে সে আস্তে আস্তে আমাকে খুঁড়তে শুরু করলো আর এতে আমার জীবন আরো দুর্বিষহ হয়ে উঠলো।
আমি তো তাকে ভালোবেসে ফেলেছিলাম। আমার ১৪ বছর বয়সে সেটাই ছিল আমার প্রথম ভালোবাসা। আমি যে এই ভাবে ভালোবাসতে পারি সেটাই জানতাম না। এই ভাবে কেউ যে ভালোবাসে তাও জানতাম না। সে জানতো কি না তা আজও আমার জানা নেই। স্কুলের প্রায় পুরাটা চার বছর তার বন্ধুত্ব হারানোর বেদনা আমাকে তিলে তিলে ধ্বংস করে। আর সকলের টিটকারি সহ্য করতে পারলেও তারটা পারতাম না। তাকে অন্য ছেলেদের সাথে ঘনিষ্ট বন্ধুত্ব করতে দেখলে আমার ঘুম হারাম হয়ে যেত। কিছুতেই তা স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে পারতাম না। সে আমার সকল দূর্বল দিকগুলো জানতো এবং সেই জায়গাগুলোতেই আঘাত করতো। আমি আমার মন তাকে এমনভাবে দিয়ে দিয়েছিলাম যে হঠাৎ কোনো একদিন সে আমার সাথে ভালো ব্যবহার করলে আমার জীবনটা যেন ফিরে পেতাম। আর বাকি সময়টা আবার মৃত হয়ে পড়ে থাকতাম। এই চার বছরের সময়টার শেষের দিকেই আমি জীবনে একটি বারের মতো আত্মহত্যার কথা চিন্তা করি।
এখানে বলে রাখি যে “গে” বা “কুইয়ার” শব্দটা ব্যবহার করে অনেকেই অনেককে উপহাস করতো এই পরিবেশে। বিলেত জুড়ে তখন ছিল সমকামভীতির আড্ডা। এই দেশের আইন ও সমাজ ছিল সমকামীদের চরম প্রতিকূলে। কিন্তু আমি কখনই এই শব্দগুলোর মর্ম বুঝতাম না। ‘গে’ বা সমকামীর আসল মানে সম্বন্ধে আমার ছিল না কোনো ধারণা। আমার কপালেও এই অপবাদটা কেন যেন খুব একটা জুটেনি। আমি যে আসলে এই বর্ণনারই একজন প্রতিকৃতি তার উপলব্ধি কিছুতেই তখন আসেনি। আমি ভেবেছিলাম সেই ছেলেটার প্রতি আমার অনুরাগ বয়ঃসন্ধিকালের একটা স্বাভাবিক অধ্যায়। অন্যরাও নিশ্চয়ই এরকম অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যায়। পরে তা আর থাকে না।
কিন্তু আমার চারপাশের নিয়ম যে যথেষ্ট আলাদা, সেটা আমার সহজে বোধগম্য হয়নি। আমার সমবয়সী ছেলেরা মেয়েদের প্রতিই বেশি ঝুঁকে পড়তো এবং তাদের নিয়েই কথা বলতো। আর আমি প্রহর গুনেছি আমার সেই প্রথম ইংরেজ ছেলেটির সাথে একত্রিত হবার কল্পনায়। স্বপ্নে দেখতাম আমাদের অন্তরঙ্গ মুহূর্তগুলো। বাকি ছেলেরা প্রায়ই দল মিলিয়ে দুই-তিন থেকে চার-পাঁচ জনের সাথে একত্রে বন্ধুত্ব করে ফেলতো। কিন্তু আমার সুচারু নজর গিয়েছে শুধু একটা একটা করে ছেলে প্রতি। আর তাও আবার অনেক গভীরের তলদেশে। এর পরেও দুই তিন জনের প্রতি আমার কিছুটা অনুরাগ জন্ম নিয়েছিল এবং কষ্টও পেয়েছিলাম। কিন্তু প্রথম প্রেমের আঘাতের ফলে আমি মানসিকভাবে নিজেকে আগের মতো আর দূর্বল হতে দেইনি।
১৯৯১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আমি বাবা-মাকে বিদায় জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি দেই বিলেতের প্রতি ঘৃণা বহন করে ও প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়ে যে সেই দেশে আমি আর কোনো দিন ফিরবো না। আমেরিকায় যাই মিশিগান অঙ্গরাষ্ট্রের একটা নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়নের জন্য। আহ! নেমেই দেখি কী শান্তির বাতাস। এই দেশের পরিবেশ আর মানুষ যেন প্রকৃত অর্থেই ফেলে আসা বিলেতের চেয়ে অনেক মধুময়। আমি তখন অনেক কষ্টে রপ্ত করা খাস বিবিসি ইংরেজি উচ্চারণ করি যার প্রতিধ্বনি শোনা মাত্র মার্কিনিরা ছাগলের বাচ্চার মতো গদগদ হয়ে যেত। আমার খটকা লাগলো যে ইংরেজ হারামিরা মার্কিনি ইংরেজি সহ্য করতে পারে না, অথচ মার্কিনিরা কী রকম লালা ফেলতে থাকে উল্টাটা শুনলে। এতেই আমি আমেরিকানদের উন্নত মানসিকতার পরিচয় পেতে শুরু করি। আমার বিবিসি মার্কা মুখ খোলা মাত্রই মানুষ আমার সাথে কথা বলতো আর বন্ধু হয়ে যেত। আমি সকলের ঘৃণার পাত্র থেকে পরিণত হয়ে গেলাম সকলের মধ্যমণি। অতীতকে ভুলে গিয়ে নতুন জীবনকে স্বাগত জানালাম মুক্ত আলিঙ্গন করে। আর তার পরের ১২টি বছর ছিল আমার জীবনে সবচেয়ে আনন্দময় কিন্তু একই সাথে তীব্র অভিজ্ঞতা সম্পন্ন।
বিলেতি আর মার্কিনিদের মধ্যে সবচেয়ে বড় পার্থক্য হলো পরের জনরা মনে যা করে, মুখে সেটাই বলে। সেখানে আর কোনো রহস্য থাকে না। ইংরেজরা প্রায়ই ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে এবং আসল কথায় না গিয়ে জিলেপির প্যাঁচ দিয়ে কথা বলে। তাদের মনের আসল কথা বোঝা দায়। তাদের আঞ্চলিক ভাষার অচেনা ইংরেজি এবং বিলেতের শ্রমিক শ্রেণির বাজে ইংরেজি আরো বোঝা যায় না। আমেরিকানরা দেখলাম একেবারেই বিপরীত। তারা সহজ সরল ইংরেজিতে অল্প কথায় এবং কিছুটা অলসতার সাথে মনে যেটা আসে সেটা সরাসরি বলে দেয়। এতে মানুষটা আমাকে পছন্দ করেছে কি করেনি সেটা সহজেই বুঝে নেয়া যায়। আমার কী আনন্দ। আমি মনের মতো মানুষ পেলাম। ইংরেজদের বুক ফাটে তো মুখ ফোটে না আর আমেরিকানরা গড়গড় করে বলে দেয় নিজেদের কথা। আমার আসলেই মনে হলো আমি বুঝি আমার নিজের বাড়িতেই এলাম। মার্কিনিদের এই স্বভাব আমাকে এতটাই মুগ্ধ করেছে যে আমি আজও তাদেরকে ভালোবাসি।
মার্কিনি পররাষ্ট্রনীতি এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের উপর সেটার প্রভাবের সাথে এই সব মানুষদের কোনো যোগাযোগ নেই। এরা নিরীহ মানুষ যারা নিজের জীবন অতিবাহিত করা নিয়ে ব্যস্ত এবং অধিকাংশরাই সেই সময়ে বিদেশিদের প্রতি বিদ্বেষ বা বিদেশাতঙ্কে ভুগতো না। বলা বাহুল্য যে আমি সামনের ১২টা বছর বিলেতিদের নিয়ে একটাও ভালো কথা বলিনি। মার্কিনিদের সাথে তুলনা করে বিলেতিদের মনে হয়েছে নিকৃষ্ট মানের কীটপতঙ্গ। আমেরিকানদের নিয়ে রাজা-উজির মারার অভ্যাস তাদেরই যারা কোনো দিন যুক্তরাষ্ট্রে আসেনি বা থাকেনি। বিলেতের শ্রমিক শ্রেণি ও অতি বামপন্থী আঁতেল থেকে শুরু করে বাংলাদেশের মোল্লা, বুদ্ধিজীবি, ওয়ার্কাস পার্টির সদস্য, সবাই আমেরিকানদের বাঁশ দিতে চুলকানি বোধ করেন দিন রাত। তবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বের হয়ে আসা গান-বাজনা, চলচিত্র, কাপড়-চোপড়, জীবন ধারা, খাওয়া-দাওয়া (ফাস্ট-ফুড) এগুলো অনুকরণ করতে তেমন দ্বিধা বোধ করেন না তারা। আবার তাদের অনেকেরই ছেলে মেয়েরা আমেরিকায় লেখাপড়ার উদ্দেশ্যে দেশান্তর। এই হলো ভন্ডামীর সুন্দর একটা নিদর্শন।
এন আরবার শহরের ইউনিভার্সিটি অফ মিশিগানের ক্যাম্পাসে হঠাৎ একদিন দেখলাম “সমকামিতা সচেতনতা সপ্তাহ” চলছে। কী অদ্ভুত ব্যাপার! বিভিন্ন আবাসিক দালানগুলোর ভেতরের দেয়ালে কিছু ছবি টাঙ্গানো যেখানে দেখা যাচ্ছে দুই পুরুষের অন্তরঙ্গ মুহূর্ত। অনেকটা যৌনাচারের ছবির মতো। আমি কিছুতেই সেগুলো থেকে আমার চোখ ফেরাতে পারছিলাম না। জীবনে এই প্রথম এরকম কিছু দেখলাম। এর আগে নারী-পূরুষের যৌন ছবি অনেক তো দেখেছি, কিন্তু এই রকম আনন্দ আর উৎসাহ লাগেনি। কিছু দিন এটা নিয়ে আর ভাবিনি। কিন্তু ঘটনাক্রমে একদিন ছাত্র-ছাত্রিদের একটি বাসায় একটি পার্টিতে উপস্থিত হই যেখানে বেশ কিছু সমকামী ছেলেরাও ছিল। তারা আমাকে দেখেই বুঝে ফেললো আমি খুব সম্ভবত তাদেরই একজন – অথচ আমি তার কিছুই জানতাম না। অনেক পরে জানলাম আমার কিছু হাস্যকর কথা তাদেরকে এই ব্যাপারে নিশ্চিত করে দিয়েছিল। আমার সেই কথাগুলো তারা এখনো মনে রেখেছে। আর সেই রাতেই এক সুদর্শন মার্কিনি ছেলের সাথে আমার হলো জীবনের প্রথম চুম্বনের অভিজ্ঞতা। এর আগে কিছু মেয়ের সাথেও তা হয়েছিল। কিন্তু সেই রাতের অনুভুতির তুলনায় সেগুলো ছিল একেবারেই যান্ত্রিক। বুঝিওনি যে আসল চুম্বন কখনোই যান্ত্রিক হয় না। তা হয় শরীর ও মনের পুলকিত ডানা মেলে দিয়ে, যৌন অনুভুতির মধুর সুরে।
সেই অভিজ্ঞতার কথা এখনো ভুলিনি। ছেলেটার সাথে বন্ধুত্ব থেকে যায় কিন্তু আমার মাথায় পড়া বাজ সামলানোর শক্তি আমার ছিল না। এটা কী হলো? আমি এত দিন যা জানতাম তার সবই তো উলটে পড়ে এলোমেলো হয়ে গেল। নিজে ছেলে হয়ে আরেকটা ছেলের সাথেকার অন্তরঙ্গ মুহূর্তটা এত জীবন্ত ও পরিপূর্ণ মনে হলো কেন? আগে দুই একটা মেয়েদের সাথে একই ধরণের সময়গুলো এত সুন্দর তো ছিল না? বরং পরে বিরক্তই লেগেছে। আমি কি তাহলে তাই? বিলেতের আবাসিক বিদ্যালয়ে সবাইকে “গে” বলে যে টিটকারি মারা হত, আমি কি তাদেরই একজন? এই কি আমার আসল রূপ? এ তো অসম্ভব! আমি তো একজন বাংলাদেশি, তার উপর মুসলমান। আমরা তো এসব হতে পারি না। বাংলাদেশের কোথাও তো এই ধরণের মানুষ নেই। আমার মতো আর আট-দশ জন বাঙ্গালী তো এই রকম হয় না। সবাই একদিন একটা মেয়েকে বিয়ে করে, কেউ কেউ আগেই তাদের সাথে প্রেম করে। এই তো শিখেছি। একদিন আমিও তো তাই করবো। বিয়ের বয়স হয় নি, তাই কোনো যৌন অভিজ্ঞতাও হয় নি। কিন্তু এটা আবার কী হলো?
আমি আগামী কয়েকটা মাস ভীষণ মানসিক যন্ত্রণায় ভুগতে লাগলাম। কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলাম না আমার এই পরিণতি। লেখাপড়ার চাপ আর এই চিন্তায় জীবন থেকে সুখ শান্তি সব চলে গেল। আমি কার কাছে আমার মনের কথা বলবো? আমি আমেরিকান ছেলে মেয়েদেরকে বলতে পারি। কিন্তু তারা কি আমার মনের ভেতরের দ্বন্দ্বটা বুঝবে? আমি বাংলাদেশি ছেলে। যতই ফটফট করে বিলেতি সুরে ইংরেজি বলে তাদের মন জয় করি, ভেতরে আমি কাঁনছি, বেদনায় ফেটে যাচ্ছি। তার প্রতিফলন দেখতে পারছিলাম যে আমি বিভিন্ন পার্টিতে অন্যদের তুলনায় অতিরিক্ত মদ ও বিয়ার জাতীয় জিনিষ সেবন করছি। সে আরেক ইতিহাস। রক্ষণশীল মনোভাব নিয়ে বড় হয়ে ১৮ বছর বয়সে যখন কিছু হারামি বন্ধুদের চাপে পড়ে প্রথমবারের মতো একটু এলকোহল মুখে দেই, দেখলাম কিছু পরে মন থেকে আমার সারা জীবনের গ্লানী কমতে লাগলো। কিছু দিন পর নিজ থেকেই আরেক পার্টিতে গিয়ে আরেকটু খেলাম। নিজের ভেতরের চাপা নানান ক্ষোভ ও আত্মবিশ্বাসহীণতা কেটে গিয়ে পেলাম এক নতুন মন ও চরিত্র। এখানে আমি সর্বশক্তিমান ও সব কিছু জানে যে, সেই মানুষটা।
জীবনের এক সময়ে যারা এলকোহলের নেশায় আক্রান্ত হয়ে যায়, তাদের অনেকের মুখ থেকেই এই ধরণের প্রথম অভিজ্ঞতার কথা শোনা যায়। তাদের জীবনে ছিল অনেক চাপা কষ্ট। কিন্তু মদের কোলে তারা পেয়েছিল শান্তি ও শক্তি। সকল প্রকার মদ জাতীয় বস্তু এবং সেটাকে ঘিরে সকল সামাজিকতা ও কর্ম আমার জীবনের পরবর্তি ২৫ বছরকে ঘিরে রাখে। মদ ছিল আমার নিত্য দিনের সঙ্গী। একে ছাড়া আর কোনো কিছু করা ছিল চিন্তার বাইরে। এক সময়ে মদ ছাড়া আমার জীবনে আর কিছুই ছিল না। আসলেই সব হারাতে বসেছিলাম। আজ আমি মদ মুক্ত হয়েছি “এলকোহলিকস এনোনিমাস”-এর সাহায্যে। এটা বিশ্বজুড়ে একটি খ্যাতনামা সমাজ সেবা প্রতিষ্ঠান। আজ লন্ডনে এদের কারণে আমি ফিরে পেয়েছি আমার নিজের সত্বাকে। নিজের স্বাভাবিক আত্মবিশ্বাস আর শক্তিকে। এগুলো অনুভব করতে এখন আর মদের আশ্রয় নিতে হয় না আমাকে।
তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই দিনগুলোতে মদ খেয়ে যে সদ্য আবিষ্কার করা যৌন প্রবৃত্তির কষ্ট ভুলে থাকার চেষ্টা করতাম, সেই বিষয়ে আমার এখন আর সন্দেহ নেই। পড়ালেখার ক্ষতি আমি এই অজুহাতে পার করে দেই। কিন্তু পাঠকদের কাছে আমার বিনীত সতর্কীকরণ। যারা দুঃখ কষ্টে বড় হয় এবং ভেতরে অনেক চাপা বেদনা লুকিয়ে রাখে, তারা মদ ও মাদকের প্রতি ঝুঁকে আসক্ত হয়ে যাবার বাড়তি ঝুঁকিটা রাখে। বাংলাদেশে অল্প বয়সী অনেকেই এখন বিভিন্ন উপায়ে মদ জাতীয় জিনিষ সেবন করে থাকে আর মুহূর্তের জন্য হলেও তাদের দৈনন্দিন জীবনটা ভুলে যায়। এটার মোহ বড়ই শক্তিশালী। সীমিত পরিমানে এলকোহল সেবন করলে তেমন বিপদের সম্ভাবনা নেই। কিন্ত লাগামছাড়া হয়ে যাওয়ার অভ্যাস হয়ে গেলেই কেউ না কেউ আসক্ত হয়ে বাকি জীবনের সকল স্বপ্ন ও সুখ বিসর্জন দিয়ে ফেলতে পারে।
যুক্ত্ররাষ্ট্রে ২২ বছর বয়সে আমার প্রথম প্রেমের সম্পর্ক হয় এক ছেলের সাথে যেটার মেয়াদ ছিল মাত্র দেড় মাস। দুই জনই ছিলাম এই বিষয়ে অনভিজ্ঞ, তাই কী জটিল অবস্থা।! কেউ কিছুই জানতাম না। খালি বুঝতাম যে একজনের প্রতি আরেক জনের প্রচুর আবেগ। কিন্তু আমাদের সামনে ছিল না কোনো রূপরেখা। কীভাবে এটা নিয়ে আগাতে হয়, কীভাবে শারীরিক আনন্দ দিতে ও নিতে হয় তাও না। মার্কিনি এই ছেলেটা পরে নিজেই অনেক বিভ্রান্ত হয়ে আমাকে বললো যে আমরা বন্ধু হলে ভালো হয়। মনের সেই দাগ এখনো কাটেনি। তবে বহু কান্নাকাটির পর তার স্নিগ্ধ হাসির কথা মনে করে আমিও মৃদু হাসতে শুরু করি। তার দুই তিন মাস পর সমকামীদের মানসিক সমর্থন ও আড্ডা খানায় আরেকটি বাচ্চা চেহারার মার্কিনি ছেলের সাথে প্রথমে বন্ধুত্ব, তারপর কিছু শারীরিক আনন্দ আর তারপর প্রেম। হ্যাঁ! অনেক সমকামীদের ক্ষেত্রেই প্রেম শারীরিক মিলনের পরে হয়, আমেরিকাতেও তাই, বর্তমানে বাংলাদেশেও তাই। অথচ সমাজ আমাদের শিখিয়েছে যে আগে প্রেম, তারপর বিয়ে, তারপর যৌনাচার। কী অবাস্তব ব্যাপার! বিয়ের পর যদি দেখি আমরা যৌনচারের ক্ষেত্রে একে অপরের জন্য শারীরিক ভাবে উপযুক্ত নই, তখন?
সেই সম্পর্কটা চললো ছয় মাস। নিজের যৌনতা আর সমকামী হয়ে আসল সত্বা উপভোগ বোধহয় জীবনে এই প্রথম করলাম। এটা ছিল বড়ই শান্তির আর নিজের জীবনের উপর আস্থা সৃষ্টিকারী। ছয় মাস পর তার কিছু ব্যক্তিগত সমস্যায় আমাকে আর জর্জরিত না করতে সেই সম্পর্কটা ভেঙ্গে দিল। আমি কেন যেন বেশি কষ্ট পেলাম না। আমাকে এত সুন্দর করে বুঝিয়ে দিয়েছিল যে তার উপর কোনো ক্ষোভ জমা রাখতে পারিনি। তার কিছু পর আমার চেয়ে বয়সে বড় আর লম্বা এক মার্কিনি ভদ্রলোক আমাকে অনেক কষ্টে পটিয়ে ফেললো। আমার মধ্যে কী দেখেছিল সেই জানে। তার সাথে তিন মাস খুব আনন্দে কাটলো। আমি তখন তার আদরের পুতুল যা নিয়ে সে খুব গর্ব করতো সবার সামনে। কিন্তু হায়! আমার তো এমন কাওকে তেমন পছন্দ না যে আমার চেয়ে বড় এবং লম্বা। এটা বোঝার পর আমি কিছুতেই এই সম্পর্ক মেনে নিতে পারছিলাম না। মনে কোথায় যেন একটা খুঁতখুঁতে ভাব লেগেই থাকতো। তাই আমি নিজের কাছে সততা বজায় রেখে তার সাথে সম্পর্কটা ছিন্ন করে ফেললাম।
তারপর নিজের এক ঘনিষ্ট বন্ধু যার সাথে আমি এক বছর একটা কামরা ভাগ করেছিলাম, এরকম একজনের প্রেমে আমি মশগুল হয়ে পড়ি। কিন্তু এই অনুরাগ কোনো দিন ফেরত আসেনি। আমাকে সে সেই ভাবে দেখতো না। কিন্তু আমি তার মতো হতে শুরু করলাম। তার মতো করে কথা বলতে লাগলাম, তাকে অনুসরণ করতে লাগলাম। ব্যাপারটা একটা অস্বাভাবিকতায় পরিণত হয়ে গিয়েছিল। আর তখনই এলকোহল আমাকে আরো বেশি গ্রাস করে ফেলে। আমি নিজেকে হারিয়ে ফেলি। ভুলে যাই আমি কে। আমার ঘনিষ্ট বন্ধুরা আমাকে দেখে ভয় পেয়ে যায়। তারা বুঝে উঠতে পারেনি আমি এই ছেলের মাঝে কী এমন দেখলাম। আর সে যখন অন্য ছেলেদের সাথে শয্যাইত হত বা সম্পর্ক করতো, আমি মনের ভেতর মরে গিয়ে একাকার হয়ে যেতাম। এই বিষ হজম করার ক্ষমতা আমার ছিলা না।
এক বছর পর এই অবস্থার অবসান হওয়ার পরপরই এক বন্ধুর বাসায় দেখা পেলাম এক সুদর্শন মার্কিনি যুবকের যে আমাকে বেশ পছন্দ করে ফেললো। আমিও তার প্রতি কিছুটা আকৃষ্ট হয়ে গেলাম তার সুন্দর বচন আর রূপ দেখে। এখানে বলে রাখি যে মদ জাতীয় জিনিষ এই ধরণের সব পরিবেশেই উপস্থিত ছিল এবং বিভিন্ন সমকামীদের বিভিন্ন অভিজ্ঞতা শুরু হত এবং এখনো হয় কিছুটা মদ সেবন করার পর। সেই রাতে আমি তার বাসায় উপস্থিত। পর দিন সকাল বেলা শুরু হলো ছয় বছর ব্যাপী এক অভিযাত্রা যেটাকে আমি বলবো আমার এখন পর্যন্ত সব চেয়ে লম্বা, জটিল আর আমার উপর সবচেয়ে প্রভাব ফেলা একটি সম্পর্ক। আমরা প্রায় ছয় বছর একত্রে বাস করি একটি যুগল হিসেবে। সাথে ছিল তার বিড়াল যেটাকে আমিও ভালোবেসে ফেলি। সেই সম্পর্কে আমি তার কাছ থেকে শিখতে পারি পশ্চিমা উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত, ফরাসী খাবার (যা ছিল তার প্রিয়), কিছু দার্শনিক চিন্তাভাবনা আর সাথে সাথে কিছু নাস্তিকতার ধারণা যা আমি তখন একেবারেই পছন্দ করতাম না। আর আমার কাছ থেকে সে শিখে বাংলাদেশ সম্বন্ধে, তার ছোট গন্ডির বাইরের দুনিয়ার সম্বন্ধে। একে অন্যকে অনেক কিছু শিখিয়ে আর নিজেও শিখে আমাদের মধ্যে ছিল এক সুন্দর আধ্যাতিক সম্পর্ক।
হ্যাঁ, শারীরিকভাবে আমার চাহিদা যেটা চাইতো, সে সেটার অনেকখানিই ছিল। তাই আমাদের সম্পর্কে সেখানেও ছিল এক যাদু। কিন্তু এখানে দূরের কিছু কালো মেঘ ছিল যা আমি আগে টের পাইনি। সে ছিল মদের প্রতি আসক্ত। এই আসক্তিতে সে ছিল জর্জরিত এবং কোনো এক ক্ষোভ বা কষ্ট তার ভেতরে চাপা ছিল যা আমি আজও সঠিকভাবে উদঘাটন করতে পারিনি। ক্রমে ক্রমে তার এই আসক্তি আমাদের সম্পর্কটাকে বিষাক্ত করে ফেলে এবং আমিও দেখলাম যে জীবনে প্রথমবারের মতো আমিও প্রতিটি দিন অল্প করে হলেও এলকোহল সেবন করছি। এর আগে কখনই এটা দৈনন্দিনের ব্যাপার ছিল না। প্রিয় পাঠকদের উদ্দেশ্য করে বলছি যে প্রতিদিন মদ সেবন করা হচ্ছে বিপদ সংকেত।
ছেলেটার সাথে সম্পর্ক শুরু হওয়ার প্রথম দিনগুলোর দিকে আমি মিশিগান অঙ্গরাষ্ট্রের অনেক বাংলাদেশিদের সাথে পরিচিত হই এবং তাদের বিভিন্ন সাংষ্কৃতিক অনুষ্ঠানে আমার ডাক পড়তো। ছোট বেলার সেই গানের গলা তখন ভালোই ছিল এবং তাদের অনেকের সাথে আমার হয়ে যায় ঘনিষ্টতা। কিন্তু সেই সব অনুষ্ঠানের পর আমি ফিরে আসতাম আমার মানুষটার কাছে যার কথা আমি বাংলাদেশিদেরকে বলতে পারতাম না। এই চাপা কষ্ট আমাকে আস্তে আস্তে গ্রাস করে ফেলে। আমাকে তারা একটা বাংলাদেশি সমিতির প্রশাসক হতে বলেছিল যা আমি গ্রহণ করিনি নানান অজুহাতে। সেই সম্পর্কে থাকা কালীন আমি এটাও খেয়াল করলাম যে আমার বাবা-মা ও বোনদের সাথে আমার হয়ে গিয়েছে এক বিরাট দূরত্ব। তারা ততদিনে ফিনল্যান্ড ছেড়ে যুক্তরাজ্যের উত্তর আয়ারল্যান্ডে এসে পাড়ি জমিয়েছে। আমার মনের ভেতর কামড়াতে থাকলো যে আমি আমার যেই যৌনপ্রবৃত্তি আর সম্পর্কের কথা এত দিন তাদের কাছ থেকে লুকিয়ে রেখেছি, তা মুখ ফুটে বলার সময় হয়ে এসেছে। আমার বয়স তখন ২৭। প্রতিটি সমকামীর জীবনে এই মুহুর্তটা আসে মরুভূমির এক ঘন বালুঝড়ের মতো।
কেউ হয়তো ভাববেন এগুলো বলার দরকার কি? যেমন আছে তেমন থাকলে ক্ষতি কিসের? ক্ষতি অনেকগুলো। প্রথমত, ততদিনে আমি আমার যৌনতা নিয়ে বিভক্তি কাটিয়ে উঠে একটি আস্থা সম্পন্ন ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছি। এটা অন্তত আমার মার্কিন সমাজের চোখে। কর্মক্ষেত্র ও বন্ধু-বান্ধবদের কাছে আমি ছিলাম একজন আত্মসন্মান বিশিষ্ট সমকামী ব্যক্তি। একই সঙ্গে আমার ছিল একটি ছেলের সাথে দীর্ঘ সম্পর্ক। সমস্যাটা দেখা দিল সেখানকার বাংলাদেশিদের নিয়ে, আমার বাবা-মাকে নিয়ে ও বাংলাদেশে আমার কোনো ভবিষ্যত নিয়ে। নিজের দেশের সাথে আমার হয়তো কোনো দিন আর সম্পর্ক থাকবে না। কিন্তু নিজের বাবা-মা সাগরের ঐ পাশেই থাকেন এবং তাদের কাছে এত বড় মিথ্যা নিয়ে আর বেঁচে থাকতে পারছিলাম না। আমার এই গোপনীয়তার জন্য তাদেরকে দূরে ঠেলে দিচ্ছি, এই অপরাধবোধ আমাকে শেষ করে ফেলছিল। এরপর হয়তো ভাববেন বাবা-মা যদি এত কিছু জানার পর আমাকে ত্যাজ্য করে দেয়? হ্যাঁ, সেই ভয় আমার যথেষ্ট ছিল এবং কিছুতেই নিজেকে প্রস্তুত করতে পারছিলাম না এই ভয়াবহ কাজটা করতে। কিন্তু এটা যে সম্পন্ন করতে হবে সেই ব্যাপারে আমি ছিলাম নিশ্চিত, এর পরিণাম যাই হোক না কেন। আমি কী, তা তাদেরকে জানতেই হবে। কারণ তারা আমার পিতা-মাতা।
এই ভয়াবহ কাজটা করলাম একটি লম্বা চিঠি লিখে ও তারা সেই চিঠি পেয়ে পড়ার সময়ে তাদেরকে ফোন করে। সে কী বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতা। আমি মদের ঘোরেই কেঁদে কেঁদে কথা বলেছি। তাদেরও কান্নার আওয়াজ ভেসে আসলো ওই পার থেকে। জানলাম যে তারা আমার এই ব্যাপারটা জানতেন। নিজেদের মধ্যেই আলাপ করে তারা এই ব্যাপারে নিশ্চিত হয়েছেন অনেক দিন আগে। কিন্তু তারা সেটা আমাকে জানতে দেননি আর আমার বোনদেরক বলে দিয়েছিলেন আমাকে বলতে যে আমি যেন কথাটা মুখ ফুটে তাদেরকে কোনো দিন না বলি। তারা আমার কাছ থেকে কথাটা শুনতে চাননি। আমি বোনদেরকে আমার কথা আগেই বলেছিলাম। আমার বোনরা আবার আমাকে কখনো বলেনি যে বাবা-মা জানেন এবং তাদেরকে আমার এটা বলা নিষেধ। কিন্তু মা আমাকে তখন ঠিকই বলে ফেললো যে তাদেরকে বলে আমি হয়তো কাজটা ঠিকই করেছি।
সেই থেকে শুরু হলো আরেকটা লম্বা যাত্রা যেখানে আস্তে আস্তে আমার পিতা-মাতা আমার জীবনে আবার ফিরে এলো দূর থেকে হলেও। আস্তে আস্তে সব মিথ্যা কেটে যেতে আরম্ভ করলো। এখন আমাকে নিয়ে তাদের কাছে আর কোনো রহস্য নেই। তাদেরকে নিয়ে আমার মাঝেও নেই কোনো রহস্য। আমার মার্কিনি পারিক যে কেবল বন্ধু নয়, সেটা বলতে আর ভয় লাগলো না। আর একটা অদ্ভুত অনুভূতি টের পেলাম কিছু দিনের মধ্যেই। আমি এত দিন ছিলাম একটি বিভক্ত মানুষ। বাইরের দিক থেকে আমি ছিলাম মার্কিনি হতে চায় এমন একজন সমকামী পুরুষ। আর ভেতরে ছিলাম একজন বাঙ্গালী যে তখনও নিজেকে মুসলমান ভাবতো (শুধু নামে, কর্মে নয়)। এবং কিছুতেই এই দুই মানুষের মিলন কোনো দিন হবে বলে আমার ধারণা ছিল না। এইভাবে বিভক্তির ভেতর দিয়েই বুঝি বাকিটা দিন কাটিয়ে দিতে হবে। কিন্তু না! বাবা-মার কাছে এই কঠিন কাজটা করে ফেলার পর মনে হলো কাঁধ থেকে বিরাট একটা বোঝা উঠে গেল আর আমার সেই দুইটা মানুষ আবার এক হয়ে বলতে লাগলো আমি একজন বাংলাদেশী সমকামী।
বাবা-মা’র মন নরম ও স্বাভাবিক হতে আরো অনেক বছর লেগে যায় কিন্তু সেটা ক্রমান্বয়ে হয়েছে তার নিজের গতিতে। ছেলের এই জীবন আপাত দৃষ্টিতে মেনে নেয়া আর সেটার মর্ম সত্যিকারভাবে অনুধাবণ করে গ্রহণ করে নেয়ার মধ্যে আকাশ পাতাল তফাৎ। তাদের দোষ দেই কীভাবে? তাদের কি ছিল অন্য বাবা-মাদের সাথে কথা বলে এই ব্যাপারটা বুঝে নিতে, সহায়তা পেতে? তাদের কি ছিল একটি অনুকূল পরিবেশ যেখানে অনেক বাবা-মা’দের সন্তানরাই প্রকাশ্যে সমকামী? এখন ভাবলে বিশ্বাসও হয় না যে ১৯৯০ দশকে তখনো পশ্চিমা দুনিয়া ছিল যথেষ্ট ভিন্ন। আমি যেমন আমার ছাত্র পরিবেশে পেয়েছি অঢেল সমর্থন, তারা পেয়েছেন শুন্য। হয়তো তারা অসহায়ও বোধ করেছেন এই ব্যাপারে। কিন্তু আজ তারা সব মেনে নিয়েছেন আমাকে সময়ের সাথে আরো ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করে ও আমাকে আবার নতুন করে জানতে পেরে। আর আমিও সেই সাথে তাদের প্রতি আমার ছোট বেলার ক্ষোভের কথা প্রায় ভুলে গিয়েছি। আমি এখানে ভাগ্যবান কারণ আমার বাবা-মা কিছুটা শিক্ষিত এবং তারা পশ্চিমা দুনিয়াতে অনেক দিন ধরে বাস করছেন। কিন্তু আমার মতো কি আরো বাংলাদেশি আছে যাদের কপাল এতটা ভালো নয়?
সেই থেকেই আমার এক নতুন উদ্দীপনা এলো আমার মতো বাংলাদেশি সমকামীদের খুঁজে বের করে তাদের সাথে যোগাযোগ করতে। বাংলাদেশে আন্তর্জাল এসেছে তখন বেশি দিন হয়নি। কিন্তু সেই নেটে তত দিনে ইয়াহু গ্রুপ হয়ে গিয়েছে বাংলাদেশি সমকামীদের ঘিরে। আমি হতভম্ভ যে আমার মতো আরো কিছু ছেলেপেলে আছে যারা বাংলাদেশে বসেই একজন আরেকজনের সাথে কথা বলছে, আত্মপ্রকাশ করছে, নিজের আনন্দের কথা বলছে, দুঃখের কথা বলছে আর যৌন অভিজ্ঞতার জন্য একজন আরেকজনের সাথে দেখা করতে চাচ্ছে। আমি পেলাম নতুন এক অনলাইন জীবন। আমি ভেবে বসেছিলাম যে সারা দুনিয়ায় আমিই বুঝি এক মাত্র বাংলাদেশি সমকামী ছেলে। নিজের দেশের সাথে সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যাবে, এই কষ্টেই আমি এত দিন মরছিলাম অথচ অনলাইনে আবার দেশের সাথে যোগাযোগ শুরু হলো। বাংলাদেশের অনেকগুলো দৈনিক পত্রিকাগুলোর আন্তর্জাল সংষ্করণও তত দিনে বের হয়ে গিয়েছে। কাজেই ২০০১-২০০৬ সালের মধ্যে বিএনপি-জামাত শাসনামলে বাংলাদেশ কীভাবে একটি জঘন্য দূর্নীতিবাজ আর সন্ত্রাসবাজ রাষ্ট্রে পরিণত হয়ে গিয়েছিল তা আমার ছোট মার্কিনি শহরে বসে ও ২০০৩ সালের মার্চ মাস থেকে লন্ডনে বসে পরোক্ষভাবে দেখেছি।
২০০১ সালের সেপ্টেম্বর মাসের ১১ তারিখে যুক্তরাষ্ট্রের উপর এলো এক অনাকাঙ্খিত, অপ্রত্যাশিত ও জগন্য আক্রমণ। আরব জঙ্গিরা বিমানে চড়ে নিউইয়র্ক শহরের দুইটি সব চেয়ে উঁচু দালান, রাজধানী ওয়াশিংটনে একটি দালান ইত্যাদিতে আত্মঘাতীভাবে বিমান প্রবেশ করিয়ে সেই দালানগুলো ধ্বংস করে প্রায় চার হাজারের মতো লোক নিহত করলো। আমেরিকায় সেই সকাল নয়টার দিকে আমি কী করছিলাম তা আমার এখনো মনে আছে। আগ রাতে পারিকের সাথে সামান্য কথা কাটাকাটি হওয়াতে সেই সকালে কিছুটা মেজাজ নিয়েই অফিসে যাচ্ছিলাম। যাওয়ার আগেই হঠাৎ টিভিতে দেখলাম এক ভয়াবহ দৃশ্য। তারপর একটা মাস ছিল একটা ঘোরের আমেজে। বিশ্বাস হচ্ছিল না যে দুনিয়াটা কী রকম উলটা পালটা হয়ে গেলো। খবর আসতে লাগলো যে কিছু আরবরা এই কাজ সাধন করলো আর আফগানিস্তান থেকে ওসামা বিন লাদেন এটার দায় স্বীকার করে নিল। বাংলাদেশে আমারই এক ঘনিষ্ট আত্মীয় আমাকে ফোন করে আমার কুশলাদি জেনে নেয়ার সাথে সাথেই বলে উঠলোঃ “আমরা খুব খুশী হয়েছি”। বাংলাদেশ সহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মুসলমানদের কন্ঠে (অনলাইনে এবং টিভিতে) প্রথমে শোনা গেল তাদের পুলকিত হবার কথা, পরে শোনা গেল তাদের পেচানো নিন্দা করার কথা কিন্তু তার সাথে আমেরিকার এটা সেটা দোষের বৃত্তান্ত।
আমার দুইটা দুনিয়া – আমার পশ্চিমা মার্কিনি দুনিয়া আর বাংলাদেশি মুসলমান সত্বা – যেন একটা আরেকটার উপর হুমরি খেয়ে পড়লো। এই টক্করটা আমার মনের ভেতর এক ধ্বংসাত্বক বিস্ফোরণ তৈরি করলো। আমার ধর্মের মানুষরা এই কাজ করতে পারে? মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি যতই ঘোলাটে হোক, এই নিরীহ মানুষগুলোর কী দোষ ছিল? আগের রাতে মদ সেবন করে পরের দিন সকালে আল্লাহু আকবর বলে এই জানোয়ারগুলো এই ভাবে কোন ধর্মের নামে এই কাজটি সাধন করতে পারলো? আমি ভালোভাবেই জানি যে অনেক মুসলমানরা এখনো এটা বিশ্বাস করতে চায় না যে মুসলমানরা এই কাজ করতে পারে। তাই তারা গুজব ছড়িয়েছে যে ইহুদীরাই এই কাজ করেছে যাতে আমেরিকানরা পরে মুসলমান দেশ আক্রমণ করে। এই যুক্তিটা যতটাই না হাস্যকর, তার চেয়ে বেশি রাগ সৃষ্টিকারী।
দীর্ঘ নয় বছর পর সেই ডিসেম্বরেই আমি দেশে বেড়াতে আসি বাবা-মা ও বোনদের সাথে। তখন আমার নিকট আত্মীয় স্বজনদের টুইন টাওয়ার ধ্বংস হওয়ার আনন্দ উচ্ছাস দেখে ও আগের তুলনায় তাদের বাড়তি মুসলমানগিরি দেখে ঘৃণায় আমার চোখ বের হয়ে গিয়েছিল। ইসলাম ধর্মকে রক্ষা করার দায়িত্ব হঠাৎ করে এসে পড়লো আগে শাড়ি আর চুলের স্টাইল নিয়ে থাকা আমার অনেক মহিলা আত্মীয়দের উপর যারা এখন আরবদের ঝুলে থাকা কাপড় পরে আর মাথায় হিজাব টেনে নিজেদের বিশ্বাসকে বাঁচাতে শুরু করলো। তারপর আমেরিকায় আমার সেই ছোট শহরে ফিরে এসে আমি উপলব্ধি করলাম যে আমি বাংলাদেশি ঠিকই কিন্তু মুসলমান হতে পারি না। এই ধর্মের লোক যদি এমন জানোয়ারসুলভ হয়, তো সেই ধর্মেই আমার থাকার কোনো প্রয়োজন নেই। ধিক্কার দিলাম আমি এই ধর্মকে আর এই ধর্মের ধর্মালম্বীদেরকে।
আমার সমকামিতার জন্য আমার ধর্মের ভিত্তি দূর্বল হয়ে যাচ্ছিল অনেক আগে থেকেই। কিন্তু এই ঘটনার পর ভিত্তির যতটুকু বাকি ছিল তা নিঃশেষ হয়ে গেল। আমার আর দরকার ছিল না নিজেকে মুসলমান বলার আর এটার সাথে আমার কোনো পরিচয়কে স্বীকার করার। সময়ের সাথে সাথে জানতে পারলাম যে কোরআন ও হাদিসেই আছে বিভিন্ন আয়াত ও উক্তি যা আল-কায়দা থেকে শুরু করে বর্তমান যুগে মধ্যপ্রাচ্যের ইসলামিক স্টেট (আই এস) পর্যন্ত ব্যবহার করে তাদের কর্মকান্ডের যৌক্তিকতা প্রকাশ করতে পারে। হ্যাঁ, আলেমরা বলেন যে সেগুলোর যথাযথ ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা রয়েছে। কিন্তু আমি বলবো যে যার যার ব্যাখ্যা তার তার কাছে। তাই বাংলাদেশে সবাই আরবিতেই কোরআন শরীফ উচ্চারণ করতে শিখে। বাংলা বা ইংরেজিতে কোরআন ও হাদিস পড়ে পাছে কিছু মানুষ না আবার নাস্তিক না হয়ে যায়, সেই ভয়ে সেটার দিকে আর কোনো জোর দেয়া হয় না। ভাগ্যক্রমে ফেসবুক আর ব্লগের যুগে বাংলাদেশে নাস্তিকতার লক্ষণ ক্রমশই বাড়ছে।
টুইন টাওয়ার ধ্বসে পরার পর মার্কিনিরা অনেক ধৈর্য আর সহিষ্ণুতার পরিচয় দেখিয়েছিল। সমগ্র দেশ জুড়ে মুসলমানদের উপর ঢালাওভাবে আক্রমণের কোনো খবর পাওয়া যায়নি এবং গণমাধ্যম সহ সবখানেই ছিল সহিষ্ণুতার ডাক। অধিকাংশ মার্কিনিরাই তাতে ভালোভাবে সারা দিয়েছিল। তবে দুই একটা খবর পাওয়া যায় যার মধ্যে একটা ছিল যেখানে মুসলমান ভেবে একজন শিখ মানুষকে কিছু বদমাশদের আক্রমণ করার ঘটনা। আমি ভেবে মরি যে বাংলাদেশে কিছু বিদেশি খ্রিস্টানরা ঢাকায় একটা দালান উড়িয়ে দিলে দেশের সবাই সব কয়টা দেশি খ্রিস্টানদের ধরে কি মেরে ফেলতো না? অথচ ৯/১১ ঘটনার পর বাংলাদেশি সমকামীদের ইয়াহু গ্রুপে চেনা কিছু আবালরা আমাকে জিজ্ঞেষ করার ধৃষ্টতা দেখিয়েছে যে আমেরিকায় মুসলমানদের এখন কী অবস্থা! আমেরিকানদের কী অবস্থা সেটা জানার তাদের কোনো ইচ্ছা ছিল না। যারা এরপর আফগানিস্তান এবং ইরাকে জর্জ বুশের আক্রমণের নিন্দা জানিয়েছে, তাদের নিন্দা গ্রহণযোগ্য। কিন্তু তাদের এটা ভুলে যাওয়া উচিৎ না কোন ঘটনাটা আগে ঘটে গিয়েছিল।
আমার ছয় বছরের সম্পর্কটা আমার পারিকের, সাথে আমারও কিছুটা মদের আসক্তিতে এতটাই অসহনীয় হয়ে উঠেছিল যে সম্পর্কটাকে আর টিকিয়ে রাখা আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। তার সাথে থেকে আমি হয়ে গিয়েছিলাম অসুখী। তার সবকিছু দেখতে দেখতে নিজেকেই হারিয়ে ফেলেছিলাম। ভুলে গিয়েছিলাম যে আমারও বিভিন্ন ইচ্ছা আছে, শখ আছে, আনন্দ আছে। আমার জীবনের সব চেয়ে কঠিন কাজ যেগুলো করতে হয়েছে তার মধ্যে আমার পারিকের সাথে ছয় বছরের যুগলের সম্পর্কটা শেষ করে দেয়াটা ছিল সেগুলোর মধ্যে অন্যতম। আর এই দিকে টুইন টাওয়ারের ঘটনার পর আমেরিকায় অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের উপর আসে মারাত্বক ক্ষতির হুমকি। আমি যেই অফিসে চাকরি করতাম তারা আমার মার্কিন স্থায়ী বাসিন্দার কাগজপত্র তৈরি করছিল ঠিকই কিন্তু এই প্রক্রিয়া যেহেতু অনেক দীর্ঘমেয়াদী, আমি সেই প্রক্রিয়ার চুরান্ত পর্যায়ে তখনও পৌছাতে পারিনি। আর সেই মুহুর্তে প্রতিষ্ঠানটি হয়ে যায় দেউলিয়া। এতে সেই দেশে আমার থাকা ও কাজের অনুমতি বাতিল হয়ে যায়। আমার জানা মতে অনেক বিদেশি পেশাজীবীদের এই সমস্যার সন্মুখিন হতে হয়। আমার এক বন্ধু নিউয়র্ক শহরে থাকতো এবং আমার কথা শুনে আমাকে আমন্ত্রণ করলো আমি যেন মিশিগান ছেড়ে দিয়ে তার এখানে চলে এসে আবার নতুন করে শুরু করার চেষ্টা করি।
আমার প্রাক্তন পারিক ও আমাদের গোছানো সংসার ছেড়ে দিয়ে নিউইউর্কে চলে আসার বেদনাটা ভোলার নয়। এ ছিল একটা পরাজয়ের মুহুর্ত। ছয় বছর এই সম্পর্কটাকে দিয়েছি নিজের সর্বস্ব শক্তি ও মন। সেটাকে বাঁচাতে পারলাম না, সেখানে থাকতেও পারলাম না। সে এখন আমার পারিক আর না থাকলেও, যেই মানুষটাকে এত দিন ভালোবেসেছি সেই মানুষটার প্রতি মায়া মহব্বত তো থেকেই যায়। তাকে আর আমার সেই ছোট্ট শহরকে সেই যে ফেলে এসেছি, আজ অবধি আর ফিরে যাইনি। নিউইউর্কে এসে দেখলাম যে সেই শহরে এত কিছু ধ্বংসের পর সেখানে সফটওয়ার প্রকৌশলীর কাজ একেবারেই নেই। অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গিয়েছে বা যেগুলো আছে সেখানে একটা চাকরির জন্য হাজারটা আবেদন। আর ৯/১১ ঘটনার পর মার্কিনি মানুষরা অনেক উদার মন দেখাতে পারলেও জর্জ বুশের প্রশাসন সেটা দেখাতে পারেনি। বুশ ঘোষণা দিল যে একটা সীমিত সময়ের মধ্যে ২৫টা মুসলমান প্রধান দেশগুলোর সকল বিদেশি নাগরিকদেরকে নির্ধারিত অফিসে হাজিরা দিয়ে তাদেরকে সেই দেশে থাকার কাগজপত্র দেখাতে হবে, আর তা না করলে ভবিষ্যতের জন্য তারা কালো তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে এবং পরে নতুনভাবে কোনো ভিসা থেকে বঞ্চিত হবে, গ্রেফতারকৃত হবে ও দেশ থেকে বহিষ্কার হয়ে যাবে।
আমি তখন পড়লাম দোটানায়। আমি হাজিরা দিলে আমার তখনকার বর্তমান অবস্থা তারা জেনে ফেলবে যে আমি মিশিগানে আমার চাকরি হারিয়ে তখন সেই দেশে থাকার অনুমতি হারিয়ে ফেলেছি। আর হাজিরা না দিলে ভবিষ্যতে আবারও চাকরি পেয়ে নতুন করে কাজের ভিসা বা স্থায়ী বাসিন্দার জন্য আবেদন করলে তারা দেখবে যে আমি আগে একটা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে হাজিরা দেইনি। তখন সাথে সাথেই গ্রেফতার করে বহিষ্কার। অন্ততঃ এই ভয়টাই প্রশাসন দেখিয়েছে এবং আশেপাশের অনেকেই একমত ছিল যে এখান থেকে আর বের হবার উপায় নেই (কোনো মেয়েকে ভুয়া ভিত্তিতে বিয়ে করে সেই দেশে থাকা ছাড়া, যা আমি কোনো দিনও করতে পারতাম না)। এই পরিস্থিতিতে আমাকে হার মেনে নিতে হলো যে আমার আমেরিকান স্বপ্ন হয়তো আর কোনো দিন বাস্তবায়ন হবে না। যেই দেশ আমাকে এত কিছু শেখালো, আত্মমর্যাদা দিল, নিজের মতো করে ভালোবাসতে দিল, উচ্চ লেখাপড়া শেখালো, চাকরি দিল, সেই দেশ ও দেশের মায়া ত্যাগ করে আজ আমাকে চলে যেতে হবে আরেক জায়গায়। এটা ছিল আরেক পরাজয় ও সবচেয়ে কঠিন কাজ যেগুলো করেছি তার আরেকটা।
আমি তার কিছু আগে থেকেই জেনেছি যে ততকালীন বিলেতি প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের আমলে যুক্তরাজ্যের কিছু নিয়মনীতি শিথিল করায় সেই দেশে অনেক পেশাজীবীদের নতুন করে ঢোকার প্রবেশপথ তৈরি হয়েছে বা হতে যাচ্ছে। এদিকে আমি আমার বাবা-মা ও বোনদের ফেলে অনেক দিন আমেরিকায় পড়ে আছি। তাদের কাছে বাকি জীবনের জন্য ফিরে যাওয়ার এটাও ছিল একটা ভালো অজুহাত। আমি নানান কৌশলে সীমিত সময়ের জন্য বিলেতি কাজের ভিসা পেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মায়া ত্যাগ করি এবং লন্ডনে নতুন জীবন শুরু করি। সময়ের সাথে সাথে সফটওয়ার প্রকৌশলী হিসেবে একটা চাকরিও পেয়ে যাই, যাদের মাধ্যমে এখন পেয়েছি এই দেশে স্থায়ী বাসিন্দার কাগজপত্র এবং তারপর নাগরিত্ব। আজ আমি বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্যের দ্বৈত নাগরিক।
এই ধকলগুলো সহ্য করেছি মনের শক্তি দিয়ে কিন্তু মদের আশ্রয় নিয়ে। লন্ডনের সমকামীদের সমস্ত বার ও ক্লাবে ছিল আমার অজস্র আসা যাওয়া এবং বেশ কিছু বছর আমি সেই মোহে নিজেকে হারিয়ে ফেলি। এখানকার সমকামী ইংরেজদের অমায়ীক ব্যবহার আমাকে আস্তে আস্তে এই দেশটার প্রতি আমার আগের ঘৃণা মুছে ফেলতে সাহায্য করে। আমি ইংরেজদের মাঝে দেখি আরেকটা রূপ যা আমাকে করে মুগ্ধ। আমি আমেরিকায় থাকার সময়ে এই দেশটার অনেক পরিবর্তন আসে। সেই পরিবর্তনটা সবচেয়ে বেশি লক্ষণীয় ছিল লন্ডনে। এখানে প্রকাশ্যে বর্ণবাদ আচরণ এখন আর একেবারে নেই বললেই চলে। সমাজেও এসেছে সমকামীদের প্রতি সহিষ্ণুতা ও শ্রদ্ধা।
সম্প্রতি একটা সময় এসেছিল যখন আমার এখানকার সবচেয়ে ঘনিষ্ট বন্ধুরাই ছিল অন্যান্য ইংরেজ সমকামী ছেলেরা। আমেরিকায় আমার সেই দীর্ঘ সম্পর্কটার পর আমার আর কোনো সম্পর্কে যাওয়ার ইচ্ছা হয়নি। বন্ধনহীন আনন্দেই দিনগুলো পার করেছি। কারো সাথে অন্তরঙ্গ মিলন যে হয়নি তা নয়। অবশ্যই হয়েছে। কারো প্রেমে যে পরিনি সেটাও আবার নয়। কিন্তু যাদের প্রেমে পড়েছি তারা সেই প্রেম পালটা নিবেদন করেনি আর যারা আমাকে চেয়েছে, তাদেরকে আমি চাইনি। এই হচ্ছে সমকামীদের এক বিরাট বাস্তবতা। বয়সের সাথে সাথে এর প্রভাব আরো বেশি করে লক্ষ্য করলাম। বিরাট এই শহরে ইংরেজ ছাড়াও বহু দেশের বহু সমকামী ছেলে এখানে বন্ধনহীন আনন্দে লিপ্ত। কেউ কেউ সম্পর্কে যায়, তাও আবার খনিক কিছু দিন বা মাসের জন্য। কখন কোথায় আবার নতুন কারো দেখা মেলে, সবাই থাকে সেই ধান্দায়।
কিছু সময় পর দেখলাম বাংলাদেশ থেকে আগত হয়েছে কিছু নতুন সমকামী ছেলেরা যাদের সাথে বন্ধুত্ব আমাকে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করে দেয়। মনে আছে যে আমি এক সময়ে ভেবেছিলাম যে আমি বুঝি একমাত্র বাংলাদেশি সমকামী? সেই ভুল ভাঙলো আরো সুন্দরভাবে এবং একজন বাংলাদেশি সমকামী হিসেবে আমি আরো গর্ব অনুভব করলাম। এদিকে লন্ডনে আসার পর থেকেই আমি প্রায় প্রতিটা বছর এখানকার বাৎসরিক সমকামীদের পদযাত্রা বা “প্রাইড”-এ অংশ করি কখনো বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে, কখনো সেচ্ছাসেবকদের একজন হয়ে। এতে আমার মাঝে গড়ে ওঠে নিজের দেশের সমকামীদের প্রতি আমার একটা গভীর দায়িত্ববোধ। এই দেশ ও পশ্চিমা অনেক দেশগুলোতে দেখলাম সমকামীদের বিরুদ্ধ সকল আইন প্রত্যাহার ও তাদের বিবাহের অনুমোদন। যুগান্তকারী এই পদক্ষেপগুলো এই সব দেশে বাস করা সকল যৌন সংখ্যালঘুদের জন্য ছিল আশাতীত। কিন্তু বাংলাদেশের যৌন সংখ্যালঘুরা আজ কেমন আছে? তারা কি এই সব স্বপ্ন ভুলেও কখনো দেখতে পারে?
বিলেতের প্রতি আমার নতুন শ্রদ্ধা আর ভক্তি ভেঙ্গে গেল দুই বছর আগের মাঝামাঝি এই দেশ ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছেড়ে দিবে কি না সেই গণভোটের ফলাফলের কারণে। ৫১% মানুষ ই-ইউ ছেড়ে দেবার পক্ষে ভোট দেয় আর ৪৯% থাকার পক্ষে। এরকম একটা গণভোট এই দেশের বিভক্ত মানসিকতাকে ফুটিয়ে তোলে যা ছিল বেশ পীরাদায়ক। ৪৯% মানুষ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গঠিত এই গোত্রের কারণে পশ্চিমা ইউরোপে যেই শান্তি, ভাতৃত্ববোধ আর সমৃদ্ধি এসেছে তার মূল্যায়ন করার ক্ষমতা রাখে কিন্তু বাকি ৫১% মানুষরা তথাকথিত ইংরজি নাক উঁচু মনোভাব, বর্ণবাদিতা আর বিদেশাতঙ্কে ছিল জর্জরিত। গণভোটের আগে নির্বাচনী প্রচারণায় এই দেশে ই-ইউ থেকে আগত অনেক বিদেশি শ্রমিক ও পেশাজীবীদের বিরুদ্ধে প্রচার করা হয় কুৎসা আর ভীতি। এই প্রচারণার ফলে ই-ইউর বাইরের কিছু মানুষ যেমন দক্ষিণ এশিয়া, ওয়েষ্ট ইন্ডিজ ও আফ্রিকা বংশভুত বিলেতিদের উপরেও বর্ণবাদী আচরণ কিছু সময়ের জন্য বেড়ে যায়। ২০১৬ সালে দেখলাম ১৯৮০ দশকের পদধ্বনি। আমি আবারও এই দেশের প্রতি কিছুটা ঘৃণা অনুভব করলাম যদিও এই দেশের আইনের শাসন, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানসমূহ এবং এতদিন পাওয়া বিভিন্ন সুযোগ সুবিধার প্রতি আমার তখনও রয়েছে অঢেল শ্রদ্ধা এবং কৃতজ্ঞতা। সেটা মনে করেই মেনে নিলাম এই দেশের পরিণতি। ই-ইউ ছেড়ে দেয়ার পর এই দেশ হবে অপেক্ষাকৃত দরিদ্র। ইউরোপের অধিকাংশ দেশের সাথে রয়েছে বিলেতের সংযুক্ত বানিজ্যিক সম্পর্ক। সব ভেস্তে যাবে এবং মানুষদের জীবন যাত্রার মান কমে যাবে। তবুই সেই ৫১% মানুষ ই-ইউ থেকে “স্বাধীন” হতে চায়। তারা নিজেরা দুনিয়া শাসন করেছে, তাই তারা ই-ইউর নিয়ম কানুন মানতে রাজি নয়।
এই দেশকে আমি ভালোবাসতে পারিনি, কিন্তু শ্রদ্ধা করতে শিখেছি। কিন্তু সেই শ্রদ্ধা এই দেশের সেই শ্রমিক শ্রেণির মানুষদের উপর আসেনি যারা ঢালাওভাবে ভোট দিয়ে এই দেশটাকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বের করে দেয়ার চেষ্টা করলো। আর তাদের প্রতি আমার ছোট বেলায় তৈরি হওয়া মনোভাব এই ভোটের কারণে আরো দৃঢ় হলো। মজার ব্যাপার হচ্ছে যে আমি ভেবেছিলাম যে এই দেশের জাতিগত সংখ্যালঘুরা হয়তো ই-ইউতে থাকার পক্ষেই ভোট দেবে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই তা হয়নি। এই দেশে বাংলাদেশের সিলেট থেকে আগত অনেক বিলেতি বা বিলেতি হবেন এমন মানুষরা উপমহাদেশীয় খাবারের রেস্তোরাঁর ব্যবসায় নিয়জিত। এই ব্যবসাগুলো এতই সফল যে ভারতীয় বা বাংলাদেশি খাবারের এক অদ্ভুত নতুন সংস্করণ এখন এই দেশে বিলেতিদের সবচেয়ে পছন্দনীয় খাবার বলে গণ্য করা হয়।
ই-ইউ থেকে এত শ্রমিক চলে আসার একটা পরিণাম ছিল যে বাংলাদেশ থেকে বাবুর্চি আসার পথ অনেকখানি কমে গিয়েছিল আর ই-ইউ ছাড়তে চায় এমন রাজনীতিবীদরা সেই রেস্তোরাঁর মালিকদেরকে আশ্বাস দিয়েছিল যে ই-ইউ থেকে সকল শ্রমিক আসা বন্ধ হলে বাংলাদেশ থেকে বাবুর্চি আনার পথ তারা সুগম করে দেবেন। আমি এটা শুনেই বুঝেছিলাম যে এটা হচ্ছে ই-ইউ ছাড়ার সকল মিথ্যা প্রচারণাগুলোরই একটি এবং পরে দেখা গেছে আসলেই ব্যাপারটা ছিল ঠিক তাই। আহাম্মক রেস্তোরাঁর মালিকরা দল বল মিলিয়ে ই-ইউ ছাড়ার পক্ষে ভোট দিয়েছে অথচ ব্রেকজিট (ই-ইউ ছাড়ার প্রক্রিয়াটি) সম্পন্ন করতে বদ্ধপরিকর বর্তমান সরকার বাংলাদেশ থেকে নতুন করে বাবুর্চি আনার কোনো পরিকল্পনা রাখেনি। গাধাসুলব মানসিকতা শুধু ইংরেজ শ্রমিক শ্রেণির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না।
ফিরে আসি সমকামীদের কথায়। বলে রাখা উচিৎ যে এই সব দেশেও দীর্ঘদিন ধরে সমকামীরা সামাজিক ও আইনই বৈষম্যের শিকার হওয়ার ফলে কিছুটা বিদ্রোহী মনোভাব নিয়ে তাদের একটা উল্লেখযোগ্য অংশের মধ্যে প্রবেশ করেছে বিভিন্ন মাদক সেববের প্রবণতা। “ক্রিস্টাল মেথ” যা বাংলাদেশে ইয়াবার সমতূল্য, তা সর্বনাশ করে ফেলেছে বিভিন্ন সমকামীদের জীবন। এই মাদক ও অন্যান্য মাদক মিশিয়ে অনেক ছেলেরাই যৌন কর্মে লিপ্ত হয় দিনের পর দিন বিভিন্ন ঝুঁকি নিয়ে, জীবনের বাদ বাকি সব কিছু ভুলে গিয়ে। এর পরিণাম হচ্ছে মর্মান্তিক। বাংলাদেশে ইয়াবাখোরদের মতো এরাও এদের স্বপ্ন ভাংচুর করছে, স্বাস্থের ক্ষতি করছে, ও বিভিন্ন রোগ বালাইয়ের শিকার হচ্ছে। এই আই ভি এইডসের এখন টিকা জাতীয় প্রতিরোধক অশুধ আছে বলে কন্ডমহীণ যৌনাচার আবার ৭০ দশকের মতো মাথা চারা দিয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের সমকামী ছেলেদের হুশিয়ার করে দিতে চাই যে অবাধ যৌনাচারের সাথে যেন ইয়াবা বা অন্যান্য মাদক এমন কি অধিক পর্যায় মদ জাতীয় জিনিষ মিশ্রিত না হয়। এতে নিজের বুদ্ধি ও বিবেকের লোপ পায় এবং ফলাফল হয় শোচনীয়। এসব মাদক থেকে আমি নিজেকে মুক্ত রাখতে পারলেও মদ আমার জীবন প্রায় শেষ করে দিয়েছিল লন্ডনে এসে। কিন্তু আগেই বলেছি যে আজ আমি সম্পূর্ণ মদ মুক্ত।
আবার ফিরে যাই বাংলাদেশে। আওয়ামী লীগের শাসনামলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পন্ন হওয়াতে সেই সরকারের উপর আমার জন্মেছিল অঢেল শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা। তবে বিচার শুরু হওয়ার পর লন্ডনে বসে দেখলাম যে বাংলাদেশের জামাতে ইসলামি দলটা এই দেশে তারই সহধর্মী মুসলিম কাউন্সিল অফ বৃটেনকে ব্যবহার করে এই সব দেশের মুসলমানদেরকে চরমভাবে উসকে দিতে শুরু করলো। যারা বাংলাদেশি বা পাকিস্তানি পিতা-মাতার বিলেতি সন্তান এবং পিতা-মাতার ভাষা বা সংষ্কৃতির সাথে ভালোভাবে পরিচিত না হলেও ধর্মটা ঠিকই ধরে রেখেছে বিলেতি মুসলমান হিসেবে, তারা টুইটার ও অন্যান্য যোগাযোগ মাধ্যমে ঢালাও ভাবে “বাংলাদেশ বাঁচাও” বলে প্রচারণা শুরু করতে লাগলো। কোন জিনিষটা থেকে বাংলাদেশকে বাঁচাতে হবে জানতে হলে ইউটিউবে আজমল মনসুরের কিছু শুক্রবারের ওয়াজ শোনা যেতে পারে। তিনি লন্ডনের একটা মসজিদে তখন ইমামতি করতেন এবং তিনি বাংলাদেশি বংশভুত একজন বিলেতি নাগরিক। সেই মসজিদে তিনি “শেখ হাসিনা বাংলাদেশে ইসলামকে ধ্বংস করে দিচ্ছে” ইত্যাদি মিথ্যা কথা বলে যা প্রচার করছিলেন সেটা এই দেশের ফাঁকা মস্তিষ্কের ছাগলের বাচ্চারা গিলেছে এবং তাদেরকে খুব ভালোভাবেই বুঝিয়ে দেয়া হয়েছিল যে যুদ্ধাপরাধীরা আসলে ছিলেন নানান ধর্মীয় গুরু এবং এদেরকে নানান ভুয়া অজুহাতে দন্ডিত করে হাসিনা বাংলাদেশ থেকে ইসলাম উঠিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে। আমি শুনেছি যে আমেরিকাতেও না কি একই চিত্র দেখা গেছে।
এই মিথ্যা প্রচারণা মুখ বুঝে সহ্য করার ক্ষমতা আমার এবং এই দেশে বাস করা অনেক বাংলাদেশির পক্ষেই সম্ভব ছিল না। তাদের মতো আমিও টুইটারে ইংরেজিতে দিন রাত মিথ্যা প্রচারণার জবাব দিয়েছি এবং গাধাদের মাথায় সত্য কিছু তথ্য উত্থাপন করার চেষ্টা করেছি। শাহবাগ আন্দোলনের সাথে একাত্বতা ঘোষণা করে এখানে বসে তাদের প্রচারণা ইংরেজিতে করে দেয়ার চেষ্টা করেছি। বিদেশি সংবাদমাধ্যমগুলো শাহবাগের এই জাগরণের মাথা মুন্ডু কিছুই বুঝতে পারেনি আর তাই বাংলাদেশে নতুন করে ফিরে আসা এই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং যুদ্ধাপরাধের সঠিক ইতিহাস তেমনভাবে তুলে ধরতে পারেনি। তাই আমরা অনেকেই ব্লগ লিখে লিখে সঠিক তথ্য বহির্বিশ্বের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। বিদেশে বসেই আমরা দেশের প্রতিটা মুহুর্তের সাথে এক হয়ে ছিলাম আর একেকটা রায় কার্যকর হওয়ার সময়ে শ্বাসরূদ্ধ হয়ে বসেছিলাম। একেকটা রায় কার্যকার হওয়ার সময়ে নানান জায়গার লোকদের সাথে তর্ক করতে হয়েছে টুইটারে। এক হচ্ছে কিছু পাকিস্তানিদের সাথে যারা তাদের আগের বংশের সেনাদের হাতে বাংলাদেশের হৃদয়বিদারক মুক্তিযুদ্ধ এবং লাখ লাখ শহীদ এবং ধর্ষিতা মা-বোনদের কথা কিছুই জানে না। দুই হচ্ছে সব পশ্চিমা আঁতেলদের সাথে যারা সকল ক্ষেত্রেই মৃত্যুদন্ডের বিরুদ্ধে। তারা মৃত্যুদন্ডের এতটাই বিরুদ্ধে ছিল যে সেটাকে কেন্দ্র করে এরাও জামাতের সুরে পুরা বিচার প্রক্রিয়াটাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে, এটা সেটা বলে আখ্যায়িত করেছে।
এই নিয়ে আমার বক্তব্য হচ্ছে যে বাংলাদেশ থেকেও মৃত্যুদন্ড উঠিয়ে দেয়া উচিৎ কিন্তু তা এই জঘন্য যুদ্ধাপরাধী রাজাকারদের দিয়ে শুরু করা যেত না। কোনো দিনও না। বাংলার মাটিতে এদের যাবত জীবন কারাদন্ড হলে বিরোধী দল বিএনপি তাদের দোষর জামাতের সাথে আবার ক্ষমতায় এলে সব কয়টা অপরাধীরা ছাড়া পেয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আর ধর্ম নিরপেক্ষতার সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াত। ১৯৭১ সালে গোলাম আজমরা যা করেছিল তা সুযোগ পেলে তারা আবারও করতো সেই ব্যাপারে সন্দেহ রাখার কোনো অবকাশ ছিল না। তাছাড়া আমি চিরকালই যুদ্ধাপরাধ এবং জঙ্গি সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের জন্য মৃত্যুদন্ডের পক্ষে থাকবো।
এখানে সবচেয়ে বেশি লক্ষণীয় ব্যাপারটা হচ্ছে যে বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভের সাথে সাথেই এই হারামীরা দেশ থেকে চিরকালের জন্য পালিয়ে গিয়েছিল। বাংলাদেশ ছিল এই জানোয়ারদের পদধূলা বিহীন। এরা কীভাবে আবার স্বাধীন দেশে ফিরে আসার ধৃষ্টতা দেখাতে পারলো? সেটা নবপ্রজন্মকে ভালোভাবে জানতে হবে। জিয়াউর রহমান তার নিজের হাত শক্তিশালী করতে এই নরকের কীটগুলোকে আস্তে আস্তে দেশে ফিরে আসার সুযোগ করে দেয়। এরা ফিরে আসলে এরা ইসলামি মূল্যবোধের গান গাইতে পারবে যেটা তারা ৭১ সালেও গেয়েছিল এবং সেটার দোহাই দিয়ে পাকিস্তান ভাঙ্গার বিপক্ষে থেকে পাক সেনাদেরকেই সাহায্য করেছিল বাঙ্গালীদের বিরুদ্ধে গনহত্যা আর ধর্ষণ চালিয়ে যাবার জন্য। ইসলামি মূল্যবোধের গান গাইলে এবং তাতে জিয়ার হাত থাকলে তার শ্বাসনামলে ভেতো বাঙ্গালী মুসলমানদের সহানুভুতি বাড়বে এবং হয়েছিলও ঠিক তাই। কিন্তু এই কাজ করে জেনারেল জিয়া যে বাংলাদেশের রাজনীতিকে চিরতরে ধ্বংস করে দিয়ে গেছে সেটা বিএনপি সমর্থকদের বোঝানোই যায় না, যদিও জেনারেলটার এই খেলা ক্ষমার অযোগ্য।
আওয়ামী লীগই ছিল স্বাধীনতা এবং ধর্মনিরপেক্ষতার সত্য আহবায়ক। কিন্তু আমার সেই ধারণাটা ক্রমেই বদলাতে শুরু করে যখন সম্প্রতিকালে হেফাজতের পাছা চুম্বন করতে গিয়ে আমাদের প্রধানমন্ত্রীর মুখ থেকে ধর্মনিরপেক্ষতার কথা উঠে যায়। আর তার সাথে দেখতে পাই ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত বিরোধী মনোভাব ও আইন যেগুলো একটি ধর্মনিরপেক্ষ দেশের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। বাংলাদেশের সংবিধান সংষ্কারের সময়ে তিনি ধর্মনিরপেক্ষতা ফিরিয়ে আনলেও ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ঠিকই রেখে দিয়েছেন এবং সংবিধানের শুরুতে বিসমিল্লাহটা এখনো রয়ে গেছে। সংবিধানটা যেন মুসলমানদেরই একটা কাগজ। এবং রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম হওয়াতে দেশের বাকি ধর্মালম্বী এবং নাস্তিকরা এখনো দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক। লীগের ভক্তরা বলে থাকেন এটা ভোটের রাজনীতি। বেশ, তো এই ভোটের রাজনীতি করতে গিয়ে যারা নিজেদের নীতি বিসর্জন দিতে পারে, তারা আমার মতো মানুষের ভোট পাবে কেন? আমরা যারা মুক্ত চিন্তাবীদ, ধর্মনিরপেক্ষ, নাস্তিক ও যৌন সংখ্যালঘু, তারাও সবাই মিলে ছিলাম একটা ভোট ব্যাংক। কিন্তু এই সরকার আমাদেরকে বানিয়েছেন বলির পাঠা।
তা না হলে কী করে দেশে ইসলামি জঙ্গিদের হাতে একের পর এক মুক্তমনা আর নাস্তিক খুন হলো অথচ প্রধানমন্ত্রী প্রথমে বিরোধী দলের উপর সেটার দোষ চাপিয়ে দিয়ে পরে ব্লগারদেরকেই দোষী করেছেন ইসলাম ধর্মের বিরুদ্ধে লেখার জন্য? এতে কি জঙ্গিরা তাদের হায়না স্বরূপ আক্রমণ করার বাড়তি উৎসাহ পায় নি? ঢাকার গুলশানে একটা ক্যাফেতে অনেক বিদেশি খুন হওয়ার পরে সরকারের টনক নড়েছে অথচ তার বহু আগে জঙ্গিদের পেছনে সরকার লেগে পড়লে আজ বেঁচে থাকতো অভিজিৎ রায়, জুলহাজ মান্নান সহ আরো অনেকে। কিন্তু তখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থেকে শুরু করে প্রধানমন্ত্রীর মুখ থেকে যা শোনা গেছে তা আমাদেরকে করেছে হতাশ। ২০১৬ সালের এপ্রিল মাসের শেষ নাগাদ ইসলামি জঙ্গিদের হাতে যখন বাংলাদেশের সমকামী অধিকার কর্মী জুলহাজ মান্নান এবং সমকামী সাংষ্কৃতিক কর্মী মাহবুব তনয় নির্মমভাবে খুন হলো, তখন বাংলাদেশের সুশীল সমাজ থেকে শুরু করে সরকারের নিরব ভুমিকা ক্ষমার অযোগ্য।
বাংলাদেশের আবালদের কাছে থেকে প্রায়ই শোনা যায় যে ৯২% মুসলমান দেশে মুসলমানরা যা চাবে তার মানেই না কি গণতন্ত্র। অথচ সেটা ভোটের ক্ষেত্রে হলেও দেশ শাসনের সময়ে সংখ্যাগরিষ্ঠদের ইচ্ছা পূরণ করার সময়ে এটাও সমানভাবে খেয়াল রাখতে হয় যে কোনোভাবেই সংখ্যালঘুদের স্বার্থ যেন বিঘ্নিত না হয়। এই পরষ্পর বিরোধী দুই নীতির সংমিশ্রণেই প্রকৃত গণতন্ত্রের চেহারা ফুটে উঠে। একই আবালদের মনেও থাকে না যে ১৯৭২ সনে বাংলাদেশের সংবিধান প্রতিষ্ঠার সময়ে সেখানে কোনো রাষ্ট্রধর্ম ছিল না। দেশে কি তখন কোনো মুসলমান ছিল না? আশির দশকে শৈরাচারী এরশাদ তার অবৈধ ক্ষমতাকে আরো কুক্ষিগত করার জন্য মুসলমানদের সহানুভূতি পাওয়ার আশায় সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম এনে দেশের সংবিধান ও সমাজকে কলূষিত করে ফেলেন। এই প্রক্রিয়া শুরু হয় তার আগে জেনারেল জিয়া রহমানের আমল থেকেই। এই ইতিহাস এখন ভুলে গেলে চলবে না।
সমকামীদের দুই নক্ষত্র জুলহাজ ও তনয় আমাদের কাছ থেকে চলে যাবার পর বাংলাদেশে যৌন সংখ্যালঘুদের করুন দশা কিছুটা লাঘব হয়ে আজ এক নতুন দিগন্তের সূচনা হতে যাচ্ছে। বাংলাদেশের প্রতিটা গ্রামে, প্রতিটা ছোট ও বড় শহরে মোবাইল ফেসবুক ও মেসেঞ্জারের মাধ্যমে অল্প বয়সী সমকামী ছেলে ও মেয়েরা সাহস নিয়ে আত্মপ্রকাশ করছে, একজন আরেকজনের সাথে পরিচিত হচ্ছে, নিজের সুখ ও দুঃখের কথা বলছে, প্রেমে পড়ছে বা নিছক যৌন মিলনের জন্য দেখা সাক্ষাৎ করছে। আর এদেরই অনেকে আমাকে খুঁজে বের করেছে মনে সাহস পাবার জন্য, নিজেদের কথা বলার জন্য। আমিও তাদের সুখ ও ভবিষ্যতের জন্য উৎসর্গ করে দিয়েছি আমার বাকিটা জীবন। এরা অনেকেই এখন আমার একটা নিজের পরিবারের মতো। এদের আনন্দে আমি হাসি, এদের দুঃখে আমি কাঁদি। বিলেতিদের রেখে যাওয়া বাংলাদেশের দন্ডবিধির ৩৭৭ ধারা যা প্রকৃতি বিরুদ্ধ যৌনাচার হিসেবে সমলৈঙ্গিক সম্পর্কগুলোকে অবৈধ হিসেবে দেখে এবং দেশের সকল যৌন সংখ্যালঘুদের সমান, মানবিক, আইনি ও সামাজিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করে, তার বিরুদ্ধে সবার মাঝে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে এবং অন্যান্য অনেক দেশের মতো বাংলাদেশেও তার বিলুপ্তি ঘোষণা করতে হবে। বাংলাদেশের আইন ইসলামের শরীয়া দ্বারা গঠিত নয় এবং কোনো দিন সেটা হতেও দেয়া যাবে না। তাই ইসলাম ও অন্যান্য ধর্ম সমকামিতা নিয়ে কী বলে তা নিয়ে রাষ্ট্রের মাথা ঘামাতে হবে না। রাষ্ট্র এখানে সকল নাগরিকের সমান অধিকার ও প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর।
আর সবচেয়ে বেশি এখন যেটার প্রয়োজন তা হচ্ছে দেশের যৌন সংখ্যালঘুদের মাঝে ঐক্য। বর্তমানে এটারই বড় অভাব। এক দল দেশে সকল প্রকার অধিকার নিয়ে মগ্ন, আরেক দল নিরালায় সারা জীবন বিভিন্ন যৌন কর্মে লিপ্ত হয়েই শান্ত – এরা ভবিষ্যতে বিপরীত লিঙ্গের কাওকে বিয়ে করে বসে থাকবে পরিবার ও সমাজকে মুখ দেখানোর জন্য। আরেক দল আছে যারা গেমিন অর্থাৎ গে + মুমিন। এরা রাতে সমকামিতাও করবে এবং দিনের বেলায় ধর্মের সাফাই গেয়ে সমকামিতার নিন্দা করবে। এরা যৌন সংখ্যালঘুদের সব চেয়ে বড় শত্রু। আর তার উপর আছে অনেক উভকামী ছেলে যারা সমকামীদের সাথে লিপ্ত থেকে, পরে তাদের মন ভেঙ্গে দিয়ে একটা মেয়ে বিয়ে করে বসে থাকে যা তারা তাদের যৌন প্রবৃত্তির কারণে সহজেই করতে পারে। এই সকল ব্যাপার নিয়ে মুক্ত আলোচনার প্রয়োজন। আমি কোনো সমকামীকে নাস্তিক হয়ে যেতে বলবো না। কিন্তু ধার্মিক চিন্তাভাবনা যে সমকামীদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার সবচেয়ে বড় অন্তরায়, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
২০০০ দশকের দিকে বাংলাদেশে সমকামী অধিকার নিয়ে সোচ্চার হয়ে উঠে ঢাকার অভিজাত এলাকার ইংরেজিভাষী ফটফটিরা। তাদের অবদান ভুলবার নয়। তাদের “বয়েজ ওফ বাংলাদেশ” নামের দলটার মাধ্যমে সুশীল সমাজে কিঞ্চিৎ আলোড়ন সৃষ্টি হয় বাংলাদেশে আমাদের অস্থিত্ব নিয়ে। তারপর জুলহাজ মান্নানের বলিষ্ঠ ভুমিকায় আসে “রূপবান” যেখানে বাংলাদেশের বাকি অংশ থেকে মূলত বাংলাভাষীদের ক্ষমতায়নের চেষ্টা করা হয়। এখন সময় এসেছে দেশের একেবারেই আনাচে কানাচে চলে যাবার। সেখানকার সকল প্রান্তিক যৌন সংখ্যালঘুদের কাছে আগে ভাগেই এই বার্তা পৌছে দিতে হবে যে সমকামী, উভকামী, রূপান্তরকামী, অদ্বৈত, আন্তঃলিঙ্গ, লিঙ্গতরল ইত্যাদি হিসেবে তাদেরও আছে অধিকার এবং তাদের যৌন প্রবৃত্তি বিষমকামীদের যৌন প্রবৃত্তির মতোই স্বাভাবিক। তাদের লিঙ্গ পরিচয় নারী ও পুরুষদের মতোই স্বাভাবিক। যৌন প্রবৃত্তিটা জন্মগত অথবা জন্মের ঠিক পরেই নির্ধারিত এবং ডাক্তারই বিজ্ঞান দ্বারা প্রমাণিত। তাদের জীবনের সুখ আসবে আত্মগ্রহণের মাধ্যমে, তারপর পরিবার, বন্ধু-বান্ধব, সমাজ ও রাষ্ট্রের গ্রহণের মাধ্যমে। আমরা প্রথম থেকেই এই তরুণ ও তরুণীদেরকে ভরসা ও ইতিবাচক চিন্তাভাবনা দিয়ে ভরে দিয়ে মাঠ পর্যায় থেকে একটা চেতনা ও শক্তি গড়ে তুলবো। বাংলাদেশে যৌন সংখ্যালঘুদের অধিকার প্রতিষ্ঠা হবে আমাদের দ্বিতীয় স্বাধীনতা – পরাধীনতা ও ধর্মীয় বেড়াজাল থেকে বের হয়ে এসে এক নতুন দিনের সূচনায় এক নব প্রভাতের উন্মোচনা।
অনাকাঙ্খিত কারণবশত বাংলাদেশের এবং সমগ্র বাংলাভাষী যৌন সংখ্যালঘু এবং তাদের শুভানুধ্যায়ীদের উদ্দেশ্যে নির্মিত বৈচিত্র্য নামের তথ্য ও সৃজনশীলতা ভিত্তিক জালপাতা আমার একার পক্ষে আর রক্ষণাবেক্ষণ ও চালানো সম্ভব নয় বলে ভারাক্রান্ত হৃদয়ে আমি এই পাতাটি বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছি। কিন্তু সেটার স্মৃতি মুছে যাওয়ার নয়। অনেক মানুষের স্বপ্ন ও আকাঙ্খা সেখানে পরিস্ফুটিত হয়েছিল। পাতাটির সূচনা হিসেবে ২০১৭ সালের ডিসেম্বরমাসে লেখা “সম্পাদকের বক্তব্য” প্রচ্ছদটি এখানে হুবুহু উঠিয়ে দিলাম।
রিয়াজ ওসমানী
২ ফেব্রুয়ারী ২০২১
ধরুন আপনি সমাজের অধিকাংশ মানুষদের মতোই বিষমকামী অর্থাৎ বিপরীত লিঙ্গের মানুষদেরকে যৌনভাবে পছন্দ করেন এবং তাদেরই প্রেমে পড়েন। হঠাৎ দেশে আইন পাস করা হলো যে আপনার মতো মানুষদের এখন থেকে সমলিঙ্গের কাউকে বিয়ে করতে হবে এবং তার সাথেই বাকিটা জীবন কাটাতে হবে। আপনি কি পারবেন কোনও প্রকার চিকিৎসা, দোয়া দরুদ, ঝাড় ফুক, যাদুটোনা বা ধ্যান করে নিজেকে বদলে নিতে যাতে সেই মানুষটার সাথে আপনি যৌনভাবে মিলিত হতে পারেন এবং তাকে ভালোবেসে তার সাথে বাকিটা জীবন কাটাতে পারেন? ব্যাপারটা আপনার কাছে আজগুবী এবং কিঞ্চিৎ বিরক্তিকর মনে হচ্ছে না? পুরুষ হয়ে আরেক পুরুষের সাথে যৌন কারবারের প্রতি কিঞ্চিৎ ঘৃণা প্রকাশ করছেন না? এক মহিলা হয়ে আরেক মহিলার সাথে যৌন কারবারকে কি মনে হচ্ছে আপনার? পারবেন এসব করতে? না, পারবেন না। আপনি যেহেতু একজন বিষমকামী মানুষ, আপনার পক্ষে তা কখনোই করা সম্ভব হবে না। জন্মসূত্রে পাওয়া আপনার যৌন প্রবৃত্তি আপনাকে কখনোই সেটা সহজে ও আনন্দে করতে দেবে না।
এখানে বর্ণিত চিত্রটি আপনি সঠিকভাবে কল্পনা করতে পারলে এর উল্টাটাও অনুধাবন করতে পারবেন। কল্পনা করুন কিছু মানুষ আছে যারা বিপরীত লিঙ্গের কাউকে যৌনভাবে পছন্দ করে না, প্রেমে পড়া তো দুরের কথা। তারা শুধু সমলিঙ্গের মানুষদের প্রতিই যৌনভাবে আকৃষ্ট হয়, ছোটবেলা থেকে তাদেরই প্রেমে পড়ে হৃদয়বিদারক কল্প-কাহিনীর নায়ক হয়। অথচ সমাজের রীতি এবং দেশের আইন তাদেরকে বলে যে তাদেরকে বিপরীত লিঙ্গেরই কাউকে বিয়ে করে সংসার করতে হবে। তাদের উপায়টা কি সেটা এখন বলতে পারবেন? সমাজ, ধর্ম ও পরিবার তাদেরকে শিখাচ্ছে একটা অথচ তারা নিজেরা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে যে তাদের কাছে স্বাভাবিক ব্যাপার ঠিক আরেকটা। এবার বলবো যে এরা কেউ আপনার কল্পনার ফানুস নয়। এরা সত্যিকারেরই রক্ত-মাংসের মানুষ। এরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে আপনার জানাশোনা মানুষদের মধ্যেই। আপনারই কোনও এক বন্ধু, শিক্ষক, ভাইবোন বা দুর সম্পর্কের আত্মীয় একজন সমকামী, অর্থাৎ জন্মসূত্রে পাওয়া তার যৌন প্রবৃত্তির কারনে সে ছেলে হয়ে ছেলেদেরকেই সেইভাবে ভালোবাসে, মেয়ে হয়ে মেয়েদেরকে।
এবার হয়তো বলবেন যে এটা কি করে সম্ভব? এটা তো প্রকৃতি বিরুদ্ধ। আর সবাই এরকম হলে আমরা মানব প্রজাতি হয়ে বংশ বিস্তারই বা করবো কি করে? ভলো বলেছেন। যেটা হয়তো আপনার জানা নেই সেটা হচ্ছে যে সবাই সমকামী হয়ে যাওয়ার কথা হাস্যকর। আদিকাল থেকেই পৃথিবীর ৫ থেকে ১০ শতাংশ মানুষ বিষমকামীদের যৌন প্রবৃত্তির চেয়ে ভিন্ন কিছু নিয়ে জন্মগ্রহণ করে আসছে এবং বর্তমান দুনিয়াতেও এর শতকরা হার বেড়ে যাওয়ার কোনও হদিস নেই। যেটার হদিস আছে তা হলো যে বাংলাদেশ সহ পৃথিবীর সব দেশেই সমকামী, উভকামী, রূপান্তরকামী, প্রভৃতি মানুষ – যারা সমষ্টিগতভাবে যৌন সংখ্যালঘু হিসেবে নিজেদের পরিচয় দেয় – তারা বিরাজমান কিন্তু সমাজের অন্তরালে। নিজেদের যৌন প্রবৃত্তিকে আড়ালে রেখে এরা আপনার মত চালচলনের অভিনয় করে। অর্থাৎ পরিবার ও সমাজের চাপে বিপরীত লিঙ্গের কাউকে বিয়ে করে বসে থাকে এবং বাকিটা জীবন ভালোবাসাবিহীন একটা বিয়েতে আবদ্ধ হয়ে নিজের ও অন্য মানুষটার জীবনের সর্বনাশ করে ফেলে। আনন্দ ব্যতিত যৌন কর্মের ফলের এদের হয়তো সন্তান জন্ম দেয়ারও সুযোগ হয়। কিন্তু সেই দুইটা জীবন থেকে যায় অপরিপূর্ণ এবং মিথ্যে।
আপনার কি বিশ্বাস হচ্ছে যে এরা আদৌ আছে কি না? বা থাকলেও তাদের যৌন প্রবৃত্তি কি বদলানো যায় না? এই ৫-১০ শতাংশ মানুষকে প্রকৃতি বা সৃষ্টিকর্তা তৈরি করলেনই বা কেনো? আর কষ্ট করে সন্তান জন্ম যদি দেয়াই যায় তাহলে বিপরীত লিঙ্গের কাউকে বিয়ে করতে ক্ষতি কি? আর ধর্ম যেখানে ব্যভিচারের বিরুদ্ধে কড়া নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে সেখানে এই সব কথাবার্তা বলাও তো হারাম। দু’টা মানুষের মধ্যে যৌন কারবার তো একটা বিবাহিত নারী ও পুরুষের মধ্যেই হতে পারে। অবিবাহিত নারী ও পুরুষের মধ্যেও নয়, দুই পুরুষ বা দুই নারীর মধ্যে তো দুরের কথা। সমাজ ধ্বংস হয়ে যাবে যদি প্রচলিত বিবাহ জীবন ব্যতিত মানুষদের মধ্যে যৌন মিলন হয়। সমাজের সুশৃংখলা নষ্টের পাশাপাশি ধর্মের এতো বড় অবমাননা আমরা সইবোই বা কি করে? আমরা তো সবাই একবাক্যেই জানি যে ইসলাম এবং অধিকাংশ ধর্মেই সমকামিতা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
আসুন এবার এই ব্যাপারগুলো একটু খতিয়ে দেখি। প্রথমত এরা আদৌ আছে কি না এই নিয়ে আপনার সংশয় থাকলে কিছু করার নেই। তবে এইটুকু বলতে পারি যে এরা না থাকলে এই ওয়েবপাতাটি তৈরি করার কোনও প্রয়োজন হতো না! তাই বাকি কথায় আসি। আসি যৌন প্রবৃত্তি নিয়ে। পশ্চিমা দুনিয়ায় বিগত কয়েক দশকের গবেষনার ফলে প্রমানিত হয়েছে যে কারও যৌনতা বদলানো যায় না। আপনারটাও যেমন বদলানো যাবে না, ঠিক তেমনি সমকামীদের যৌনতাও বদলানো যাবে না। এই ব্যাপারে আমাদের “তথ্য ভান্ডার” বিভাগে অনুবাদকৃত লেখাগুলো পড়ে নেবেন। কোনোভাবেই যদি যৌনতা বদলে নেয়া না যায়, তাহলে তার দরকারটাই বা কি বলুন? আর মার্কিন সাইকোলজিকাল এসোসিয়েসন অনেক আগেই পরীক্ষা নিরীক্ষা করে ঘোষণা দিয়ে দিয়েছে যে সমলিঙ্গের প্রতি আকর্ষন সৃষ্টিকারী যৌন প্রবৃত্তি অর্থাৎ সমকামিতা কোনও মানসিক বা শারীরিক রোগ নয়। এটা স্বাভাবিক যৌনতারই একটা বহিঃপ্রকাশ। এই ক্ষেত্রে একটি মাত্র ভিন্নতা ছাড়া পরীক্ষিত মানুষেদের মধ্যে আর কোনও পার্থক্য দেখা যায় নি। তাই সমকামিতা যদি কোনও রোগ বালাইয়ের মধ্যে নাই পড়লো, তাহলে এর চিকিৎসার প্রশ্নই বা আসলো কি করে?
আমাদেরকে তাহলে প্রকৃতি বা সৃষ্টিকর্তা তৈরিই বা করলেন কেনো? এটার উত্তর আমাদের জানা নেই। আদৌ জানতে পারবো কি না সেই ধারণাও নেই। কিন্তু আমরা যে জন্মগ্রহণ করেছি তা জানি। প্রকৃতি আমাদের তৈরি করলে আমরা প্রকৃতিরই অংশ এবং যেহেতু আমাদের যৌনতা জন্ম থেকেই নির্ধারিত, সেহেতু সেই যৌনতা অর্থাৎ সমকামিতাও প্রাকৃতিক অর্থাৎ একেবারেই প্রকৃতি বিরুদ্ধ নয়। আর আমরা যদি বিশ্বাস করি যে প্রকৃতি ব্যতিত অন্য কোনও সৃষ্টিকর্তা আমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন, তাহলে তিনি কেনো করেছেন সেটার উত্তর তাঁর কাছ থেকেই জেনে নেবেন। আমরা জানি যে আমরা এই পৃথিবীতে আছি।
বিয়ে করার একমাত্র উদ্দেশ্য যদি সন্তান জন্ম দেয়াই হতো তাহলে যে সকল বিষমকামী দম্পতি তাদের নিজেদের কারণে বাচ্চা নিতে অক্ষম, তাদের বিবাহ অবৈধ। কিন্ত সেভাবে তো কোনও দিন ভেবেছেন বলে মনে হয় না। আর আধুনিক উপায়ে সমকামী যুগলদের সন্তান নেয়া এখন আর অসম্ভব কিছুই না। তার উপর এই দুনিয়ায় এতো এতিম শিশুগুলোর মধ্যে কেউ কেউ সমকামী দম্পতিদের ঘরে ও হৃদয়ে ভালোবাসা ও আশ্রয় পেলে এতে কি দুনিয়ারই লাভ নয়? কিন্তু বিয়ের উদ্দেশ্য যে শুধু সন্তান জন্ম দেয়া, তা হতে পারে না। এটার উদ্দেশ্য অবশ্যই হওয়া উচিৎ একজন আরেকজনকে ভালোবেসে তার সাথে বাকি জীবনটা কাটানোর দৃঢ় প্রতিজ্ঞা ব্যক্ত করা। এখানে সন্তান না আসলেও সেই ভালোবাসায় কোনও কমতি থাকতে পারে না। ঠিক একই সূত্র ধরে বলা যায় যে যৌন মিলন একমাত্র গর্ভধারণের জন্য না। যৌন মিলনের আরেক উদ্দেশ্য একজন আরেকজনকে আনন্দ দেয়া, সেই আনন্দ দিয়ে তার প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করা। আর নিছক আনন্দের জন্যে প্রাণীরা যেমন যৌন মিলনে আবদ্ধ হয়, তেমন মানুষরাও তাই হয়। প্রসঙ্গক্রমে এখানে বলতেই হবে যে প্রাণী জগতে সমকামিতা প্রবল। অনেকেই অজ্ঞতার কারনে এই কথা অস্বীকার করে।
এবার ধর্ম টানবেন নিশ্চয়ই! চলুন দেখি ধর্ম কি বলে। খৃষ্ট ধর্মের মত ইসলাম ধর্মেও লুত (আঃ) এবং সডম ও গোমোড়াহ শহরের কথা বলা আছে। সনাতন চিন্তা-ভাবনা অনুযায়ী সমকামিতার কারনে আল্লাহ এই নগর ধ্বংস করে দিয়েছেন। তাই ইসলামে সমকামিতা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কিন্তু এই বিবরণটা আরেকটু খতিয়ে দেখলে দেখবেন যে এই ঘটনা নিয়ে বিতর্ক আছে। পশ্চিমা অনেক মুসলমানরা গবেষণা করে বলেছেন যে সডম ও গোমোড়াহ ধ্বংস করে দেয়ার পেছনে সমকামিতা কারণ হিসেবে ছিল না, ছিল পুরুষ ধর্ষণ। লুত (আঃ) এর কাছে অথিতি হিসেবে একটি রাতে মানব রূপ নিয়ে দুইজন ফেরেস্তা আসেন। লুত (আঃ) তাদেরকে মেহমান হিসেবে গ্রহণ করলেও সেই রাতে সেই নগরীর কিছু পুরুষরা তাদের সাথে অনিচ্ছাকৃত যৌন মিলনে আবদ্ধ হয় যা ধর্ষণের সামিল। সৃষ্টিকর্তা এতে অসন্তুষ্ট হয়ে সেই নগরীকে ধ্বংস করে দেয়। এই থেকেই ইসলাম ধর্মে সমকামীদের প্রতি বিদ্বেষ সৃষ্টি হয়। তবে কোরান শরীফে সমকামীদের শাস্তির কোন নির্দিষ্ট বিধান নেই। বিধান খুজে পাওয়া যায় হাদিসের বিভিন্ন গ্রন্থে – অর্থাৎ নবী (সঃ) মারা যাওয়ার দুইশত বছরের পর বিভিন্ন মুসলমান সমাজে সমকামীদের শাস্তির বিধান খুজে পাওয়া যায়। সময়ের সাথে সাথে সেই বিধান আরও কঠোর হয়ে উঠে যার সব চেয়ে জঘন্যতম নিদর্শন আমরা দেখতে পেয়েছি বর্তমান যুগের মধ্যপ্রাচ্যের ইসলামিক স্টেটে (আই এস) যেখানে সমকামীদের ধরে উঁচু দালান থেকে ফেলে দেয়া হয়েছে।
ভাগ্য ভালো যে বাংলাদেশের আইন কানুন শরিয়া দ্বারা গঠিত নয় এবং আমাদের এই গনতান্ত্রিক এবং তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ দেশে কোনও দিন তা হতেও দেয়া যাবে না। কিন্তু আমাদের উপর ইসলামী শাস্তি কামনা করার অধিকার আপনাকে কে দিয়েছে? আপনার বিশ্বাস নিয়ে আপনি থাকুন। কিন্তু সমকামীদের উপর আপনার বর্বর শাস্তি প্রয়োগ করার কোনও অধিকার আপনার নেই। আর বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ইসলাম সমকামিতা নিয়ে কি বললো তা দেশের আইন কানুনের ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক নয়। কারন দেশের আইন “কমন লও” দ্বারা গঠিত, ধর্মীয় অনুশাসন দিয়ে না। সমাজের অবক্ষয়ের কথা বলবেন এবার নিশ্চয়ই। বলবেন যে আমরা অল্প বয়সের ছেলে মেয়েদের সমকামী বানিয়ে ফেলবো। আমার আগের কথাগুলো পড়ে আশা করি বুঝতে পেরেছেন যে বাচ্চা ছেলে পেলেদের সাথে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে যৌন মিলন করলে তাদেরকে সমকামী বানানো যায় না। কারন তাদের যৌনতা (সেটা যেটাই হোক) জন্ম থেকেই নির্ধারিত। আর তাদেরকে যদি অতো সহজেই সমকামী বানানো যেত, তাহলে মাদ্রাসা থেকে বের হওয়া অধিকাংশ ছেলে শিশুরাই সমকামী হয়ে বের হতো। যখন হুজুররা সেই সব শিশুদের বলাৎকার করে, তখন আপনার ইসলাম ধর্ম কই থাকে? আর সমকামিতা আর শিশুকামিতার মধ্যে যে আকাশ-পাতাল তফাৎ সেটাও হয়তো জানেন না। একটার সাথে আরেকটার কোনও যোগাযোগ নেই।
বাংলাদেশের সমাজে ইসলাম ধর্মের অনুশাসন পরিপন্থী আরও প্রচুর অন্যায় বা পাপ হয়। বিবাহ বহির্ভুত বিষমকামীদের সম্পর্ক, নারী ও শিশু নির্যাতন, ঘুষ ও বাটপারী, বিশ্বাসঘাতকতা, গুম, খুন, মানুষকে ঠকানো – এগুলোর তালিকা দীর্ঘ। কিন্তু এসব ব্যাপারে ধর্ম নিয়ে আপনার তেমন কোনও মাথাব্যথা দেখি না, যত খানি দেখি সমকামীদের যৌন মিলন এবং ভালোবাসার কথা উঠলে। শুধু আমাদের বেলায় আপনার ধর্মীয় মূল্যবোধ বাছাইকৃতভাবে বেশি চলে আসে কেনো? আমাদেরকে আমাদের মতো করে থাকতে দিলেই তো পারেন। আমরা কারও ক্ষতি করছি না – আমরা শুধু আমাদের মতো করে বাঁচতে চাচ্ছি, ভালোবাসতে চাচ্ছি, নিজেদের আত্মসন্মান বজায়ে রেখে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে চাচ্ছি। এতে আপনার এতো বেগ কেনো?
আপনি কি চান যে ধর্ম, সংষ্কৃতি ও পরিবারের কথা মনে রেখে আমরা বিপরীত লিঙ্গের কাউকে বিয়ে করে তার জীবনটা শেষ করে দেই? নিজেদের কথা না হয় বাদই দিলাম। আপনি বাবা হয়ে আপনার মেয়েকে, বা ভাই হয়ে আপনার বোনকে কোনও সমকামী ছেলের সাথে বিয়ে দিতে চাবেন? আপনার সমকামী ছেলে বা মেয়েরা আপনার জোরপূর্বক অনুরোধে বিয়ে বসে বাকিটা জীবন অসুখী থেকে গেলো – এই কি ছিল আপনার বাসনা? মা হয়ে আপনি জোর করে বিয়ে দেবেন দেখে আপনার সমকামী মেয়ে বা ছেলে আত্মহত্যার চিন্তা শুরু করে দিল, এই কি ছিল আপনার আশা? ব্যাপার আপনার যতোই অপছন্দ হোক না কেনো, আমাদের জন্ম যেহেতু হয়েছে, আমাদের বাঁচার অধিকার আছে সুখী হয়ে, নিজের জীবনটা পরিপূর্ণ করে। এবং আপনার অপেক্ষাকৃত আপত্তি থাকা সত্যেও আমরা নিজেদের বদলাতে পারছি না, চাচ্ছিও না, চাবোও না। আমরা আমাদের যৌনতা বেছে নেই নি। এই জীবনটাও বেছে নেই নি। কে স্বেচ্ছায় বেছে নেবে এই জীবন, যেই জীবনে আছে শুধু আপনার, আমাদের পরিবার ও আমাদের সমাজের লাঞ্ছনা? আমাদের জন্মই এইভাবে এবং আমরা বাকি সারা জীবন এভাবেই থাকবো। তাই আমাদেরকে বাঁচতে দিন। একটু ভালোবাসা দিন। একটু সমর্থনসূচক হাত বাড়িয়ে দিন। আমরাও প্রত্যুত্তরে এই দেশ, সমাজ ও আপনাকে অনেক কিছু দিতে পারবো।
অনাকাঙ্খিত কারণবশত বাংলাদেশের এবং সমগ্র বাংলাভাষী যৌন সংখ্যালঘু এবং তাদের শুভানুধ্যায়ীদের উদ্দেশ্যে নির্মিত বৈচিত্র্য নামের তথ্য ও সৃজনশীলতা ভিত্তিক জালপাতা আমার একার পক্ষে আর রক্ষণাবেক্ষণ ও চালানো সম্ভব নয় বলে ভারাক্রান্ত হৃদয়ে আমি এই পাতাটি বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছি। কিন্তু সেটার স্মৃতি মুছে যাওয়ার নয়। অনেক মানুষের স্বপ্ন ও আকাঙ্খা সেখানে পরিস্ফুটিত হয়েছিল। পাতাটির সূচনা হিসেবে ২০১৭ সালের ডিসেম্বর মাসে লেখা “আমাদের সম্বন্ধে” প্রচ্ছদটি এখানে হুবুহু উঠিয়ে দিলাম।
রিয়াজ ওসমানী
২ ফেব্রুয়ারী ২০২১
আমরা সমকামী এবং উভকামী (মহিলা বা পুরুষ)। আমরা রূপান্তরকামী, রূপান্তরলিঙ্গ, আন্তঃলিঙ্গ, অদৈত্ব, লিঙ্গতরল এবং রূপান্তররূপী। আমাদের সমষ্টিকে কিছু ইংরেজি অক্ষর দিয়ে সংক্ষেপে “এলজিবিটি” বা “এলজিবিটিকিউআইএ” বলা হয়। বাংলা ভাষার প্রেক্ষাপটে আমরা “যৌন সংখ্যালঘু”। পৃথিবীর ৫ থেকে ১০ শতাংশ মানুষ এই গোত্রে পড়ে এবং বাংলাদেশেও এর কোন ব্যতিক্রম নেই। আমরা বাংলাদেশি এবং বাংলাভাষী যৌন সংখ্যালঘু। এই আন্তর্স্থানটিতে অনেক জায়গাতেই যৌন সংখ্যালঘু অথবা সমকামী বলে একই জিনিষ বোঝানো হয়েছে, যদিও স্পষ্ট করে বলে দিতে চাই যে এই ক্ষেত্রে সমকামী কথাটা যৌন সংখ্যালঘুর পুরা পরিবারটিকেই বোঝাচ্ছে, শুধু সমকামীদেরকে নয়। একটু আগে উল্লেখিত সবাইকে নিয়েই আমাদের বৈচিত্র্য। আর আমরা এসেছি সমাজের সকল স্থর থেকে। কারও পিতা-মাতা বিত্তবান এবং আমরা পশ্চিমা হালচাল নিয়ে চলি। কেউ এসেছি দরিদ্র ঘর থেকে এবং জীবনের কোন কূলকিনারা খুঁজে পাই না। আবার আমরা কেউ মধ্যবিত্ত যারা অর্থনৈতিক, ধার্মিক, সাংষ্কৃতিক এবং সামাজিক ভারসাম্য রাখতে গিয়ে হিমসিম খেয়ে ফেলি। আমরা থাকি দেশের ছোট ছোট গ্রামে আবার বড় বড় শহরে। মফস্বলের বিভিন্ন আঞ্চলিকতা আমাদেরকে মাঝে মাঝে বিভক্ত করে। তার উপর আছে ধর্ম অনুসরনের কারনে আমাদের মাঝে আরেক বিভক্তি। এই বিভক্তি এড়াতে বা ধর্মীয় অনুশাসন অনুযায়ী আমাদের জীবনের প্রতি প্রতিকূল মনোভাব সৃষ্টি হওয়াতে নিজেদের ভেতর দ্বন্দ্ব কাটিয়ে উঠতে আমরা কেউ কেউ হয়েছি নাস্তিক। আর তা না হলে আমাদের ধর্ম বিশ্বাস আর আমাদের যৌনতাকে নিয়ে আপন মনে একটা সমঝোতায় আসার চেষ্টা করেছি। বাংলাদেশের আদিবাসীদের মধ্য থেকেও সমকামীরা ফেসবুক যুগে সোচ্চার। এখানে আমরা সবাই মিলে একটা বড় পরিবার।
এখানে আমাদের সাথে আরও থাকছেন ভারতের পশ্চিম বাংলা ও অন্যান্য অঙ্গরাজ্যের সমকামী বাঙ্গালী – পৃথিবীর সবখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সকল বাংলাভাষী যৌন সংখ্যালঘুরা। আমরা এখানে আমাদের কথা বলব, আমাদের যৌন প্রবৃত্তির বিষয়টি উন্মোচন করবো এবং এই নিয়ে বাংলাদেশ এবং বিভিন্ন জায়গায় বাঙ্গালী সমাজের সকল ভুল ও বদ্ধ ধারনা শুধরে দেবার চেষ্টা করবো। আমরা সমকামিতা ও যৌন প্রবৃত্তি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক এবং অধ্যাপক সুলভ তথ্য ইংরেজি ভাষা থেকে বাংলায় অনুবাদ করবো – সমাজ, সংষ্কৃতি ও ধর্ম আমাদের নিজেদের জীবনে যে প্রভাব ফেলেছে তা নিয়ে আলাপ করবো। আমরা তুলে ধরবো ভারত উপমহাদেশে বিলেতিদের রেখে যাওয়া দন্ডবিধির ৩৭৭ ধারাকে, যেটাকে ধার্মিক ও সাংষ্কৃতিক দিক থেকে ব্যবহার করে এই অঞ্চলের বর্তমান স্বাধীন দেশগুলোতে রেখে দেয়া হয়েছে। ভারতে তা উঠিয়ে দেয়ার প্রচেষ্টা অবশেষে সফল হলেও বাংলাদেশে এটা নিয়ে কোন উদ্যোগ এখনও শুরুই হয়নি। এই আইন আমাদের জন্য কত খানি ক্ষতিকর এবং বাংলাদেশে এটা উঠিয়ে দেয়ার প্রক্রিয়া কতখানি চলমান, সেই ব্যাপারগুলো নিয়ে আমরা এখানে সবাইকে হালনাগাদ করে রাখবো।
এখানে আমাদের সৃজনশীলতা ফুটে উঠবে। আমরা ভালো গল্প লিখতে পারি, কবিতা লিখতে পারি, ছবি অঙ্কন করতে পারি, ভালো অডিও বা ভিডিও বানাতে পারি। আমরা তথ্যপ্রযুক্তিতে এগিয়ে – আমরা আর পাঁচ-দশজনের মত সমাজ ও দেশের সম্পদ। আমরা ভালো ছাত্র-ছাত্রী, আমরা ভালো চাকরিজীবি, ভালো কৃষক, ভালো দিনমজুর, ভালো শ্রমিক এবং ভালো ব্যবসাই। আমরা ভালো ডাক্তার, ভালো আইনজীবি, ভালো প্রকৌশলী, ভালো দার্শনিক এবং রাজনীতিবীদ। আমরা ভালো গায়ক, বাদ্য বাদক, পরিচালক, সুরকার, অভিনেতা এবং নৃত্যকার। আমরা ভালো বিজ্ঞানী, ভালো সৈন্য বা সেনাপতি। আমাদের যৌন প্রবৃত্তি ডাক্তারই বিজ্ঞান দ্বারা প্রমানিত – আমাদের ভালোবাসাগুলো যে কোন কবি-সাহিত্যিকদের বর্ণিত লেখনীতে ফুঁটে ওঠার যোগ্য স্থান পায়। আমাদের জীবন আর বাকি সবার জীবনগুলোর মতই মূল্যবান। আমাদেরও সত্ত্বা আছে, অনুভুতি আছে, আছে যৌন কাম – হোক সেটা সংখ্যাগরিষ্ঠদের থেকে কিছুটা ভিন্ন। এই সমাজ ছোট বেলা থেকেই আমাদেরকে বিষমকামীদের মত শুধু বিপরীত লিঙ্গের কাওকেই ভালোবাসতে বলেছে, তার সাথে ঘর বাধতে বলেছে। কিন্তু আমরা যৌবনে পা দিয়ে টের পেয়েছি যে আমাদের পক্ষে তা কখনোই সম্ভব নয় (যারা উভকামী, তারা ব্যতিত)। এই মানসিক চাপে আমরা অনেকেই বড় হই বিষন্নতা নিয়ে, বড় একলা হয়ে। অনেকেই নিজের জীবনটা নিয়েও নিয়েছি নিজের ও পরিবার থেকে কষ্ট সহ্য করতে না পেরে। যারা বেঁচে আছি তাদের কেউ কেউ মনের দুঃখ আর নিঃসঙ্গতা ভুলতে গিয়ে বিভিন্ন প্রকার মদ ও মাদকের প্রতি ঝুঁকে জীবনটা নষ্ট করে ফেলেছি।
আমরা আর একলা নই। আমরা নেই দূর্বল। এই পাতাগুলোর সকল লেখা ও তথ্য দিয়ে আমরা একজন আরেকজনের পাশে এসে দাঁড়াবো। একজন আরেকজনকে সাহস যুগিয়ে দেব। এবং দেখিয়ে দেবো একজন যৌন সংখ্যালঘু হিসেবে কিভাবে এই সমাজে নিজের জায়গা নিজেকেই তৈরি করে নিতে হয়। তবে তা হবে আমাদের সবার ভালোবাসা আর সমর্থনের ছত্রছায়ায়। আমাদের মন দৃঢ় করার জন্য আমরা সারা দুনিয়ার যৌন সংখ্যালঘুদের আবহমান সংবাদের বাংলা অনুবাদ এখানে প্রকাশ করবো। আমরা জানবো যে এই পৃথিবীতে আমরা কেউ একলা নই। আর বিষমকামী সমাজে আমাদের যে সকল শুভানুধ্যায়ী রয়েছেন, তাদেরকেও আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর অনুরোধ করবো। তাদের অবদান অপরিহার্য। বৈচিত্র্য একটা পরিবার, একটা সত্ত্বা, একটা গুন – একটা দেশ ও সমাজের সুন্দর একটা বহিঃপ্রকাশ।
সব শেষে আমরা মনে রাখবো যে ২০১৬ সালের এপ্রিল মাসের শেষ নাগাদ ইসলামী জঙ্গীদের হাতে আমরা আমাদের দুই নক্ষত্র জুলহাজ মান্নান এবং মাহবুব তনয়কে হারিয়েছি এক নির্মম হত্যাকান্ডের মাধ্যমে। এরা ছিলেন যথাক্রমে একজন বাংলাদেশি সমকামী অধিকার কর্মী এবং একজন বাঙ্গালী সাংষ্কৃতিক কর্মী (নিজে সমকামী)। তাদের হারানোর অপুরণীয় ক্ষতি কিছুটা হলেও লাঘব করা সম্ভব হবে যদি আমরা আবারও একত্রে জোর গলায় কথা বলতে শিখি এবং ধর্মীয় মৌলবাদ, ঘৃণা, ও জঙ্গিবাদকে ভয় পেয়ে নিজের আড়ালে নিজেকে আর আবদ্ধ করে না রাখি। রূপবান পত্রিকার ভাষায় বলতেই হবে যে আমরা আছি, আমরা থাকবো।
On January 11, 2021, a) Dr. Soumen Bhowmic, a human rights activist in Bangladesh and UK, b) Tasmiah Nuhiya Ahmed, an Advocate and human rights activist in Bangladesh and c) Dr. S. M. Siddique Hossain, Director of Empowerment through Law of the Common People (ELCOP), collectively filed a Writ Petition of number 505 of 2021 with the High Court Division of Bangladesh Supreme Court. This is a public interest litigation and is now with Annex Court 35. You can view a PDF of the certified copy of the petition towards the bottom of this page.
Section 375 of Bangladesh’s Penal Code covers instances of rape of a woman by a man. It does not take into account non-consensual sexual assaults inflicted on a woman by a woman, on a man by a woman, on a man by another man, on a transgender by another transgender or a man or woman. Consequently, this section does not acknowledge male and transgender victims of rape.
One of the gaps in the definition of “rape” in Bangladesh’s legal system is that only a non-consensual intercourse with a woman amounts to “rape”. This is compounded by the fact that “penetration” as referenced in 375 only means penovaginal penetration. This clearly excludes boy children and adult men from the purview of the law.
In the year 2000, the Government of People’s Republic of Bangladesh passed a law for giving protection of women and children, through “Nari O Shishu Nirjaton Daman Ain, 2000” or “The Prevention of Cruelty Against Women and Children Act, 2000”. This was amended in the year 2003 but no change took place regarding the definition of “rape”, which should have been replaced with a term of gender-neutral offence such as “sexual assault”.
This law miserably failed to address men or transgenders as victims under the law. It is therefore appropriate to broaden the meaning of penetration to include not only vaginal penetration but also anal and oral penetration as well as penetration by any part of the body or by any object. It should be without doubt that the experience of a boy, man or transgender of such sexual assaults by a man, women or transgender would be equally brutal and traumatizing as that of a girl or woman.
In vast majority of child sexual abuse cases in Bangladesh, the penetration is other than penovaginal. Yet, it is not widely accepted within the law enforcement agencies that when a man sodomizes a boy under the age of 16 with or without the latter’s consent, the man can be charged under Nari O Shishu Nirjaton Daman Ain, 2000. It is not clearly defined that such an act of sodomy equates to “rape”.
Moreover, if a man sodomizes another man without the latter’ consent, there is currently no legal recourse for the victim. In a recent interview with BBC Bangla, the Bangladeshi Law Minister Mr. Anisul Huq stated that a non-consenting adult male victim of sodomy by another adult male can seek recourse through Section 377 of Bangladesh’s Penal Code which criminalizes any sexual act against the laws of nature which has been interpreted mostly as sodomy. It escaped the Minister that under this section, both the victim and perpetrator of forceful sodomy would be penalized and for this reason, an adult male victim of forceful sodomy by another male never seeks justice.
Section 377 is at the same time inhuman and unethical. It is a remnant of the British Raj and it is widely accepted in the civilized world that consensual sexual acts between adults of the same gender should never be penalized. Petitioning against this section is a battle for another day.
This Writ Petition asks to broaden the definition of “rape” to cover all variations of forceful sexual acts by a person on another irrespective of the type of act and the genders involved. Details of all types of such acts are provided in the petition. This would bring all human beings (both victims and perpetrators) under the purview of the law and ensure equality before the law as guaranteed under the Constitution of Bangladesh.
This petition is of utmost importance to the country given the complete lack of legal recourse for male and transgender victims of sexual assault by any gender (though mostly by males).
Dr. Bhowmic has WON the writ petition (at an initial stage). On last Sunday (April 9, 2022), the country’s High Court has given a Rule Nisi in favour of the petition. Bangladesh government has been given one month to decide to accept the ruling or appeal against it. I cannot fathom any logic as to why the government would appeal against the rule, except for sheer pigheadedness.
Depending on what happens next, which would involve hearings, we could in the not too distant future, see an amended and expanded version of section 375 of Bangladesh’s penal code, which would bring a considerable change to the country’s law and justice system. This broadened definition of rape in Bangladesh will bring about a major social change as well. For example, male victims of rape will now be able to get legal recourse under a befitting law, the opportunity for which currently does not exist.
In addition to showing the path for an important legal and social change, Dr. Bhowmic has demonstrated something else as well. Under a personal/private initiative, it is possible to bring a writ petition against any section of Bangladesh’s penal code, and if that initiative is logical and has legal robustness, then it is possible to get a ruling from the Court in favour of the writ. Everyone in Bangladesh should remain grateful to him for this. Until now, such petitions have been brought forward only by the country’s legal and human rights organizations. This is a first by a personal/private initiative of a Bangladeshi national. This sets an important precedent for days ahead.
Dr. Soumen Bhowmic has spent a considerable part of his fortune to bring us this initial victory. In addition to spending his own money, he has dedicated his personal life for this cause as well. He has obtained the written copy of the Rule Nisi attached below. Bangladesh government has 4 (four) weeks to respond from the date of this written copy which is April 26, 2022.
Update on March 13, 2025: There has been no response from the government (the now deposed Awami League government).
The Next Steps
The next step to resolve this issue is to conduct a series of hearings at the Court based on the positive Rule Nisi. I am waiting to gather sufficient funds to complete the legal process. If anyone wishes to help me with this please feel free to get in touch with me. You can at the least get aquainted with this whole endeavour and support it in your own way. I will provide further updates as and when.
বিগত ১১ জানুয়ারী ২০২১ তারিখে ক) ডাঃ সৌমেন ভৌমিক যিনি বাংলাদেশে ও বিলেতে একজন মানবাধিকার কর্মী, খ) তাসমিয়া নুহিয়া আহমেদ যিনি বাংলাদেশে একজন আইনজীবী এবং মানবাধিকার কর্মী এবং গ) ডাঃ এস এম সিদ্দিক হোসেইন যিনি “এম্পাওয়ারমেন্ট থ্রু লও অফ দা কমন পিপল (এলকপ)”-এর পরিচালক, সন্মিলিতভাবে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালতের উচ্চ আদালত বিভাগে ২০২১ এর ৫০৫ – এই নম্বরের একটি রিট আবেদন দাখিল করেছেন। এটি একটি জনস্বার্থ মোকদ্দমা এবং এটি এখন এনেক্স কোর্ট ৩৫-এর কাছে হস্তান্তরিত আছে। আপনি এই লেখাটির নিচের দিকে এই আবেদনটির একটি সত্যায়নকৃত অনুলিপির পিডিএফ দেখতে পাবেন।
বাংলাদেশের দন্ডবিধির ৩৭৫ ধারা একজন পুরুষ দ্বারা একজন নারীর ধর্ষণ নিয়ে লিখিত। এখানে একজন নারীর মাধ্যমে আরেকজন নারীর উপর অসন্মতিসূচক যৌন আক্রমণ, একজন পুরুষের উপর আরেকজন নারীর একই অন্যায়, একজন পুরুষের উপর আরেকজন পুরুষের একই কর্ম, এবং একজন রূপান্তরকামীর উপর একজন পুরুষ, নারী বা আরেক রূপান্তরকামীর আক্রমণ নিয়ে কোনও মনোযোগ দেয়া হয়নি। এর ফলে এই ধারায় ধর্ষিত পুরুষ এবং রূপান্তরকামীদের স্বীকার করা হয়নি।
বাংলাদেশের আইনি প্রক্রিয়ায় “ধর্ষণের” সংজ্ঞার একটা বড় ঘাটতি হচ্ছে যে এটির মাধ্যমে শুধু একজন মহিলার সাথে অসন্মতিসূচক যৌন মিলন বোঝানো হয়েছে। এর সাথে ব্যাপার আরও ঘোলাটে করা হয়েছে ৩৭৫ ধারায় উল্লেখ করা “অনুপ্রবেশ” শব্দটি দিয়ে, যার ব্যাখ্যা দেয়া আছে শুধু শিশ্ন দ্বারা যোনির অনুপ্রবেশ হিসেবে। এর ফলে পরিষ্কারভাবে বাচ্চা ছেলে এবং প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদেরকে এই আইনের পরিধি থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে।
২০০০ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার নারী ও শিশুদের প্রতিরক্ষা প্রদানের জন্য “নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০” নামের একটি আইন পাস করে। এটাকে ২০০৩ সালে সংশোধন করা হয় কিন্তু “ধর্ষণ” শব্দটির সংজ্ঞায় কোনও পরিবর্তন আনা হয়নি, যেখানে সেই শব্দটিকে প্রতিস্থাপন করে “যৌন আক্রমণ” জাতীয় একটি লিঙ্গ নিরপেক্ষ শব্দ বসিয়ে দেয়া উচিৎ ছিল।
এই আইনটি তার চোখে পুরুষ ও রূপান্তরকামীদেরকে অপরাধের শিকার হিসেবে চিহ্নিত করতে একেবারেই ব্যর্থ হয়। অতএব “অনুপ্রবেশ” শব্দটির অর্থটিকে বিস্তৃত করে এর মধ্যে শুধু “যোনি প্রবেশ” অন্তর্ভুক্ত না করে এর সাথে “পায়ু প্রবেশ”, “মুখ প্রবেশ” এবং শরীরের যে কোনও অঙ্গ দিয়ে আরেকজনকে প্রবেশ, অথবা যে কোনও বস্তু দিয়ে আরেকজনকে প্রবেশ – এগুলোকেও অন্তর্ভুক্ত করাটা এখন জুতসই। এটা নিঃসন্দেহে সত্যি যে পুরুষ, নারী বা রূপান্তরকামী দ্বারা উপরে উল্লেখিত অসন্মতিসূচক আক্রমণগুলোর ফলে আরেকজন পুরুষ, নারী ও রূপান্তরকামী মানুষের অভিজ্ঞতাটা একজন মেয়ে শিশু অথবা নারীর অভিজ্ঞতার মতো সমানভাবে পাশবিক এবং অতিশয় বেদনাদায়ক।
বাংলাদেশে অধিকাংশ শিশু যৌন অত্যাচারগুলোর অনুপ্রবেশগুলো “শিশ্ন-যোনি প্রবেশ” নয়। তথাপি, আইন প্রশাসনের কাছে এটা ব্যাপকভাবে গ্রহণীয় হয়ে উঠেনি যে একজন পুরুষ যখন ১৬ বছরের নিচে একজন ছেলে শিশুকে তার ইচ্ছায় বা তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে তার পায়ু প্রবেশ করে, তখন সেই পুরুষটিকে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর অধীনে অভিযুক্ত করা যায়। কোথাও এটা পরিষ্কার করে বলে দেয়া হয়নি যে এই পরিস্থিতির পায়ুসঙ্গমগুলো হচ্ছে “ধর্ষণ”-এর শামিল।
উপরন্তু, একজন পুরুষ যদি আরেকজন পুরুষের সাথে জোর পূর্বক পায়ুসঙ্গমে লিপ্ত হয়, তাহলে বর্তমানে সেই ধর্ষণের শিকার পুরুষটির কোনও আইনি আশ্রয় নেই। সম্প্রতি বিবিসি বাংলায় একটি সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের আইনমন্ত্রী জনাব আনিসুল হক উল্লেখ করেছেন যে অন্য পুরুষ দ্বারা পায়ুসঙ্গমে সন্মতি দেয়নি (অর্থাৎ ধর্ষণের শিকার) এমন একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ বাংলাদেশের দন্ডবিধির ৩৭৭ ধারার মাধ্যমে আইনি প্রতিকার পেতে পারে, যেই ধারাটি প্রকৃতি বিরুদ্ধ যে কোনও যৌনাচারকে অপরাধিকরণ করে এবং যেখানে মূলত পায়ুসঙ্গমকেই বোঝানো হয়েছে। এটা মন্ত্রীর উপলব্ধি হয়নি যে এই ধারার অধীনে জোর পূর্বক পায়ুসঙ্গমকারী আর সেটার শিকার উভয়ই দণ্ডিত হবে, এবং সেই কারণে আরেকজন পুরুষ দ্বারা এরকম জোর পূর্বক যৌনাচারের একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ শিকার কখনোই বিচার চাইতে আসে না।
৩৭৭ ধারা একই সাথে অমানবিক এবং অনৈতিক। এটি বিলেতি সাম্রাজ্যবাদের একটি অবশিষ্ট্যাংশ এবং সভ্য জগতে এটা এখন ব্যাপকভাবে স্বীকৃত যে প্রাপ্তবয়স্ক সমলিঙ্গের মানুষদের মাঝে সন্মতিসূচক যৌনাচারকে কখনোই দণ্ডিত করা যাবে না। এই ধারার বিরুদ্ধে আবেদন করাটা আরেক দিনের সংগ্রাম।
এই রিট আবেদনটি প্রার্থনা করেছে “ধর্ষণ” শব্দটির সংজ্ঞাকে প্রসারিত করে সেখানে যৌনাচারের প্রকার ও তাতে অংশগ্রহণকারীদের লিঙ্গ (পুরুষ বা নারী) উপেক্ষা করে সকল রকম জোর পূর্বক যৌনাচারকে অন্তর্ভুক্ত করতে। আবেদনটিতে সংশ্লিষ্ট সকল প্রকার যৌনাচারের বিস্তারিত দেয়া হয়েছে। এর ফলে সকল মানুষকে (জোর পূর্বক যৌনাচারকারী এবং তার শিকার উভয়কে যথারীতি আইনের শাসনে এবং আইনের আশ্রয়ে) আনা যাবে এবং বাংলাদেশের সংবিধানে নিশ্চিত করা আইনের চোখে সকলের সাম্যতা বজায় রাখা যাবে।
এই আবেদনটি বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যেহেতু যে কোনও মানুষ দ্বারা (অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পুরুষ) যৌন আক্রমণের শিকার কোনও পুরুষ বা রূপান্তরকামীর জন্য আইনি প্রতিকারের কোনও ব্যবস্থাই নেই।
এই রিটে ডাঃ সৌমেন ভৌমিক প্রাথমিকভাবে জয়ী হয়েছেন। গত রোববার (৯ এপ্রিল ২০২২) দেশের উচ্চ আদালত রিটের পক্ষে একটি কারণ দর্শানোর আদেশ (রুল নিসি) জারি করে। বাংলাদেশ সরকারকে এক মাসের মধ্যে এই আদেশ মেনে নেয়ার সিদ্ধান্ত জানাতে হবে অথবা এই আদেশের বিরুদ্ধে আপীল করতে হবে। একমাত্র ঘাউরামি ছাড়া এই আদেশের বিরুদ্ধে সরকার কেন আপীল করবে আমি তার কোনো যুক্তি খুঁজে পাচ্ছি না।
এর পরবর্তীতে কী হবে, যার মধ্যে শুনানি অন্তর্ভুক্ত, আমরা অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশের দন্ডবিধিতে ৩৭৫ ধারার একটি সংশোধিত এবং বর্ধিত সংস্করণ দেখতে পাবো যেটা বাংলাদেশের আইন ও বিচারের ক্ষেত্রে একটা বড় রকমের পরিবর্তন আনবে। বাংলাদেশে ধর্ষণের এই বর্ধিত সংজ্ঞা বড় রকমের একটা সামাজিক পরিবর্তনও আনবে। উদাহরণ, ধর্ষণের শিকার পুরুষরা একটা যথাযথ ধারার আদলে আইনের আশ্রয় নিতে পারবে, বর্তমানে যেটার সুযোগ নেই।
একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি ও সামাজিক পরিবর্তনের পথ দেখাতে পারার পাশাপাশি ডাঃ সৌমেন ভৌমিক আরেকটা জিনিষ দেখিয়ে দিলেন। ব্যক্তিগত উদ্যোগে বাংলাদেশের দন্ডবিধির যে কোনও ধারার বিরুদ্ধে রিট আনা যায় এবং সেখানে যৌক্তিকতা এবং আইনি দৃঢ়তা থাকলে আদালতের কাছ থেকে সেই রিটের পক্ষে আদেশ পাওয়া যায়। এর জন্য তার কাছে বাংলাদেশের সকলের কৃতজ্ঞ থাকা উচিৎ। এত দিন কেবল দেশের ভেতর আইনি বা মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মাধ্যমে এই রিটগুলো আনা হয়েছে। একজন বাংলাদেশি নাগরিকের ব্যক্তিগত উদ্যোগে এই প্রথম। এই দৃষ্টান্তটা আগামী দিনগুলোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ডাঃ ভৌমিক তার ব্যক্তিগত অর্থ থেকে একটা বিরাট অংশ ব্যয় করে আমাদেরকে এই প্রাথমিক বিজয়টা এনে দিয়েছেন। অর্থ ব্যয় ছাড়াও তিনি এটার পেছনে তার ব্যক্তিগত জীবনটা উৎসর্গ করে দিয়েছেন। তিনি আদেশটির লিখিত অনুলিপি এনেছেন যা নিচে দেয়া হলো। এই লিখিত অনুলিপির তারিখ অর্থাৎ ২৬ এপ্রিল ২০২২ থেকে ঠিক ৪ (চার) সপ্তাহের মধ্যে বাংলাদেশ সরকারকে তার উত্তর জানাতে হবে।
হালনাগাদ, ১৩ মার্চ ২০২৫: পদচ্যুত বিগত সরকারের কাছ থেকে কোনো উত্তর আসেনি।
পরবর্তী পদক্ষেপগুলো
এই সমস্যা সমাধানের পরবর্তী পদক্ষেপ হল এই ইতিবাচক রুল নিসির উপর ভিত্তি করে আদালতে ধারাবাহিক শুনানি পরিচালনা করা। আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য আমি পর্যাপ্ত তহবিল জোগাড়ের অপেক্ষায় আছি। যদি কেউ আমাকে এই বিষয়ে সাহায্য করতে চান, তাহলে দয়া করে আমার সাথে যোগাযোগ করতে দ্বিধা করবেন না। আপনি অন্তত এই পুরো প্রচেষ্টার সাথে পরিচিত হতে পারেন এবং আপনার নিজস্ব উপায়ে এটিকে সমর্থন করতে পারেন। আমি সময় মতো আপনাদেরকে আরো হালনাগাদ করবো।
1) Residential teaching in Madrasas must come to an end.
2) It must be made obligatory that pupils under the age of 12 are taught by female teachers.
3) In addition to Arabic and Quran-Hadith, all general subjects must be included in the syllabus.
4) All Qawmi Madrasas must be brought under the Education Ministry of Bangladesh.
5) There must be a regular doctor in every Madrasa.
6) If a pupil falls ill, he or she must be taken to a nearby hospital right away, and guardians and the nearest police station must be informed. Otherwise legal proceedings must be taken against the Madrasa authority.
7) A teacher or older student cannot use a pupil for personal and bodily favours.
8) Yearly sports competition and picnic must be arranged.
9) There must be facilities for pupils to play sports at a certain time of the day – it must be ensured that they have the freedom listen to music, watch TV, listen to radio and practice music – they must have the right to view all webpages that are available and permitted within the country.
10) Pupils under 18 cannot be taken to any political rallies, meetings, processions, demonstrations etc.
11) If a pupil prematurely dies due to the negligence of the Madrasa authority, then the authority must take all responsibility, and the family of the pupil must be given appropriate compensation.
12) Any residential pupil must be given a monthly health check.
13) Every Madrasa must have a counsellor who is independent of the Madrasa’s finances. He or she can be someone who has completed an internship at the nearest Medical University’s psychology department. He or she will sit with the pupils every week to discuss various issues and find solutions to problems.
14) All shower rooms and toilets in Madrasas must have a CCTV camera by the door so that two people cannot enter those places together.
15) If part of a room is not covered by CCTV camera, then a teacher cannot sit or lie on that place.
16) A Madrasa cannot be turned into an orphanage. There cannot be any affiliation between a Madrasa and an orphanage.
17) There must be a specific rehabilitation centre or an orphanage in each sub-district in Bangladesh, so that a group of dishonest “faith-traders” cannot capitalise on the orphans and open various “faith-trading” institutions in every alley, in every area. This is also so that the orphans do not suffer from social discrimination.
18) Madrasas for girls cannot have a male Principal.
19) Male pupils under the age of 18 should not be taught about issues to do with women’s menstruation and Islamic teachings regarding women in general.
20) Pupils in nearly all Madrasas wear clothes made of synthetic material which means they are covered most of the day from head to toe in uncomfortable garments. This gives rise to various skin diseases. That is why all pupils must be given comfortable uniforms made of cotton.
প্রস্তাবনায়ঃ সেন্টার ফর সেইফটি অফ মাদ্রাসা স্টুডেন্টস (সি এস এম এস)
১) মাদ্রাসায় আবাসিক শিক্ষা বন্ধ করতে হবে।
২) ১২ বছরের নিচের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে নারী শিক্ষক দ্বারা পাঠদান বাধ্যতামূলক করতে হবে।
৩) আরবি ও কোরআন-হাদিসের পাশাপাশি সকল সাধারণ পাঠ্যক্রম পাঠ্যতালিকায় রাখতে হবে।
৪) প্রতিটি কওমি মাদ্রাসাকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতাভুক্ত করতে হবে।
৫) প্রতিটি মাদ্রাসাতে একজন নিয়মিত চিকিৎসক থাকতে হবে।
৬) কোনো শিক্ষার্থী অসুস্থ হলে তাকে সাথে সাথে নিকটবর্তী হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে এবং অভিভাবক ও নিকটস্থ থানায় জানাতে হবে। অন্যথায় মাদ্রাসা কতৃপক্ষের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহন করতে হবে।
৭) কোনো শিক্ষার্থীকে মাদ্রাসার কোনো শিক্ষক অথবা বড় ছাত্র তাদের ব্যক্তিগত কোনো খেদমতের জন্য ব্যবহার করতে পারবে না।
৮) বাৎসরিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা এবং বনভোজনের ব্যবস্থা রাখতে হবে।
৯) দিনের একটি নির্দিষ্ট সময়ে শিক্ষার্থীদেরকে স্বাধীনভাবে খেলাধুলা করার ব্যবস্থা রাখতে হবে – গান শোনা, টিভি দেখা, বেতার শোনা ও সঙ্গীত চর্চার স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে – দেশের ভেতর লভ্য এবং অনুমোদিত সকল ওয়েব পাতা প্রদর্শন করার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
১০) ১৮ বছরের নিচে কোনো শিক্ষার্থীকে কোনো প্রকার সভা, সমাবেশ, মিটিং, মিছিল ও বিক্ষোভ অনুষ্ঠানে নেয়া যাবে না।
১১) মাদ্রাসা কতৃপক্ষের অবহেলায় যদি কোনো শিক্ষার্থীর অপমৃত্যু হয় তবে সমস্ত দায় কতৃপক্ষকে নিতে হবে এবং ঐ শিক্ষার্থীর পরিবারকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
১২) মাসে একবার আবাসিক শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে হবে।
১৩) প্রতিটি মাদ্রাসাতে একজন করে মনো-উপদেষ্টা থাকতে হবে, যিনি মাদ্রাসার কোন প্রকার লাভ বা ক্ষতির সাথে জড়িত থাকবেন না। তিনি শহরের মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগে ইন্টার্নশীপ (প্রশিক্ষণ জাতীয় কর্ম) করেছেন এমন কেউ হতে পারেন। তিনি প্রতি সপ্তাহে শিক্ষার্থীদের সাথে বসে বিভিন্ন বিষয়ে আলাপ-আলোচনা করবেন এবং সমাধানের ব্যবস্থা করতে পারবেন।
১৪) মাদ্রাসাগুলোতে প্রতিটি গোসলখানা এবং শৌচাগারের দরজায় সিসি ক্যামেরা রাখতে হবে, যাতে সেই জায়গাগুলোতে দুজন মানুষ এক সাথে প্রবেশ করতে না পারে।
১৫) একটি কক্ষের কোনো জায়গা সিসি ক্যামেরার আওতায় না থাকলে সেখানে কোনো শিক্ষক বসতে বা শুতে পারবে না।
১৬) মাদ্রাসাকে এতিমখানা করা যাবে না। মাদ্রাসার সাথে এতিমখানার কোন প্রকার সম্পৃক্ততা থাকতে পারবে না।
১৭) এতিমদের জন্য প্রতিটি থানায় আলাদা করে একটি নির্দিষ্ট পুনর্বাসন কেন্দ্র অথবা এতিমখানা করতে হবে, যাতে করে এতিমদের পুঁজি করে এক শ্রেণির অসাধু ধর্ম-ব্যবসায়ীরা পাড়া-মহল্লায়, আনাচে-কানাচে ধর্ম-ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খুলে বসতে না পারে, এবং এতিম বাচ্চাগুলোকে সামাজিক বৈষম্যের শিকার হতে না হয়।
১৮) নারীদের মাদ্রাসাগুলোতে পুরুষ মুহতামিম থাকতে পারবে না।
১৯) ১৮ বছরের নিচে ছেলে শিক্ষার্থীদেরকে নারীদের হায়েজ-নেফাস (মাসিক) সহ মেয়েলী মাসআলা-মাসায়েল (ইসলামি বিধি-বিধান) এর শিক্ষা দেওয়া যাবে না।
২০) প্রায় প্রতিটি মাদ্রাসাগুলোতে শিক্ষার্থীদের পোশাক কৃত্রিম কাপড়ের হয় এবং এতে করে দিনে অনেকটা সময় তাদের আপাদমস্তক অস্বস্তিকর পোশাকে ঢাকা থাকে। এতে তাদের বিভিন্ন চর্ম সমস্যা দেখা দেয়। তাই সকল শিক্ষার্থীদেরকে আনুষ্ঠানিক পোশাক হিসেবে আরামদায়ক সুতির পোশাক দিতে হবে।